
যেখান থেকে একবার ফিরে আসি, সেখানে আর ফিরে না যাওয়ার সেই পুরনো উপদেশটি অক্ষরে অক্ষরে পালন করার চেষ্টা করি। এতে এক ধরনের গোঁড়ামিও প্রতিষ্ঠিত থাকে। সময় ও পরিবেশ-পরিস্থিতির গুরুত্ব না দিয়ে নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকার মধ্যে এক ধরনের মৌলবাদিতাও টের পাই। তবু শেষ পর্যন্ত তা জিইয়ে রাখার মধ্যে যেন এক ধরনের রাজনৈতিক দৃঢ়তার মতো কিছু অনুভব করি।
জন্মস্থানটি নিয়েই কথা বলছিলাম। এ বাড়িটি বিক্রি করে চলে আসার পরে আর কখনো যাইনি। যেতে ইচ্ছা করে, দেখতে ইচ্ছা করে শহরের মধ্যে একমাত্র গাছপালা বোঝাই সেই বাড়িটার গাছগুলোর কথা। ওরা যেন ছিল আমার ছোটবেলার বন্ধু। বড় বড় চারটা পেয়ারা, তিনটা শরিফা, একটা বড়ই, দুইটা আম, একটা কাঁঠাল, দুটা ডালিম আর একটা আতা গাছ ছিল। ও বাড়িতে মাঝেমধ্যে মায়ের সঙ্গে গেলে গাছগুলো ছাড়া আর সঙ্গী ছিল না। মা রান্না করতেন আর আমি ঘুরে ঘুরে গাছগুলো দেখতাম। বড় পেয়ারা গাছটায় চাকু দিয়ে নিজের নাম লিখেছিলাম। লেখাটা এখনো দেখতে ইচ্ছা করে। যেদিন মনে পড়ে সেদিন রাতেই স্বপ্ন দেখি। আর নারকেল গাছটায় লিখেছিলাম বাংলা অক্ষরে। তারিখসহ। কেমন আছে সেই গাছগুলো! মাঝে মাঝে মা কিংবা বড় বোনেরা গেলে তাদের কাছে কাঁঠাল, পেয়ারা, ডালিম, আতা, শরিফা প্রভৃতি গাছের মৃত্যুসংবাদ পাই। বড়ভাই-বোনদের লাগানো গাছগুলো নেই অথচ বাবা প্রয়াত কিন্তু বাবার হাতে লাগানো নারকেল গাছটাই নাকি জীবিত আছে।
বড় ঘরের দেয়ালের চুনকামের ভেতর লুকানো আছে বড় ভাইজানের চিত্রকর্মগুলো। তিনি কি মাইকেল এঞ্জেলো বা ভিঞ্চি বা রেনেসাঁ যুগের চিত্রশিল্পীদের মতো চার্চের দেয়াল, গম্বুজ, ছাদ ইত্যাদি অঙ্কন করার দৃশ্য রোমান্টিকভাবে কল্পনা করে এসব এঁকেছিলেন! তিনি তো রোমান্টিক ছিলেন বলে জানি না। তার রেখে যাওয়া কবিতাগুলোতে তেমন প্রমাণ পাই না। সেই দেয়ালের চুনকাম ঘষলে ছবিগুলো কি এখনো দেখা যাবে! সচেতনভাবেই ভুলে থাকতে চাই ওই বাড়িটার কথা। কিন্তু অবচেতন মন স্বপ্নে দেখায়। না হলে এখনো কেন আমার বইগুলোতে জন্মস্থান হিসেবে বাড়িটার কথা লিখি?
অনেক কিছু ভুলে থাকার জন্য মাঝে মাঝে ঠাট্টা-মশকরাও করি। যেমন, সুলতান শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ তার পুত্র সুলতান সিকান্দার শাহ এবং তার পুত্র সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহকে আমাদের দুলাভাই বলি। তারা হয়তো বিষয়টা জানেন না। তারা বাঙালি ছিলেন না বলে জানেন না ‘দুলাভাই’ কাকে বলে, আর আমাদের সামাজিক অবস্থায় সম্পর্কটাই বা কেমন। যদিও ‘দুলহা’ শব্দটা আমাদের না; ‘ভাই’ও না। তাদের সঙ্গে সম্পর্ক রচিত হয়েছে আমাদের এখানে বিয়ে করেছিলেন বলে। বাপে-পুতে-নাতি সবাই দুলাভাই! বিষয়টা আমাদের কাছে হাসির, কারণ তাদের স্বজন ও পরিজনদের চিনি না। এলাকার খাতিরে রাজকীয় সম্পর্ক মাত্র!
এদের মধ্যে সুলতান সিকান্দার শাহের নামটা আমার কাছে বেশি পরিচিত। আমার পাঠকের কাছেও। তারা জানেন আমার প্রতিটি বইয়ে জন্মস্থান হিসেবে তার নামে নামকৃত সড়কটির কথাই আছে। সড়কটি বেশি বড় না, প্রশস্তও না। নয় নম্বর বাড়িটিতে আমার জন্ম। সর্বমোট আঠারো নম্বর পর্যন্ত সম্ভবত বাড়ি আছে। গৌড়ের এই সুলতানকে যারা সোনারগাঁয়ের শাসক ভেবে নিজেদের এলাকায় তার নামে একটি রাস্তার নামকরণ করে নিজেদের ধন্য করতে চেয়েছেন তারা সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করে একশ মিটার দীর্ঘ এই সড়কটিতে এনে সীমাবদ্ধ করেছেন এই বিরাট সম্রাটকে।
তাতে আমার কিছু যায় আসে না। কারণ সুলতান সিকান্দার শাহ কিংবা ইলিয়াস শাহী বংশের কোনো সম্র্রাটের সঙ্গে আমার স্বার্থগত সম্পর্ক নেই। দুলাভাই পরিচয় দিলেও ডাকার সুযোগ নেই। যদিও বাংলা ভাষায় ‘দুলাভাই’ শব্দটি সম্পূর্ণ ব্যবহারিক। এমন শব্দ ব্যবহার না করা হলে এর গুরুত্ব থাকে না। সম্পর্কটা অনেকটা বলা যায় কাইনেটিক; পোটেনশিয়াল নয়। ডাকাডাকি না করলে দুলাভাইয়ের দাম নেই।
আমার বরং স্বার্থগত সম্পর্ক আছে এই রাজবংশের দুইশ বছর পরের হোসেন শাহী রাজবংশের সঙ্গে। কারণ আলাউদ্দিন হোসেন শাহের স্বর্ণযুগে তার অনুপ্রেরণায় যে সব বাংলাসাহিত্য রচিত হয়েছে সবগুলোর নাম বলতে পারিনি বলে অনার্স পরীক্ষায় ভালো ফল অর্জন করতে পারিনি। আর সে কারণেই জীবনে একটা স্থায়ী চাকরি হল না। সরকারি চাকরির বয়স গেছে। এখন বেসরকারি চাকরির বয়সটাও যাচ্ছে। সন্তানদের মুখের দিকে তাকালে বুকে দীর্ঘশ্বাস ওঠে। সারাটা জীবন দার্শনিকের তত্ত্বের মতো খণ্ডিত চাকরিই করে গেলাম। হোসেন শাহ সম্পর্কে মমতাজুর রহমান তরফদারের মতো ইতিহাসবিদ অনেক কিছু লিখে গেছেন, সেগুলোও জানি না। কী লিখেছেন তিনি! আমি তো আর ইতিহাসের ছাত্র ছিলাম না যে, মমতাজুর রহমান তরফদারের ইতিহাস পড়তে হবে। তবে শিক্ষকেরা জানিয়েছেন, সাহিত্য পড়তে এলে চণ্ডীপাঠ থেকে জুতো সেলাই পর্যন্ত সবকিছু জানতে হবে। এসব ব্যাপারে পড়তে হবে। অথচ আমি দেখেছি আমার এক বান্ধবী এক স্যারকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘কোচবিহার’ বলতে কী বোঝায়? সে আর সবার মতোই কোচবিহারকে উচ্চারণ করেছিল ‘কুচবিহার’। স্যার ভিলেনি হাসি হেসে বলেছিলেন, দেখ, শুনলে তো বিষয়টা তোদের কাছে ভালো লাগবে না। শরমও লাগতে পারে। ‘কুচ’ অর্থ কুমারী নারীর স্তন, আর ‘বিহার’ অর্থ ভ্রমণ। এবার বুঝে নে।
আমাদের ক্লাসের অনেকেই বুঝেছিল, যে হাত কুমারী নারীর স্তনে ভ্রমণ করে সেই হাতকে ‘কুচবিহার’ বলা হয়। অনেকটা বহুব্রীহি সমাসের বহুল ব্যবহৃত উদাহরণ ‘বীণাপাণি’র মতো। তবে আমার আরেক বান্ধবী বলেছিল, ‘বীণাপাণি বলতে হাত না বুঝিয়ে একজন হাতওয়ালা ব্যক্তিসত্তাকে বোঝায়, তিনি হলেন দেবী সরস্বতী। কিন্তু কুচবিহার বলতে কোন ব্যক্তিসত্তাকে বোঝাবে?
সবাই একযোগে চিৎকার বলে বলেছিল, ‘কেন, এই স্যারকেই।’
তারপরে অনেক ইতিহাস হয়ে গেছে। সেই স্যার কবিতা লেখার কথা বলে আমাদের চেয়ে বয়সে ছোট কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় এক বছরের সিনিয়র পুষ্প— যাকে আমাদের ‘পুষ্প আপু’ বলে ডাকতে হতো, তাকে বাংলা একাডেমি আর কোথায় কোথায় নিয়ে গিয়েছিলেন সে সব কথা উঠতে লাগল। পুষ্পআপুও কেন এই স্যারকে ‘লুচ্চা’ বলে গালি দেয় তার অলিখিত ইতিহাস মুখে মুখে জানলাম। আমার ঠোঁটকাটা বান্ধবী পুষ্পের বুকের দিকে চেয়ে আমাদের কাছে ফিসফিস করে বলত, ওখানে কি সত্যি ঐ স্যারের ওই বিরাট পাঞ্জার হাতগুলো ভ্রমণ করেছে?
লাজুক বান্ধবীটি বলত, ওখানে কি দাগ লেগে থাকে?
এই কথায় আমরা সবাই থেমে গিয়েছিলাম। কারণ সত্যি, অনেক অপরাধেরই দাগ থাকে না।
আলাউদ্দিন হোসেন শাহ সম্পর্কে ওই স্যার কিছুই জানতেন না। ডক্টর আহমদ শরীফের ভক্ত এবং ছাত্র, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধে বিতর্কিত একজন স্যার আলাউদ্দিন হোসেন শাহ সম্পর্কে অনেক কিছু বলেছিলেন। ততদিনে অন্য সেমিস্টারে আমরা রেজিস্ট্রেশন করে ফেলেছি। রাজাকার ঐ স্যারের কথা যদি সত্য হয়ে তাকে, তাহলে বলতে হয়, ভাগ্য ভালো যে আমাদের দেশের মৌলবাদীরা ইতিহাস পড়ে না। আলাউদ্দিন হোসেন শাহ সম্পর্কে জানে না। না হলে ওয়াজ-মাহফিলে বলে বেড়াত যে, বাংলা বা হিন্দুস্তানের মাটিতে জন্মগ্রহণকারী যে কোনো শাসকের তুলনায় মক্কায় জন্মগ্রহণ করা সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহ অনেক ন্যায়পরায়ণ, বেশি যোগ্য ও সুশাসক ছিলেন। সুতরাং আমাদের উচিত মক্কার লোকদের অনুসরণ করা।
পরে ড. আজহার ইসলামের বাংলার প্রাচীন ও মধ্যযুগের সাহিত্যের ইতিহাস পড়ে আলাউদ্দিন হোসেন শাহ সম্পর্কে একটা বাজে ধারণা সৃষ্টি হয়েছিল মনে। তিনি লিখেছেন, সত্যপীর, বড়মিয়া বা গাজি মিয়া বলে পরিচিত পীর ইসমাইল গাজি নাকি আলাউদ্দিন হোসেন শাহের ঔরসজাত অবৈধ সন্তান। বিষয়টা ভাবতে বড় ঘৃণা লাগত। সময় মতো বিয়ে করে একটা বৈধ সন্তান জন্ম দিতে পারছি না, সেখানে অবৈধ সন্তান মেনে নেই কেমন করে! আমার ঠোঁটকাটা বান্ধবী অবশ্য অমুসলিম হলেও ফতোয়া দিয়ে সুলতানকে বাঁচিয়ে দিত। সে বলত, আরে তখন তো দাসী-বান্দিদের সাথে সেক্স করা জায়েজ ছিল। তাহলে সন্তানটা নাজায়েজ হয় কেমন করে!
তবু মানতে পারতাম না। আলাউদ্দিন হোসেন শাহের বৈধ সন্তান সুলতান নসরত শাহ তো অবৈধ সন্তান ইসমাইল গাজির মতো মহান হতে পারেননি। এই ইসমাইল গাজীর মাজারের আশে-পাশে অনেক কবি-সাহিত্যিকের জন্ম হয়েছে। এর মধ্যে ভারতচন্দ্রের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। গাজীর মাজারে আগত হিন্দু-মুসলমান সব ধর্মের, পেশার ও শ্রেণীর লোকদের মিশ্রভাষা গ্রহণ করেছিলেন ভারতচন্দ্র। তাছাড়া সৈয়দ হামজা, শেখ ফয়জুল্লাহও দোভাষী সাহিত্য রচনা করেছেন। তার মানে মরহুম গাজী সাহেবের সমাধির শক্তি ইতিহাসের পাতার নসরত শাহের চেয়ে বেশি। নুসরাত শাহের নামটা বলতে গেলে মোগলদের মতো শব্দটা তরবারির ঝনঝনানির মধ্যে হারিয়ে যায়।
ভেতরে কোনো গোপন ঈর্ষা ছিল কি না জানি না। অবৈধ সন্তান এত বড় হল কেন, এটাই যেন আমার পক্ষে মেনে নিতে কষ্ট হতো! পরে মমতাজুর রহমান তরফদারের ইতিহাস থেকে পড়ে একদিন অন্য এক স্যার শোনালেন, আলাউদ্দিন হোসেন শাহের রাজত্বকালের আগে সুলতান রুকনুদ্দিন বারবাক শাহের আমলেই ইসমাইল গাজীর মৃত্যু হয়। রুকনুদ্দিন বারবাক শাহের রাজত্বকাল ১৪৫৯ থেকে ১৪৭৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। আর আলাউদ্দিন হোসেন শাহ ক্ষমতায় আসেন ১৪৯৪ খ্রিস্টাব্দে।
বান্ধবীর কথায় হোসেন শাহের চরিত্র আবার উজ্জ্বল হয়ে উঠল। আমি কোনো কথা বললাম না। স্যার আমার মুখের দিকে চেয়ে রইলেন, আসলে আমি কি হোসেন শাহের সম্পর্কে ভালো নাকি মন্দ ধারণা নিয়ে ক্লাস থেকে বেরোতে চাই এটা যেন স্যার কিছুতেই বুঝতে পারছিলেন না। ইসমাইল গাজীর সময়কালের চেয়ে যেন আমার মনোভাব বেশি রহস্যময় হয়ে আছে আমার চেহারায়। যা আমি দেখতে পারছিলাম না—শুধু আয়নার মতো স্যারের চেহারায় প্রতিফলিত আমার মনের চেহারা পড়ে বুঝতে পারছিলাম। ক্লাস থেকে বেরিয়ে বললাম, আচ্ছা আমি যদি তখন বেঁচে থাকতাম। আমার যদি তোর চেয়ে সুন্দরী একটা দাসী থাকত, তাহলে কেমন হতো?
বান্ধবী বলল, তাহলে তুই পাকা বদমাশ হইতি।
কথাটা বুঝলাম না।
তোর ঐ রকম দাস-দাসী রাখার সঙ্গতি নাই বলেই বদমাশ হইতে পারস নাই। সুযোগ পাস নাই বলেই ভালা হইয়া আছিস।
তার মানে দারিদ্র্য মোরে করেছে মহান!
ঠিক।
মনে মনে ভাবলাম, একেবারেই ঠিক না। অভাবের লম্বা জিভ আমার কত আকাক্সক্ষা চেটেপুটে শুকিয়ে রেখেছে। কত প্রয়োজন অপূর্ণ রেখে দিয়েছে। বাবার মৃত্যুর কয়েকদিন আগে কত সামান্য একটা বিষয়ে কেমন ডাহা মিথ্যা কথা বলতে পেরেছি। একবার ইচ্ছা হল কথাটার প্রতিবাদ করে বিষয়টা ওকে খুলে বলি, কিন্তু ওর চোখে-মুখে আলাউদ্দিন হোসেন শাহের রাজত্ব দেখে চুপ করে রইলাম।
পাসটাস করে বেরিয়ে গিয়েছি। নম্বর যা পাওয়ার তাই পেয়েছি। হোসেন শাহের চরিত্রের ভালো-মন্দে আসলে আমার কিছুই যায় আসে না।

