॥ পর্ব-৯॥
ভারী ভারী ওষুধের কার্টন কাঁধে করে নেয় বাবা। বড় বড় গ্যালনে জল ভরে নেয় দোকানের জন্য। বাবা অনেকটা বুড়ো হয়ে গেছে, সোনালী তাকিয়ে তাকিয়ে ভাবে। কবে যে সে দায়িত্ব নিতে পারবে! দীপুর পড়ার খরচটা যেন চালাতে পারে নির্বিঘ্নে একটাই ভাবনা সারাক্ষণ। কিন্তু ভাগ্য যেন আরও কঠিন সময়কে বেছে নিলো। সত্যনারায়ণ যে ওষুধের দোকানে কাজ করে, তার মালিক লিভারের সমস্যায় ভুগে মারা গেলো। দোকানটা বন্ধ হয়ে গেলো এবং সত্যনারায়ণ কাজটা হারালো। এই বয়সে কাজ হারিয়ে দিশেহারা সত্যনারায়ণ। ছেলেমেয়েরা সবাই স্কুলে যায়, সংসারের খরচ, কিভাবে কী করবে কিছুই বুঝে উঠতে পারে না।
এদিকে দীপু হঠাৎ তার এক জন্মদিনে জেদ করে বসলো। জন্মদিনে পার্টি করতে হবে। দীপু দেখে অন্য প্রায় সব মা তার সন্তানের জন্মদিনে ক্ষীর, পায়েস রান্না করে আশেপাশের বাচ্চাদের খাওয়ায়। সকালবেলা শিব মন্দিরে যাওয়া, সারাদিন নিরামিষ খাওয়া, পূজার আসনে প্রদীপ জ্বালিয়ে রেখে, ক্ষীর রান্না করে সবাইকে খাওয়ানো, পুরি আলুর দম বিতরণ করা; একটা আনন্দময় দিন তৈরি করে সন্তানদের জন্য। দীপুর খুব কষ্ট হয় তাদের বাবা মা কেন এমন কিছু করে না তার জন্য। তার কোনো দিদির জন্যও কিছু করতে দেখেনি দীপু কখনো। এবার তার জিদ, জন্মদিনে তার অনুষ্ঠান করতেই হবে।
দীপু সবার বাড়িতে গিয়ে খেয়ে আসে, কখনো খাওয়াতে পারে না কাউকে, এটা খুবই অপমানজনক। এবার কিছু একটা করতেই হবে। পরের সোমবার দীপুর জন্মদিন। বাড়ির কাউকে কিছু না জানিয়ে দীপু আশেপাশের সবাইকে জন্মদিনের দাওয়াত দেয়। আভাকে অনেক অনুরোধ করে দীপু অনুষ্ঠান করার জন্য। কিন্তু মা কিছুতেই রাজি হচ্ছে না দেখে সে নিজেই দাওয়াত দিয়ে আসে সবাইকে। শনিবার সকালে দীপু মাকে জানায় সবাইকে দাওয়াত দেওয়ার কথা। আভা ভীষণ রেগে যায় এসব কথা শুনে।
দীপু অস্থির হয়ে ওঠে। অনেক কঠিন কথা শোনায় মাকে। তার পরিবার তার জন্য কিছুই করছে না। ভিক্ষা করে হলেও দীপুর সম্মান তাদের বাঁচানো উচিত। সংসারে যুদ্ধ করতে করতে ক্লান্ত আভা। ছেলের মুখে এমন কথা শুনে রাগে দুঃখে নিজেকে সংবরণ করতে না পেরে দীপুর গালে ঠাস করে এক চড় লাগালো আভা। সোনালী এসে ভাইকে জড়িয়ে দরে সরিয়ে নিয়ে যেতে চাইলো। কিন্তু বেশ বেগ পেতে হচ্ছিল আভার। এমন সময়ে দীপু এক ঝটকা মেরে উঠে দাঁড়ালো। সোনালীকে ওই হাড্ডিসার হাতে এক ধাক্কা মেরে ফেলে দিলো। সোনালী মেঝেতে ছিটকে পড়ে গেলো। সোনালীর ধাক্কায় হাড়ি পাতিল ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়লো। আভা চিৎকার দিয়ে উঠলো। দীপুর পিঠে দুমাদুম মারতে লাগলো। কান্নায় ভেঙে পড়লো আভা। আদরের ছেলেকে এভাবে মারতে বুকটা ভেঙে যাচ্ছে আভার। এমন সময়ে সত্যনারায়ণ ঘরে ঢুকলো। ঘরে ঢুকে দেখলো আভা আর বড় মেয়ে সোনালী মেঝেতে পড়ে আছে। মাঝে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে দীপু। সত্য নারায়ণ চিৎকার করে বলে উঠলো, কী হয়েছে? তখন দীপু তার বাবার সমর্থন পাওয়ার আশায় ঘটনার বর্ণনা দিতে লাগলো। আর কেউ না বুঝলেও তার বাবা দুঃখ বুঝবে এই আশা ছিলো দীপুর।
দীপু জানতো না তার বাবা এমন আচরণ একদম পছন্দ করবে না। ততক্ষণে আভা আর সোনালী মেঝে থেকে উঠে দাঁড়িয়েছে। সত্যনারায়ণের দিকে তাকিয়ে আছে সবাই। আভা বা সোনালী কেউ কিছু বললো না। হঠাৎ সত্যনারায়ণ চুপচাপ ঘর থেকে বের হয়ে গেলো। কেউ কিছু বুঝতে পারছে না। দীপু ট্রাংকের ওপর আত্মবিশ্বাস নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। সত্যনারায়ণ বাইরে থেকে একটি লাঠি হাতে ফিরলো। এরপর দীপুর দিকে লাঠি তাক করে বললো, তুমি তোমার মাকে মারলে কেন? এই ঘটনার পর দীপু শান্ত হয়ে গেলো অনেকটা। সোনালী টিউশন করাতে চাইলো। কিন্তু আশেপাশের গ্রামগুলোতে টিউশনের জন্য কেউ পয়সা খরচ করতে রাজি হলো না।
সোনালী শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন দেখে। কিন্তু তার জন্য ডিগ্রি দরকার। পরিবারের যে অবস্থা তাতে পড়ালেখা চালানো খুব কঠিন হয়ে পড়লো। দু মাস পরেই মাধ্যমিক পরীক্ষা। এই অবস্থায় পড়ালেখা বন্ধ করতেও পারবে না সোনালী। অথচ বাড়িতে দু বেলা খাবার জোগাড় করাই কঠিন হয়ে পড়েছে এখন। ঠিক এই সংকটের সময় বিশাল মনের পরিচয় দিলো বেবি। পাগলামি করে স্কুল পালানো মেয়েটা বিজ্ঞ মানুষের মতো প্রস্তাব রাখলো। সে পাশের গ্রামে গৃহকর্মীর কাজ করবে। দু বেলা খাবারের জোগাড় তো হবে সবার। দিদির পরীক্ষা শেষ হলে সে কোনো একটা কাজ খুঁজে পেলে এই গৃহকর্মীর কাজ ছেড়ে দিবে বেবি। দিদির স্বপ্নটা পূরণ হোক। সবাইকে হাতজোড় করে অনুরোধ করে বেবি। তাকে পরিবারের জন্য এই কাজটুকু করার সুযোগ দেওয়া হোক।
রাস্তার মাস্টার ॥ পর্ব-৮॥ শারমিন রহমান

