আয়লান কুর্দির কথা কি সবাই ভুলে গেছেন? এ যুগে মিডিয়ার চেয়ে গতিশীল আর কী আছে! সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের সময় ইউরোপে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয়-প্রার্থী পরিবারের সঙ্গে ইজিয়ান সাগর পাড়ি দিতে গিয়ে ডুবে মারা গিয়েছিল দুবছর বয়সী আয়লান কুর্দি।
আনিস ছয় মাস পরে তার ছেলে আহমারকে একদিন লালরঙের একটা জ্যাকেট পরানোর পরে হঠাৎ চমকে উঠল। কী ভয়াবহ অবস্থা! এ যে আয়লান কুর্দি! উপুড় হয়ে বিছানায় শুয়ে আছে। হাত দু’টি দেহের দুই পাশে। ছোট্ট জুতো পরা পা দুটি সোজা। যেন ইজিয়ান সাগরের বেলাভূমিতে পড়ে আছে।
সুমা রান্না ঘরে ছিল। আনিস দ্রুত বিছানায় গিয়ে ছেলের গলার নিচে হাত রেখে স্পন্দন দেখল। পৌষ মাসেও তার শরীর ঘেমে উঠল। ছেলের স্পন্দন দেখে আর পিঠের ওঠানামা দেখে স্বস্তি বোধ করল। এ সময় সুমা ঘরে এসে দেখল, আনিস ছেলের গায়ে হাত দিয়ে রেখেছে। কী যেন দেখছে। সে জিজ্ঞাসা করল, পোলারে জাগাও ক্যান? খাওনের কিছু আনছ?
আনিস কিছুটা লজ্জা পেয়ে গেল। দুই বছরের ছেলেটা তার কতকিছুই খেতে চায় কিন্তু সে প্রতিদিন আনতে পারে না। সামান্য বেতনের চাকরি। তিন কিলোমিটার মাত্র দশ টাকা ভাড়া দিয়ে প্রতিদিন অফিস থেকে ফেরে। পুরোটা পথ পায়ে হেঁটে এলে দশটি টাকা বাঁচে। মাঝে মধ্যে এ টাকায় বাড়ির কাছের মোড়ের দোকান থেকে একটা চিপস কিনে আনে।
চিপস নাকি জাংক ফুড; এতটুকু শিশুকে খাওয়ানো নিষেধ। তবু সে এটাই আনে। এর বেশি সে আনতে পারে না। আর প্রতিদিন অফিস থেকে হেঁটে আসতেও পারে না। রাস্তায় প্রচণ্ড ধুলো। নাকে-মুখে ঢোকে। রাতে শ্বাসকষ্ট হয়। নাক বন্ধ হয়ে থাকে। ঘুমের ভেতর দম বন্ধ করা ভয়ঙ্কর দৃশ্য দেখে ঘুম ভাঙে। নাক বন্ধ বলে শ্বাস টানতে পারছে না। সারাশরীর তখন কাঁপতে থাকে। ঘেমে ওঠে। গলা শুকিয়ে যায়। উঠে গেলাস থেকে পানি খেতে হয়। আবার গলার ভেতর শাঁই শাঁই শব্দ হয়। সাগুর মতো দানা দানা হয়ে থাকে কফ। শ্বাসনালীতে আঠার মতো লেগে থাকে। অনেকক্ষণ ধরে কাশলে সামান্য একটু কফ বেরিয়ে এলে নিজের দশ বছরের আয়ু বেড়ে গেছে বলে মনে হয়। কিন্তু আধ ঘণ্টা পরে আবার সেই অবস্থা। তাই সে মাঝে মাঝে হেঁটে আসে। ছেলের মুখে কিছু দেওয়ার জন্য চাইলে সে সর্বদাই হেঁটে আসতে পারে। কিন্তু ছেলের জন্য তো তাকে সুস্থও থাকতে হবে। বেঁচে থাকতে হবে। না হলে কে তখন ছেলেকে দেখবে! সুমার বয়স তার তুলনায় প্রায় অর্ধেক। আর সুমা দেখতেও অনেক সুন্দরী। গরিব বলেই সুমা আনিসের ঘরে ঘরনী হয়েছে। কিন্তু আনিস যদি হঠাৎ মারা যায় বা অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে থাকে সুমা ছেলেকে ফেলে রেখে চলে যেতে পারবে। আবার তাকে যেকোনো পরিবারে বিয়ে দেওয়া যাবে। কাজেই আনিসকে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে বেঁচে থাকতে হবে। মানুষের বেঁচে থাকার মধ্যে যে এমন অদৃশ্য প্রতিদ্বন্দ্বীর প্রতি গোপন ঈর্ষা থাকে এটা আনিস জীবনে ভাবতেও পারেনি। কেউ তাকে বলেনি।
সুমাকে কিছু বলল না আনিস। শুধু ছেলেকে ঘুরিয়ে সামান্য কাত করে শুইয়ে দিল। যেন তাকে ইজিয়ান সাগরতীরের আয়লান কুর্দির লাশের মতো না দেখা যায়। একটা কাঁথাও টেনে গায়ে দিয়ে দিল। আর পা থেকে জুতা দুটি খুলে নিচে রেখে দিল। সুমা বলল, ভারী জ্যাকেটটা গায়ে আছে, আবার কাঁথাও দিলা? ঘামায়া যাইব তো!
এবার আনিস সুমাকে বলল, আরে নাহ।
মা-বাবার কথাবার্তা শুনে আহমার জেগে উঠল। সোজা বসে পড়ল বিছানায়। যেন মাত্র এক সেকেন্ডের ব্যাপার! ঝট করে উঠে বসে পড়েছে। চুলগুলো কপালের দুই দিকে বেড়ে আছে। চুলগুলো কাটানো প্রয়োজন। দোকানে নিলে শিশুদের চুল কাটাতে সময় বেশি লাগে, তাই টাকাও বেশি চায়। সুমা বলছে একটা ব্লেড এনে দিলে সব চুল ছেঁচে ফেলে দেবে। আনিস ছাঁচতে দিতে রাজি না। ছেলেটা বাবার দিকে চেয়ে হাসছে। সামনে ওপরের পাটিতে শাদা দাঁতগুলো ফুটে আছে। আনিস আবার চমকে উঠল। এ যে বাবার কোলে আয়লান! লাল জ্যাকেট পরা। নীল ট্রাউজার! সামনের দাঁতগুলো স্পষ্ট দেখা যায়। ঠোঁট দুটি একটু প্রসারিত। পত্র-পত্রিকায়, টিভির খবরে তো জীবিত আয়লানের এই ছবিটাই দেখানো হয়েছে। ‘উহ্’ করে আনিস আর্তনাদ করে উঠল। ছেলে বাঁচবে তো!
সুমা কিছুই ভেবে পেল না। সে আনিসের যন্ত্রণাটা বুঝল কিন্তু কারণ জানল না। সে জিজ্ঞাসা করল, কী হইছে কওনা!
আনিস বলল, না। কিছু না।
তা হইলে এমন করতাছ ক্যান?
না। তেমন কিছু না। আমি ভাবছি, লাল জ্যাকেটটা পাল্টায়া আনমু। আমার কাছে ভালা লাগে না।
এবার যেন সুমা রেগে গেল। ক্যান লাল জ্যাকেট তোমারে কী ক্ষতি করছে? সবাই কয় এই জ্যাকেটায় অরে মানাইছে আর তুমি কও ভালা লাগে না। তোমার কাছে কী ভালা লাগে? বাপ হইয়া জীবনে পোলারে দামি একটা জামা আইন্না দিছ? ফুটপাতের থিকা পুরান একটা জ্যাকেট আনছো, হেইটা আবার চাও পাল্টায়া আনবা। এইটা পরলে সবাই ওরে কয় বিদেশি বাচ্চার মতন লাগে। বাপ হইয়া পোলার ভালা চাও না। এইটা ভালা না লাগলে আরেকটা কিন্না আনো।
সুমার এতগুলো কথার মধ্যে আনিসের কাছে একটারও সদুত্তর নাই। সে চুপ করে রইল। মনে মনে ভাবল বেশি সুন্দরী মেয়ে বিয়ে করলে কত কথাই শুনতে হয়। দেমাগ কি কমবে না? আনিসদের বাড়ি নেই, বিক্রি করে বাবার চিকিৎসা করানো হয়েছিল। কিন্তু বাবা বাঁচেননি। মায়ের ওয়ারিশ ছিল নানাবাড়ি। নানারা অনেকটা সম্পন্ন। কিন্তু মামারা তার মাকে এটা-সেটা ছোট-খাটো নানা কিছু দিয়ে ভুলিয়ে ভালিয়ে শেষ পর্যন্ত পাওনা ওয়ারিশ লিখিয়ে নিয়ে গেছে। এরপর থেকে সে নানা-মামাদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখেনি। আনিসের বিয়ের কথাবার্তার সময় মামারা ছিল। এর পর থেকে ওই বাড়ির লোকজন এমনকি সুমাও খোটা দেয়, তোমার মামারা না এত্ত বড় লোক! কওনা একটু হেল্প করতে।
আনিস এসব ক্ষেত্রে কোনো কথা বলে না। সে পোস্টঅফিসের সামান্য চাকরিজীবী। এই বেতনে সে ঘর ভাড়া করে বউ-বাচ্চা নিয়ে থাকে। তার কাছে টাকা নেই বলে সে চুপ করে থাকে। টাকার অভাবে যে মানুষকে চুপ হয়ে থাকতে হয় এই অভিজ্ঞতা তার নতুন। ছোটবেলা থেকেই তারা দরিদ্রজীবন যাপন করে এসেছে। ক্রিকেট খেলার একটা বল ছিল না, নদীর পাড় থেকে শুকনো কচুরিপানা সুতলি দিয়ে পেঁচিয়ে বল বানিয়ে খেলেছে। একটা ব্যাট কোনোদিন পায়নি। নদীর ঘাটে ভিড়ে থাকা নৌকার পাটাতন থেকে একটা তক্তা চুরি করে দা দিয়ে কুপিয়ে ব্যাট বানিয়ে খেলেছে। কিন্তু খেলার মাঠে বা স্কুলে কোথাও সে কখনো চুপ থাকেনি। কেউ একটা বললে সে তিনটা শুনিয়ে দিত। বিয়ের পর থেকে তার কথাবার্তা কমে আসতে থাকে। এখন তার এই নতুন অভিজ্ঞতা।
ফুটপাত থেকে আরেকটা জ্যাকেট কেনার টাকা আনিসের কাছে নাই। কথার মারে সে নিরুপায়। সে কোথায় যাবে! ছেলেটাকে দেখতে অবিকল আয়লান কুর্দির মতো লাগছে। এতে তার মনে ভয় লাগছে। ছেলেটাকে এমন লাগছে কেন? আল্লাহ কি ওকে তার বুকের ভেতর থেকে ছিনিয়ে নিয়ে যাবে! আরেকটা সন্তান নেওয়া উচিত ছিল। সুমা কিছুতেই রাজি হয় না। এক সন্তানে হৃদয় ভরে না। আবেগ হয়ে ওঠে এককেন্দ্রিক। আবেগ বিকেন্দ্রিক না করলে মানুষ নিজেই বিপন্ন বোধ করে। ঢাকা জিপিওর এক কর্মচারী আলমগীর ভাই একদিন এই কথাটা বলেছে। তার যদি একমাত্র সন্তানটা আল্লাহ না করুক একটা কিছু হয়ে যায় তখন চাকরি করার মতো সুস্থ সে থাকবে না। কাজেই সন্তান গেলে স্বাস্থ্য যাবে, চাকরি যাবে, সংসার যাবে সবই যাবে। আরেকজন থাকলে তাকে নিয়ে তো অন্তত বেঁচে থাকা যাবে!
আনিস তাহলে কোথায় যাবে! সে এই সামান্য বেতনের চাকরিতে আরেকটা সন্তান নিলে সংসারের খরচ বাড়বে। এই বাসা ছেড়ে দিতে হবে। তখন সে কোথায় যাবে!
আহমার বাবার দিকে চেয়ে হাসছে। আনিস আয়লান কুর্দির ফটো দেখে ভয় পেয়ে পিছিয়ে গেল।

