চোখের সামনেই যেন ঘটল ঘটনাটা। এই যে চোখের সামনে সবুজ বিশাল ফসলের মাঠ। এটা কয়েকদিন আগেও ছিল না। এখানে উঁচু একটা পাহাড় ছিল। আশেপাশেও ছিল অনেক ছোটবড় পাহাড়। আসলে এলাকাটাই ছিল মোটামুটি পাহাড়ি জনপদ। এখন সব একাকার। সব সমান। চোখের সামনে যে আলু খেতগুলো—মাঝখানে একফুট করে আইল। একটা জমি খিল পড়ে আছে। সেখানে সবুজ ঘাস। কয়েকটা ছাগল লম্বা দড়িতে বাঁধা। গলায় শামুক ঝুলোনো কয়েকটা গরুও ঘাস খাচ্ছে। এখন আর আগের মতো গলায় পিতলের ঘণ্টা ঝোলানো হয় না। কয়েক সপ্তাহ আগেও তিনি দেখেছেন পাহাড়ের ঢালুতে এই গরু-ছাগলগুলো ঘাসের বনে চড়ে বেড়াচ্ছে।
পাহাড়ি গবাদিপশু তাদের শক্ত পা আর ধারালো খুর নিয়ে সমতলে নেমে এসে এখন বেশ মানিয়ে নিয়েছে। কোনো দিকে তাকাচ্ছে না। অস্বাভাবিক মনে হলে ওরা কিছু মুখে দিতে পারত না। চারদিকে তাকাত আর চিৎকার করত। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে পরম নিশ্চিন্তেই আছে। মাথা নিচু করে ঘাস খেয়েই যাচ্ছে। ঘন সবুজ সতেজ ঘাস।
খিল জমিটার পেছনে যে ছোট একটা পুকুরের মতো দেখা যাচ্ছে ওটাও পাহাড়ে ছিল। ছোট একটা লেক বলে গণ্য করা হতো। ওখানে যেতে প্রায় তিনশ সিঁড়ি ভেঙে উঠতে হতো। লেকের পাড়ে কয়েকটা বেঞ্চ ছিল। পর্যটকেরা এলে এই লেকের পাড়ে ঘাসের মধ্যে বসত। মাথার ওপরে কয়েকটা আম আর কড়ুই গাছ ছিল। এখনও সেই গাছগুলো আছে। এর পেছনে দুইটা টিনের ঘর আছে। ঘরদুটি পাহাড়েও ছিল। তখন সবুজ পাহাড়ের গায়ে ঘরদুটো দূর থেকে ছবির মতো সুন্দর লাগত। এখন সমতলেও ঘরগুলো আছে। বাচ্চাদের স্কুলে আঁকা নিসর্গচিত্রের মতো লাগছে। সবুজ ফসলের জমি। কয়েকটা গাছ। ঘাসের মাঠে গরু-ছাগল চরছে। পেছনে একটা বাড়ি, দুটি ঘর। একটা পুকুর। দূরে আঁকাবাঁকা একটা সরু নদী। নদী গিয়ে মিশেছে দূর দিগন্তে।
যখন এলাকাটা পাহাড়ি ছিল তখন এ নদীটা ছিল একটা ঝরনা। আর তীব্র বেগে বয়ে চলা একটা নালা। এখন সেই খরস্রোতা নালাটি এক শান্ত নদী। কয়েকটা গ্রামের পেছনে গিয়ে দূর দিগন্তে গিয়ে হারিয়ে গেছে। নদীতে কয়েকটা নৌকাও দেখা যাচ্ছে এতদূর থেকে। পাহাড়ি নালার ওপরে ঔপনিবেশিক আমলের শক্ত একটা লোহার সেতু ছিল। সেতুর রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে নিচে তাকালে ভয় লাগত। এখনও সেতুটা আছে। কিন্তু নিচে নালা নেই, সরু নদীর ওপরে এত উঁচু সেতুটা দেখতে এখন অস্বাভাবিক লাগে। এখন তো আর আগের মতো উঁচু মাস্তুলওয়ালা নৌকা-জাহাজ চলে না; সেতুটা ভেঙে ফেললেই পারে। কিন্তু ওটা কালের সাক্ষী হয়ে আছে।
এখানে দাঁড়িয়ে কোনো কিছুই অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে না। তিনি ভাবছেন, এটা কেমন করে হলো! একটা পাহাড়ি ভূমি সমতল ভূমিতে রূপান্তরিত হয় কেমনে! এক-আধটু ভূগোল তিনি পড়েছেন, কিন্তু ভূ-প্রকৃতির আকস্মিক পরিবর্তনে এমন হতে পারে তা জানেন না। এমন হওয়ার কথাও না। ভূমিকম্প, আগ্নেয়গিরি, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা বা এ ধরনের কিছুই ঘটেনি। ধীর পরিবর্তনে এমন একটি পাহাড়ি অঞ্চল সবুজ সমভূমিতে রূপান্তরিত হতে অনেক বছর লেগে যাওয়ার কথা। এক জীবনে দেখা পাওয়ার সম্ভাবনাও নেই। মধ্য এশিয়ার আরাল সাগরটি শুকিয়ে এখন মরুভূমি হয়ে গেছে বলে শোনা যাচ্ছে, টেলিভিশনে দেখানো হচ্ছে।। ভূগর্ভের পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় হ্রদের পানি শুকিয়ে এটা ঘটতেও সময় লেগেছে চার দশকের বেশি সময়। বর্তমান প্রজন্মের তরুণরা তো আগের সেইরূপটা দেখতে পায়নি। অথচ এখানে মাত্র কয়েক সপ্তাহ—পুরো একমাস হবে কিনা সন্দেহ। এর মধ্যে এই চেনা পাহাড়ি এলাকাটি সবুজ সমভূমিতে রূপান্তরিত হয়ে গেল!
গত সপ্তায় পাহাড়গুলো টিলার মতো ছোট দেখা গেছে। এর আগের সপ্তায় মোটামুটি উঁচুই ছিল। নিচ দিয়ে পাকা রাস্তায় যাওয়ার সময় চূড়া দেখা যেত না। হাতের বাম পাশে খাড়া সবুজ পাহাড়গুলো দেখা গেছে। গত সপ্তায়ই প্রথম চোখে পড়ল যে, পাহাড়গুলো নিচু লাগছে। কয়েক জনকে জিজ্ঞাসাও করেছেন। কেউ তার কথা বিশ্বাস করেনি। গোনায় ধরেনি। কিন্তু আজ যে একেবারেই ভিন্ন এলাকা। চোখের সামনে এত বড় পাহাড়ের এই নেমে আসা, দেবে যাওয়া নয় যদিও কিন্তু এটাকে কী বলা যায়! পাহাড়ের পতন? এমন পতন হতে পারে?
তিনি কি ওই বাড়ির লোকদের সঙ্গে কথা বলতে যাবেন? ঘন সবুজ আলু খেতের ভেতর দিয়ে হেঁটে যেতে থাকেন। মাঘ মাসের শীতের রোদ ভালোই লাগছে। একটা জমি পরিমাণ গিয়ে থামলেন। থাক কী প্রয়োজন জিজ্ঞাসা করার! তারা যদি ওপর থেকে নিচে নেমে থাকতেই ভালোবাসেন তাহলে আর এ নিয়ে কথা বলে লাভ কী?
তিনি ফিরে আসতে লাগলেন। তার মনে এক ধরনের পরিবর্তন ঘটছে বুঝতে পারেন।

