॥ পর্ব-১০॥
সোনালী বোনের এ আত্মত্যাগে কেঁদে ফেললো। জড়িয়ে ধরলো বোনকে। প্রতিজ্ঞা করলো বেবিকে আবার স্কুলে ফেরাবে। আভা নিজে অন্যের বাড়িতে কাজে যেতে চাইলো, বেবির কাজ করতে চাওয়ায় তার আপত্তি। অনেক বুঝিয়ে মাকে অবশেষে রাজি করাতে পারলো। বেবি নবম শ্রেণিতে পড়ে, পড়ালেখায় বেশ ভালো। একটু পাগলামি করে তবে রেজাল্ট ওর ভালো। পড়া ছেড়ে বেবির অন্যের বাড়িতে কাজ করতে যাওয়ার সিদ্ধান্তে বাড়ির সবাই মনে ভীষণ আঘাত পেলো। কিন্তু পুরো পরিবার তখন নিরুপায়। অসহায় হলে মানুষের তখন আর কিছু করার থাকে না। দীপুকে বড্ড আঘাত পেলো বিষয়টায়। তার পড়ালেখা চালু রাখতে, তাকে ভালো রাখতে পরিবারের সবার ভাবনা, আত্মত্যাগ নিজেকে অপরাধী বানিয়ে দিলো।
কেমন যেন হঠাৎ করেই দীপুটা বড় মানুষের মতো আচরণ করতে শুরু করলো। পরিবারের দুঃখ তার বুকে বড্ড লাগে।
সত্যনারায়ণের শরীরজুড়ে এখন বয়সের ছাপ স্পষ্ট। বয়সের তুলনায় তাকে অনেক বেশি বৃদ্ধ লাগে। সত্যনারায়ণের হাড়ে ক্ষয় ধরেছে, প্রচণ্ড ব্যথা শরীরে, কোমর ব্যথায় বেশির ভাগ সময় সে শয্যাশায়ী থাকে। একটু ভালো লাগলেই সে কাজের খোঁজে বের হয়। বিভিন্ন জায়গায় কাজের খোঁজে ঘুরে বেড়ায়। কেউ তার শারীরিক গড়ন দেখে কাজে নিতে চায় না। ফিরিয়ে দেয়। সত্যনারায়ণ রেলওয়ে কলোনিতে গেলো বেশ কয়েকবার। কুলী বা মালি হিসেবেও যদি একটা কাজ তাকে কেউ দেয় দয়া করে, সেই আশায় ৩-৪ বার আবেদন করলো। কিন্তু প্রতিবারই সে ব্যর্থ হলো। সত্যনারায়ণ বসে থাকলো না। রান্নাঘরের পাশে আরও কিছু জায়গা পরিষ্কার করে সেখানে পেয়ারা, আমলকির চারা লাগালো। সঙ্গে চাষ করলো আলু, চমেটো, সবুজ শাক। সংসারে একটা কিছু অন্তত আসুক। কাজ না করার অপরাধ বোধ তাকে আরও বুড়ো বানিয়ে দিয়েছে যেন। মেয়েটা অন্যের বাড়ির এঁটো থালাবাসন পরিষ্কার করে সংসারের সবার মুখে ভাত জোগাড় করছে, এটা সত্যনারায়ণের জন্য বড্ড যন্ত্রণার।
প্রাণবন্ত, হাসিখুশি মেয়ে বেবি। ঘরের কাজে ভীষণ পটু। তার ব্যক্তিত্ব, সততা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন কাজের জন্য পুড়ো কলোনির মানুষের মন জয় করে নিলো সহজেই। সবাই বেবিকে ভালোবাসে। যে-সব বাড়িতে কাজ করে বেবি, তারা তাদের খাবারের বাড়তি অংশটুকু ভালোবেসে বেবিকে দেয়। এছাড়া কারও বাড়িতে পুজো, জন্মদিন বা অন্য কোনো অনুষ্ঠান থাকলে বেবিকে তারা মিষ্টি, ফলসহ আরও অনেক খাবার দেয়। সত্যনারায়ণের পরিবারে বেবির আনা খাবার যেন অমৃত। দীপু, রুম্পা ভালো একটু খাবারের আশায় দিদির পথ চেয়ে বসে থাকে। বেবি দিদি কিছু না কিছু ভালো খাবার আনবেই, এটা ওদের বিশ্বাস। বেবি বাড়ি ঢুকতেই খাবার নিয়ে এক উৎসব শুরু হয়ে যায়। খাবার নিয়ে এইযে হৈ চৈ, কাড়াকাড়ি… সোনালী, আভা সত্যনারায়ণকে ভেতর থেকে একদম ভেঙে দিচ্ছিল।
এরই মধ্যে সোনালী মাধ্যমিক পাস করে বাংলা কলেজে ভর্তি হলো। দীপু, রুম্পা আর সোনালীর পড়ালেখা চলতে থাকলো। কাবেরি তুলনামূলকভাবে ওদের থেকে পড়ালেখায় খারাপ ছিল। এত কষ্টের সংসারেই তাই বেবির পড়ালেখাটা কিছুদিনের জন্য বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো। তবে সে সিদ্ধান্ত নিলো কাবেরী নিজেই। তার পড়তে একদম ভালো লাগতো না। কাবেরী ভাবলো এর থেকে বেবি দিদির সঙ্গে যদি দুই-একটা বাড়িতে কাজ করতে পারে সে তাহলে ভালো খাবার খেতে পারবে এবং বাড়ির সবাইকে সাহায্য করতে পারবে। সবাই মিলেই একটু ভালো থাকা যাবে। এত অভাবের সংসারে সবার পড়ালেখা করার কথা চিন্তা করা এক বিলাসিতা। চেষ্টা করলে কাবেরী যে ভালো ফল করতে পারতো না তা নয়। কিন্তু বই-খাতা কেনার টাকা নেই, টিউশন নেওয়ার অবস্থা নেই, শুধু শুধু খরচ বাড়িয়ে কী লাভ! বাবা-মায়ের ওষুধ কেনার টাকা পর্যন্ত ঘরে নেই।
এছাড়া এমন পড়ালেখা করে সে কিছুই করতে পারবে না। এমন চিন্তা করেই শেষ পর্যন্ত কাবেরী বেবির সঙ্গে দুটি নতুন বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজে যোগ দিলো।
সত্যনারায়ণের নামে যে রেশন কার্ড রয়েছে, তাতে পাওয়া জিনিসপত্র ১৫ দিনের মধ্যেই শেষ হয়ে যায়। বাকি দিনগুলো বেবি, কাবেরীর অন্য বাড়ি থেকে আনা খাবার বা উপহার পাওয়া খাবারের ওপর চলে। এ যুদ্ধে সোনালী হেরে যেতে চায়নি। বোনদের আত্মত্যাগের মর্যাদা দিতে সে আরো কঠিনভাবে পড়ালেখা শুরু করলো। পরীক্ষা আগামীকাল থেকে। সোনালী খুব মন দিয়ে পড়ছে। তাকে ভালো ফল করতেই হবে। কাল থেকে পরীক্ষা। সোনালী ঠাকুরকে ডাকছে আর পড়ছে। হঠাৎ কেরোসিন শেষ হয়ে গেলো। কী করবে সোনালী! অসহায় লাগছে ওর।
কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়লো। কিছুই রিভিশন করতে পারলো না ও। ভোর হতেই বই নিয়ে বসে পড়লো সোনালী। কিন্তু বেশিক্ষণ পড়তে পারলো না। কারণ ট্রেনেই ২ ঘণ্টা লাগবে কলেজে পৌঁছাতে। তাই কোনোরকম একটা রুটি মুখে দিয়েই বেরিয়ে গেলো সোনালী। ট্রেনে উঠে দেখলো মানুষে মানুষে গিজগিজ। আজ মনে হয় মানুষের হাট বসেছে। এমনিতে এই সময়টা অফিসগামী মানুষের ভিড় থাকে। তবে এতোটা দেখেনি সোনালী আগে। আজ প্রতিদিনের থেকে দুইটা ট্রেন আগের টাতে উঠেছে সোনালী। তাই ভিড়টাও বেশি। কোনোরকম দাঁড়াতে পেরেই ব্যাগ থেকে বইটা বের করলো সে। বই বের করে পড়তে শুরু করলো। কে কী মনে করলো তা নিয়ে ভাবার সময় নয় এখন। তাকে রাতের পড়টা ট্রেনে যাওয়া আসার এই ২ ঘণ্টায় এগিয়ে রাখতে হবে।
কেরোসিনের খরচ বাঁচাতে এর চেয়ে ভালো উপায় আর হতে পারে না। কলেজ থেকে ফিরতে ফিরতে সোনালীর সন্ধ্যা হয়। বেবি ১ লিটার কেরোসিন এনেছে। যাদের বাড়িতে কাজ করে তাদের কাছ থেকে ১ লিটার তেলের ব্যবস্থা করে এনেছে। ওর মাসিক মায়না থেকে ১০ টাকা কেটে নেওয়ার শর্তে কেরোসিনের ব্যাবস্থা করেছে বেবি। সোনালী এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে কেরোসিনের বোতলটার দিকে। কিছুতেই এ তেল অপচয় করতে পারবে না সে। তেলটা তুলে রাখলো বিপদ আপদের সময় ব্যবহার করর জন্য। সে পড়ার সময় বের করে ফেলেছে।যাওয়া আসার সময় ট্রেনের ৪ ঘণ্টা সোনালী তার পড়ার কাজে লাগাবে, নিজেই নিজেকে যেন প্রতিজ্ঞা করলো সে।
রাস্তার মাস্টার ॥ পর্ব-৯॥ শারমিন রহমান

