
দীর্ঘ দুপুরের দাগ
এখনো আমার বুকে লোমের মতন জেগে আছে
সেইসব রোদপোড়া দীর্ঘ দুপুরের দাগ
তরমুজ ফালি হয়ে তাই হয়েছি দুভাগ
সবুজের আবরণ চিরে বের হয়ে গেছে রক্তিম হৃদয়
চারপাশে হল্লা করে হননের মাছি
আগ্রাসী গোঁফের মুখে দগদগে লোভ করে নাচানাচি।
সেইসব সূর্যপোড়া বৃষ্টিহীন দীর্ঘ দুপুরের দাগ
জীবনজমিনে জেগে আছে ইটের ভাটার মতো
শান্তিমাটি জ্বলতে জ্বলতে টেরাকোটা লাল
স্বপ্নমাটি ক্ষয়ে ক্ষয়ে মহাস্থানগড়ের দেয়াল
সুখমাটি পুড়তে পুড়তে নাগাসাকি
এই দগ্ধ বুক দগ্ধ মন আমি এখন কোথায় রাখি?
শিশিরের ভোর জোছনার রাত আজ সমস্ত নির্বাক
শুধু দীর্ঘশ্বাসে দগ্ধ দীর্ঘ দুপুরের দাগ অহর্নিশ অতন্দ্র সজাগ।
সুন্দরের সপ্তপদী
ময়নামতি: কালের চাকায় অচল আজ সেই জীবন স্পন্দন গতি
একদিন ছিল প্রাণবন্ত, বুদ্ধের দীক্ষায় মানুষ হয়েছে সন্ত
এখন শুধুই মৃত্তিকার গ্রাস, হাসে সবুজের ঘাস
রক্তাভ ইটের ভগ্নস্তূপে কাঁদে রাত—জ্ঞানের নিঃশব্দ যাতায়াত
বিশাল প্রাচীর যেন প্রাচীনের জাগ্রত পাহারা
নয়া সভ্যতার হাসি ভুলে বুদ্ধের ধ্যানের মধ্যে ডুবে ডুবে
আমি বধিকক্ষে পেলাম জ্ঞানের গুপ্তধন—সুন্দরের রহস্যের ধারা।
সময়ের সিঁড়ি
আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে এমন একটা সময়ের সিঁড়ি
যে সিঁড়ির ওপারে হাসছে জীবনের পূর্বাচল
কিন্তু এক একটা সিঁড়ির ধাপে একেক রকম বিনাশী ছোবল
প্রথমেই দাঁত বের করে আছে চিতার রক্তাক্ত থাবা
পরের ধাপেই ফণা তুলে ফোঁস ফোঁস করে হরণের অজগর
তারপর বিশাল হা করে আছে মৃত্যুর কুমির
এভাবে সিঁড়ির ধাপে ধাপে হিংস্রতা, অশুভ ভয় করে ভীড়
আমরা ভয়েই শামুকের মতো মুখ লুকিয়েছি সুদৃশ্য খোলসে
কচ্ছপের মতো মাথা ঢেকে নিয়েছি শঙ্কিত নিরাপদ আশ্রয়ে প্রশ্রয়ে
তাহলে আমরা আজীবন অস্তাচলে রয়ে যাব ডুবে ডুবে?
সিঁড়ি বেয়ে একবার ওপারের সবুজ আলোয় ডানা মেলব না?
মৃত্যুছোঁয়া সিঁড়ি পার হলেই জীবন জেগে উঠবে অবাক সূর্যোদয়ে
তবে আমাদের দুঃখ হয়ে যাক কালবৈশাখীর শক্তি
আমাদের দীর্ঘশ্বাস থেকে জন্ম হোক সাহসের জাগর বারুদ
আমাদের যন্ত্রণার বান হোক পূর্ণিমা রাতের প্লাবিত জোয়ার
আমাদের পদক্ষেপ হোক পদাতিক দাবানল
যেভাবেই হোক ভেঙে ভেঙে পার হতে হবে সময়ের সিঁড়ি
খোলস ছাড়িয়ে চলো একবার হয়ে যাই ফুঁসে ওঠা অগ্নিগিরি।
সরাও তোমার বিজ্ঞাপন
আমার নক্ষত্র ঢেকে যায়, আড়ালে আমার চাঁদ
চলে যায়, আমার দিগন্ত চোখ থেকে অদৃশ্যে হারায়
তোমার বিশাল বিজ্ঞাপনে।
মনের ভূগোলে ইতিহাসে ক্যানভাসে
আমার স্বপ্নের সেই মানবীকে অস্বচ্ছ, ঝাপসা
করে দিচ্ছে সজ্জিত মডেল—বর্ণিল আলোর ঝলকানিতে।
আমার স্মৃতিতে যতগুলো নদী-নারী-নিসর্গের
জলছবি আছে—সবগুলো এই আলোর ঝিলিকে
দিকেদিকে দৌড়াচ্ছে, পালাচ্ছে। বিচলিত, বিলোড়িত
ঝলসিত সব শান্তিছবি-ছায়াছবি! কোথা রাখি
এই চোখ এই মন?
সরাও তোমারবিজ্ঞাপন!
সকাল সন্ধ্যায় আমি এইপথ দিয়ে হেঁটে যাব আমার পদ্মায়—
চোখের তারায় চাঁদ রেখে সপ্তর্ষির ইশারায়
লাইলির চেনাপথ ধরে জুলেখার আঁচল উড়িয়ে
হেলেনের ট্রয় ঘুরে আসবে আমার মনপবনের নাও।
পথের দুপাশ খুলে দাও!
পুঁজির প্রকাশ যেন অন্ধ না করে সবুজ-দিগন্ত-আকাশ
চাঁদ সূর্যের আলোয় মেলে দেই এই আত্মা এই মন
সরাও তোমার বিজ্ঞাপন!
ফেরা না ফেরা
কেউ ফিরুক বা না-ই ফিরুক আমাকে ফিরতেই হবে
আমার আশ্রয়ে। পাখিরা যেমন ফেরে। ফেরে সাগর ঢেউয়েরা
মনের দিগন্ত দ্বার ভেঙে বিরল স্মৃতির হারানো মেঘেরা
কিন্তু আমার রাজপথ না ফেরার হরতাল, ব্যারিকেডে ঘেরা
কারা যেন মত্ততায় মাতাল না ফেরার উৎসবে
আমার কী হবে ফেরা?
ঋতু ফিরে আসে
রাত ফিরে আসে
ভোর ফিরে আসে নিজ পৃথিবীতে, নিজ ঠিকানায়
ইতিহাস ফিরে আসে ইতিহাসে
তবে কেন আমার হবে না ফেরা?
কেউ ফিরুক বা না-ই ফিরুক আমাকে ফিরতেই হবে
ঈশাখাঁর দুরন্ত ঘোড়ার বেগে। বিশ্বাসের সবুজ আবেগে
আমার বিন্দুতে।
আলোকিত আমার অমোঘ উৎসে।
ফেরা না ফেরার কত মানুষের পদচিহ্ন পৃথিবীতে আছে লেগে
আমিও ফেরার যাত্রী। পদচ্ছায়া রেখে যেতে চাই ফেরার বৈভবে।
আত্মার তৃষ্ণায় আমি ফেরার নদীতে আকণ্ঠ সাঁতরে যেতে চাই
আমার আশ্রয়ে
নিজ ঠিকানায়।
