
উৎসর্গ
শরণার্থী
চোখে দেশ নাই ঘরে দোর নাই মাটি পরদেশি
দেহে মন নাই মনে খুন খোঁজে খুনি প্রতিবেশী
দেশহীন মানুষের গান
গোপনতা ওগো গোপনতা
আলিঙ্গনে ছুরি বসিয়েছো, গোপনতা ওগো
গোপনতা, বলতে পারিনি কোনোদিন
ক্ষত সাইরা গেছে বটে, ইনবক্সে হীমবাহ দাগ
আবরণহীন; এই ফতেপুর, এই সিক্রি
আকবর-অনুরাগ-বীরবল-তানসেন-আবুল ফজল
অমৃতসর, মরিচঝাপি, যশোর রোড, শাহপরী দ্বীপ
সব যেন চিরচেনা বন্ধুরপথ, বিশ্বাস যদি ঠেলে
দেয় ভুল পথে, রাজনীতি বোঝাইবে কে আমাকে?
গোপনতা ওগো গোপনতা বলতে পারিনি
কোনোদিন। কারো নাম লেখা থাকে স্কুল গেটে
কারো নাম লেখা থাকে খুনির পকেটে
কারো বা খোদাই করা থাকে সেমেট্রি বা কবরে
কারো নাম মুছে যায় পদ্মার জলে
কারো নাম লেখা হয় স্যেন নদীর তলে
এই রোজার দিন, এই শবে কদরের রাইত শোনো,
আকবর বাদশার স্যেকুলার নাম লেখা ইলাহী দলিলে
আমার নাম লেখা আছে প্রেমের সলিলে
গোপনতা ওগো গোপনতা সে কথা বলতে পারিনি কোনোদিন।
স্ক্যান্ডাল
কত কত গুজব তোমায় নিয়ে, কত শত স্ক্যান্ডাল
তোমার চাঁদ দুটো নিয়ে অনেক গল্প ছড়ালো
পাড়ায় পাড়ায়, মাঠে চাঁদ কেমন কেমন
জোছনা ছড়ালো একা একা; সবুজ মায়া…
তোমায় নিয়ে পুরাকালে মূর্তি বানানো ছিলো
সে সব মূর্তি দেখে কেউ কেউ বললো,
এ-তো রাধার গোপন শৃঙ্গারমূর্তি
কেউ বললো অষ্টাদশী নয়, এ তো কিশোরীলো
পহেলা শ্রাবণী, কেউ বললো মা-কুমারেশ্বরী
এসো তোমায় প্রণাম করি, কেউ বললো
ওকে তো চন্দ্রিমা উদ্যানের মূল ফটকে
দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি…
আরে ওতো আমার সাধিকা
কেউ কেউ বললো, ও তো পদ্মাপাড়ের মেয়ে
জেলেদের ঘরেই বেড়েছে, দেখছো না? নাকছাবি
প্রবাস থেকে কে একজন চিনে ফেলেছে তোমাকে!
সে নাকি দেখেছে লেক অন্টারিয়র পাড়ে একা…
শরণার্থীর বিষণ্ণ চোখ, শূন্যতায় আঁকা।
একজন এসে দাবী করে বসলো, সে তোমার
আপন মানুষ; তোমাকে নিয়ে অনেক কথাই হলো
অনেক ভালোবাসাবাসী হলো; পাহেলগাঁও থেকে
অচেনা এক পাখি এসে জানিয়ে গেল
তুমি কে আমার।
তুমি একটুতে ভেঙে পড়, একটুতে জল
কলঙ্ক গাছের দিকে তাকাতে ভয়
চেয়ে দেখো কলঙ্ক গাছেতে ওই
ঝুলে আছে, বেহেস্তি-ফল।
তোমাকে নিয়ে অনেক কথাইতো হবে
অনেক কথাই হয়, অনেক অনেক কথা…
তাকিয়ে দেখো তোমার এক বুকে মধুমতি
অন্য বুকে জ্বলে সন্ধ্যাতারা।
প্রতিটি গার্লস স্কুল পাশে
প্রতিটি গার্লস স্কুল পাশে একটি সবুজ ছায়াপথ আছে
কিশোরেরা স্কুল ফাঁকি দিয়া ছায়াপথ ধইরা হাইটা যায়;
কাছে হাতছানি, স্বর্ণকুমারী নদীর ধার…
যেই নদীতে কেবলি উষ্ণ ঢেউ, কেবলি উথলি হাওয়া
কেউ কেউ কড়ি ফাঁকি দিয়া শুধু ঢেউ গোনে;
কেউ কেউ ঘুমায়া পড়ে দিন-জোছনার অন্ধকারে
কেউ কেউ সন্ধ্যা হবার ছলে বাড়ি ফেরে নদী পাড় ধরে
কেউ কেউ লেক অন্টারিয়র খোঁজে
ছায়াপথ ধইরা হাইটা যায় উদ্বাস্তুনগরে
নাগরিক কোলাহলে; বাঁচে, মরে, কেউ কেউ নিজেকে বাঁচায়
আমি কারো কারো মত, ছায়াপথ ধরে হাইটাছি একদিন
সেই স্মৃতি হারায়েছে কবে, তবু বুকে ধরা আছে, এখনও
মাঝে মাঝে বুক থেকে নেমে, বর্ণিল ঝর্ণা বয়ে যায় মনে।
আমি এক সাগরে ভাসা ক্রীতদাস
এই সমুদ্র মায়ার, এই সমুদ্র ধাঁধার
ক্রীতদাস- ক্রীতদাসী হয়ে এই সমুদ্রে ভাসছে
আমারই মা-ভাই-বোন
অভিবাসী দুঃস্বপ্নে বিভোর, সাঁতার না জানা এ-সব স্বজন।
শ্বেতপদ্ম হাতে জন্মেছিলে, মুক্ত-স্বাধীন দেশে, তাহাদের মতন।
গভর্মেন্ট ফেরারী এখানে, বুদ্ধিজীবীরা বাকুড়ার পুতুল সকল
ক্যাফে জ্বলছে, চলছে সংসদ; বারে নাচছে বয়সী বেশ্যা
মুদ্রা জমছে কতিপয়ের হাতে, যারা মানুষ নামে নকল।
স্বপ্ন কেড়ে নিয়েছে নীলজল, সাক্ষী টুনা-ফিস, হার্পুন মাছ
শ্রম লুট হবার আগেই শরীর হারিয়ে
বসে আছে যেন মৃত অক্টোপাস।
চোখ টিপে হাসছে আন্দামান, আচেহ প্রদেশ;
হাসছে রেঙ্গুন আলওয়ালের স্বদেশ
রক্তের ঢেউগুনে দুঃস্বপ্নের দিন; থ্যাতলানো সময়
রক্তপায়ী দালাল ঘুরছে যেন মৃত দূত করছে প্রণয়।
ও ফুল গ্লাডিওলাস, তুমি কি গ্লাডিয়েটরদের চেনো?
যারা ভাসছে বঙ্গপসাগর আর আন্দামানে
আমিও যেন ভাসছি তাদের সাথে, তারা কি বেঁচে আছে এখনও?
মৃত্যু, জাদুকরের মুখের ভিতর লুকানো এক শকুন
ঘুমের ঘোরে পরজন্মের কাফনের পাখি ওড়ে মনে আমার
শোনো প্রণয়িনী পাখি ওগো বুবুন
ওড়ার ঠিকানা জানা নেই যে পাখির ডানার
সেই পাখি আমি; ওদিকে দেখো ওরা ভাসছে অথৈ নোনাজলে
আয়ুরেখা মুছে গেছে যার,
সে যে মৃত্যুর আগেই স্বপ্নবেচা এক নিহত শিকার।
অং সান সু চি তোমাকে বলছি শোনো
চোখে বিশ্বাস হচ্ছে না
মনকে বলেছি শোনো—
ওবায়েদাকে ধর্ষণ করেছে যারা
তাদের ক্ষমা নেই কোনো।
ওবায়েদা, রাখাইন দেশ;
সব ধর্ষিতা—কিশোরীর মা—
কখনো সে সালিমা কাশ্মেরী
কখনো সাঁওতাল পরগণা
বোবাদের নগরীতে সিরীয় যুবতী
ইয়াজিদি কিংবা হাবসী দাসীর-জা
নৌকাতে যুদ্ধবন্দি কিশোরী
কখনো বা কল্পনা চাকমা।
অং সান সু চি তোমাকে বলছি শোনো
নোবেল কাইড়া নিলেও
মানুষ হিসেবে মানুষের কাছে
এ নৃশংসতার ক্ষমা নেই কোনো।
রাধারগুল যাবার বাসনা
রাধারগুল যাবার বাসনা ছিল না কার
পাসওয়ার্ড ভুইলা যাওয়া আমি কি
যেতে চাইনি একটি বার।
ভুলে যাওয়া পথে হেঁটে দেখেছি
ও পথে দুঃখ নেই সুখ নেই
আছে কিছু স্মৃতির আভাস।
স্মৃতিসেতু ভাইঙ্গা গেছে সেই কবে
আপন বিষাদে পইড়া আছি
আকালের নিরুৎসবে।
সব ঝরা ফুলে মালা হয় না নারী
তব্ওু মৃত্যুগন্ধা মন বেদনার সাথী খোঁজে
ফেরি করে জীবনের বাড়ি।
শাহজাদি রুশবাই
বলো দেখা হবে কবে?
বলি, ঝিলাম নদীতে ঝড় উঠলে তবে।
ততদিনে চারারা গোলাপ দেবে
পৃথিবীতে কত সন্ধ্যা-সকাল হবে
যুদ্ধ বিমান থেকে আসলে কি পুষ্প বৃষ্টি হবে?
শরণার্থী শিবিরের কান্না কি থেমে যাবে?
কত কত কিশোরীরা পদ্মিনী হবে যৈবনে
কত শত কুমার কৌমার্য হারাবে ফাল্গুনে
বলো, আবার কি দেখা হবে?
ভালোবাসার আগুন নদী সাঁতরে গেছ কবে
নীলপদ্ম পাবে না জেনে
চক্ষুদানের নিয়ত কইরাছো সবে!
প্রতীকী নাম ভাবছ বুঝি তাই?
ইনবক্সে জানিয়েছো গুডবাই
নাগো জানি, তুমিই তো শাহজাদী রুশবাই।
কোষে কোষে মৃদঙ্গ সুর দোলে
সব বীজ রোপনের আগে সন্ধ্যা জোনাকি জ্বলে
নিস্তব্ধতার শুরু সঙ্গরাগে
আসলে কি আর দেখা হবে?
আততায়ী নদীতীরে
মৃত ঈশ্বরের কায়া
ভালোবাসা ফুরিয়ে যায়নি একেবারে
তাই তো দেখি জলের কিনারে ছায়া
খুঁইজা ফিরি অভিভূত কৈশোরে
তোমার আমার অলিখিত কিছু মায়া।
এক পাগলিকে দেখে
অবাধ্য কিশোর আমি, যার ডাক নাম জানে শুধু—
এই রতিঝর্ণা পথ।
কৈশোরের কোনো এক সকালবেলায়
এক পাগলীকে দেখে মা ডাকতে মন কেঁদেছিল বেশ।
বাবা শব্দটি আপন মনে হয়নি কোনোদিন,
রূপকথার মতন ভাইবোন ঝুলে আছে ছাতিমতলায়
বন্ধুরা পথের ধূলো, যদিও শিকারীর পাঠ নেয়নি তারা
দেখেছি নয়াল রমণীরা চেরাজিভে কাছে ডাকে
আমাকে মানুষ করবে দায়িত্ব নিয়েছিল যে নগর
তার হৃদয় ছিল না কোনো;
সে ছিলো গুপ্ত নিশ্চিন্ত—ঘাতকের ঘর।
নগরের পূর্ণ শবাধারে আমি মৃত সহদর
আর সব জীবিত শবেরা ঘাতক চোখে
আধখানা অন্ধরাত লাশের খাটের মতো কাঁধে নিয়ে
ঘুরে বেড়ায় এপাড়া থেকে ওপাড়ায়
এসব দেখে আমার সেই পাগলীকে মনে পড়ে যায়
যে তার শিশুকে শুকনো স্তনের বাট মুখে দিতে দিতে বলেছিল
ও আল্লাহ এই খানকিপট্টীতে কানু তোরে ক্যামনে বাঁচামু ক’দেহি।
মাগো তোর ষোল
জল পুড়ে যাচ্ছে, মন পুড়ে যাচ্ছে; দেহ?
অথচ আগুন নেই, বস্তুত সন্দেহ
চেরাজিভ লজ্জা দেখে ফেলে হাসে; সাপ!
বাস্তুসাপ ঘর বেঁধেছে মনের ভিতর ঘাসে।
মাগো তোর ষোল, হৃদয় ছিল টলোমলো
নয়মাস আমি তোর পেটে, একটু একটু আমারও মনে আছে
রক্তনীল, সেই নদী এখনো দুচোখে ভাসে
ফতোয়াবাজির; ঘৃণাবুকে কাটার মালার সাজে
প্রতিবেশীরা গর্ভবতীকে বেত্রাঘাতের পরে
ভাসিয়ে দিয়েছে, বিষখালির অথৈ ধূসর জলে।
আফিম ফুলের থেকে রেণু দিয়েছিল বীরাঙ্গণা তোকে
ভাঙা হারমোনিয়ামের মতো পাঁজর বাজিয়েছে লোকে
মাগো তোর পরনে শাড়ি ছিল না কোনো
লাশ দেখে ছিল মুক্তিকামীরাও, মনে ছিল সন্দেহ
উদ্বাস্তু নদীটা তুইতো জানিস শঙ্খলাগা মাকে
নাভিমূলে কম্পোমান আমারই দেহ, একলা একলা দোলে
মাগো এখনো লাঞ্ছিত নদীটি গর্জন দিয়ে বোবা কথা বলে
মুখোমুখি আমি তুমি মৃত্যুশয্যা জলে
বেঁচে গেছি এমন পৃথিবীতে চোখ খুলিনি বলে।
দেশহীন মানুষের গান
বর্ষার দিন আর সইছে না
পাখিদের নোটবুকে যে নাম
ভুলে গেছি সেই প্রেমিকার দেহ
বীথিকা-আঁখিমা নাম মনে বইছে না
হৃদয়ের ক্ষতে বিগত দিনের সন্দেহ
মরিচঝাঁপি ক্যাম্প আর ঘুমধুম
বিশ্বের এ যেন অভিশপ্ত যোনিদেহ
দেশভাগ আর দেশহীন মানুষের গান
কি রোহিঙ্গা কি-বা সিরিয়ার আয়লান
নাফ নদী, যার শোক নাই দুঃখ নাই
পড়ে আছে যেন মৃত ঈশ্বরের দেহ
দৃশ্য নাই ভালোবাসা নাই, আছে শুধু সন্দেহ।
অনুভূতি অনুবাদ কতটুকু করা যায় বলো?
বীথিকা-আঁখিমা নাম মনে বইছে না
তবুও শৈশব হাত নাড়ে পাশে আইসা বসে
দূরে ঠেইলা রাখি সন্দেহ
. বর্ষার দিন আর সইছে না…
প্যারিসের রাস্তায় সিরীয় যুবতী
আপন ঘরকে মর্গ বলে মনে হয় কখনো কখনো
নগ্ন লাশ ঘোরাফেরা করে অন্ধকার ক্ষুধার্ত হলে
চিলেকোঠা ছেড়ে আঁধারের ভাঁজে চুল খোলে কে যেন;
কী চায় সে, বোবাদের নগরীতে, কেন চোখ জ্বলে?
প্যারিসের রাস্তায় সিরীয় সেই যুবতীর নগ্ন মুখ
রেড লাইট এরিয়ায় শরণার্থী চোখ
ন্যুডবারে নাচতে নাচতে পড়ে যাওয়া বিলাতি মেয়ে
শ্রমিকের ঘাম ঝরে চিমনির নল বেয়ে
যেন এই শবাগার, এই লাশকাটা শহরের চোখ।
চোখে দেশ নাই
ক.
চোখে দেশ নাই ঘরে দোর নাই মাটি পরদেশি
দেহে মন নাই মনে খুন খোঁজে খুনি প্রতিবেশী
জন্মে দেখে খুন-রাহাজানি, মৃত্যুর আগুন
চোখের ভেতর ভালোবাসা খোঁজে, খোঁজে পুরনো রেঙ্গুন।
খ.
দাসজাহাজের খোলে তাজা রক্তের উষ্ণতা দোলে
কুমারী নদীর দেহ ছিবড়ে খাচ্ছে বর্মী হায়েনা শকুন।
শাহপরী দ্বীপ বলতে পারো কি? ঝাউসারি স্মরণিকা হয় কবে
মংডু নাকি নাফ নদীতে রোহিঙ্গা মরণ উৎসবে?

