অন্ধকার-২
পিতা, আপনি বলেছিলেন:
‘অন্ধকার হওয়ার আগেই আমাদের সবকিছু সেরে ফেলতে হবে’।
প্রতিধ্বনিত হয়েছিল একই উচ্চারণ পিতামহের কণ্ঠেও, যা তিনি
শুনেছেন পুরনো বৃক্ষের শেকড়ের মতো সুদৃঢ় আমার প্রপিতামহের দরাজ উচ্চারণে।
একই বীজমন্ত্র বেজে উঠেছে বারবার প্রতিটি সম্ভাবনার সকালে।
এভাবেই প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে
ধর্মশ্লোকের মতো প্রবাহিত হচ্ছে এই মন্ত্র।
‘অন্ধকার হওয়ার আগেই আমাদের সবকিছু সেরে ফেলতে হবে’।
কিন্তু প্রতিটি পুরনো অধ্যায়ের মতো
আজো আমাদের কিছুই হয়নি সারা। দেখুন পিতা, ভালো করে তাকিয়ে দেখুন,
কী ভয়ানক অন্ধকার
নেমে আসছে আমাদের অসমাপ্ত স্বাধীনতায়,
সুস্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি আমাদের সবকিছু
ক্রমশ ডুবে যাচ্ছে অন্ধকারের অতল গহনে।
পিতা, আমি আমার সন্তানকে আর শোনাতে চাই না সেই পুরনো বাণী
বরং ওর কর্ণকুহরে চিৎকার করে বলতে চাই:
‘বৎস্য, আগুন জ্বেলে দাও অন্ধকারের শরীরে। তুমি বরং
শিখে নাও অন্ধকারকে পরাজিত করার কৌশল,
কেননা এই অন্ধকারের ভেতরেই তোমাকে এবং তোমার উত্তর প্রজন্মকে
বসবাস করতে হবে আরও বহুকাল।’
কয়েন
আকাশের পকেটে একটি কয়েন রেখেছিলাম
দূর শৈশবে। যৌবনে তা খুঁজিনি,
হয়ত ভুলেই গিয়েছিলাম,
না কি অজান্তেই সমস্ত যৌবন ধরে তাকে
খুঁজেছি? কেমন ছিল তার রঙ, আকার?
ঝকঝকে রূপালি চাঁদের মতো?
না কি ভোরের আলোর মতো স্বর্ণখচিত,
অথবা মামুলি এক টুকরো লৌহখণ্ড কেবল!
ওকে খুঁজতে খুঁজতে আজ এইখানে,
এই নিয়ন বাতির নিচে এসে দাঁড়িয়েছি।
হলুদ আলোর নিচে ছড়ানো সভ্যতা, বিটুমিন-রাস্তা,
স্বার্থপর এক শহরের মেরুদণ্ড
হাতের আঙুলের মতো সরু এভেনিউগুলো অতিক্রম করি দ্রুত পায়ে
জানি এই রাস্তার গন্তব্য কোথায়,
রেহেলের মতো ছড়ানো উরুর অন্ধকার,
ওখানেই কি গচ্ছিত আছে দূর শৈশবের সেই ধাতু, যা একদিন আমি
খুব গোপনে রেখেছিলাম আকাশের উদার পকেটে?
জলদিগন্ত
অতলান্তিকের পাড়ে পড়ে যাচ্ছে দিন
দৃষ্টি তখনো গোটায়নি আস্তিন
স্তনের বোঁটার মতো ভেসে ওঠে প্রত্যাশার কিস্তি,
দূরে, জলদিগন্তে গাংচিল ডানা-বৃত্তের বাইরে
ক্রমশ প্রস্ফুটিত হচ্ছে নৌকোটি
একটি, হ্যাঁ, একটিই তো
কেউ একজন বলে ওঠে: আরে না, না, দেখো,
ভালো করে দেখো, দুটি, দুটি নৌকো।
আমিতো তখনো একটিই দেখতে পাচ্ছি।
দ্বিতীয় নৌকোটি, আমাদের প্রত্যাশার অন্ন, স্তন্য
তখনো আমার দৃষ্টির সীমানায় এসে পৌঁছোয়নি।
দিন-রাত্রীর গল্প
তখন পৃথিবীর কোনো রঙ ছিল না
না কালো, না শাদা, না আলো, না অন্ধকার
দিন এবং রাত্রীর মধ্যে ছিল না কোনো বিভাজন রেখা
শুধু দু’দল মানুষ ছিল পৃথিবীতে
একদল ছিল পরশ্রীকাতর, তাদের হৃদয়ে ছিল কয়লার অন্ধকার
তাদের অন্তঃকরণ এমনভাবে তৈরি করেছিলেন ঈশ্বর
যেন তারা ভালো কোনো চিন্তা করতে না পারে
তারা তাদের হৃদপিণ্ডের কয়লা ছড়িয়ে দিতো পৃথিবীতে
এভাবেই পৃথিবীর অন্ধকার দিকটি তৈরি হলো
আর অন্যদল ছিল কল্যাণকামী, খোদারই ইচ্ছায়।
তারা অনবরত মানুষের কল্যাণে পাড়ি দিতো ঝড় ও জলোচ্ছ্বাস,
এক ভূ-খণ্ড থেকে ছুটে যেত অন্য ভু-খণ্ডে
তারাই আলো জ্বালিয়েছে পৃথিবীতে, তৈরি করেছে দিন।
এভাবেই পৃথিবীতে দিন ও রাত্রীর সৃষ্টি হলো।
এখনও পৃথিবীতে দু’দল মানুষ আছে।
একদল হিংসার অন্ধকারে ঢেকে দিতে চায় দিনের সূর্য
আর অন্যদল ভালোবাসার আলো জ্বালায় রাতের অন্ধকারে।
