
ছেচল্লিশের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ক্ষত শুকানোর আগেই মানচিত্রের ওপর দাগ দিয়ে দ্বিখণ্ডিত করা হলো বাংলাকে। মানুষ তখনও তাড়িত হচ্ছে তেতাল্লিশের দুর্ভিক্ষের দুঃস্বপ্নে। শিকড় ধরে বাঁচতে চাওয়া মানুষগুলোর ওপর দিয়ে বিশ্বযুদ্ধের পেষণও নিকটতম অতীত। এভাবে ভেঙে যাওয়া গুহাঘরের ভেতর শুধুই বিহ্বলতা আর হাহাকার। স্বপ্নের মুকুলগুলো বেদনায় ম্লান। মূল্যবোধগুলো যেন হতাশায় অবক্ষয়ে লীন।
ফলে শুরু হচ্ছে ভাঙাগড়া। বিত্তভিত্তিক শ্রেণীগুলো ভেঙে যাচ্ছে। বদলে যাচ্ছে সকল কাঠামো। পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয়। গড়ে উঠছে শিল্প, গড়ে উঠছে নগর। বেগে যাচ্ছে বৈষম্য। বেড়ে যাচ্ছে শোষণ। কেউ কেউ মানবতার চরমতম ধ্বংসযজ্ঞের শিকার। কেউ মুকুলে মুকুলে সাজাচ্ছে রতিজাল। কেউ হয়ে যাচ্ছে অন্ধকারে লীন। কেউ জ্বালাচ্ছে ভোগের প্রদীপ।
এ ভাবে ভাঙছে, গড়ছে। গড়ছে, ভাঙছে। ফলে আত্মপরিচয়টাই হুমকির সম্মুখীন। তখনই এলো ভাষার ওপর আঘাত। কিন্তু প্রতিবাদটাই প্রমাণ করে দিলো আপন জাতিসত্তার মূল শক্তিকে। তারপর…
তারপরই তো মূল যুদ্ধ। ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে অধিকার প্রতিষ্ঠা করা গেল ঠিকই কিন্তু এই ভাষার বিকাশ ও টিকিয়ে রাখার কৌশলটাই তো মূল যুদ্ধ। এই মূল যুদ্ধ যখন শুরু হলো, তখন যারা প্রবল প্রতাপে অবতীর্ণ হয়েছিলেন কলম হাতে, সৈয়দ শামসুল হক ছিলেন তাদের অন্যতম। যে কলমের কালি সাদা পষ্ঠার ওপর এঁকেছিল কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক। কাজটা সহজ ছিল না। কারণ এই যুদ্ধের প্রতিপক্ষ ছিল স্বয়ং রাষ্ট্র।
সৈয়দ শামসুল হক তখন বাংলার দুঃখিনী বর্ণমালাকে আপন করে নিয়ে লিখলেন ছোটগল্প—‘তাস’ (১৯৫৪), ‘শীত বিকেল’ (১৯৫৯), ‘রক্তগোলাপ’ (১৯৬৪), ‘আনন্দের মৃত্যু’ (১৯৬৭), ‘প্রাচীন বংশের নিঃস্ব সন্তান’ (১৯৮২), ‘প্রেমের গল্ ‘ (১৯৯০), ‘জলেশ্বরীর গল্প’ (১৯৯০) ইত্যাদি। লিখলেন কবিতা—‘একদা এক রাজ্যে’ (১৯৬১), ‘বিরতিহীন উৎসব’ (১৯৬৯), ‘বৈশাখে রচিত পঙ্ক্তিমালা’ (১৯৭০), ‘প্রতিধ্বনিগণ’ (১৯৭৩), ‘অপর পুরুষ’ (১৯৭৮), ‘পরাণের গহীন ভিতর’ (১৯৮০) ইত্যাদি। লিখলেন উপন্যাস—‘এক মহিলার ছবি’ (১৯৫৯), ‘অনুপম দিন’ (১৯৬২), ‘সীমানা ছাড়িয়ে’ (১৯৬৪), ‘নীল দংশন’ (১৯৮১), ‘স্মৃতিমেধ’ (১৯৮৬), ‘মৃগয়ায় কালক্ষেপ’ (১৯৮৬), ‘বৃষ্টি ও বিদ্রোহীগণ’ (১৯৮৯, ১৯৯০) ইত্যাদি। লিখলেন কাব্যনাটক—‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ (১৯৭৬), ‘গণনায়ক (১৯৭৬), ‘নুরুলদীনের সারাজীবন’ (১৯৮২) ইত্যাদি।
তাঁর বহুবিধ সৃজনকর্মের মধ্যে যদি ছোটগল্পের দিকে তাকাই, দেখা যাবে তিনি ক্লান্তিকর ও গ্লানিময় অভিজ্ঞতাকে দিয়েছেন অর্থময়তা, রাজনৈতিক চেতনাকে উপস্থাপন করেছেন আকাঙ্ক্ষার শীর্ষে, বেঁচে থাকার যুদ্ধকে দিয়েছেন অপার মহিমা, ধ্বংসের কিনারায় পতিত হওয়ার পরও দিয়েছেন সৃষ্টির উল্লাস, স্বপ্নের সূর্যের আভাস। নাগরিক জীবনের স্বপ্ন-সংকট-সম্ভাবনাকে এমনভাবে এঁকেছেন, যেন মানুষ এ সবের ভেতরে খুঁজে পায় বেঁচে থাকার আপার সম্ভাবনা। ক্ষতের গভীরে তিনি ঢেলে দিয়েছেন মধু-বৃক্ষের বীজ। পাথর সরানোর সাহস জুগিয়ে জানাচ্ছেন ভেতর রয়েছে প্লাবন-উন্মুখ ঝর্ণা।
প্রসঙ্গক্রমে ‘প্রাচীন বংশের নিঃসঙ্গ সন্তান’ গল্পের দিকে একটু আলোকপাত করা যেতে পারে। গল্পে লেখক প্রত্যক্ষভাবে উপস্থিত। এবং বিশ্বাস-অবিশ্বাসের একটা বিবরণও তিনি দিয়ে ফেলেন এখানে। বলেন, ‘এ কাহিনী এর আগে যারা শুনেছে তারা অবিশ্বাস করেছে, এ কাহিনী ভবিষ্যতে যারা শুনবে অবিশ্বাস করবে তারাও।’ এক দুর্ভিক্ষপীড়িত এলাকায় গিয়ে তৃষ্ণায় কাতর হলে ইদ্রিস খাঁ নামক এক লোক ‘রুপার রেকাবিতে রাখা রুপার গেলাশ’ নিয়ে উপস্থিত হন। লেখকের সাথে তাঁর কথোপকথন চলে। কথোপকথন থেকেই জানা যায় ইদ্রিস খাঁ সব কিছু বিক্রি করে দিতে দিতে নিজেকেও বিক্রি করে দিয়েছেন। বিক্রি করার পর তিনি আবার পালিয়েও এসেছেন। কারণ পেটে ভাত যাবার পর তার বোধোদয় হয়েছে যে এই দু’মুঠো ভাতের জন্য পরাধীনতা! কিন্তু এর থেকে মুক্তির উপায় কী? মুক্তির উপায় বলে দেন ভোলা মাস্টার। উপায় অনুযায়ী ভোলা মাস্টার তাকে চুরি করবেন। কিনে নেওয়া মানুষটি এর জন্য কোথাও কারও কাছে অভিযোগ করতে পারবেন না। কারণ মানুষ বিক্রির মতো দ্রব্য না।
উপনিবেশবাদ আর সাম্রাজ্যবাদের কাছে আমাদের বিক্রি হয়ে যাওয়া, বিক্রি হয়ে যাওয়ার পর বোধোদয়, বোধোদয়ের পর মুক্তির পথ খোঁজা, মুক্তির পথ খুঁজতে একজন ভোলা মাস্টারের জন্য প্রতীক্ষা করা, মানুষ যে বিক্রির দ্রব্য নয় এই বোধোদয়ের মাধ্যমে মানবতার জয়গান গাওয়া- গল্পটিতে এসব কিছুই এসেছে প্রতীকের আড়ালে। যা বাঙালির ঐতিহাসিক জীবনের বোধ-বিকাশের ক্রম পরম্পরা।
তাঁর রচিত নিরীহ অক্ষরগুলো এভাবেই যুদ্ধ করেছে। মৌনলিপিগুলো এভাবেই দংশন করেছে তৎকালীন তথাকথিত রাষ্ট্রের চাপিয়ে দেওয়া জগদ্দল পাথরকে।
এই মহান সব্যসাচী লেখকের জন্মদিনে তাঁকে প্রণতি জানাই। তিনি বেঁচে থাকুন ১১৬ বছর।
