এক-দুদিনের ছুটি হাতে পেলে অন্যরা যেমন সিনেমা দেখে, বসে বসে বই পড়ে অথবা সংসারের মন রেখে ভাগেযোগে আড্ডা দেয়—আমার অমন হয় না। আমি হয় লালনবাড়িতে জমা পড়ি, নয় তো আজগুবি একদিকে চলে যাই। খুব দূরে নয়! বেশিরভাগ ভ্রমণ কুষ্টিয়া টু মেহেরপুর। তারপর ফের কুষ্টিয়া ভায়া ঝিনাইদহ। নিয়মিত প্যান্টশার্ট আর মুখস্ত করা মানুষজন লাগাতার হলেই দৃশ্যের মধ্যে একঘেয়েমি নেমে পড়ে। তখন আপাত লাপাত্তা হতে ভালো লাগে। সেই ধারা বুঝেই একদিন মেহেরপুরের গিয়ে হাজির হয়েছিলাম।
হোটেল-বাজার জুড়ে তখনও ভোরের অলসতা। কাউন্টার ছাড়া কেউ নেই কোথাও। জবুথবু একটা চায়ের দোকানে কোনোমতে চুলা জ্বলছে মাত্র। দৌড়ে গিয়ে দুধচায়ের কথা বললাম—লিকার বেশি দিয়ে এক কাপ বানান। আগে এক গ্লাস পানি দিয়েন। মুখে ‘হবে’ বলেই খলানি দিয়ে কচলে কচলে গ্লাস পরিষ্কার করলেন দোকানি। তারপর ধীরেসুস্থে গ্লাস ভরে সামনে ধরলেন, ‘ভাই ন্যান’। ব্যবহার দেখে মনটা ভালো হয়ে গেল। জিজ্ঞাসা করলাম, আপনার দোকান দেখে তো মনে হচ্ছে হাজার টাকার মালও নেই, সংসার চালাতে পারেন! এ রকম পারসোনাল প্রশ্নে রাগের পরিবর্তে উল্টো টুল টানলেন তিনি। বললেন, ভাই বসেন না ক্যানে, বসেন। বসার পর বলতে শুরু করলেন, শোনেন ভাই, আগে তো মেকারি কত্তাম, সাইকেলের। তো একদিন কাজ কত্তে গিয়ে আঙুলে হাঁতুড়ির চোট পড়ে গেল। সে দিনই বুঝলাম, আমার দ্বারা আর হবে নাকো। তাছাড়া বলে (শক্তি) তেমন পালাম না। তাই ওকাজ ফেলে চায়ের দোকান দিলাম। এখন দু-তিন শ হয়, চালানের মালিক ওই একজন-আল্লাহ। শান্তিপুরি ভাষায় একদাগে গফ্ফারের এহেন বয়ান শুনে পুলকিত হয়ে গেলাম—আপনার লেখাপড়া কতদূর? গফ্ফার চিন্তিত হলেন না; উল্টো লাজুক হাসলেন—লিখাপড়াটা কত্তি পারি নাই, কোনোমতে নাম সইডা কত্তি পারি।
চাওয়ালার মুখে এরকম নম্র উত্তর আশা করিনি। ভালো করে কথা বলতে পারাটা লেখাপড়ার চেয়ে কম কিসে! দাম মিটিয়ে ভ্রমণের কথা বললাম। সময় নিয়ে পথ বাতলালেন তিনি—কী তেমন দ্যাকপেন, তয় মজিবনগরে যেতি পারেন। আমঝুপিতেও যেইতি পারেন। একন তো বাসগাড়ি কিছু পাবেন নাকো, তবে আল্গামনে যেইতি পারেন। নছিমন, করিমনের নাম শুনেছি কিন্তু আলগামন মানে! গাফ্ফার হেসে ফেললেন—এখানে চার রকমের ভট্ভটি আছে ভাইজান। আলমসাধু, নছিমন, করিমন আর আলগামন। মালটানা খোলাগাড়ির নাম আলমসাধু। ছইওয়ালা ভ্যানমতো হলো করিমন। আর ছই ছাড়া আলগা করিমন গুলানই আলগামন। গফ্ফারের মতো সহজমানুষের সাহচার্য আমাকে আনন্দ দেয়। কথা বলতে বলতে আমি গফফারের সুস্বাদু চায়ে চুমুক দিই। একসময় গফ্ফার হয়ত নতুন গ্রাহকদের নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।আমি সেদিকে যাই না বরং ভাবনাগ্রস্ত মাথায় অকাতরে আয়েশ করতে থাকি। তারপর খামোখাই রুহুল ফকিরের মুখটা মনে পড়ে, তিনিও কি সহজমানুষ নন! ক্ষ্যাপা কিসিমের এ বাউলের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল দোল উৎসবে। কথা বলতে গেলে সাবজেক্টের ঠিক থাকত না। লাগাতার বকে যান তিনি। একদিন কী মনে করে দেহতাত্ত্বিক বিষয়ে জানতে চেয়েছিলাম—যেমন ধরেন, বাতাসের সাধনায় নারীদেহের যোগ আছে? শেষ করতে পারলাম না, রুহুল ক্ষেপে গেলেন—আরে ধুরো, নারীর লগে তো কোনো কতাই নাই আপনার। আপনে তো আদম, আপনের লগে খেলা। নারী হলো নাথিং। উনি আমার প্রয়োজনে।
________________________________________________________________________________________________
ইল্লিন আর সিজ্জিল। পাপের কাজ করলে সিজ্জিল আর নেকিতে যাবে ইল্লিনে। ক্ষেপিয়ে তুলতে চাইলাম—মহাযোগের সঙ্গে তো নারীর যোগ আছে। কী বলেন? রুহুল এবার সত্যি ঝাঁঝিয়ে উঠলেন—মহাযোগ নিজের সঙ্গে। হাওয়ার লগে কিসের গল্প!
________________________________________________________________________________________________
আমাকে আল্লাহ নিজ সুরাতে বানাইছে। ক্ষ্যাপামুখেই লালনপদ বলতে লাগলেনতিনি—
আপন সুরাতে আদম গঠলেন দয়াময়
তাইতে ফেরেস্তাদের সিজদা দিতে কয়
পদ শেষ হলে মুখ পানে চেয়ে সাপ্টা প্রশ্ন ছুঁড়লেন—নাম কী আপনার?
বললাম—আজাদুর রহমান
রুহুল হা হা করে উঠলেন—আজাদুর রহমান সারেজাহান খুঁজলে আর পাবেন না। নাম পাবেন কিন্তু আপনার চেহারা পাবেন না। এটা হলো চেহেরে খোদা। পরিষ্কার করতে তিনি ফের উদাহরণ টানলেন—যেমন, আমার নাম রুহুল। রুহুল আর পৃথিবীতে নাই। নাম আছে, রুহুল নাই। এই বডিটা হলো আদম। আল্লাহ নিজ তরফ থেকে এর ভিত্রে রুহু ফুঁকারে দিয়েছেন। কোরানে দ্যাখেন আল্লামাল আদামা আসমাহা…।
তার মানে আল্লাহ নিজেই ঢুকেছেন?
হ নিজেই ঢুক্ছেন…আল্লাহু কুল্লি…আমি গর্দানের শাহীরগের সন্নিকটেই আছি। বর্ণনা শুনে নিজের গলার রগ দেখিয়ে বললাম, এখানে? রুহুল ফের চিৎকার করলেন—আরে হাঁ, আল্লাহতায়ালা এর চেয়েও সন্নিকটে আছেন। সেই আল্লাহকে চিনছেন? আল্লাহ্ ছাড়া কাউকে সেজদা করলে হারাম হয়ে যাবে। অন্ধকারে ডুব দিয়ে লাভ কী!
পাল্টাপাল্টি কথায় সুবিধা হলো প্রসঙ্গের তোয়াক্কা না করেই দিগ্বিদিকে প্রশ্ন করা যায়। জিজ্ঞাসা করলাম, আপনি মারা গেলে কী হবে?
যদি কোনো ভালো গুনাবলী থাকে তবে সাঁইজির মতো এরকম একটা মাজার হবে।
হোক কিন্তু রুহুলটা কই যাবে?
রুহুলটার জন্যি তো থান-ই আছে! ইল্লিন আর সিজ্জিল। পাপের কাজ করলে সিজ্জিল আর নেকিতে যাবে ইল্লিনে। ক্ষেপিয়ে তুলতে চাইলাম—মহাযোগের সঙ্গে তো নারীর যোগ আছে। কী বলেন? রুহুল এবার সত্যি ঝাঁঝিয়ে উঠলেন—মহাযোগ নিজের সঙ্গে। হাওয়ার লগে কিসের গল্প! এখন বলেন, হাওয়ার কোনো কাঠামো তৈরি করেছে? নকশা আছে? আদমের বডিতেই হাওয়ার উৎপত্তি। কথা হলো আমি নারী, আমিই পুরুষ।
অবাক হলাম—পুরুষই নারী এ কেমন কথা!
রুহুল পাল্টা ব্যাখ্যা করেন—আমি নারী না হলে আমার বীজে মেয়ে হলো ক্যামনে! তিনি আঙুলের ইশারায় পাশে ঘুমন্ত স্ত্রীকে দেখান—ই দ্যাকেন, উনারে আমার প্রয়োজনে আনছি। জমি আনছি আবাদ করার জন্যি। আদমের মধ্যেই সব…।
ফকির রুহুলকে ভেবে কতক্ষণ অন্যমনস্ক ছিলাম জানি না। ভট্ভট্ শব্দে সচকিত হওয়ার আগেই গফ্ফার হাঁক ছাড়লেন—এই সোলেমান। আয় আয় ইদিকি আয়। এই ভাইজান নীলকুঠি যাপেন…। কথাগুলো শেষ করে তিনি মুখে হাসি তুললেন—ভাইজান আপনি যান, উ খুব ভালো ছেলি, কোনু অসুবিধা হবে নাকো।

