সত্যেন্দ্রনাথ বসু (১৮৮৪-১৯৭৪) বাঙালি বিজ্ঞানী, গণিতবিদ ও সাহিত্যিক। বাংলা সাহিত্যের গভীর অনুরাগী ছিলেন বলেই তিনি ‘সবুজপত্র’ ও ‘পরিচয়’ পত্রিকার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ছিলেন। ছিলেন এই দুটি পত্রিকার লেখকগোষ্ঠীর সদস্যও। তিনি বাংলা সাহিত্যের সদ্য প্রকাশিত বইয়ের খবর রাখতেন বলেই এত বাঙালি কবি-সাহিত্যিকের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক ছিল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার ‘বিশ্ব পরিচয়’ (১৯৩৭) গ্রন্থটি সত্যেন্দ্রনাথ বসুকে উৎসর্গ করেন। সুধীন্দ্রনাথ দত্ত তার প্রথম আধুনিক ও বিখ্যাত কবিতার বই ‘অর্কেস্ট্রা’(১৯৩৫) উৎসর্গ করেন সত্যেন্দ্রনাথ বসুকে। অন্নদাশঙ্কর রায় তার বিখ্যাত ভ্রমণকাহিনি ‘জাপানে’ সত্যেন্দ্রনাথ বসুকে উৎসর্গ করেন। বিষ্ণু দে পূর্ণাঙ্গ একটি ইংরেজি গ্রন্থ Satyendranath Bose: A Legend in his Life time (1964) রচনা করেন বসুকে নিয়ে।
বিজ্ঞানী ও গণিতবিদ সত্যেন্দ্রনাথ বসুর বিশ্বপরিচয় ইংরেজি রচনার জন্য এবং তার ইংরেজি রচনার আইনস্টাইন কৃত জার্মান অনুবাদের জন্য। তবে তার বাংলা রচনার পরিমাণও কম নয়। তিনি বিজ্ঞানী ও গণিতবিদ হিসেবে গণিত ও বিজ্ঞান জগতের নানা বিষয় এবং দেশ-বিদেশের বহু গুণীজনকে নিয়ে যেমন লিখেছেন, তেমনি বিজ্ঞানের বাইরের নানা বিষয়, যেমন: সাহিত্য, ভাষা ও মাতৃভাষা, শিক্ষা, রাজনীতিবিদের স্মৃতিচারণ, ইংরেজি, জার্মান, ফরাসি প্রভৃতি আধুনিক ইউরোপীয় ভাষা থেকে গল্প, স্মৃতিচারণ ও সাক্ষাৎকার অনুবাদ, সঙ্গীত, ইতিহাস, গ্রন্থ-সমালোচনা এবং চিঠিপত্রও লিখেছেন। সব মিলিয়ে তার রচনার পরিমাণ অনেক। গ্রন্থভুক্ত হয়নি এমন রচনাও অনেক পত্রপত্রিকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। বর্তমান রচনায় তার অনুবাদ কর্মের মধ্যে ‘তলস্তয়ের মৃত্যুদৃশ্য’ নিয়ে লেখাটির আলোচনা করা হচ্ছে। তলস্তয়ের ফরাসি জীবনী-লেখক জাঁরি ত্রইয়ার লেখা জীবনী থেকে নেওয়া একটি অংশের অনুবাদ এটি।
রুশ সাহিত্যের মহান লেখক এবং উনিশ শতকের বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ লেখক, ‘সাহিত্যসিংহ’ খেতাবপ্রাপ্ত লেভ তলস্তয় উনিশ শ দশ খ্রিস্টাব্দে মারা যান। তার মৃত্যু নিয়ে সারাবিশ্বের মানুষের কৌতূহল ছিল এবং এখনো আছে। মৃত্যুর আগে তলস্তয় স্ত্রীর সঙ্গে রাগ করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে চলে যান। আস্তাপোপোভ নামের এক ছোট্ট রেলস্টেশনে গিয়ে আশ্রয় নেন। সেখানেই তার মৃত্যু ঘটে। মাঝখানের সাতটি দিন কেমন করে কাটল সেই শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির বর্ণনা সত্যেন্দ্রনাথ বসু বাংলায় লিখেছেন।
এ রচনাটি বিষয়বস্তুগত দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ এবং আকর্ষণীয়। ভাষা শুধু সরল আর প্রাঞ্জলই না, অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শীও। এত বড় লেখক তলস্তয়ের এই সাধারণ জায়গায় মৃত্যুর ঘটনা, তার পরিবারের সদস্যদের আচরণ, স্ত্রীকে দূরে সরিয়ে রাখা, কন্যাদের সাহচর্য, সরকারের সিদ্ধান্ত, গণমাধ্যমের ভূমিকা সব কিছু উঠে এসেছে চমৎকার ভাষায়।
জীবনের শেষ দিনগুলোতে তলস্তয়ের ধর্মভাবনা, মৃত্যুচেতনা, সাহিত্যচিন্তা এবং কৃষিজমিতে কাজের পূর্ব অভ্যাসের প্রত্ননিদর্শনসহ বার্ধক্যের নিখুঁত বর্ণনা যেন দক্ষ হাতের কথাসাহিত্য। অসমাপ্ত রচনার বিষয়ে সিদ্ধান্ত, চিঠিপত্র লেখানো কত কিছু তিনি করেছেন শেষের এই সাত দিনে। তিনি স্পষ্ট বুঝতে পারছেন আয়ু ফুরিয়ে এসেছে। তাই তিনি অসমাপ্ত কাজের জন্য তাড়া দিচ্ছেন। গায়ে জ্বর উঠছে, ঘুমাচ্ছেন ওষুধের পাহারায়। আবার জাগছেন। উপস্থিত স্বজনদের নাম ভুলে যাচ্ছেন। চেহারা দেখে চিনতে পারছেন না। গোঙাচ্ছেন। প্রলাপ বকছেন। শ্বাসকষ্টে ছটফট করছেন। প্রলাপের ভেতরে তার প্রিয় কৃষকদের হয়ে কথা বলছেন। তাদের দাবির কথাও ভুলছেন না। মস্তিষ্ক বিভ্রান্ত করছে—স্মৃতি উল্টেপাল্টে যাচ্ছে। আবার মেয়ের সঙ্গে কথা বলছেন। আঙুলকে কলম বানিয়ে চাদরের ওপরে দ্রুত কী যেন লিখছেন, ক্লান্ত হয়ে আবার শুয়ে পড়ছেন। একবার ছেলে সার্জকে বললেন, ‘আমি আর ঘুমাতে পারছি না। সব সময়ই রচনা করছি—লিখতে হচ্ছে—অবশ্য সবই শৃঙ্খলার সঙ্গে চলছে।’
কখনো বলছেন, ‘এই দেখো, এই শেষ আর কিছুই নাই।’ আবার মেয়েকে বলছেন, ‘এই কথাটি মনে করো আমার উপদেশ—এই পৃথিবীতে লিও নিকোলোভিচ ছাড়াও অনেক লোক আছে—তুমি কিন্তু শুধু এক ব্যক্তিকে নিয়েই রয়েছো।’ আবার যন্ত্রণায় বলছেন, ‘আঃ কি কষ্ট! এমন কোথাও যাবো যে, আমায় কেউ আর পাবে না। আমায় শান্তিতে থাকতে দাও।’ কখনো মৃত কন্যাকে ‘মাশা, মাশা’ বলে চেঁচিয়ে ডাকছেন। আবার কখনো কৃষকের মতো চিৎকার করে বলছেন, ‘এ ছাউনি তোলো—তুলতে হবেই।’
যথেষ্ট অনুতপ্ত হওয়া সত্ত্বেও স্ত্রীকে তার সন্তানরা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তলস্তয়ের কামরা থেকে দূরে সরিয়ে রাখলেন। কাউন্টেস শনিয়া কাচের ভেতর দিয়ে দূর থেকে কঙ্কালসার বৃদ্ধটিকে দেখে চোখের পানি ফেললেন। সারাজীবনের সুখ-দুঃখের সঙ্গী—আটচল্লিশটি বছরের স্মৃতি ঠেলে ওঠে; চোখের পানিতে ভেসে যায়। তলস্তয় একবার মেয়েকে বললেন, ‘শনিয়ার ওপর অনেক ভার পড়লো।’ এ কথায় মনে হয় স্ত্রীকে কাছে পেলে হয়তো তিনি রেগে উঠতেন না, যে আশঙ্কা করেছিলেন তার কাছে উপস্থিত ছেলে-মেয়ে ডাক্তারসহ অন্যেরা।
উনিশ শ দশ খ্রিস্টাব্দের সাত নভেম্বর সকাল ছয়টায় তলস্তয় কন্যার, পুত্রের এবং ডাক্তারের ডাক অগ্রাহ্য করলেন। আর জেগে উঠলেন না। ঋষি তলস্তয়ের প্রথাগত চার্চে আনুগত্য ছিল না বলে চার্চের বিশপরা অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় অংশ নিলেন না; তার বিদেহী আত্মার জন্য প্রার্থনা করলেন না, অংশও নিলেন না। বরং এড়িয়ে গেলেন। তারা যেন ঐক্যবদ্ধভাবেই তলস্তয়ের মরদেহকে অপমান করলেন। মৃত্যুসংবাদ গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ছড়িয়ে পড়ল। স্কুল থেকে ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা ফুল নিয়ে দৌড়ে আসতে শুরু করল। কৃষকেরা দলে দলে মাঠ থেকে কাঁদতে কাঁদতে ছুটে এলেন। স্বজন হারানোর আহাজারি তাদের কণ্ঠে। এক কৃষকপত্নী তার ছেলেকে বললেন, ‘দেখ্ মনে রাখিস ইনি আমাদের জন্যই খেটেছেন সারাজীবন।’
রেল স্টেশনের ছোট কামরায় তলস্তয়ের মরদেহ। তখন সারা রাশিয়ায় জনগণ বিশেষ করে কৃষকেরা নিজেদের মতো করে প্রার্থনার আয়োজন করছেন। শহরে শহরে শোক পালিত হচ্ছে। বন্ধ হয়ে গেছে সেন্ট পিটার্সবুর্গের থিয়েটার ও বিশ্ববিদ্যালয়। সেন্ট পিটার্সবুর্গ ও মস্কো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শত শত ছাত্রছাত্রী ছুটে আসছে ইয়াসনায়া পলিয়ানার দিকে। লাশ ইয়াসনায়া পলিয়ানায় যেন না নেওয়া হয় সে জন্য বিশপদের কথায় পুলিশ ঐদিকের সব যাত্রীবাহী ট্রেন বন্ধ করে দিল। অবশেষে কৃষকেরাই মহান সাহিত্যিক তলস্তয়ের লাশ মালগাড়িতে করে ইয়াসনায়া পলিয়ানায় নিয়ে গেলেন। নিজেদের হাতে সমাহিত করলেন তাকে ইয়াসনায়া পলিয়ানার জাকাসের বনে, নির্জন স্থানে। যে জায়গাটা ছোটবেলা থেকেই তার ভাই নিকোলাস ‘বিশ্ব প্রেমের ফর্মুলা’ বলে অভিহিত করতেন সেখানে তলস্তয় সমাহিত হলেন। পার্থিব জগতের সব যন্ত্রণা থেকে মুক্তিলাভের জন্য সত্যিই তলস্তয় চলে গেলেন সবার থেকে দূরে। ঈশ্বরের সৃষ্টি তলস্তয় নির্দিষ্ট আয়ুর সমাপনীতে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন কিন্তু তলস্তয়ের সৃষ্টিগুলো অমর হয়ে রয়ে গেল।

