॥ পর্ব-৬॥
মরুভূমির তপ্ত বালুর মাঝে যেন প্রশান্তির বৃষ্টি। সত্যনারায়ণের জীবন থেকে একটা ভারী পাথর নামিয়ে দিয়েছে যেন ঈশ্বর। ঈশ্বরের পায়ে কোটি প্রণাম জানায় সত্য। আভার দু’চোখে নোনা স্রোত। ভিজিয়ে দিচ্ছে বুকের সব বেদনাকে। পুড়ে যাওয়া হৃদয়ে প্রশান্তির প্রলেপ।
একটা পুত্র সন্তানের জন্য আভাকে কতইনা যন্ত্রণা দিয়েছে এই সমাজ। আজ দীপুর জন্মের পর যেন সব কষ্ট মনে পড়ছে আভার। বুকের জমানো সব দীর্ঘশ্বাস কান্না হয়ে ভাসিয়ে দিচ্ছে বুকের জমিন। দীপুকে বুকে নিয়ে চোখ বুজলো আভা। ছোট্ট দীপুকে কাঁপা হাতে স্পর্শ করলো। ওর ছোট্ট হাত পা, ছোট্ট মাথা স্পর্শ করতেই বুকের ভেতরটা ভেঙে-চুরে কান্না বেরিয়ে এলো চিৎকার হয়ে। পাগলের মতো কাঁদলো আভা। সে কান্না ভাসিয়ে দিলো সত্যনারায়ণ আর ওর তিন মেয়েকেও।
এবার সমাজের সব লাঞ্ছনার অবসান হবে কি? আভা এই ভেবে অবাক হয়, তার পুত্র সন্তান হওয়া বা না হওয়া নিয়ে সমাজের মানুষের ক্ষোভ বা ঘৃণা কেন! আজ দীপু তার বুকে। কিন্তু এই সমাজের মানুষের দেওয়া লাঞ্ছনা ফিরিয়ে নিতে পারবে? তাদের যে কষ্ট, ঘৃণা আর অবহেলা সহ্য করতে হয়েছে, তা যেন এই সমাজের আর কারও না হয়, সেই চাওয়া আভার।
সব অন্ধকার কেটে আলো এসে উঁকি দিচ্ছে জীবনে। দীপু বেড়ে উঠছে উঠোনের কোণে লাগানো বেগুন, টমেটো আর সবুজ ডাটা শাকের সঙ্গে হেসে খেলে। অভাব থাকলেও আনন্দে ভরপুর আভা আর সত্যনারায়ণের সংসার। ফুলকাকু আপাতত বাড়ি ছাড়ার কথা বলতে ভুলে গেছে। তবে বেশিদিন থাকা যাবে না এখানে। নিজের একটা বাড়ি, নিজের একটা মাথাগোঁজার ঠাঁই দরকার। সত্যনারায়ণের চার মেয়ের পর একটা ছেলে হয়েছে। এই খবর যাদবানন্দের কানেও পৌঁছেছে। খবর পাঠিয়েছে যেন সত্যনারায়ণ দেখা করে ছেলেকে নিয়ে। কিন্তু কিছুতেই যাবে না সে। তার অভিমানও বুকে পাহাড় সমান।
রবিবার সকাল। বেগুন ভাজা আর মুগডালের গরম খিঁচুড়ি রান্না করে ছেলেমেয়েকে খেতে দিয়েছে আভা। টমেটো ক্ষেতের পাশে রোদ এসেছে। সেখানে মাদুর পেতে খেতে বসেছে সবাই। দীপুর আধো আধো কথা বলা নিয়ে মজা করছে সবাই। এমন সময়ে বাড়িতে উপস্থিত হলো যাদবানন্দ। দীপুর ঠাকুরদা। বয়সের ভার, রোগ-শোক তাকে একেবারেই নুইয়ে দিয়েছে। একদম প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে উপস্থিত হয়েছে যাদবানন্দ। অদ্ভুত এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হলো ফুলকাকুর বাড়ি। এতটা বছর পর বাবা ছেলের দেখা। রাগ, অভিমান, কষ্ট একপর্যায়ে কান্নায় ফেটে পড়লো। যাদবানন্দের বারবার ছেলের কাছে ক্ষমা চাওয়া পরিবেশকে আরও ভারী করে তুলেছে।
দীপুকে কোলে নিয়ে আদরে ভরিয়ে তুললো যাদবানন্দ। সোনালী, কাবেরী, বেবি আর রুম্পাকে দূরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কাছে ডেকে নিলেন। সবার সামনে হাত জোড় করে ক্ষমা চাইলেন, এরের সবাইকে একসঙ্গে আঁকড়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়লেন। বাড়ি গিয়ে যেন সবাই থাকে, সে অনুরোধ করলেন বারবার। জোর করার সাহস পেলেন না। যাওয়ার বেলায় দীপুর হাতে একটা কড়ি দিয়ে গেলেন আশীর্বাদ করলেন। তবে বাবা যাই বলুক সত্য নারায়ণ ওই বাড়ি আর ফিরবে না, এ বিষয়ে কোনো সংশয় নেই।
ফুলকাকুর চাকরি শেষ। অবসর পেয়ে ফুলকাকু ফিরে এলেন নিজ বাড়িতে। কিন্তু এবার তিনি নিজের জন্য রান্নার আলাদা লোক রাখলেন। আলাদা হয়ে নিজের মতো থাকতে শুরু করেছেন। সত্যনারায়ণ, আভা ছেলেমেয়েকে শান্ত থাকতে বললো। দাদু পছন্দ করে না, এমন কাজ যেন তারা না করে সেটা বারবার বোঝাতে লাগলো। দীপু আর রুম্পার হাসিমুখে তার কোনো চিহ্ন পড়ল না। ওরা এখনো পৃথিবীর এত জটিল সমীকরণ বোঝে না। তবে সোনালী, কাবেরী আর বেবি অনেকটা গম্ভীর হয়ে গেলো। ঘরের কাজে মাকে সাহায্য করার পর বাকি সময়টা ঘরের কোণে চুপচাপ বসে থাকতে শুরু করলো। খেলাধুলা, অকারণ দৌড়াদৌড়ি বন্ধ করলো ওরা।
দীপু এখনো স্কুলে যেতে শুরু করেনি। কিন্তু আশেপাশের জঙ্গল, স্টেশন বাজার, কলোনি সব তার নখদর্পণে। সারাদিন দীপু ঘুরে বেড়ায়। শারীরিকভাবে বেশ দুর্বল দীপু। পেটে কোনো খাবার হজম হয় না। মাঝে মাঝে খাওয়ার পরপরই বমি করে ফেলে। রুগ্ণ, পাতলা, টিনটিনে হাত পা নিয়ে সে ঘুরে বেড়ায়। প্রকৃতির মাঝে থাকতে ভালো লাগে দীপুর। আশেপাশের এলকার জীবনযাত্রার সঙ্গে নিজেদের মেলাতে শুরু করে। দিদি, মাকে হাজারটা প্রশ্নে জর্জরিত করে তোলে সারাদিন।
দীপুর শরীর বেশি খারাপ থাকলে ও ঘুরতে বের হয় না সেদিন। বাড়িতেই শুয়ে বসে থাকে আর রুম্পার সঙ্গে গল্প, খেলা আর মারামারি। কিন্তু ফুলকাকু বিরক্ত হন ভীষণ। তিনি নিরিবিলি থাকতে পছন্দ করেন। এত হট্টোগোল পছন্দ করেন না। চিৎকার দিয়ে ওদের থামতে বলেন। হাতের লাঠি দিয়ে টেবিলের ওপর জোরে জোরে আাঘাত করেন। বাড়ির সবাই আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। ফুলকাকু সারারাত ধরে কাশতে থাকেন। পাশের ঘর থেকেও সত্যনারায়ণ, আভার ঘুম ভেঙে যায়। ফুলকাকুর সব কথায়, ব্যবহারে তার খিটখিটে মোজাজ বোঝা যায়।
সত্যনারায়ণ সেদিন বাড়িতেই ছিলো। দীপু হঠাৎ চিৎকার করতে করতে বাড়ি ফিরলো। যেন বিশাল কিছু আবিষ্কার করে ফেলেছে। দিদিরা সব দৌড়ে বের হলো। পেছন পেছন এলো সত্যনারায়ণ। সত্যনারায়ণ দেখলো ছেলে তার এক ভাঙা রেডিও নিয়ে হাজির। উঠোনের কোণে পাতা মাদুরে দুপা মেলে দিয়ে রেডিও খোলার চেষ্টা করছে। চিৎকার শুনে ভয় পেয়ে গেছিলো সত্যনারায়ণ। আসল ঘটনা বুঝতে পেরে নিশ্চিন্ত হলো। এদিকে দীপুর চিৎকার শুনে ফুলকাকুর চেঁচামেচি শুরু হয়েছে তার আর থামার নাম নেই। কী বলছেন, কিছুই বোঝার উপায় নেই। শুধু বিরক্তিমাখা একটা কণ্ঠস্বর কানে ভেসে আসছে।
দীপুর আবিষ্কারের গল্প থেকে বোঝা গেলো পাশের বড় রাস্তার ধারে যে ডাস্টবিন আছে সেখানে কেউ রঙচটা ভাঙা পুরনো রেডিওটা ফেলে গেছিলো। দীপু দেখতে পেয়ে কুড়িয়ে নিয়ে এক দৌড়ে বাড়ি পৌঁছেছে। দীপু কলোনির ঘরগুলোতে দেখেছে রেডিও, টেলিভিশন। ওদের ঘরে ঢোকার অনুমতি নেই দীপুর। জানালা দিয়ে টেলিভিশন দেখার চেষ্টা করলেও ওরা জানালা বন্ধ করে দিয়েছে। মনে মনে কত ভেবেছে, ইশ! আমাদেরও যদি এমন ঘর হতো। ঘর না হোক, একটা রেডিও বা টেলিভিশনও যদি থাকতো।
এই ভাঙা, রঙচটা রেডিও পেয়ে দীপুর খুশি যেন আর বাঁধ মানছে না। সত্যনারায়ণ ছেলেকে শান্ত হতে বললো। রেডিওটা নিয়ে বসলো এবার সত্যনারায়ণ। দেখলো রেডিওতে তেমন কিছু হয়নি। হয়তো পুরনো দেখে ফেলে দিয়েছে কোনো বড়লোক বাড়ির লোকরা। তবে ব্যাটারি নেই বলে পুরোপুরি নিশ্চিন্ত হওয়া গেলো না। সত্যনারায়ণ ব্যাটারি আনতে বাজারে গেলে ভাইবোনেরা সব রেডিওকে কেন্দ্র করে নাচতে শুরু করো। রান্নাঘর থেকে ছেলেমেয়েদের আনন্দ দেখে আভার চোখ ভিজে উঠলো। হায়রে জীবন! কারও অবহেলার ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া জিনিস আবার কারও বাড়িতে আনন্দের বন্যা বয়ে আনে।
চলবে…
রাস্তার মাস্টার ॥ পর্ব-৫॥ শারমিন রহমান

