দুই.
বসন্তের এক সুন্দর সকালে আভার ঘটে গেলো চরম সর্বনাশ। পায়ের নিচের মাটি, মাথা গোঁজার ঠাঁই; সব হারলো। জামা কাপড়ের পুঁটলি নিয়ে তাকে রাস্তায় দাঁড়াতে হলো। সোনালির হাত ধরে সত্যনারায়ণ ধীরে ধীরে বেরিয়ে গেলেন বাড়ি থেকে। আভার মুখের দিকে তাকানোর সাহস তার নেই।
আভা অন্তঃস্বত্তা। দুই মেয়ের পর এবারও মেয়ে হবে এই আশঙ্কা ছিল শ্বশুর-শাশুড়ির। কিন্তু সেই আশঙ্কার সঙ্গে ক্রোধ যোগ হলো একটি ঘটনার পর। সত্যনারায়ণের বাড়িতে চুরি হলো। চুরির সব দায় পড়লো আভার গায়ে। আভার পরপর দুই বার মেয়ে হওয়ায় সে অলক্ষুণে । সব অশুভ কাজের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। আভাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়ে অশুভ ছায়া বিদায় করে হাফ ছেড়ে বাঁচলো জগদানন্দ নায়ক।
কোথায় যাবে সত্যনারায়ণ? বসে পড়লো গাছতলায়। আভা ভীষণরকম চুপ হয়ে গেছে। মুখটা কালো মেঘের মতো থমথমে। হয়তো মমতার ছোঁয়া পেলেই ঝরঝর করে বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়বে। তার ভাবনার বাইরে সব ঘটে গেলো। আভাকে মেয়ে দুটো দিয়ে বসিয়ে রেখে সত্যনারায়ণ বের হলো। জিনিসপত্র বলতে কয়েকটা জামা-কাপড়ের পুঁটলি। আভার আজ ক্ষুধা নেই, কষ্ট নেই। নির্বিকার হয়ে বসে আছে। বেলা গড়িয়ে যখন সন্ধ্যা, তখন সত্যনারায়ণ ফিরে এলেন। অবশেষে বস্তিতে একখানা ঘর জোগাড় করতে পেরেছে। বাড়ি থেকে বেশ দূরে শহরের কাছাকাছি একটা বস্তিতে এসে উঠলো আভার সংসার। আভার মনে হলো জীবনের বিশাল এক সমস্যার যেন সমাধান হলো। মাথা গোঁজার ঠাঁই যাদের নেই তারাই বুঝবে এই বস্তির ঘরের মূল্য। কাজ করতে হবে সত্যনারায়ণকে। কিন্তু কী কাজ পারে সে, কেই বা তাকে কাজ দেবে! আশেপাশে বস্তির লোকেদের সঙ্গে টুকটাক কাজ করে সত্যনারায়ণ। তাই দিয়ে একবেলা করে খাবার জুটছে ওদের। সোনালীর স্কুলে যাওয়ার বয়স হলেও সে সুযোগ মেয়েটা পায়নি। কিন্তু পড়ালেখার মতো বিলাসিতা নিয়ে ভাবার সময় হয় না আভার। এখানে প্রতি মুহূর্তে অস্তিত্ব টেকানোর লড়াই করতে হয়।
এখানে ছোট্ট ছোট্ট ঘুপচি ঘর। লাগোয়া সব। কলতলায় লাইন, টয়লেটে লাইন আর হুড়োহুড়ি, চেঁচামেচিতে সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকে এ বস্তি। বস্তি থেকে বেশ দূরে ডোবার ধারে পাশাপাশি তিনটি টয়লেট। তাতে প্রায় ৫০০ লোক কাজ সারে। লাইন কখনোই ভাঙে না। অন্তঃস্বত্তা আভার খুব কষ্ট হয় টয়লেট চাপিয়ে রাখতে। এখানে কেউ কাউকে ছাড় দেয় না। সবার হাজারটা সমস্যা। কেউ কারও জন্য মায়া করে না। এই বস্তিতে প্রতিযোগিতা করে টিকে থাকে প্রতিটি প্রাণ।
শুনুন শারমিন রহমানের কবিতা
শহরঘেঁষা জামুরিয়া এই বস্তিতে কোনো গল্প আড়াল থাকে না। এখানে সবাই সবার গল্প জানে। হাঁড়ির খবর থেকে শুরু করে রাত্রিযাপনের গল্পও এখানে আলোচনা চলে। ঝগড়া, বিবাদ, মারামারি করে এখানে টিকে থাকে সবাই। আভা বা সত্যনারায়ণ কেউই তাদের বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার গল্প কাউকে বলেনি। তবু বস্তির লোকদের মুখে মুখে সে গল্প। কলতলায়, চায়ের দোকানে বা টয়লেটের লাইনে এখন সবচেয়ে আলোচিত গল্প সত্যনারায়ণের বাবা তাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। অতি উৎসাহী কিছু লোক ভেতরের গল্পটাও উদ্ধার করে ফেলেছে। সে উদ্ধার হওয়া গল্পের সঙ্গে রঙ মিশিয়ে নিজেদের মতো করে ছড়িয়ে দিয়ে মজা পাচ্ছে। বস্তিতে যেন অনেকদিন পর একটা উপভোগ্য রাসালো গল্প পাওয়া গেছে। আভা যে অশুভ, তাও বাতাসের গতিতে ছড়িয়ে পড়েছে বস্তিতে। দুই দুইটা মেয়ের পর এবারও যে তার মেয়েই হবে সেটা লক্ষণ দেখেই স্পষ্ট। আভার অশুভশক্তির কারণে তার শ্বশুরবাড়ি পথে বসতে চলেছে, যে বাড়িতে কোনোদিন চুরি হয়নি, সেখানেও চুরি হয়েছে। এসব গল্প এখন বস্তির বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে। এসব গল্পে আভা কোনো মানুষ নয়। যেন অশুভ কোনো আত্মার নজর পড়েছে তার ওপর।তাই আভা এ বস্তির জন্য শুভ কিছু বয়ে আনতে পারে না।
ভয়ঙ্কর বিপদ আসতে চলেছে এ বস্তিবাসীর ওপরে। তাই অশুভ এই পরিবারটিকে বস্তি থেকে বের করে দিতে একমত হলো সবাই। একটি পরিবারের জন্য সবার ক্ষতি তো তারা মেনে নিতে পারে না। সত্যনারায়ণকে জানিয়ে দেওয়া হলো, তারা এখানে থাকতে পারবে না। যত দ্রুত সম্ভব তাদের বস্তি ছাড়তে হবে। সত্যনারায়ণ এবার আকুল পাথারে পড়লেন। কোথায় যাবেন! দিনমজুরের কাজ করে যতটুকু রোজগার তাতে একবেলা খাবার জোটানোই মুশকিল। বস্তি ছেড়ে কোনো ভাড়া বাড়িতে ওঠার ক্ষমতা নেই তার। আভার ডেলিভারিরও সময় হয়ে এসেছে। অনেক কাকুতি মিনতি করে কয়েকটা দিন সময় চেয়ে নিলেন সত্যনারায়ণ। তবে বস্তির সর্দার এসে একপ্রকার শাসিয়ে গেছে ওদের। নিজে থেকে বের না হলে ঘরের জিনিসপত্র ছুড়ে ফেলে ঘর খালি করে নেবে তারা।
এত ভয়ানক পরিস্থিতিতে, কঠিন দুঃসময়ে আভার তৃতীয় মেয়ের জন্ম হলো জামুরিয়া বস্তির ছোট্ট সেই ঘরে। পরিস্থিতি যাই হোক, প্রকৃতি তার নিজস্ব নিয়মেই চলবে। জন্ম বা মৃত্যু আটকানোর ক্ষমতা কারও নেই। কেউ স্বাগত জানালো না, উলু দিলো না, আনন্দধ্বনি করলো না কেউ, তবু এই পৃথিবীতে একটা নতুন প্রাণের জন্ম হলো। এই পৃথিবীতে তার কত প্রত্যাশা, কত স্বপ্ন নিয়ে এলো সেই প্রাণ কিন্তু তার জন্য অপেক্ষা করলো একরাশ অবহেলা আর অভাব। মাথা গোঁজার ঠাঁই হারানোর দুঃস্বপ্ন আর চিন্তার মধ্যে এই পৃথিবীতে আগমন ঘটলো একটি নতুন প্রাণের। তার নাম রাখা হলো কাবেরী। এবার আভার নিজেকে সত্যি সত্যি অশুভ, অপয়া মনে হতে লাগলো। চোখের জলে বুকের শিশুটি ভিজে গেলো দুঃখের বর্ষণে। অসহায়ত্ব ফুটে উঠলো সত্যনারায়ণের মুখেও। হঠাৎ যেন অনেক বয়স বেড়ে গেছে সত্যনারায়ণের। আভার তাকে বৃদ্ধ লাগছিল দেখে।
ভেতরে ভেতরে মানুষটা যে একেবারে ভেঙে পড়েছে, তা চেহারা স্পষ্ট জানান দিচ্ছে। আভা শুধু ঠাকুরকে একই প্রশ্ন করে যায়, ‘কী পাপ করেছি ঠাকুর? এত শাস্তি কেন দিচ্ছ আমায়?’
এদিকে মেয়ে হওয়ায় বস্তিবাসীর ধারণা বদ্ধমূল হলো আরও। আভা থাকলে বস্তিতে সবার শুধু মেয়ে হবে। তারা আর সময় দিতে রাজি নয় সত্যনারায়ণকে।
চলবে…
আরও পড়ুন: রাস্তার মাস্টার ॥ পর্ব-১॥ শারমিন রহমান

