০১.
আভা ঘোমটার আড়াল থেকে ডাগর ডাগর চোখে বাড়িটা দেখে নেওয়ার চেষ্টা করছে। পেটের ভেতরে হাতুড়ি পেটাচ্ছে কেউ। প্রচণ্ড ক্ষুধা লেগেছে। বিয়ে বাড়িতে তার খাবার নিয়ে কারও কোনো ভাবনা নেই। নতুন বউ হিসেবে আভা কাউকে বলতে পারছে না খাবারের কথা। তখনো তাকে বরণ করে নেওয়ার কিছু কাজ বাকি। আভার মনে হলো মাথা ঘুরে পড়ে যাবে। এখুনি তার কিছু খেতে হবে। খাবারের কথা ভাবতেই তার চোখ ফেটে জল এলো। পৃথিবীতে কি একমাত্র আভারই এত ক্ষুধা লাগে! এই ক্ষুধার কাছে অসহায় আভা। বাবা রমানাথ মুখার্জি কাজ করতেন রেল রাস্তায়। গরিব হলেও আভার খাবারের কোনো অভাব বুঝতে দেননি বাবা। কিন্তু বাবা রেলে কাটা পড়লেন। যেন বাবা সঙ্গে করে নিয়ে গেলেন পৃথিবীর সব আনন্দ, ভালোবাসা, সচ্ছলতা। আর আভার জন্য রেখে গেলেন এক পৃথিবী ক্ষুধা! খেতে না পেয়ে আভার শরীর এতই শুকিয়ে গেলো যে মুখের সামনের দাঁত ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়তো না প্রথম দর্শনে। তার মায়াভরা চোখে শুধু ক্ষুধা ভেসে উঠলো।
দাদা আভার বিয়ের জন্য পাত্র খুঁজতে শুরু করলেন। শরীরে লাবণ্য না থাকলে কিছু মানুষরূপী কুকুরের কাছে নারী শরীর ক্ষুধা নিবারণের বস্তু। তাতে লাবণ্য বা মমতার প্রয়োজন নেই। আভার দাদার শুধু মনে হতে লাগলো রাস্তার ভবঘুরে কুকুরগুলোর হাত থেকে বোনকে বাঁচানোর জন্য একটা পাত্র প্রয়োজন। যে আভাকে দুবেলা দুমুঠো খাবার আর মাথার ওপর একটা নিরাপদ ছাদের নিশ্চয়তা দিতে পারবে।
১১ বছরের কিশোরীর জন্য পাত্র খোঁজা শুরু হলো। কিন্তু না আছে আভার শরীরের লাবণ্য, না আছে যৌবন। পুরো শরীরে শুধুই অভাবের চিহ্ন, ভাতের অভাব। অবশেষে, আভার জন্য ১৪ বছর বয়সী এক পাত্র পাওয়া গেলো। নন্দী গ্রামের সত্য নারায়ণ নায়কের সঙ্গে বিয়ে হলো তার। দাদা খুব খুশি হলেন। সত্য নারায়ণের পূর্বপুরুষ জমিদার ছিলো। এখন সেই জমিদারি না থাকলেও নামডাক আছে বেশ। বাড়িতে পুরনো আমলের দালান, পুকুর দেখে আস্বস্ত হয়ে বিয়ের দিন ঠিক করে দিলেন দাদা। আভা বিয়ে কী, তা না বুঝলেও এতটুকু জেনেছে, তার তিনবেলা পেট ভরে ভাত খাওয়ার ব্যবস্থা হলো। আভা এই ভেবে ভীষণ খুশি যে, তার জীবন থেকে অভাব চিরতরে বিদায় নিলো।
এসব ভাবতে ভাবতেই আভার পেটের মধ্যে ক্ষুধা মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো আবার। একটি মেয়ে এসে দুটো মিষ্টি আর তিনখানা নোনতা বিস্কিট দিয়ে গেলো বিশাল বড় এক প্লেটে। বড়ো প্লেটের মধ্যে মিষ্টিটাকে একটি বিন্দুর মতো মনে হলে আভার। আভা মিষ্টিটা ছোঁ মেরে নিয়েই মুখে পুরে নিলো। বিস্কিট ধরার আগেই বাচ্চারা কাড়াকাড়ি করে খেয়ে ফেললো। একটি ছেলে হা করে তাকিয়ে আভার মুখের মিষ্টি খাওয়া দেখছে। তার ধারণা ছিল, নতুন বউ হাত দিয়ে কিছু খাবে না। তাই তো মায়ের কাছে গল্প শুনেছে। নতুন বউকে মিষ্টি খাওয়ানোর নাম করে সে খানিকটা খেয়ে নেবে, এই আশায় বসে ছিল এতক্ষণ। কিন্তু নতুন বউয়ের মিষ্টি ছোঁ মেরে খেয়ে নিতে দেখে সে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো। আভা খেয়াল করলো বিষয়টা। ওর দিকে তাকিয়ে মিষ্টি একটা হাসি দিলো। একগ্লাস জল খেয়ে পেটটাকে আপাতত সান্ত্বনা দিতে পারলো আভা। যে অভাব থেকে বাঁচার জন্য এই বিয়েতে এত খুশি ছিল আভা, সে জানতেও পারলো না যে, তার জীবনগল্পে অভাব আর সংগ্রামের দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার পরিকল্পনা ভাগ্যবিধাতা তার জন্য করে রেখেছেন বহু আগেই।
সত্যনারায়ণ মানুষ হিসেবে ভীষণ ভালো। কিন্তু বড্ড নরম স্বভাবের আর ভীতু। আভা বিয়ের আগে কল্পনা করতো কেমন হবে জমিদারের বাড়ি। ভেবে আর কুল পেতো না আভা। ওর মনে হতো পূর্বপুরুষ জমিদার মানে গোলাভরা ধান, পুকুরভরা মাছ, চারপাশে চাকর-চাকরানি, আরাম আর সুখের জীবন। এসব শুনে সত্য নারায়ণ হেসেছিলেন। আভাকে বুঝিয়েছিলেন। জমিদার তো পূর্বপুরুষ ছিলো। সেই কবেকার গল্প সেসব। আমাদের তো পরের জমিতে খেটে খাওয়া জীবন। সহজ সরল কিশোরী বউটার জন্য মায়া হতো সত্য নারায়ণের। কতই না আশা নিয়ে এসেছে এই বাড়িতে। কী-ই বা দিতে পারবে মেয়েটাকে!
কল্পনার মতো না হলেও আভার এই বাড়িটা বেশ ভালো লাগে। দুপাশে মেঠোপথ, সামনের দিকে স্নানের জন্য পুকুর। গাছপালা-ঘেরা বাড়িটা বেশ মায়া ছড়ানো। পুরনো বিল্ডিংটাতে মোট ৬ খানা ঘর। সামনে বড় খোলা বারান্দা। পুজোর আসন রয়েছে তার এককোণে। সামনে বাঁধানো তুলশি মঞ্চ। ঘরটাতে রঙ নেই কোনো। তবু পোড়া ইটের পোড়া খয়েরি রঙটা ভালো লাগে আভার। কোথাও কোথাও ইট সুরকি ভেঙে বেরিয়ে গেছে। শ্রীহীন ঘরটাকে আপন ভেবেই ভালোবাসা, যত্ন আর মমতা দিয়ে আভা সংসার শুরু করে। তার যত্নে বাড়িতে সৌন্দর্য ফিরতে শুরু করে। পুরনো বাড়িটাও যত্নে হেসে ওঠে যেন। হাসতে থাকে আভার কোল। প্রথম মেয়ের মা হয় আভা। এখন বয়সের সঙ্গ আভারানি হয়ে ওঠে সে। সোনাবরণ মেয়ের নাম রাখেন সোনালি। সোনা মেয়ে তাদের। সত্যনারায়ণকে এবার কাজের প্রতি একটু বেশি গুরুত্ব দিতে বলে আভা। সংসার বড় হচ্ছে। বাবার দিনে দিনে বয়স বাড়ছে। কিন্তু সত্য নারায়ণ খুব বেশি কষ্টের কাজ করতে পারেন না। বড্ড নরম মানুষ তিনি। পেটের ক্ষুধা তো আর কোনো যুক্তি মানে না। মেয়ে হওয়ায় আভা আর সত্যনারায়ণ খুশি হলেও বেশ নাখোশ হয়েছেন তার বাবা- মা। মেয়ে মানেই একরাশ টাকার অপচয়। আভাকে স্পষ্ট বলে দিয়েছে শাশুড়ি ‘শোন বউমা, তাড়াতাড়ি একটা নাতির মুখ দেখাও আমাদের। প্রথমেই তো একটা অলক্ষুণে কাজ করলা। বংশের প্রথম বাচ্চা মেয়ে হওয়া অশুভ লক্ষ্মণ। পুজো আচ্চায় মন দাও, ঠাকুরকে ডাকো। ছেলে সন্তান দরকার।’
অবশেষে সেই দিন এলো। দ্বিতীয় মেয়ের জন্ম হলো। আঁতুড় ঘরে শশুড়ি মা ঘেঁষলেন না। নাতনির মুখটাও দেখলেন না। সত্যনারায়ণ মাঝে মধ্যে আভার জন্য খাবারের থালাটা নিয়ে হাজির হতেন। আভার পেটে যেন ক্ষুধা নামের হাঙর।
আভা ভয় পেতে শুরু করে। টানাটানির সংসার হলেও স্নেহ, মমতা দিয়ে ভরপুর ছিল সংসার। আভার কষ্ট হয়নি এ বাড়িতে এসে। যে নিশ্চিত জীবনের স্বপ্ন দেখেছিল আভা, তা পূরণ না হলেও ভালোবাসা আর মমতা দিয়ে সেটা ভরিয়ে তোলার চেষ্টা করেছিল সে। কিন্তু শ্বশুর-শাশুড়ির আচরণ দিন দিন বদলে যেতে শুরু করেছে। আভার খুব মন খারাপ হয়। মেয়ে কেন খারাপ বা অশুভ লক্ষ্মণ তার কারণ খুঁজে পায় না। ছেলে বা মেয়ে হওয়া যদি মানুষের হাতে থাকতো তাহলে সবাই নিজের পছন্দমতো করে নিতে পারতো।আভার দোষটা কোথায়, সেটাই বুঝে উঠতে পারে না।
শ্বশুরমশাইয়ের বেশ শরীর খারাপ হয়ে পড়ে। বাড়িতেই থাকেন এখন। সত্যনারায়ণ তেমন ভালো কোনো কাজ পান না। যখন যে কাজে ডাকে মানুষ তাই করেন। কষ্টের কোনো কাজ বা ভারী কাজ সত্যনারায়ণ করতে পারেন না। তার কাজ থেকে যে সামান্য টাকা আসে তা দিয়ে এখন খাবারও নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না। আভা এখন দ্বিতীয় সন্তানকে পৃথিবীতে আনতে যাচ্ছে। অভাব যেন আষ্টেপৃষ্ঠে ঘিরে ধরেছে। ধান কিনে আনা হয়েছে। চাল কিনে খাওয়ার থেকে ধান কিনে চাল করলে খরচ কম হয়। তাতে যদি একটুখানি সাশ্রয় হয় ক্ষতি কী!
ধান সেদ্ধ করা, রোদে শুকানো, ঢেঁকিতে ধান থেকে চাল বের করা; এসব কাজ আভাকে একার হাতে করতে হয়। এদিকে পুষ্টির অভাবে আভার শরীর ভীষণ দুর্বল হয়ে পড়েছে। শরীরে বয়ে বেড়াচ্ছে আরেকটা মানুষ। তার এখন বাড়তি খাওয়ার প্রয়োজন। অথচ পেটে ক্ষুধা রেখেই তাকে ঘুমিয়ে পড়তে হয়। শাশুড়ি সব কাজ আভাকে দিয়েই করান। মেয়ে হওয়ার অপরাধের শাস্তি দেওয়া হয় এভাবেই। ধান সেদ্ধ করার সময় ধোঁয়ায় ঘর ভরে যায়, দম বন্ধ হয়ে আসে আভার। মনে হয় ফুসফুস দখল করে নিয়েছে ধান সেদ্ধর গন্ধ আর কালো ধোঁয়া। দৌড়ে বাইরে যায় আভা। গাছের নিচে দাঁড়িয়ে প্রাণভরে নিশ্বাস নেয়। একটু স্বাভাবিক হতেই আবার উনুনের কাছে গিয়ে বসে। বসে বসে কাজ করতে গিয়ে পেটব্যথা করে আভার। পানি খায় বারবার। এবার শরীর ছেড়ে দেয়। মনে হয় শরীরটাকে ভীষণ ভারী। শাড়ির আঁচল বিছিয়ে মেঝেতেই শুয়ে পড়ে। শাশুড়ি এসে দেখে কাজের ফাঁকি দেখে রেগে যান। ভীষণ গালিগালাজ করেন আভাকে। আভা খুব কষ্টে শরীরটাকে তুলে বসে। বড় বড় মাটির কলস ধরিয়ে দেন আভাকে। পুকুর থেকে জল তুলে আনতে পাঠান। এভাবেই দিন কাটে আভার। মায়ের কথা মনে পড়ে ভীষণ। একটা মমতার হাত খুব পেতে ইচ্ছে করে মাথার ওপর।
এত এত কষ্টের মাঝেও আভাকে ঘিরে থাকে অন্য এক আতঙ্ক। যদি এবার ছেলে না হয়, এই ভাবনাটা মাথায় আসতেই গায়ে কাঁটা দেয় আভার। আর কিছুই ভাবতে পারে না। এ বাড়িতে তার সঙ্গে যেমন ব্যবহার করা হয়, তার থেকে আরও খারাপ ব্যবহার করা সম্ভব কি না, তা জানে না আভা। সংসারের অভাব মেটাতে গিয়ে দাদার কাছ থেকে পাওয়া মায়ের ছোট ছোট গয়নাগুলো একে একে সব বিক্রি করেছে আভা। কিছুই অবশিষ্ট নেই আর। কয়েকটা পিতলের থালা বাসন ছাড়া। সারাক্ষণ ঠাকুর দেবতাকে ডাকতে থাকে। তার একটা ছেলে চাই। ছেলে না হলে এ সংসারে তার আর জায়গা হবে কি না, সেটাই সংশয়। আভার মনে অভিমান জমে। স্বামী সত্যনারায়ণ তার কষ্ট চোখে দেখেও কোনো কথা বলতে পারেন না। রোজগার নেই, ভীতু মনুষটা নিজেই মেয়ে হওয়ার অপরাধে কুঁকড়ে থাকেন সারাক্ষণ।
অবশেষে সেই দিন এলো। দ্বিতীয় মেয়ের জন্ম হলো। আঁতুড় ঘরে শশুড়ি মা ঘেঁষলেন না। নাতনির মুখটাও দেখলেন না। সত্যনারায়ণ মাঝে মধ্যে আভার জন্য খাবারের থালাটা নিয়ে হাজির হতেন। আভার পেটে যেন ক্ষুধা নামের হাঙর। অথচ খাবার পেতো এক বেলা। মুড়ি, চিড়া চিবাতে ভালো লাগে না। তার তো ভাত খেতে খুব ভালো লাগে। কিন্তু ভাত একবেলা যা পায় তাতেও পেটের অর্ধেক খালি থাকে আভার। মেয়েটা বুকের দুধ পায় না। বাইরের দুধ কেনার কথা বলার সাহস আভার নেই। সারারাত কাঁদতে থাকে শিশুটা। বুটকা ফেটে যায় আভার। কী পাপ করেছি ঠাকুর! এতটুকু মেয়েকে কেন শাস্তি দিচ্ছ? ঠাকুরকে ডেকে ডেকে গলা শুকিয়ে যায় আভার। চোখের জল মুছে নেয় গোপনে।

