॥ পর্ব-১২॥
বেবি যখন গৃহকর্মীর কাজ করতো, তখন ওর যাওয়া-আসার পথে এবং কাজের কিছু বাড়িতে বেশ সমস্যা হতো। ছেলেরা তাকে উত্যক্ত করতো। কিন্তু বেবি কৌশলে তা এড়িয়ে যেতো। আর নিজের মধ্যে লুকিয়ে রাখতো। বিয়ে বা প্রেমের প্রস্তাব পাওয়া তার প্রতিদিনের রুটিনে ছিল। বাড়াবাড়ি পর্যায়েও সেটা যেতো কখনো কখনো। বাড়িতে কখনো এ নিয়ে আলোচনা করেনি বেবি। যদি বাবা বা দিদি কাজ করতে যেতে নিষেধ করে দেয়, সেই ভয়ে। তাদের সংসার চালানোটা সবচেয়ে বড় বিষয় ছিল বেবির কাছে। কারণ বেবি এটা বেশ ভালো বুঝতে পেরেছিল, পরিবারের পেট ভরে খাবার খেতে হলে তার এই কাজটা কতটা প্রয়োজন।
এখন বাড়িতে বসে পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়ার সিদ্ধান্তে বেবি তাই ভীষণ খুশি। রাস্তায় আর বের হওয়া লাগবে না। রাস্তার দুধারে দাঁড়িয়ে থেকে আর যন্ত্রণা দিতে পারবে না তাকে। গরিবের ঘরের মেয়েদের এমনিতেই যন্ত্রণার শেষ নেই। এর ওপর যদি বেবির মতো দুধে আলতা রঙ হয়, তাহলে তো কথাই নেই।
বেশ কিছুদিন কেটে গেলো। বেশ ভালো সময় কাটছে সবার। জীবনে পেট ভরে খাওয়ার ব্যবস্থা হলে আর কী চাই জীবনে! এতেই সুখী সত্যনারায়ণের পরিবার। হঠাৎ আভার এক ভাইঝির বিয়ের অনুষ্ঠানের দাওয়াত এলো। বেশ বড় অনুষ্ঠান করা হবে। বহুবছর ওদের খোঁজ কেউ নেয়নি। দাওয়াত দেওয়া তো অনেক পরের কথা। তাই দাওয়াত পেয়ে আভা আর না করেনি। ছেলেমেয়েকে কোথাও কোনোদিন নিয়ে যাওয়া হয়নি। আভা তার তিন মেয়ে আর দীপুকে নিয়ে বিয়ের দুদিন আগেই পৌঁছে গেলো ভাইয়ের বাড়ি।
সত্যনারায়ণ আর সোনালী রইলো বাড়িতে। ওরা দুজন বৌভাতের দিন সকালে যাবে। সত্যনারায়ণের দোকানের কাজ রয়েছে। আর সোনালীরও এতদিন ছুটি নেওয়া সম্ভব নয়, তাই বাবা-মেয়ে রয়ে গেলো বাড়িতে। সোনালীর চাকরিতে যোগ দেওয়ার বেশ কয়েকটা মাস পেরিয়ে গেছে। ঘরের কিছু মেরামতের কাজ করিয়েছে এর মধ্যে। খুঁটিগুলো বদলেছে। মূল ঘরের সঙ্গে আরও ২টি ছোট ঘর তুলে সংযোগ দিয়েছে। মায়ের জন্য আলাদা একটা রান্নাঘর তোলা হয়েছে। এছাড়া সবার জন্য কিছু নতুন জামাকাপড় কেনা হয়েছে। নতুন জায়গা, নতুন চাকরিতে ভদ্রভাবে থাকতে গেলে যতটুকু প্রয়োজন ততটুকুই করেছে সোনালী। বোনদের জন্য করেছে নতুন সালোয়ার-কুর্তি।
বৌভাতের দিন সোনালী আর সত্যনারায়ণ উপস্থিত হলো। খুব সুন্দর সাজানো হয়েছে বিয়ে বাড়ি। বেবিকে নীল কুর্তা আর চুড়িদারে অদ্ভুত সুন্দর লাগছে। সোনালী চোখ ফেরাতে পারছে না। তার বোনটা যে এত সুন্দর, এর আগে কখনো সেভাবে দেখেনি সোনালী। মলিন জামাকাপড়ে ঢাকা পড়ে থাকতো বেবির সব আলো। মামা সবাইকে নতুন জামাকাপড় উপহার দিয়েছে, সেই পোশাক পরে আছে সবাই। বিয়ের বাড়ির আনন্দ দুশ্চিন্তায় পরিণত হলো যখন বেবির জন্য বিয়ের প্রস্তাব এলো। ধনী পরিবারের একমাত্র ছেলে। বয়স ত্রিশ পার হয়ে গেছে। দেখতে বেশ রোগা। বেশ কয়েকবার টাইফয়েড হয়ে তার শরীর ভেঙে গেছে।
চার বোনের এক ভাই। তাই ভাই তাদের অনেক আদরের। ভাইয়ের জন্য তারা সুন্দরী, চিন্তাশীল ও বুদ্ধিমতি বউ খুঁজছে। সোনালীর মামার কাছে প্রস্তাবটি এসেছে। তাই এই প্রস্তাবটি অবহেলা করার সুযোগ নেই। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো ছেলেদের কোনো আর্থিক চাওয়া নেই। কোন দাবি নেই। তাই যৌতুকের দায় থেকে সত্যনারায়ণ মুক্ত। বেবির বয়স ১৬ কেবল, বোনের মাধ্যমিক পরীক্ষাটা দেওয়ার স্বপ্ন দেখেছে সোনালী।
তাই বিয়ে নিয়ে একটা দোটানায় সোনালী। বিয়ের অনুষ্ঠানের তিন চারদিন পরেই ছেলেটি তার বাবা-মাকে নিয়ে সত্যনারায়ণের বাড়িতে হাজির হলো। সোনালীর মামার কাছ থেকে ঠিকানা জোগাড় করেছে তারা। বিয়ের কথা পাকা না করে তারা বাড়ি থেকে উঠলো না। কোন বাড়িতে মেয়েকে বিয়ে দেবে, সেটা দেখা খুব জরুরি মনে হলো আভার। সত্য কথা, আভা এক বিকেলে গিয়ে ছেলের বাড়ি দেখে এলো। বাড়ি, পরিবেশ সব দেখে সত্যনারায়ণের মনে হলো তাদের মেয়ের জন্য এই বাড়িতে বিয়ে হওয়া একটা আশীর্বাদ। তার মতো দরিদ্র পিতার পক্ষে এত ভালো পরিবারে যৌতুক ছাড়া বিয়ে দেওয়া কিছুতেই সম্ভব নয়।
সোনালী পড়ে গেলো দুশ্চিন্তায়। বিয়ের খরচ, বোনকে কিছু অলঙ্কার দেওয়া প্রয়োজন। কিন্তু কোথায় পাবে টাকা?
চলবে…
রাস্তার মাস্টার ॥ পর্ব-১১॥ শারমিন রহমান

