খুব একটা বেশি সময় হবে না। দেখতে দেখতে সমস্ত আকাশ কালো মেঘে ছেয়ে গেল। আশেপাশের লোকজন ছোটাছুটি করে নিরাপদ আশ্রয় খুঁজতে থাকলো। কিছুক্ষণের মধ্যে দোকান ঘরগুলো থেকে সার্টার নামার শব্দ ভেসে এলো। দিকভ্রান্ত কিছু পাখির আর্তনাদ শুনতে পেল কেউ কেউ। হঠাৎ করেই চারদিকের সবকিছু অন্যরকম হলো। কিছুটা থমথমে কিছুটা ভয়ার্ত। গুড়ুম-গুড়ুম মেঘের ডাক শুনে মনে হলো সামান্য দূরেই কোথায় যেন যুদ্ধ চলছে। রণক্ষেত্র থেকে ভেসে আসছে বোমা ফোটানোর আওয়াজ। এমন অবস্থায় মুলাডুলি রেলগেটে ভাবলেশহীন দাঁড়িয়ে আছে জসিম। তার হাতে বাজারের ব্যাগ। হাট থেকে আলু-কচু-বেগুনসহ বড়সড়ো একটা সিলভার কার্প মাছ কিনে ব্যাগ ভর্তি করেছে সে। রেলগেট থেকে হাটের দিন নছিমন করিমন ভটভটি ব্যাটারি চালিত অটোগুলো ছেড়ে যায় বিভিন্ন গন্তব্যে। অথচ জসিম আজ একটা নছিমন করিমন অটো দেখতে পেলো না। এমন অনেকদিন হয়েছে প্রয়োজনের সময় কিছুই পায় না সে। মাত্র দুই ঘণ্টার জন্য অফিস থেকে বলে-কইয়ে বের হয়েছিল, মুলাডুলি হাটে আসবে বলে। অথচ ঘণ্টা দেড়েক চলে গেছে। এখন হাতে আছে মাত্র আধা ঘণ্টা সময়। আকাশে ভয়ঙ্কর মেঘ, রাস্তায় বাড়ি ফেরার কোনো গাড়ি নেই। ঝড়ো বাতাস আসতে শুরু করেছে। ধুলোঝড় যাকে বলে। এখন আর সামনে পেছনের কোনো কিছুই চোখে পড়ছে না তার।
মুলাডুলি রেলগেট লাগালাগি ঈশ্বরদী যাওয়ার রাস্তাটা এখন বেশ প্রশস্ত হয়েছে। তবে আনোয়ায়ের পানের দোকান, সুজনের চায়ের দোকান আর মহিদুলের মুদি দোকান ঠিক আগের মতো আগের জায়গাতেই আছে। এত এত দোকানপাঠ থাকতে জসিম কোনদিকে যাবে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। একটু আশ্রয়ের কথা ভাবতে আরও কিছু সময় চলে গেল তার। তখনো সুজনের চায়ের দোকানের একমাত্র ঝাঁপ খোলা। দোকান ভর্তি লোকজন। ইতোমধ্যে চায়ের চুলা বন্ধ হয়ে গেছে। সবার শরীর ধুলোয় মাখামাখি। সুজন খোলা ঝাঁপ বন্ধ করতে গিয়ে আরও একবার সামনের দিকে তাকালো। বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে। অর্ধেক ভেজা জসিম তখন সুজনের চায়ের দোকনের সামনে। সুজন ভাবলো মানুষটা হয়তো দাঁড়ানোর জায়গা খুঁজছে।
এই যে ভাই, ওখানে দাঁড়িয়ে থাকলে তো আরও ভিজে যাবেন। ভেতরে আসেন না কেন?
জসিম তখনো বার বার রাস্তার দিকে তাকাচ্ছে। এই বৃষ্টির ভেতর যদি গাড়িঘোড়া কিছু একটা পাওয়া যায়। মনে হলো সুজনের কথা তার কানে পৌঁছেনি। ধীরে ধীরে মেঘের গর্জন কমে গেল। কিন্তু বৃষ্টির পরিমাণ বাড়তে থাকলো। এমন সময় কাকভেজা একটা ভটভটি এসে জসিমের সামনে দাঁড়ালো। ভটভটির দিকে দৌঁড়ে গেল জসিম। ভটভটিওলা কোথাও একটু দাঁড়নোর জায়গা খুঁজছে তখন।
এই ভটভটি যাইবা না কি?
আপনে মনে লয় পাগল হইছেন। এই ঝড়বৃষ্টি লইয়া কোথাও যাওয়া যাইব? অহন কোথাও গিয়া একটু বন, বৃষ্টি থামলে যাইমুনে।
ততক্ষণে পুরোপুরি ভিজে গেছে জসিম। এখন আর কোথায়ও দাঁড়িয়েও কোনো লাভ নেই। হাঁটতে শুরু করবে কি না, ভাবতে থাকে। মাত্র চার কিলো রাস্তা যেতে আর কত সময় লাগবে। ভাবা মাত্রই হাঁটতে শুরু করে জসিম। কিন্তু এগুতে পারে না। পা দু-টো কেমন যেন ভারী হয়ে আসে। ভেজা মানুষের ওজন বেড়ে যায় হয়তো। তার ওপর কেমন যেন ভয়ার্ত অন্ধকার। তবে বিশ্বরোড বলে তখনো এই বৃষ্টির মধ্যে কিছু বড়গাড়ি চলাচল করছে। তবে প্রতিটি গাড়ির হেডলাইট জ্বলছে। ধীর গতিবেগে এগুচ্ছে তারা।
গড়মাটি রশিদ অটোরাইস মিলের লেবার জসিম। তবে এখানে লেবার হওয়ার জন্যও বেশ কাঠখড় পোহাতে হয়েছে তাকে। নেতাদের বাড়ি বাড়ি ধর্না দিতে হয়েছে। জসিম বুঝে পায় না। ফ্যাক্টরি মালিক কেন নেতা পালে মাস্তান পোষে! তাদের কথায় নিয়োগ হয়। তাদের কথায় শ্রমিক ছাঁটাই হয়। তবে ব্যবসা সক্রান্ত বিষয়ে কোনো হাত নেই তাদের। এক সময় গড়মাটি নতুন বাজারে কয়েকটি দোকানঘর ছাড়া আর কিছু ছিল না। যে জায়গায় রশিদ অটোরাইস মিল। সেখানে ছিলো ছাত্তার মাস্টারের বাড়ি। সতেরো বিঘা জায়গার ওপর বাড়ি পুকুর আর আবাদী জমি। দীর্ঘদিনের পুরনো বাসিন্দা সে। অথচ হঠাৎ করে একদিন ঘোষণা দিলো, সে আর এখানে থাকবে না! বাড়িঘর সব বিক্রি করে দেবে। আশেপাশের মানুষজনের সঙ্গে তেমন একটা ভাব-ভালোবাসা ছিল না তার। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতো সাত্তার মাস্টার। পরের দিন সাত্তার মাস্টারের বাড়ির সামনে জমি বিক্রির সাইনবোর্ড ঝুলতে দেখতে পেল কিছু মানুষ। তবে এখানে এত দামি সম্পদ কেনার কোনো লোক পাওয়া গেল না। প্রায় এক বছরের বেশি সময় ধরে জমি বিক্রির সাইনবোর্ডটা রাস্তার ধারে দেখা গেল। এর কিছুদিন পরে হঠাৎ করেই একদিন সবাই দেখলো, সেখানে আর সেই আগের সাইনবোর্ডটা নেই। ছোট সাইনবোর্ডের স্থানে বড় একটি নতুন সাইনবোর্ড বসেছে। সেখানে লেখা আছে,‘এই সম্পতির মালিক রশিদ গ্রুপ’।
যে সতেরো বিঘা জমি দিয়ে এখানে রশিদ গ্রুপের যাত্রা শুরু হয়েছিল, সেখানে এখন তাদের প্রায় দুই শত বিঘা জমি। কেউ বেশি দাম পেয়ে আর কেউ মাস্তানের ভয়ে অথবা কেউ ইজ্জতের ভয়ে রশিদ গ্রুপকে জায়গা দিয়েছে। রশিদ গ্রুপের পেটের ভেতর একখণ্ড জমি জসিমেরও ছিল। ১৩ কাঠা জায়গার ওপর ছিলো জসিমের বাড়ি। দুই খানা মাটির ঘর আর রান্নাঘরসহ একটা গরুর ঘর ছিল তার। বাদবাকি জায়গায় আম গাছ, জাম গাছ, পেয়ারা গাছ ছিল কয়েকটি। শীতের মৌসুমে কিছু ফুলের গাছও লাগাতো জসিমের বৌ বিলকিস বেগম। গাদা, চন্দ্রমুল্লিকা, মোরগবাকা ফুলে ফুলে ভরে থাকতো বাড়ির চারপাশ। পুরনো দিনের দু’টি মেহগনি গাছও ছিল। তবে মেহগনি গাছ দু’টি কে কবে লাগিয়েছিল, কেউ বলতে পারতো না। কারণ তিন হাত বদল হওয়ার পরে জসিমের বাবা এই বাড়িটি কিনেছিল ধীরেন মিস্ত্রির কাছ থেকে। এক সময় এই এলাকায় হিন্দু বসতি ছিল বেশি। পাশেই ছিল গড়মাটি ঘাট। সেখান বড় বড় পালতোলা নৌকা ভিড়তো। ঘাটকেন্দ্রিক হাট গড়ে উঠেছিল সেখানে। এখান থেকে পাট বোঝাই নৌকা যেত নারায়ণগঞ্জে। সেসব এখন জসিমের কাছে স্বপ্ন স্বপ্ন মনে হয়।
রাতারাতি রশিদ গ্রুপের জমি বাড়তে থাকল। কিন্তু জসিম তার বাড়ি ছাড়তে নারাজ। তার কাছে কয়েক দফা প্রস্তাব গেল। তিন লাখ টাকার জায়গা পাঁচ লাখ টাকাতেও ছাড়তে রাজি হল না জসিম। জমি বিক্রির কথা শুনলেই তার চক্ষু রক্তবর্ণ ধারণ করতো। তার মনে হতো জমির কথা কেউ বললেই সে জমির ওপরই রক্তপাত ঘটাবে। এই মাটি তার কাছে মায়ের মতো। মাকে সে অন্য হাতে কখনো কোনোদিন তুলে দিতে পারবে না। যে তিল তিল করে এই বাড়িতে সংসার গুছিয়ে তুলেছে। টাকার লোভে সে কারও হাতে এই জমি তুলে দিতে পারবে না। যতই রাগ অভিমান আসুক, তারপরও সময় সময় রশিদ গ্রুপকে ভয় হতো। কেমন যেন অস্থির অস্থির লাগতো। সমস্ত শরীর ঘেমে একাকার হতো। বিলকিস সব সময় পাশে পাশে থাকতো। গামছা এনে ঘাম মুছে দিতো। পাখা এনে বাতাস দিতো। জগ ভরে ঠাণ্ডা জল এনে খাওয়াতো। জসিমের পাশে পিঁড়ি পেতে বসতো। এক সময় জসিমের মাথার চুল নাড়তে নাড়তে বলতো,
আপনে মনে হয় ভুল কোরতিছেন। জলে বাস কইরি কি কুমিরের সাতে পারা যায়? এখন চারদিকে রশিদের জমি। সে যদি তার জমিত বেড়া দিয়ে দেয়। তালি আপনে বাড়াবেন কন দিক দিয়ে।
চুপ কর মাগি, তোক এসব ভাবতি হলি লা। বাপের ভিটি থুইয়ে আমি কোনে যাব ক। তার ওপুর জমি রশিদেক দিলি, আমার গাছগাছালি সব যাবিনি। গরু বাছুর ছাগল বোরকি কোনে লিয়ে তুলবোনে। পাঁচলাখ ক্যা আমাক দশলাক ট্যাকা দিলি পরেও আমি এই ভিটি ছাড়বো নানে।
কিছু সময় চুপ করে থাকে বিলকিস। তার ঠোঁট বিরবির করতে থাকে। এক সময় আর কিছু না বলে থাকতে পারে না।
রশিদের তো খায়ে কাম নাই। যে আপনেক দশলাক টাকা দিতি যাবিনি। একুন কোতি গেলি আর জমিই লিবিনানে।
তুই তোর কাম লিয়ে থাক তো। এ সব মিয়ি মানুষের ভাবতি হবি লা।
আমি কিচু কতি গেলিই তো আমার দোষ, আপনের যা খুশি করেন। আমি আর কুনুদিন কিচুই কোবলাকো। ভালো কতা কেউ কুনুদিন শুনতি পারে লাকো।
কয়েকদিন পর বিলকিস ভাবে আর কাঁদে। এই জায়গা টুকুন ছাড়া তাদের আর কোনো মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই। আর টাকা হলেই সব হয় না। পছন্দ মতো জায়গা খুঁজে বের করে, আবার নতুন করে বসতি গড়া চারডি খানি কথা না। দেওয়াল ঘরের জানালা খুলে চৌকির ওপর মাথা গুঁজে বসে আছে বিলকিস। তখনো ঘরে ফেরেনি জসিম। সন্ধ্যা ঘনিয়ে রাত্রি নেমেছে প্রকৃতিতে। জসিম কোথায় গেছে, তার খোঁজ জানা নেই বিলকিসের। ঘরের বাইরে অবিরত ডেকে চলেছে ঝিঁঝিপোকা। একটা দু’টা করে ঘরের ভেতর জোনাকিরা আসছে আবার বের হয়ে যাচ্ছে। এসব প্রকৃতির খেলা নিয়ে মাথাব্যথা নেই বিলকিসের। তবে তার একটা ব্যথা আছে মনে। সে ব্যথার চিকিৎসার জন্য কার দ্বারস্থ হতে হবে,এসব নিয়ে দিবারাত্রি ভাবনা হয় তার। জসিম রগচটা মানুষ। সে শুধু রাগ করতে জানে। মেয়েমানুষের মন বোঝার সময় তার নেই। রসকসহীন এই মানুষটার মনে কোনো প্রেম নেই। ভালোবাসা বলতে সে বোঝে, রাতের বেলায় একসঙ্গে শুয়ে থাকা। কিছু সময়ের জন্য বুকের পাঁজরে আটকে রাখা। সন্তান জন্ম দেওয়ার জন্য পশু-পাখির মতো মিলিত হওয়া। কিন্তু সে সন্তানও জন্ম দিতে পারেনি বিলকিস। তাদের ঘরে এখনো কোনো ফুটফুটে চাঁদের আলো আসেনি। কার দোষে সন্তান হয় না। এসব ভাবনাতে নেই বিলকিস-জসিম কেউই। সন্তান দেওয়ার মালিক ওপরওলা। সে যেদিন চাইবে, দেবে। তাতে মানুষের কী করার আছে!
তখনো জসিমের জায়গার কোনো সুরাহা হয়নি। অথচ বালির ট্রাক আসছে। প্রতিদিন শত শত ট্রাক বালি পড়ছে। জায়গা সমান করা হচ্ছে। অথচ জসিমের জায়গা নিয়ে কেউ আর কোনো কথা বলে না। বাড়ি থেকে বের হওয়ার যে রাস্তা ছিল, তা এখন বালির নিচে। এই বালির ওপর দিয়েই তাদের বের হতে হয়। ইট পড়তে শুরু করেছে। অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই সীমানা প্রাচীরের কাজ শুরু হবে। এখন আর গরু ছাগল বের করার জায়গা নেই। গরু-ছাগল বাঁধার কোনো জায়গা নেই। এদিক ওদিক তাকালেই সবখানে কেমন যেন মরুময় মনে হয়। গরু ছাগল বের করার জায়গা নেই বলে, একটা দুটো করে গরু ছাগল বিক্রি করতে শুরু করলো জসিম। শেষমেষ একটা মাত্র গরু থাকলো গোয়ালঘরে। গরুটা তখনো সাড়ে চার কেজি করে দুধ দেয়। বিকেল বেলায় আবার দেড় কেজি। সকালের দুধ বিক্রি করলেও, বিকেলের দুধ আধা কেজি করে রোজ দেয় আর বাকিটা নিজেরা খায়। বিলকিস নিজের হাতে গরুর যত্ন নেয়। আদর করে।
সাহেবের মতো দেখতে কিছু মানুষ প্রতিদিন আসে। বড় বড় ফিতা দিয়ে মাফজোক করে। আবার কী সব খাতায় লিখে খাতায় অঙ্কন করে। তার কিছু বোঝে না জসিম। জসিম জানে কোন জমিতে কোন ফসল বুনতে হবে। জমি ভালো মতো চাষ হলো কি না। সেইসঙ্গে গরু দিয়ে কড়া করে জমিতে মই দিতে পারে। একসঙ্গে পাই ধরে জমি নিড়াতে পারে। সেই জসিম, সাহেব মানুষের কথাবার্তা বুঝবে কী করে! তবে রশিদ সাহেবকে তার সাহেব সাহেব লাগে না। কেমন যেন মানুষটা। এর চেয়ে গড়মাটির সালাম সাহেবও বেশি ফিটফাটে থাকে। অথচ এই মানুষ কিনা বড় বড় ফাক্টরির মালিক।
বিশ্বরোড সংলগ্ন সাত্তার মাস্টারের বাড়িই এখন রশিদ সাহেবের অফিস তখন। সেখানে অনেক মানুষের ভিড়। কেউ কেউ চাকরির আশায় ঘোরাঘুরি করে। কেউ আবার রশিদ সাহেবের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য আসে। জসিম এ সবের ধার ধারে না। সে প্রতিদিন সকালে কামলা দেওয়ার জন্য বাড়ি থেকে বের হয়। সালাম সাহেবের বাড়িতে কখনো কাজ করে। সালাম সাহেবের সঙ্গে কথা হয় মাঝে-মধ্যে। সে অবশ্যই রশিদ সাহেবকে, জসিমের বাড়ির জায়গা দেওয়ার পক্ষেই কথা বলেছিল। জসিমের এক কথা।
বড় মামা, আপনেই কন। জায়গা দিলি আর জায়গা পাওয়া যাবিনি। না পাইলিম। কিন্তু আমার সন্তানের মতো গাছপালা কোনে পাবোনে। তার উপুর নতুন জায়গায় ঘরবাড়ি করা কম ঝামেলার কাজ না।
তা তোর ব্যাপার রে জসিম। আমি তোক কুইলিম। আমার মনে হইলি তাই।
এর মাস দুই পরে জসিমের নিকট আরও একবার প্রস্তাব পাঠালো রশিদ সাহেব। কিন্তু জসিমের সেই একই কথা। তার জায়গা সে কিছুতেই দেবে না। পারলি রশিদ আমাক তুইলি দিক। আমিও দেখপোনে, দরকার পড়লি সিদ্দিক চেয়ারম্যানের কাচে যাব। কইলি পারেই হলি। মগের মুল্লুক পাইছে নাকি রশিদ। যা খুশি তাই করবি। পরের দিন সকাল বেলা বিলকিস দেখলো, তাদের বাড়ির সামনে একট্রাক সিমেন্টের খুটি নামানো হচ্ছে। কিন্তু কী কারণে এই খুটি আনা হয়েছে, তার কিছু বুঝলো না বিলকিস। এ নিয়ে জসিমের সঙ্গে কোনো কথা হয় না। তবে একটা ভয় এসে ভিড় করে বিলকিসের মনে। সারারাত ঘুমুতে পারে না। এপাশ ওপাশ করে রাত চলে যায়। পরেরদিন সাত সকালে জসিম পান্তা ভাত খেয়ে, বাড়ি থেকে বের হয়ে গেল কাজের উদ্দেশ্যে। যখন ঘরে ফিরে তখন সন্ধ্যা আসন্ন প্রায়। বাড়ির সামনে এসো তো হতবাক জসিম। বাড়ির চারদিকে সিমেন্টের খুটি পোতা হয়ে গেছে। কেমন যেন অচেনা লাগছে সবকিছু। তার সামনে মলিন বৃক্ষের অবয়ব। বিলকিস বাড়ির বাইরে একটা গাছ ধরে দাঁড়িয়ে আছে। জসিমকে দেখে ছুটে এলো। জানেন, আগামীকালই কাঁটাতারের বেড়া দিবি রশিদ। আমরা তখন ঘর থেকি বারাবো কী কইরি। জসিম কিছু সময়ের জন্য স্তব্ধ হয়ে যায়। তার মুখ থেকে কোনো ভাষা বের হয় না।
কী ব্যাপার আপনে কতা কচ্ছেন না ক্যা? কন না একুন কী হবি… কন না?
জসিমের মাথায় যেন বজ্রপাত পড়লো। কী করবে এখন ঠিক বুঝতে পারলো না। চোখে অন্ধকার দেখতে থাকলো। ততক্ষণে বিলকিস আরও কাছে এসে দাঁড়িয়েছে।
আপনেক আগেই কইছিলিম। জলে বাস কইরি কুমিরের সাতে লড়াই কইরেন না। কিডা শুনে কার কতা। আমি কি মানুষ যে, আপনে শুনবেন আমার কতা।

