॥ পর্ব-৫॥
আঘাত মানুষকে শক্ত করে। পৃথিবীতে বেঁচে থাকার জন্য প্রস্তুত করে। সত্যনারায়ণও যেন হঠাৎ করে সব দুঃখ ঝরিয়ে নির্ভার হয়েছে। যত ঝড় আসে আসুক, বিধাতা এই ভাগ্যে যা লিখেছেন, তা হবেই। এত দুশ্চিন্তা করে কোনো লাভ নেই। নিজেকে এভাবেই বুঝিয়েছে সত্যনারায়ণ।
যাদবানন্দ ফুলকাকু বাড়ি ছাড়ার কথা বলার পর তিনমাস পেরিয়ে গেছে। এতটুকু ছোট্ট মেয়েকে নিয়ে রাস্তায় গিয়ে দাঁড়াতে পারবে না সত্যনারায়ণ, জানিয়ে দিয়েছে ফুলকাকুকে। তিনিও বিরক্ত হয়ে বাড়ি খোঁজার সময় দিয়েছে সত্যনারায়ণকে। আভা বা সত্যনারায়ণ আর বিচলিত হবে না, কারণ ওরা জানে ওদের জীবনে একটার পর একটা ঝড় আসতেই থাকবে। ওরা প্রস্তুত আজ সব রকম বিপদের জন্য। রুম্পা হওয়ার ৪ মাসের মধ্যে আভা আবার অন্তঃসত্ত্বা হলো। আভা বা সত্যনারায়ণ কারোরই পরিকল্পনা ছিল না বাচ্চা নেওয়ার। কিন্তু কিভাবে কী হলো দুজনের কেউই বুঝতে পারছে না। আভার শরীর দিনদিন আরও ভেঙে পড়তে শুরু করেছে। ফুলকাকু একের পর এক বাড়ি ছাড়ার চাপ দিতে লাগলেন। সত্যনারায়ণ তার ছোট্ট মেয়ে রুম্পা আর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আভার কথা ভেবে ফুলকাকুর কাছে আরও কিছুদিন সময় ভিক্ষা চাইলো।
‘সেই তো আবারও আরেকটা মেয়ে জন্ম দেবে তোর বউ’, মুখ বেঁকিয়ে এ কথা বলার সময়ে ফুলকাকুকে একটুও অদ্ভুত লাগলো না সত্যনারায়ণের। মনে হলো, এর থেকেও কঠিন কিছু শোনার জন্য সে নিজেকে তৈরি করে রেখেছে। তবে সত্যনারায়ণ প্রায় প্রতিদিনই বাইরে যায় কাজের খোঁজে। এর ফাঁকে ফাঁকে সত্যনারায়ণ বাড়ির খোঁজ করে। কিন্তু ভালো কোনো কাজ না করলে বাড়ি ভাড়া করবে কোন ভরসায়! এ বাড়িতে যে সংসার সাজিয়ে বসেছিল, যে-কোনো সময়ে তা ভেঙে দিয়ে চলে যেতে হবে, এ বিষয়ে আর কোনো সন্দেহ নেই।
শরীর যত খারাপই হোক, আভা তার মেয়েদের যত্ন নেওয়ার চেষ্টা করে। তবে পারে আর কতটুকু! ফুলকাকু কিছু টাকা দিতেন মাস শেষে। কিন্তু কয়েকমাস হলো সেটাও বন্ধ করে দিয়েছেন। কেন টাকা দেওয়া বন্ধ করেছেন, তা বোঝে আভা। বোঝে সত্যনারায়ণও। তাই ফুলকাকুকে এ বিষয়ে আর কোনো প্রশ্ন করেনি সত্যনারায়ণ। এক হিসেবে এখানে জোর করেই এখন আছে ওরা। ফুলকাকু তো সেই কবেই বাড়ি ছাড়ার কথা বলে গেছে। শুধু বলে যায়নি এক প্রকারের শাসিয়ে গেছে। এরপর আর পয়সা দেওয়ার প্রশ্নই আসে না। হঠাৎ করে যেন জীবনে অমাবস্যা নেমে এসেছে। সত্যনারায়ণ বাইরে ঘুরে বেড়ায়। মুটের কাজ, দিনমজুর, কুলির কাজ; যা যখন পায়, তাই করে চাল, ডাল, নুন নিয়ে ঘরে ফেরে। বাগানের সবজিটা যে এখনো কেড়ে নেয়নি ফুলকাকু, সেজন্য মনে মনে ধন্যবাদ জানাতে ভোলে না সত্যনারায়ণ। জমির সবজি বা জমিতে চাষ করার অধিকার কেড়ে নেয়নি ফুলকাকু, এজন্য ওরা কৃতজ্ঞ তার কাছে।
হঠাৎ করে যেন সবকিছু কেমন মলিন হয়ে গেলো। হাসতে ভুলে গেছে প্রত্যেকে। সোনালী, কাবেরী এখন অনেক কিছু বুঝতে পারে। বাবা-মায়ের কষ্ট দেখে যেন খুব তাড়াতাড়ি বড় হয়ে গেছে ওরা। বয়সের তুলনায় ওদের আচরণ তাই বড্ড বুকে লাগে সত্যনারায়ণের। এই বয়সের মেয়েরা হেসে খেলে বেড়ায়, কত আবদার, কত অভিমান করে। অথচ সত্যনারায়ণের মেয়েরা সেখানে বলতে শিখেছে, আমাদের কিছু লাগবে না বাবা। মেয়েদের মলিন পোশাকের দিকে তাকিয়ে এক বুক হাহাকার জাগে সত্যনারায়ণের। চোখ নামিয়ে নেয় দ্রুত। নিজেকে লুকাতে পারতো যদি কোথাও, এই ব্যর্থ চেহারা মেয়েদের সামনে দেখাতে চায় না।
নিজের থেকে পালিয়ে বাঁচতে চায় সে। মুখভর্তি খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি, গোফ, মলিন ধুতি-ফতুয়াতে বড্ড অন্যরকম লাগে সত্যনারায়ণকে। সেই সকালে বের হয় আর ফেরে বেশ রাত করে। মেয়েদের ঘুমানোর অপেক্ষা করে সত্যনারায়ণ। এত রঙহীন বিশ্রী জীবনে শুধু রুম্পা হেসে খেলে বাঁচে। ছোট ছোট হাত পা ছোড়াছুড়ি করে। আধো আধো শব্দে বাবা বলে ডাকে। বাবা ডাক প্রথম সোনালীর মুখে শুনেছে সত্যনারায়ণ। সোনালী তাকে বাবা হওয়ার অনুভূতি কেমন তা বুঝিয়েছে। এরপর কাবেরী, বেবি ওদের কাছেও বাবা ডাক শুনেছে সত্যনারায়ণ। তবুও রুম্পার হাসিমুখে আধো আধো বাবা ডাক শুনলে শিহরিত হয় সত্যনারায়ণ। সব কষ্টের মধ্যে রুম্পাই সবাইকে ভুলিয়ে রেখেছে। রুম্পা পৃথিবীর এই নিষ্ঠুরতা এখনো বুঝে উঠতে পারেনি। বাবা-মায়ের অভাব, দারিদ্র্য বোঝে না সে। রুম্পাকে দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে সত্যনারায়ণ। মেয়েটা জানেই না বড় হতে হতে ওর সব হাসি মিলিয়ে যাবে, এই নিষ্ঠুর পৃথিবীতে ওর বাবা-মা বড্ড অসহায়, অভাগা।
সময় এগিয়ে যায়, আভার শরীর প্রচণ্ড খারাপ হয়ে পড়ে। মাছের গন্ধ সহ্য হয় না আভার। সারাদিনে অসংখ্যবার বমি হয়ে শরীর নেতিয়ে পড়ে। চেষ্টা করেও বিছানা থেকে শরীর টেনে তুলতে পারে না। মায়ের এমন অবস্থা দেখে সোনালী, কাবেরি চিন্তিত হয়ে পড়ে। ওরা সিদ্ধান্ত নেয় মা সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত ওরা স্কুলে যাবে না। দুই বোন মিলে মায়ের দেখাশোনা করতে শুরু করে। সোনালী রান্নার দায়িত্ব নিয়ে নেয়। কাবেরী বাড়ির অন্যান্য কাজ করে। মাকে প্রচণ্ড ভালোবাসে ওরা। মায়ের সুস্থতার জন্য সব রকম চেষ্টা চালিয়ে যায়।
সময়টা মার্চের মাঝামাঝি। না শীত, না গরম। আলো ঝলমলে রৌদ্রজ্জ্বল দিন। একটা ফুরফুরে বাতাস বয়ে যায়। দুপুরের পর থেকে পেটে ব্যথা শুরু করে আভার। শরীরটা ঘামছে খুব। বিছানায় শুয়ে দম বন্ধ লাগছে ওর। সারা ঘর হাঁটছে আভা। সোনালী একটু পরপর মাকে শরবত, পানি এগিয়ে দিচ্ছে। সন্ধ্যার পরপর সত্যনারায়ণ বাড়ি ফিরলো। হাতে ৩ কেজি চাল, সজনে ডাঁটা আর কিছু আলু। সত্যনারায়ণের মুখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট হয়ে ফুটে আছে। স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে আভা আর নিজের শরীরের কথা জানালো না আভা। নিষেধ করলো মেয়েদের যেন বাবাকে কিছু না জানায়। শরীর এখন ঠিক আছে আভার। রাতের খাবার খেয়ে আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়লো সবাই। হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলো আভার। ব্যথা একটু কমেছিল। দশগুণ হয়ে যেন ফিরে এসেছে সে ব্যথা। সময় হয়ে এসেছে, বুঝতে পারছে আভা। এবারেও যদি মেয়ে হয়? না, না এসব আর ভাবতে পারছে না আভা। ওর বুকের মাঝে মস্ত বড় একটা পাহাড় বসিয়ে দিয়েছে কেউ যেন। চারটা মেয়ে হওয়ার পর এবার যেন আভা একটু বেশি শান্ত। ঠাকুরকে ডাকতেও যেন ভুলে গেছে। প্রচণ্ড অভিমান বুকে নিয়ে নির্বাক সে। কিন্তু ব্যথাকে উপেক্ষা করার ক্ষমতা আভার নেই। পাশে সত্যনারায়ণকে ডেকে তুললো।
রাত ২টা। সত্যনারায়ণ হঠাৎ ডাকে ভয় পেয়ে যায়। লাফিয়ে ঘুম থেকে উঠে বসে। আভার চিৎকারে ততক্ষণে সোনালী, কাবেরী, বেবি উঠে এসে মাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে। হালকা আলোতে ওরা রক্ত, পানির স্রোতের সঙ্গে একটি মানবশিশুর মাথা বেরিয়ে আসতে দেখলো সোনালী। সত্যনারায়ণ কী করবে, বুঝতে না পেরে দাইকে ডাকতে দৌড়ে যায়। সোনালী একটা বড় বাটি মানব শিশুর মাথার নিচে ধরে রাখে যেন মাটিতে পড়ে না যায়। আভার চিৎকারে সোনালী, কাবেরীও কাঁদছে। এ যেন এক দুঃস্বপ্ন! কী ঘটছে চোখের সামনে কিছুই বুঝতে পারছে না ওরা। বাটিটা ধরে বসে আছে সোনালী। ভাই, না কি বোন আসছে ওরা জানে না। মাথা ছাড়া আর কোনো কিছু পৃথিবীর আলোতে আসেনি এখনো। আভার করুণ আর্তনাদে এবার ভারী হয়ে উঠেছে চারপাশ। মেয়েরা সবাই কাঁদছে। কতক্ষণ এভাবে বাটি ধরে বসে আছে সোনালী তার হিসাব নেই। দাইকে নিয়ে বাবা ফিরলে ওদের একটু দূরে সরিয়ে দেওয়া হয়। দাই সেই ছোট্ট মাথাটাকে টেনে তাকে বের করে আনলো পৃথিবীতে। উল্টো করে ধরে রাখলো। সে কাঁদলো, তার অস্তিত্ব জানান দিলো পৃথিবীকে।
আভা, সত্যনারায়ণ তার নাম রাখলো দীপ। দীপু। যে আলো ছড়াবে। প্রার্থনার আলো। কন্যা সন্তান হওয়ায় যে অশুভ দোষ দিয়েছিল মানুষরা, সে দোষ কাটিয়ে আলো নিয়ে আসলো আভা-সত্যনারায়ণের একমাত্র ছেলে দীপু। দীপনারায়ণ নায়ক।
চলবে…
রাস্তার মাস্টার ॥ পর্ব-৪॥ শারমিন রহমান

