।। চিন্তাসূত্র রিপোর্ট ।।
প্রাইম ইউনিভার্সিটিতে ‘সাহিত্যে সাংবাদিকতা, সাংবাদিকতায় সাহিত্য’ বিষয়ক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়ে গেলো। সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন কবি-গবেষক-কথাশিল্পী ওএসবি নিউজ-এর নির্বাহী সম্পাদক মোহাম্মদ নূরুল হক। মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) সকালে রাজধানীর মিরপুরের মাজার রোডে প্রাইম ইউনিভার্সিটির বাংলা বিভাগের আয়োজনে এই সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রাইম ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ড. কাজী দীন মোহাম্মদ খসরু বলেন, ‘সাহিত্য মনের খোরাক। মনকে সমৃদ্ধ করতে সাহিত্য পড়তেই হবে। সাংবাদিকতা ও সাহিত্যের মধ্যে পার্থক্য কোথায়? মানুষ জন্মগতভাবেই মানুষ। মনুষ্যত্ব অর্জন একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। যার জন্য হৃদয় সমৃদ্ধ করতে হয়।’
বক্তব্য রাখছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবদুর রহমান
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবদুর রহমান বলেন, ‘সাহিত্য মানুষের কথা বলে। সাহিত্য শোষকশ্রেণির চোখ উপড়ে ফেলে। যিনি সাহিত্যিক, তিনিও বড় বৈজ্ঞানিক। নজরুল ইসলাম বলেছেন, তোমার এ মহাবিশ্বে প্রভু হারায় না তো কেউ। পদার্থেরও বিনাশ নেই। রূপান্তর হয় মাত্র।’ সাহিত্যিকরা না থাকলে পৃথিবী পশুদের নিয়ন্ত্রণে থাকতো মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘সাংবাদিকতা না থাকলে পুঁজিপতিদের দম্ভে ধরণী কাঁপতো। সাংবাদিকতা, সাহিত্য ও রাজনীতি আলাদা কিছু নয়।’
সেমিনারে বিশেষ অতিথি কলা ও সমাজবিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. ইসলাম মো. হাসনাত বলেন, ‘সাহিত্য কী সাংবাদিকতাকে সাহায্য করছে, না সাংবাদিকতা সাহিত্যকে এগিয়ে নিচ্ছে, এটা বলার সুযোগ নেই। কঠিন বিষয় পত্রিকায় প্রকাশ পায়। আর আরও কঠিন কথা সাহিত্যে লেখা যায়। দুটি মাধ্যমই প্রতিবাদের ভাষা তুলে ধরে।’

সেমিনারে প্রধান আলোচক কথাসাহিত্যিক ও দৈনিক খবরের কাগজের সম্পাদক মোস্তফা কামাল বলেন, ‘যে সাহসী সাংবাদিকতা কবি নজরুল করেছেন, তা আমরা করতে পারিনি, পারছি না। যখন সাংবাদিকের কলম বন্ধ হয়ে যায়, তখন সাহিত্যিকের কলম জেগে ওঠে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা সাংবাদিকরা যখন শাসকশ্রেণিকে প্রশ্ন করতে কুণ্ঠিত হই, তখন কবি তার কবিতায় প্রতিবাদী হয়ে ওঠেন।’
গণমাধ্যমে সরকারের নিয়ন্ত্রণের প্রবণতার চেয়ে বিনিয়োগকারীদের নিয়ন্ত্রণ বেশি থাকে উল্লেখ করে মোস্তফা কামাল বলেন, ‘অনেক ক্ষেত্রে সরকারও সঠিক তথ্য চায়। কিন্তু কিছু গণমাধ্যমপ্রধান নিজ ইচ্ছায় ও চাওয়ায় তা নিয়ন্ত্রণ করেন।’ তিনি আরও বলেন, এখন অনেক খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আগে আসে। এরপর কাগজে প্রকাশিত হয়। অনেক ক্ষেত্রেই সংবাদ প্রকাশে গণমাধ্যম পিছিয়ে যাচ্ছে।

সেমিনারে সভাপতির বক্তব্যে কবি, গবেষক, কথাশিল্পী ও প্রাইম ইউনিভার্সিটির বাংলা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. রকিবুল হাসান বলেন, সাহিত্য সাংবাদিকতাকে দেয় মানবিক গভীরতা; সাংবাদিকতা সাহিত্যকে দেয় বাস্তবতার মাটি। সাহিত্য শেখায় মানুষকে অনুভব করতে, সাংবাদিকতা শেখায় মানুষকে প্রত্যক্ষ করতে। একটি প্রশ্ন করে মানুষের অন্তরকে, অন্যটি প্রশ্ন করে সমাজকে। শেষ পর্যন্ত উভয়ের কলমের দায়িত্ব একই—সময়ের সত্যকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। সেই সত্য কখনো সংবাদ হয়ে আসে, কখনো প্রবন্ধ, গল্প, উপন্যাস বা কবিতা হয়ে ফিরে আসে।
রকিবুল হাসান আরও বলেন, সংবাদ হয়তো আজকের পাঠককে নাড়া দেয়, সাহিত্য আগামী প্রজন্মের স্মৃতিতে সেই সময়কে বাঁচিয়ে রাখে। এই দুই শক্তির সৃজনশীল মিলনেই গড়ে উঠতে পারে এমন এক সাংবাদিকতা, যা কেবল তথ্য দেয় না—মানুষকে ভাবায়; এবং এমন এক সাহিত্য, যা কেবল সৌন্দর্য সৃষ্টি করে না—সময়ের সত্যের মুখোমুখি দাঁড়ায়। সেখানেই সাহিত্যে সাংবাদিকের প্রয়োজন, আর সাংবাদিকতায় সাহিত্যের অনিবার্যতা।

প্রবন্ধ উপস্থাপন করছেন ওএসবি নিউজের নির্বাহী সম্পাদক, কবি, গবেষক ও কথাশিল্পী মোহাম্মদ নূরুল হক
সেমিনারে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ওএসবি নিউজের নির্বাহী সম্পাদক, কবি, গবেষক ও কথাশিল্পী মোহাম্মদ নূরুল হক। ‘সাহিত্যে সাংবাদিকতা, সাংবাদিকতায় সাহিত্য’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে তিনি বলেন, কোনো সাংবাদিক যদি একইসসঙ্গে সাহিত্যিক হন এবং নিজের সাহিত্যজ্ঞানকে তার সাংবাদিকতায় প্রয়োগ করেন, তাহলে তার ভাষা হয় শক্তিশালী, স্বচ্ছ ও সংবেদনশীল। তবে এর অর্থ এই নয় যে, তথ্যকে তিনি অতিরিক্ত অলংকারে ঢেকে দেন। বরং সংবাদের বস্তুনিষ্ঠতা বজায় রেখে মানবিক আবেদন তৈরি করেন। একইভাবে সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা একজন সাহিত্যিককেও কল্পনার জগৎ থেকে বাস্তবতার জমিনে এনে দাঁড় করায়, সমাজকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ দেয়।
এই গবেষক আরও বলেন, বিশেষ করে ডিজিটাল যুগে শুধু তথ্য দিয়ে পাঠক ধরে রাখা কঠিন; প্রয়োজন সঠিক ‘স্টোরিটেলিং’ বা গল্প বলার কৌশল। প্রযুক্তির এই অতি-সাম্প্রতিক যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হয়তো তথ্য সরবরাহ সহজ করবে, কিন্তু মানবিক অনুভূতির জায়গাটি অলঙ্কৃত করবে সাহিত্যই। সংক্ষেপে, সাংবাদিকতা ধরে রাখে সময়ের বর্তমানকে, আর সাহিত্য সেই বর্তমানকে দান করে গভীর অর্থ।

মোহাম্মদ নূরুল হক আরও বলেন, সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা সাহিত্যিককে মানুষের বহুমাত্রিক জীবনকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ দেয়। মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা, মানুষের সুখ-দুঃখ, রাজনৈতিক সংকট, পেশাগত অনিশ্চয়তা, সামাজিক বৈষম্য ও ক্ষমতার নানা রূপ সাহিত্যকে দেয় জীবনের নিরেট উপাদান। বিপরীতে সাহিত্য সাংবাদিকতাকে দেয় মানবিক সংবেদন, ভাষার গভীরতা, পর্যবেক্ষণের সূক্ষ্মতা ও গল্প বলার শক্তি।
অনুষ্ঠানে বিভিন্ন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা উপস্থিত ছিলেন।

