॥ ৪র্থ পর্ব ॥
২০.
যখন বোররাকে উড়েছি কোণেকানে
মুসার দেখা মেলে দ্বিতীয় আসমানে
বলল, ‘ভালো হলো, লাঠিটা নিয়ে যাও,
তোমার দেশে নেমে মাটিতে ছেড়ে দাও।
যেভাবে দুর্নীতি কাছারি দরগায়
যেন এ আজদাহা সকলে গিলে খায়’
আসা’টা* হাতে আছে আশাটা কোনখানে?
২১.
কুষ্ঠ রোগী দল যিশুকে ঘিরে ধরে
ব্যথায় কাতরায় আর্তনাদ স্বরে
ঈশ্বরের ছেলে স্বর্গে অসহায় –
অসুখ ভালো করে, নেই তো সে উপায়।
মলম হাত পা’য় লাগায় প্রভু যিশু
রোমান ক্যাথলিকে বকছে মাথাপিছু
এসব বাস্তবে চলছে ধামা ধরে
২২.
বলো তো ঘটনাটা ক্রুশের, হে জেসাস!
পিত্ত মেশানো সে আঙুর-বাটা রস
কেমন তেতো ছিল? চাবুক মেরেছিল?
উড়েছ আসমানে? কেউ তো বলে গেল।
জোহান বলেছিল মরেও জেগে ছিলে?
বলো না সত্যিটা জানতে চায় দিলে
বলল যিশু কানে, ‘বলতে আছে মানা!’
২৩.
লুতের কওমেরা নবিকে ঘিরে আছে
যতটা অভিশাপ পেয়েছে দুনিয়াতে
এখন তবে আর বিচার কেন হবে?
আপনি বললেই স্বর্গে দিয়ে দেবে।
আমাকে বলে লুত, ‘কমেনি সমকাম,
আমার কওমেতে কেন যে বিধি বাম
পৃথিবী কেঁপে ওঠা নেচারে ঘটে গেছে!’
২৪.
পেশল বাহু নুহ বইঠা হাতে নিয়ে
বিশাল নৌকাটা আলতো ছুঁয়ে ছুঁয়ে
জগৎজুড়ে এই জীবন স্রোতটার
সেই তো কারিগর বন্যা এড়াবার
এখনও ঝড় হয় ঘূর্ণি জলডোবা
দ্বিতীয় আসমানে বেহুদা বসে থাকা
বিশাল নৌকায় আঙুল চুষে কাটে
২৫.
দ্বিতীয় আসমানে একটি দিকে ভেজা
দেখি কী মিকাইল ঝড়ের মেঘরাজা
কাগজে টুকে রাখে বর্ষা-বৃষ্টিটা
কোথায় ঝড় হবে ভীষণ খরা কোথা
মুখটা কানে নিয়ে বলেছি, ‘শোনো ভাই
বাংলা মুল্লুকে দিয়ো না ঝড় ছাই
কদম ফুটলেই খিচুড়ি হবে ভাজা’
২৬.
কোথাও গৌতম করছে বসে ধ্যান
দেখার কুতুহলে দ্বিতীয় আসমান
নানান দিকে চেয়ে অশথ গাছতলে
বুদ্ধ চোখ বুজে কী সব বাণী বলে
রাহুল কাছে নেই বিগত সঞ্জয়
সকলে নির্বাণে হয়েছে অক্ষয়
কে শোনে বুদ্ধকে কী বাণী করে দান!
২৭.
একটু কাছে গিয়ে শুধানু বুদ্ধকে
‘কী বোধ জেগেছিল এভাবে চলে গেলে
বধূটি শুয়ে ছিল ঘুমের শিশুটিও
সকলই ফেলে গেলে কীসের টানে প্রিয়’
মুচকি হাসিমুখ, বলল, ‘জরা ক্ষয়
মৃত্যু জয়লাভ করার সে নেশায়’
সময় হলে সবে একাই চলে যায়!
২৮.
শুধাই বুদ্ধকে নেহাত একা পেয়ে
পালিয়ে সংসার কী লাভ নির্বাণে?
‘অযথা কাটাইনি জীবন থেকে ধেয়ে
প্রাণের গূঢ় কথা বুঝবে সুসময়ে’
থেকেছি উপবাস ভেঙেছি সেই ব্রত
এভাবে পাল্টেছি মনের অভিমতও
কী ধন পেয়েছিনু জানিনে দিন শেষে’
‘দ্বিতীয় আসমানে’র অন্তরালে আছে কবির চেতনার দ্বিতীয় প্রান্তিক। কবি জিললুর রহমানের ‘এক সে মেরাজের রাত্রে ঘুমিয়েছি’ কাব্যগ্রন্থে অন্ধিসন্ধির সেই দ্বিতীয় প্রান্তিকের কবিতাগুলি মূলত একটি বহুধর্মীয়, বহুসভ্যতাগত এবং আন্তঃআধ্যাত্মিক সংলাপে ভরা একাগ্র মনোপথের আলোকিত কাব্যভূমি। ইসলামের মেরাজ আখ্যানকে কেন্দ্র করে আকাশের রন্ধ্রে কবি এমন এক কল্পলোক সৃজন করেছেন, যেখানে ইতিহাস, ধর্মতত্ত্ব, পুরাণ, মনস্তত্ত্ব, নৈতিকতা ও মানবসভ্যতার মৌল ভিত্তির বিষয়গুলি একই আকাশমণ্ডলে এসে সমবেত হয়েছে, সংকেতপ্রধানের মতো হয়ে। এখানে মানবসভ্যতায় আবর্তনশীল যেসব ব্যক্তিত্বের নাম উল্লেখ করেছেন কবি, তাঁরা কেবল ধর্মীয় চরিত্রের সীমারেখা ধরে বার্তাবহ নয়, তাঁরা হচ্ছেন মানবজাতির নৈতিক, দার্শনিক ও আধ্যাত্মিক বিবর্তনের সমবেত প্রতীক।
‘দ্বিতীয় আসমানে’ জীবনের অনুকূলে সঙ্ঘবদ্ধ মহাকাল। এই পর্বে কবি জিললুর রহমান এক অভিনব কাব্যকৌশল প্রয়োগ করেছেন। এখানে মুসা, যিশু, লুত, নুহ, মিকাইল ও গৌতম বুদ্ধ— প্রত্যেকে তাঁদের নিজ নিজ ধর্মীয় পরিসরের সীমারেখা পেরিয়ে মানবসভ্যতার বৃহত্তর বৌদ্ধিক উত্তরাধিকারের প্রতিনিধি হয়ে উঠেছেন। মুসা ন্যায়ের, যিশু করুণার, লুত নৈতিক প্রশ্নের, নুহ টিকে থাকার জ্ঞানের, মিকাইল প্রকৃতির ভারসাম্যের এবং বুদ্ধ আত্মজাগরণের প্রতীক। কবি তাঁদের সঙ্গে কথোপকথনের মাধ্যমে এক ধরনের বিশ্বমানবিক ধর্মতত্ত্ব নির্মাণ করেছেন, যেখানে ধর্মীয় বিভাজনের চেয়ে মানবজিজ্ঞাসা অধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফলে ‘দ্বিতীয় আসমানে’র কবিতা কেবল মেরাজের আকাশযাত্রা নয়, এই আখ্যান সীমাহীন মানবসভ্যতার মহান আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকারগুলোর মধ্যে এক কাব্যময় দার্শনিক সংলাপ ও সমন্বয়। এই কবিতাগুলি যেন মহাকালের রোদ হয়ে জীবনের উষ্ণতা ছড়ায়।
১. মুসা : আইন, ন্যায় ও প্রতিরোধের প্রতীক
এই পর্বের যে কবিতা, এর সূচনায় মুসার আবির্ভাব ঘটেছে তাঁর বিখ্যাত ‘আসা’ বা লাঠিকে কেন্দ্র করে। আব্রাহামিক যে ধর্মমত সেখানে মুসা হচ্ছেন সেই নবী, যিনি ফেরাউনের অত্যাচারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন অন্য এক উপস্থাপনায় এবং যাঁর লাঠি অলৌকিকভাবে অজগর সাপে রূপান্তরিত হয়েছিল। কবি জিললুর রহমান এই অলৌকিক প্রতীকটিকে সমকালীন রাজনৈতিক ব্যঞ্জনায় রূপান্তর করেছেন এভাবে—
“তোমার দেশে নেমে মাটিতে ছেড়ে দাও
যেভাবে দুর্নীতি কাছারি দরগায়
যেন এ আজদাহা সকলে গিলে খায়।”
এখানে মুসা আর কেবল ধর্মীয় নবী নন, তিনি দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও সামাজিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে ন্যায়বিচারের এক বিপ্লবী প্রতীক। তাঁর এই লাঠি হয়ে উঠেছে নৈতিক বিচারশক্তির এক অভিব্যক্তিময় রূপক। ফলে মুসার ভাবনা এখানে প্রতিফলিত হয়েছে মুক্তি, ন্যায় ও অত্যাচারবিরোধী প্রতিরোধের এবং জীবনের গভীরতর দর্শনের।
২. যিশু খ্রিষ্ট : করুণা, ত্যাগ ও মুক্তির ধর্মতত্ত্ব
এই পর্বের ২১ ও ২২ নম্বর কবিতায় যিশু উপস্থিত হয়েছেন এক জটিল ব্যঙ্গবাস্তবতার মধ্যে। ঐতিহাসিকভাবে যিশু ছিলেন মানবপ্রেম, ক্ষমা ও ঈশ্বরের রাজ্যের বার্তাবাহক। খ্রিষ্টীয় ধর্মতত্ত্বে তিনি মানবপাপের মুক্তির জন্য রক্তাক্ত ক্রুশবিদ্ধ এক ত্রাণকর্তা। কবি এখানে তাঁকে কুষ্ঠরোগীদের মাঝে স্থাপন করে প্রশ্ন করেছেন অলৌকিক নিরাময়ের ধারণা নিয়ে। পরে ক্রুশবিদ্ধতার ঘটনাও স্মরণ করেছেন এভাবে—
“বলো তো ঘটনাটা ক্রুশের, হে জেসাস!”
এখানে যিশু ঐতিহাসিক সত্য, ধর্মীয় বিশ্বাস ও পৌরাণিক নির্মাণের মধ্যবর্তী এক নীরব চরিত্র। তিনি সরাসরি কোনো উত্তর না দিয়ে নির্জনতার ভেতরে, এক ধ্রুপদি বিষণ্নতায়—
“বলল যিশু কানে, ‘বলতে আছে মানা!”‘
অদৃশ্যতা নিয়ে উদ্ভাসিত অন্তর্বিশ্বে এই নীরবতার অবলম্বন অনেক গুরুত্বপূর্ণ। অন্তরঙ্গতায় এই নীরবতা যে ধর্মীয় রহস্য (mystery)-এর ধারণাকে স্মরণ করায়, তা হচ্ছে দ্রষ্টব্যের পরিস্থিতি এই বিশ্বাসকে প্রভাবিত করে যে, পৃথিবীতে কিছু বিষয় যুক্তিতে বিলীন না হয়ে চিন্তার বাইরে অবস্থান করে। এই পর্বের কবিতায় যিশু এমন এক প্রতীকী সত্তায় উপস্থিত, যাঁর ভেতর মানবদুঃখের সহযাত্রী, নিপীড়নের শিকার এবং মুক্তির স্বপ্নদ্রষ্টা— এই তিনটি পরিচয় একাকার হয়ে যায়। তাঁর নীরবতা তাই কেবল ধর্মীয় রহস্য নয়, মানব ইতিহাসের এখনও অনির্ণেয় বিষয়গুলির সাহিত্যিক ইঙ্গিত।
৩. লুত : নৈতিকতার সংকট ও সামাজিক বিচ্যুতি
লুত হচ্ছেন ইসলামী, ইহুদি ও খ্রিষ্টীয় ঐতিহ্যের সেই নবী, যিনি তাঁর কওমের নৈতিক বিচ্যুতির বিরুদ্ধে মহাসতর্ক করেছিলেন, এক সুদৃঢ় প্রকাশভঙ্গির মহিমায়। কোরআনের ঐশ্বর্যময় বর্ণনায় আছে, তাঁর সমকালে জনগোষ্ঠী ভয়াবহ এক শাস্তির সম্মুখীন হয়েছিল। কবি জিললুর রহমান এই পরিচয় ধর্মীয় আখ্যানকে পুনরাবৃত্তি করেননি, এই বিষয়টি তিনি পুনর্ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি লুতকে অতীতের ধ্বংসস্তূপে আবদ্ধ না রেখে, কবি দ্বিতীয় আসমানের এক পরাবাস্তব প্রেক্ষাপটে এনে তাঁকে বর্তমান বিশ্বের সঙ্গে মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছেন। ফলে লুতের কণ্ঠে উচ্চারিত প্রশ্নটি আর কোনো নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে ঘিরে থাকে না, তা রূপ নিয়েছে মানবসভ্যতার দীর্ঘস্থায়ী নৈতিক সংশয়ের ভাষ্যে—
“আমাকে বলে লুত, ‘কমেনি সমকাম,
আমার কওমেতে কেন যে বিধি বাম’।”
এখানে কবি সরাসরি ধর্মীয় বিধানে নয়, বরং ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ও মানবসমাজের নৈতিক বিতর্ককে সামনে আনেন। লুতের চরিত্র হয়ে উঠেছে নৈতিক শৃঙ্খলা, সামাজিক বিধি এবং মানবিক আচরণের সীমারেখা নিয়ে চলমান বিতর্কের প্রতীক। লুতের চরিত্র এখানে একক ধর্মীয় উপদেশের সীমা অতিক্রম করে সভ্যতার অন্তহীন আত্মসমালোচনার কাব্যিক রূপক হয়ে উঠেছে।
৪. নুহ : সভ্যতা রক্ষার প্রকৌশলী
নুহ মানবসভ্যতার উৎস ও বিশ্লেষণের ধারাবর্ণনায় এক মহাপ্লাবন আখ্যানের একটি কেন্দ্রীয় চরিত্র। তাঁর নৌকা কেবল ধর্মীয় অলৌকিকতা নয়, মহাপ্রকৃতির বিভঙ্গ ও বিপর্যয়ের মুখে টিকে থাকার অপূর্ব কৌশলের প্রতীক। তিনি বিপর্যস্ত পৃথিবীতে জীবনরক্ষার জ্ঞান, দূরদর্শিতা এবং অস্তিত্ব সংরক্ষণের এক চিরন্তন প্রতীক। কবি জিললুর রহমান তাঁর এই পর্বের কবিতায় নুহকে সেই দৃষ্টিতেই দেখেছেন। কবি অলৌকিকতার মোহে প্রভাবিত হননি, তিনি নুহের ভেতরে আবিষ্কার করেছেন এক জীবন-প্রকৌশলীকে। যিনি আসন্ন বিপর্যয়ের ভাষা শুনতে জানতেন এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতির প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছিলেন। কবির পঙ্ক্তিদ্বয়—
“জগৎজুড়ে এই জীবন স্রোতটার
সেই তো কারিগর বন্যা এড়াবার”
এখানে নুহকে একজন জীবন প্রকৌশলী হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে। জলবায়ু বিপর্যয়, ঘূর্ণিঝড় ও বন্যাপীড়িত সমকালীন পৃথিবীতেও নুহের প্রতীকী গুরুত্ব এখনও অটুট। কবিতার অন্তর্নিহিত দার্শনিক ব্যঞ্জনায় নুহের এই আখ্যান এক বৃহত্তর অর্থ ধারণ করেছে। এখানে প্লাবন কেবল জলরাশির উত্থান নয়, সভ্যতার প্রতিটি সংকটের রূপক— যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, পরিবেশবিনাশ, নৈতিক অবক্ষয় কিংবা ইতিহাসের আকস্মিক বিপর্যয়। সেই অর্থে নুহের নৌকা মানবজাতির সম্মিলিত প্রজ্ঞার প্রতীক, যা বারবার ধ্বংসের মুখ থেকে জীবনকে উদ্ধার করে এনেছে।
আরও লক্ষণীয় যে, কবি দ্বিতীয় আসমানে নুহকে এক ধরনের নিষ্ক্রিয় অবস্থায় দেখান—
“দ্বিতীয় আসমানে বেহুদা বসে থাকা
বিশাল নৌকায় আঙুল চুষে কাটে”
এই চিত্রকল্পে সূক্ষ্ম ব্যঙ্গের পাশাপাশি গভীর বেদনারও সঞ্চার আছে। পৃথিবীতে এখনও ঝড় ওঠে, নদী ভাঙে, সমুদ্র ফুলে ওঠে, মানুষ বিপন্ন হয়। অথচ যে মানুষ একদা মহাপ্লাবনের বিরুদ্ধে সংগ্রামের প্রতীক ছিলেন, তিনি এখন আসমানের নির্জনতায় স্মৃতির রক্ষক হয়ে বসে আছেন। ফলে এই দৃশ্য নুহের নয়, বরং সমকালীন মানবজাতির প্রতি একটি পরোক্ষ প্রশ্নও উত্থাপন করেছে— মানুষ কি তাঁর অভিজ্ঞতা থেকে কিছু শিখেছি? নাকি প্রতিটি বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়ে আত্মগত অবলুপ্ততার জন্যই নিয়ত প্রস্তুত?
৫. মিকাইল : প্রকৃতির মহাজাগতিক প্রশাসক
‘দ্বিতীয় আসমানে’ এই পর্বে ফেরেশতা মিকাইলের আবির্ভাব এক বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। এখানে তিনি কেবল ইসলামী আকিদার একজন ফেরেশতা নন, এই দুত বিশ্বপ্রকৃতির অদৃশ্য শৃঙ্খলা, ঋতুচক্রের অন্তর্লীন গণিত এবং সৃষ্টির ভারসাম্য রক্ষাকারী এক মহাজাগতিক ব্যবস্থাপকের রূপে প্রতিভাত হয়েছেন। ইসলামী বিশ্বাসে মীকাঈল সেই নূরসৃষ্ট ঐশী সত্তা, যাঁর দায়িত্ব বৃষ্টি, রিজিক এবং প্রকৃতির বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করা। কিন্তু কবির কল্পনায় এই ধর্মতাত্ত্বিক ধারণা এক অভিনব কাব্যিক রূপ লাভ করেছে। দ্বিতীয় আসমানের অলৌকিক পরিসরে কবি তাঁকে দেখতে পান এক নিবিষ্ট কর্মচারীর ভঙ্গিতে—
“কাগজে টুকে রাখে বর্ষা-বৃষ্টিটা
কোথায় ঝড় হবে ভীষণ খরা কোথা।”
এই দৃশ্যের মধ্যে রয়েছে এক অনবদ্য কাব্যিক মানবায়ন। এখানে মিকাইল আর দূরবর্তী কোনো অতিলৌকিক শক্তি নন, তিনি যেন মহাবিশ্বের জলবায়ু নথির প্রধান রক্ষক। যিনি পৃথিবীর প্রতিটি মেঘ, প্রতিটি বৃষ্টিধারা, প্রতিটি খরা এবং প্রতিটি ঝঞ্ঝার হিসাব সযত্নে লিপিবদ্ধ করে চলেছেন। তাঁর হাতে যেন সংরক্ষিত রয়েছে ঋতুর গোপন দিনপঞ্জি, বাতাসের চলাচলের মানচিত্র এবং মেঘমালার ভবিষ্যৎ গতিপথ। তবে কবি তাঁর স্বভাবসিদ্ধ রসবোধও বিসর্জন দেননি। এই গম্ভীর মহাজাগতিক প্রশাসকের নিকট তিনি একান্ত স্বদেশীয় আর্তি নিবেদন করেন—
“মুখটা কানে নিয়ে বলেছি, ‘শোনো ভাই
বাংলা মুল্লুকে দিয়ো না ঝড় ছাই
কদম ফুটলেই খিচুড়ি হবে ভাজা।’”
এই অংশে মেরাজের মহিমান্বিত আকাশযাত্রা হঠাৎ করেই নেমে আসে বাংলার মাটির গন্ধমাখা বাস্তবতায়। কদমফুল, বর্ষা, খিচুড়ি— এই পরিচিত সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গগুলো মহাজাগতিক পরিসরের সঙ্গে এমনভাবে মিশে যায় যে, কবিতাটি একদিকে যেমন আধ্যাত্মিক, অন্যদিকে তেমনি গভীরভাবে লোকজ। কবি এখানে কোনো ধর্মীয় প্রার্থনা করছেন না, তিনি এক আপনজনের মতো মিকাইলকে অনুরোধ করছেন। এই অনুরোধে আছে বাংলাদেশের দুর্যোগপীড়িত ভূগোলের স্মৃতি, আছে বন্যা ঘূর্ণিঝড়ে বিধ্বস্ত মানুষের দীর্ঘশ্বাস, আবার আছে বৃষ্টিমুখর বাংলার প্রতি এক স্নেহময় মমতাও। ‘দ্বিতীয় আসমানে’ মিকাইলের চরিত্রটি ধর্মীয় বিশ্বাসের সীমানা অতিক্রম করে প্রকৃতি ও মানবজীবনের পারস্পরিক নির্ভরতার এক কাব্যিক প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
৬. গৌতম বুদ্ধ : দুঃখ, অনিত্যতা ও আত্মজাগরণের দার্শনিক
‘দ্বিতীয় আসমানে’ পর্বে গৌতম বুদ্ধের উপস্থিতি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ মুসা, যিশু, লুত কিংবা নুহের সঙ্গে কবির সংলাপ যেখানে মূলত ধর্মীয় ইতিহাস ও নৈতিক সংকটের পরিসরে আবর্তিত, সেখানে বুদ্ধকে ঘিরে রচিত অংশগুলো প্রবেশ করেছে মানব অস্তিত্বের গভীরতম দার্শনিক প্রশ্নমালার ভেতরে। দ্বিতীয় আসমানের এই অধ্যায় এক অর্থে আত্মজিজ্ঞাসার আকাশমণ্ডলে পরিণত হয়েছে, যেখানে ধর্মীয় অলৌকিকতার চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে মানুষের অন্তর্লোকের রহস্য।
কবি প্রথমে বুদ্ধকে দেখেন ধ্যানমগ্ন অবস্থায়—
“কোথাও গৌতম করছে বসে ধ্যান
দেখার কুতূহলে দ্বিতীয় আসমান।”
এই দৃশ্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। পৃথিবীতে যিনি বোধিবৃক্ষতলে বসে জগতের দুঃখের কারণ অনুসন্ধান করেছিলেন, তাঁকে কবি দ্বিতীয় আসমানেও একই ধ্যানমগ্নতায় আবিষ্কার করেন। যেন বুদ্ধের প্রকৃত বাসস্থান কোনো ভৌগোলিক ভূমি নয়, চেতনার সেই অঞ্চল— যেখানে মানুষ নিজের অস্তিত্বকে প্রশ্ন করতে শেখে। তাঁর চারপাশে নেই রাজদরবারের ঐশ্বর্য, নেই ক্ষমতার প্রতাপ, নেই সংসারের কোলাহল। আছে কেবল নীরব মনন এবং আত্মসন্ধানের দীপ্ত একাকিত্ব। এই প্রেক্ষাপটেই কবি মানবিক ও হৃদয়বিদারক একটি প্রশ্ন উত্থাপন করেন—
“বধূটি শুয়ে ছিল ঘুমের শিশুটিও
সকলই ফেলে গেলে কীসের টানে প্রিয়?”
বৌদ্ধজীবনের ইতিহাসে এই প্রশ্নের গুরুত্ব অপরিসীম। কারণ সিদ্ধার্থের গৃহত্যাগকে বহু যুগ ধরে মানুষ কেবল ধর্মীয় ঘটনা হিসেবে নয়, মানবিক বেদনার এক অনিবার্য নাটক হিসেবেও দেখেছে। একদিকে নবজাতক রাহুল, অন্যদিকে যশোধরার স্নেহময় সংসার— এসব ত্যাগ করে এক যুবরাজ কেন অনিশ্চিত পথে যাত্রা করেছিলেন? কবি সেই পুরোনো প্রশ্নকেই নতুন কাব্যিক সংবেদে পুনরুজ্জীবিত করেন। বুদ্ধের উত্তরে ধ্বনিত হয় তাঁর সমগ্র দর্শনের সারসত্য—
“জরা ক্ষয়
মৃত্যু জয়লাভ করার সে নেশায়।”
এই উত্তরকে কেবল মৃত্যুকে পরাজিত করার আকাঙ্ক্ষা হিসেবে দেখলে এর গভীরতা ধরা পড়ে না। এখানে ‘মৃত্যু জয়’ কোনো শারীরিক অমরত্বের স্বপ্ন নয়। জন্ম, বার্ধক্য, ব্যাধি ও মৃত্যুর অন্তহীন চক্রের কারণ অনুসন্ধানের এক মহাসাধনা। বুদ্ধ উপলব্ধি করেছিলেন, মানুষের সমস্ত সুখ, ভোগ, সম্পদ ও সম্পর্ক অনিত্যতার বিধানে আবদ্ধ। ফলে তাঁর অনুসন্ধান ছিল না পার্থিব সাফল্যের দিকে,, অস্তিত্বের অন্তর্নিহিত দুঃখবোধকে অতিক্রম করার পথের দিকে। পরবর্তী সংলাপে এই উপলব্ধি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—
“অযথা কাটাইনি জীবন থেকে ধেয়ে
প্রাণের গূঢ় কথা বুঝবে সুসময়ে।”
এই উচ্চারণে কোনো ধর্মীয় প্রচারকের কর্তৃত্ব নেই, আছে এক অভিজ্ঞ অন্বেষকের প্রশান্ত আত্মবিশ্বাস। বুদ্ধ এখানে কোনো মতবাদ চাপিয়ে দিতে চান না, ইঙ্গিত করেন অভিজ্ঞতার দিকে। কারণ বৌদ্ধ দর্শনের মূল শক্তি বিশ্বাসে নয়, প্রত্যক্ষ উপলব্ধিতে। সত্যকে তিনি গ্রহণযোগ্য মতবাদ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেননি। আত্মদর্শনের মাধ্যমে আবিষ্কৃত এক অন্তরাত্মিক অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখেছেন। কবিতার শেষাংশে বুদ্ধের আরেকটি স্বীকারোক্তি বিশেষভাবে লক্ষণীয়—
“থেকেছি উপবাস ভেঙেছি সেই ব্রত
এভাবে পাল্টেছি মনের অভিমতও।”
এই পঙ্ক্তিগুলো বুদ্ধের চিন্তার এক মৌলিক বৈশিষ্ট্যকে উন্মোচন করেছে। তিনি কোনো অনড় মতবাদের আবদ্ধ ছিলেন না। কঠোর তপস্যা ও চরম ভোগ— উভয় অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, সত্যের পথ চরমতার মধ্যে নয়,, ভারসাম্যের মধ্যে। এখানেই উদ্ভূত হয় তাঁর ‘মধ্যমার্গ’-এর ধারণা, যা মানবচেতনার ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অবদান। কবি জিললুর রহমানের কাব্যিক কল্পনায় তাই গৌতম বুদ্ধ কেবল একটি ধর্মপ্রবর্তক চরিত্র নন, তিনি মানব অস্তিত্বের গভীরতম প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়ানো এক মহাজিজ্ঞাসু মন। তাঁর উপস্থিতি দ্বিতীয় আসমানকে পরিণত করেছে আত্মসন্ধানের এক দার্শনিক পরিসরে। যেখানে মানুষ নিজেকে, নিজের দুঃখকে, নিজের ক্ষয়কে এবং নিজের মুক্তির সম্ভাবনাকে নতুনভাবে চিনতে শেখে।
‘দ্বিতীয় আসমানে’ বুদ্ধের চরিত্রটি অনিত্যতার বোধ, দুঃখের বিশ্লেষণ, আত্মজাগরণের সাধনা এবং চেতনার মুক্তির এক মহিমান্বিত প্রতীক। তিনি কোনো স্বর্গীয় অলৌকিকতার প্রতিনিধি নন, তিনি মানবমনের অন্তর্লোক থেকে উদ্ভূত সেই বিরল প্রজ্ঞার প্রতিমূর্তি, যা মানুষকে বাহ্যিক জগতের সীমা অতিক্রম করে নিজের গভীরতম সত্যের দিকে যাত্রা করতে আহ্বান জানায়।
এক সে মেরাজের রাত্রে ঘুমিয়েছি: প্রথম আসমানে ॥ ৩য় পর্ব ॥ শোয়েব নাঈম

