এই সময়ের প্রতিশ্রুতিশীল কবি কবীর আলমগীরের ‘আদমের দুঃখগুলো (২০২৬)’ পড়ে মনে হলো বহুদিন পর রস জাগানিয়া কবিতার বই পড়লাম। কবিতার বই পড়ার দুটি পথ আছে; একটি হলো প্রতিটি কবিতাকে আলাদা মুহূর্ত হিসেবে দেখা। অন্যটি হলো সমগ্র বইকে একটি ক্রমবিকশিত যাত্রা হিসেবে পড়া।
‘আদমের দুঃখগুলো’ দ্বিতীয় পাঠের দাবি রাখে। নামকরণেই একটি আদিরূপ কেন্দ্রে বসেছে: আদম, প্রথম মানুষ, প্রথম নির্বাসিত, প্রথম শোকার্ত পিতা। একান্নটি কবিতার এই বইয়ে সূচিতে কোনো পর্ব-বিভাজন নেই, ভূমিকা বা কবির নিবেদনও নেই। আছে কেবল একটি উৎসর্গ, যা বইটির আবেগীয় উৎসমুখ।
প্রথমে বলে রাখা ভালো কাব্যগ্রন্থের ‘আদম’ ধর্মগ্রন্থীয় চরিত্র নন, তিনি একটি কাব্যিক চারিত্রিক অবস্থান। এই অবস্থান থেকে ব্যক্তিগত বিচ্ছেদ, প্রেমের অপূর্ণতা, রাষ্ট্রীয় হত্যা, যুদ্ধ ও বিপ্লবের ক্লান্তি একই বেদনার ভিন্ন মাত্রা হয়ে ওঠে। ‘রামিসা, তোমার নাম উচ্চারণ করতে গেলেই/ শোকের পায়রাগুলো জুড়ে বসে বুকের ভেতর।’ [‘উৎসর্গ’, পৃষ্ঠা ০৭]। এখানে বইয়ের প্রথম কাজ হলো শোককে একটি পাখির ঝাঁকে রূপ দেওয়া। উৎসর্গের বক্তা নিজেকে ‘পিতা’ হিসেবে চিহ্নিত করে এবং শিশুর কপালে আদমের চুম্বনের কথা বলে: ‘তোমার কপালে এঁকে দিচ্ছে পিতা আদমের চুম্বন।’ [উৎসর্গ’, পৃ. ০৭]। এই চরণে বইয়ের দুই প্রধান সুর একসঙ্গে বাঁধা পড়ে: শোক, এবং আদমকে ‘পিতা’ হিসেবে দেখা। রামিসা ‘কে’ এবং কবির সঙ্গে তার সম্পর্ক কী, বইয়ে তার ব্যাখ্যা নেই। কাজেই পাঠ-নির্ভর দাবি এটুকুই যে উৎসর্গের বক্তা পিতৃকণ্ঠে শোকার্ত।
কাব্যগ্রন্থটির নামকরণ কিংবা মহিমাদর্শন শিরোনামের বহুবচনেই লুকিয়ে আছে। ‘দুঃখ’ নয়, ‘দুঃখগুলো’। এটি একটি অনুভূতি নয় বরং পুনরাগত, প্রায়-সজীব একটি সঙ্গীদল। শিরোনাম-কবিতাটি সেই দুঃখের চরিত্র আঁকে: ‘আদমের দুঃখগুলো খুব চুপচাপ,/ তোলে না স্লোগান, আর হাঁটে না মিছিলে/ বরং সন্ধ্যার মতো ধীরে তার কাঁধে বসে [পৃষ্ঠা ১৭)]। তবে কবিতাটির দার্শনিক মোড় তার সান্ত্বনা-ঠিকানায়: ‘আদম জানে আকাশ নয়, স্বর্গ নয়/একদিন মাটি তার দুঃখগুলো শুষে নেবে’ [পৃষ্ঠা ১৭]। মুক্তির প্রতিশ্রুতি উর্ধ্বলোকে নয়, মৃত্তিকায়। আদম মাটি থেকে এসেছিলেন, মাটিতেই ফিরবেন। এই বইয়ের দর্শন তাই ধর্মীয় পরিত্রাণবাদ নয়, এক ধরনের মানবতাবাদ। এর সঙ্গে যুক্ত হয় একাকিত্বের ঘোষণা: ‘আদম জানে মানুষ মানে একা, খুব বেশি একা’ [পৃ. ১৭]।
কাব্যগ্রন্থটিতে আদম চরিত্রকে অন্তত চারটি রূপে পাওয়া যায়। প্রথমত, আদি-পিতা হিসেবে। ‘আদমের সন্তান’ কবিতায় বক্তা নিজেকে আদমের উত্তরাধিকারী ঘোষণা করে, আর মহাকাব্যিক পূর্বপুরুষকে টেনে আনে গৃহস্থালির ভেতরে: ‘আদমের ছেলে আমি, আদি পিতার মতন, / দুঃখের শোকেসে রাখি বিরহের বাসন-কোসন’ (পৃষ্ঠা ২৭]। ‘শোকেস’ ও ‘বাসন-কোসন’ মহাপুরাণকে মধ্যবিত্ত ঘরের আসবাব বানিয়ে ফেলে। মিথ কিংবা চিরন্তন সাহিত্য সমালোচনার ভাষায় এটি আদিরূপের স্থানান্তর।
দ্বিতীয় চরিত্রটি পাই ‘পতন’-এর পুনর্ব্যাখ্যায়। পাপ ও শাস্তির প্রচলিত কাঠামো এখানে জ্ঞানলাভ ও মানুষ হয়ে ওঠার কাঠামো: ‘আদম জানে স্বর্গের আপেল ছিল না শুধু ফল’। ‘আপেলটি রহস্যকে জানার সাহস / মানুষ হয়ে ওঠার হাজারও প্রশ্ন’। [পৃষ্ঠা ১৭] ধর্মতাত্ত্বিক ঐতিহ্যে একে ‘সৌভাগ্যময় পতন’ ধারণার সঙ্গে তুলনা করা যায় । তবে এখানে পতন ক্ষতিপূরণ ছাড়া। বইটি স্বর্গ ফেরত দেয় না, শুধু স্বর্গের প্রশ্নটুকু রেখে যায়। তৃতীয় চরিত্র, হাওয়ার সঙ্গে ভাষার খেলায়। ‘হাওয়া’ শব্দটি বাংলায় একই সঙ্গে ঈভ ও বাতাস। ‘আদমের ফাগুন’-এ এই দ্ব্যর্থতা নির্মম কার্যকারিতা পায়: ‘আদমের দুঃখগুলো বিরহী ফাগুনে ওড়ে / হাওয়ার শাড়ির মতো।’ [পৃষ্ঠা ১৬।] বাতাসে ওড়া দুঃখ এবং নারীর শাড়ি এক রূপকে জোড়া লাগে।
আদমের চতুর্থ চরিত্র কবিতার উৎস হিসেবে। ‘হাওয়ার শরীর কিংবা গন্ধম’ কবিতা স্বর্গের বদলে অন্য এক সন্ধানের কথা বলে: ‘আদম স্বর্গ নয়, হাওয়ার ভেতর খুঁজেছিল কবিতা।’ [পৃষ্ঠা ৪৪] এখানে স্বর্গহারানোর ক্ষতিপূরণ নান্দনিক। এই পাঠ সমর্থন করে ‘আদম ও হাওয়া’ কবিতার উল্টো-চলন, যেখানে মানুষের ধুলো থেকে স্বর্গ ফুল ফোটায়: ‘আদম-হাওয়ার ধুলা থেকে স্বর্গে ফুলেরা উঠলো’ [পৃষ্ঠা ৪৩)। স্বর্গ মানুষকে তৈরি করেনি, মানুষই স্বর্গে ফুল ফুটিয়েছে। বইয়ের সবচেয়ে সাহসী অবস্থান এটিই।
বইয়ের ধর্মীয় উপকরণ ইসলামি, খ্রিস্টীয়, ও বৈষ্ণব ঐতিহ্যজুড়ে ছড়ানো: আদম, হাওয়া, ইব্রাহিম, নূহ, মরিয়ম, রাধা-কৃষ্ণ, জিবরাইল, ফেরেশতা, জিকির, কালেমা। কবিতাগুলো পড়ে আমার কাছে তিনটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে।
১. ঈশ্বরের মানবিকীকরণ ও থিওডিসির প্রশ্ন: ‘নত হও প্রার্থনায়’ কবিতা আদমকে সান্ত্বনা দেয়, তবে সেই সান্ত্বনার ভেতর একটি প্রশ্ন ঝুলে থাকে: ‘দুঃখগুলো তিনি মুছে দিতে পারতেন।’ [পৃষ্ঠা ১০)] কবিতায় মুসা, ইউসুফ, মরিয়মের আখ্যান স্মরণ করিয়ে দেখায় যে স্রষ্টা সমুদ্র ভাগ করতে পারেন, ফেরেশতা পাঠাতে পারেন। ‘পারতেন’ ক্রিয়াটিই আসল, কারণ যিনি পারতেন কিন্তু আদমকে দুঃখ দিয়েছেন, তাঁর করুণা প্রশ্নসাপেক্ষ। তবু কবিতার শেষ সান্ত্বনার বাহক কে? ‘নত হও প্রার্থনায়’ কবিতায় কবি লিখলেন, ‘হাওয়ার আঁচল দিয়ে তিনি মুছে দেবেন দুঃখগুলো, [পৃষ্ঠা. ১০]। ঐশ্বরিক করুণা হাওয়ার আঁচলের মধ্য দিয়ে আসে, অর্থাৎ নারী ও বাতাসের, মানবিক স্পর্শের মধ্য দিয়ে। ঈশ্বরের কাজ মানুষের মাধ্যমে ঘটে।
২. মিথের উৎপত্তি নিয়ে প্রশ্ন: আমার কাছে ‘যেভাবে তৈরি হলো মিথ’ কবিতাটিকে একটি মেটাফরসিস মিথ মনে হয়েছে। মিথ কীভাবে জন্মায়, কবিতা সেটিই বলে, এবং ঈশ্বরকে গোত্রীয় সৃষ্টিকর্তার পর্যায়ে নামিয়ে আনে। কবি বললেন, ‘সৃষ্টিকর্তা ঈর্ষায় জন্ম দিলেন পাপের’ [পৃষ্ঠা ৪১।] ‘ভয় পেলেন ঈশ্বর/একদা জঙ্গল ছেড়ে অদৃশ্য হলেন।’ এখানে ঈশ্বর ঈর্ষাকাতর ও ভীত। ‘ঈশ্বর শূন্যতা ছুঁয়ে বেরিয়ে এলেন’ কবিতায় কবি লিখেছেন, ‘আমি একা- আমি একটি পৃথিবী তৈরি করব’ [পৃষ্ঠা ৫০।] সৃষ্টি এখানে একাকিত্বের ফল। এবং প্রেম সৃষ্টির উপজাত। কেননা কবি বলেছেন: ‘তোমাকে ভালোবাসি বলে জন্ম নিলো জুঁই-চামেলি’ [পৃষ্ঠা ৫১]। সৃষ্টিকর্তার একাকিত্ব আদমের একাকিত্বের প্রতিধ্বনি। মানুষ ও ঈশ্বর একই অস্তিত্বমূলক পীড়নের দুই প্রান্তে। একই সঙ্গে এটিও সত্য যে, কবিতা কোনো নাস্তিক সিদ্ধান্তে পৌঁছায় না। সে ঈশ্বরকে সহ-দুঃখী করে তোলে।
৩. পবিত্র শিশুর সাথে মানব শিশুর প্রতিচ্ছবি: কবির ‘মরিয়মের প্রতি’- কবিতায় যুদ্ধে কিংবা ক্ষুধায় নিহত এককটি শিশু-কে যিশুর আসন দেওয়া হয়েছে। কবি লিখেছেন, ‘ক্ষুধায় মরছে একেকটি যিশু’ [পৃষ্ঠা ৪৬]। যেমন প্রত্যেক মানুষ আদম, তেমনি প্রত্যেক ক্ষুধার্ত শিশু একেকটি যিশু। তারা ঐশ্বরিক আদিরূপের ভিড়ের ভেতর ছড়িয়ে পড়ে। অন্যান্য কবিতায় পুনর্নির্মাণ ব্যক্তিগত প্রার্থনার ভেতরে ঘটে। ‘দাও উপহার’ কবিতায় কবি ফেরেশতার আদর্শ ত্যাগ করে মানবিক পাপ-স্বীকার করে লিখেছেন, ‘আমি ফেরেশতা নই, মানুষই আমি’ [পৃষ্ঠা ৪৭] এবং কবি চায় আদমের দুঃখ যেন কালির ভেতর আশ্রয় পায়: ‘কালির ভেতর গুটিয়ে দাও আদমের দুঃখগুলো’ [ পৃষ্ঠা ৪৭]। অর্থাৎ কলমই তার উপহার; লেখাই তার ধর্ম। মৃত্যু-মুহূর্তেও ধর্মীয় বাক্য প্রেমের নামে প্রতিস্থাপিত হয়: ‘কালেমার পরিবর্তে ফুটে ওঠে তোমারই নাম’ [পৃষ্ঠা ২১]। এই সাহসী প্রতিস্থাপনে প্রেমিকার নাম বিশ্বাসের সূত্রের স্থান নেয়। ‘নিঃশব্দে হেঁটেছো প্রভু’ কবিতায় ঈশ্বর প্রায় অনুপস্থিত পথিক: ‘মাঝে মাঝে মনে হয়/ আমার পাশ দিয়ে নিঃশব্দে হেঁটে গেছ তুমি’ [পৃষ্ঠা ৫৬]। এটি লুকিয়ে-থাকা ঈশ্বরের অভিজ্ঞতা । ‘রাধা-কৃষ্ণ’ কবিতায় ভুলই সৃষ্টিশীল বলে উল্লেখ করে কবি লিখেছেন, ‘সেই ভুলেতে জন্ম নিলো প্রেমকাননের ফুল’ [পৃষ্ঠা ১৩]। আদমের ‘ভুল’ থেকে মানবজন্ম, রাধার ‘ভুল’ থেকে প্রেমের ফুল। বইয়ের পৌরাণিক পরিসর তাই একধর্মীয় নয়। ভুল থেকে সৌন্দর্যের জন্মের একটি সাধারণ মিথ-কাঠামো ধর্মীয় সীমানা ছাড়িয়ে যায়।
প্রেম, শোক ও ব্যক্তিমানুষ
বইয়ের প্রেম-কবিতাগুলো অন্তত চার রূপে ধরা যায়: উদ্ভাস, অভাব, স্মৃতি ও স্বেচ্ছা-বন্ধন। ‘চাঁদ ঝলমল করে’ কবিতায় প্রেমিকার আগমনে প্রকৃতি আলোকিত হয়: ‘তুমি এলে রাতের আকাশ তারায় তারায় জ্বলে’ (পৃষ্ঠা ১১)। ‘বৈশাখ’ কবিতায় প্রেমহীনতা ঠোঁটের ক্ষতে দগ্ধ হওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন কবি। ‘কত বৈশাখ মরেছে কেবল ঠোঁটের তুমুল ক্ষতে’ [পৃষ্ঠা ১৪]। ‘ঠোঁট’ এখানে বইয়ের পুরনো মোটিফ। ‘আদমের ফাগুন’ কবিতাতেও আদমের ঠোঁট শুকিয়েছে। এই ঠোঁট-পোড়া আদম ও প্রেমিকের অভিন্ন ক্ষুধা। ‘হৃদয়ের হেবানামা’ কবিতায় আইনি শব্দ মিশেল করে অনুভূতির কাঠামোকে আরও গভীর করেছেন। ‘হেবানামা’ দানপত্র, অথচ হৃদয়ের দলিল প্রতিদিন পুড়ছে: ‘রোজ পুড়ে যাচ্ছে হৃদয়ের হেবানামা’ [পৃষ্ঠা ২৪]। ‘বিরহী পাখি’ কবিতায় নাগাল-না-পাওয়ার যন্ত্রণা নিয়ে লিখেছেন: ‘আমি যত চাই যে কাছে পাখি তত দূরে’ (পৃ. ২৫)। ‘পাহারাদার প্রেম’ কবিতায় প্রেমকে দুইভাগে ভাগ করা হয়েছে। এক ভাগ পাহারায়, আরেক ভাগ নৃত্যে: ‘কিছু প্রেম পাহারায় থাক,/ কিছু প্রেম নেচে ওঠে গভীরে।’ [পৃষ্ঠা ২৮]। ‘দেরি করে ফেলি’ কবিতাটি বিলম্বের ট্র্যাজেডি: ‘ভালোবাসার কথাটা বলব বলব / করে দেরি করে ফেলি’ [পৃষ্ঠা ৪২)] ‘নিঃসঙ্গতা দাও প্রভু’ কবিতায় কবি লিখেছেন, প্রেম ও একাকিত্ব একে অপরের শত্রু নয়, সহচর: ‘পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর জিনিস/সে নিঃসঙ্গতা’ [পৃষ্ঠা ৪৯]। ‘আমাকে প্রেমে পরাধীন করো, বন্দি করো’ [পৃষ্ঠা ৪৯]। ব্যক্তিগত থেকে সার্বজনীনে রূপান্তরের সবচেয়ে সংযত উদাহরণ ‘বাবার সাইকেল’। একটি পুরোনো সাইকেল, কিন্তু প্রশ্নটি সন্তানের চিরকালের: ‘কখনো জানা হয়নি, বাবা তোমার দুঃখ কিসের?’ [পৃষ্ঠা ৫৩]। সাইকেলের রঙে ক্ষয় ধরে, তাতে মাটির রঙ ফুটে ওঠে: ‘রং উঠতে উঠতে হয়ে গেল মেটো’ [পৃষ্ঠা ৫৩]। ‘মেটো’ (মাটির রঙ) এখানে আদমের মৃত্তিকা-উৎসের নীরব প্রতিধ্বনি। প্রতিটি পিতা এক আদম, যার দুঃখের নাম সন্তান জানে না। ‘যখন আমার মৃত্যু হবে’ কবিতাতে সেই দুঃখ নদী হয়ে বেঁচে থাকে: ‘বাবার চোখে লুকিয়ে থাকা গভীর নদীটি’[ পৃষ্ঠা ১৮]। আর ‘ইব্রাহিমের প্রতি’ কবিতায় কবি নিজের ভেতরেও একটি ‘ব্যথিত নদী’। পিতার নদী ও পুত্রের নদী এক স্রোতের অংশ। এভাবেই ব্যক্তিগত শোক জৈব বংশধারার মধ্য দিয়ে আদম থেকে মানবে মানবে সার্বজনীনতায় পৌঁছায়। এই তিন কবিতা (উৎসর্গের পিতা, ‘বাবার সাইকেল’-এর পিতা, আদি-পিতা আদম) পরস্পরকে যুক্ত করেছে বিনে সুতার মালায়।
মৃত্যু, যুদ্ধ ও রাজনৈতিক বাস্তবতা
বইয়ের মৃত্যু-চেতনা দুইভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। ব্যক্তিগত-নাগরিক ও সমষ্টিগত-রাষ্ট্রীয়। ব্যক্তিগত মৃত্যু কল্পিত হয় শহুরে উদাসীনতার ভেতরে: ‘দেহ নিয়ে সাইরেন বাজাতে বাজাতে / এগুবে ভাড়াটে অ্যাম্বুলেন্স’ [পৃষ্ঠা ১৮]। ‘ভাড়াটে’ শব্দটি মৃত্যুকে বাজারের লেনদেনে নামায়। আর বক্তার শেষ দাবি স্মৃতি-অস্বীকার: ‘আমি মনে রাখব না এসব কিছুই’ [পৃ. ১৮]। যে-কবিতা মৃত্যুর ঘটনাকে ভবিষ্যতে সাজায়, সে আসলে মৃত্যুর পরে ভুলে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করছে। সেখানে কোনো স্মৃতিসৌধ নেই। ‘হত্যার দিনলিপি’ কবিতায় কবি সাধারণ নাগরিক, যার হত্যা আগে থেকে জানা: ‘আমি জানি, আমাকে যে হত্যা করা হবে। [পৃষ্ঠা ১৫]। আর হত্যার হাতিয়ার নাগরিকের নিজেরই অর্থে কেনা, এটি উল্লেখ করতে কুণ্ঠাবোধ করেননি কবি।: ‘ট্যাক্সের টাকায় কেনা রাইফেল তাক করা আমারই বুকে।’ [পৃষ্ঠা ১৫]। এই চরণে আধুনিক জামানায় রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্কের পুরো অভ্যন্তরীণ বৈপরীত্যের বিষয়টি কবি শক্তিশালীভাবেই তুলে ধরেছেন।। যুদ্ধ-কবিতায় বইটি আন্তর্জাতিক পরিসরে প্রসারিত হয়। ‘মানুষ মরছে’ কবিতায় ‘ফিলিস্তিন যেন এক বারুদ জমানো/ বোমার নাম’ [ পৃষ্ঠা ২৬।] এবং আন্তর্জাতিক নিষ্ক্রিয়তার বিষয়টি ব্যঙ্গ আকারে তুলে ধরেছেন কবি: ‘জাতিসংঘে মিটিং চলছে, মিটিং’ [পৃষ্ঠা ২৬]। কবিতায় মিটিং শব্দটি শান্তি-কূটনীতির শূন্যগর্ভতা বোঝায়। ‘জল্লাদ মিসাইল’ কবিতায় যুদ্ধকে ভোগ্যপণ্য ঝলমলে পরিসরে টেনে এনেছেন কবি: ‘সুপারসনিক মিসাইল কেড়ে নিচ্ছে শপিং মলের ঝলমল’ [পৃষ্ঠা ৩৪]।
ইতিহাস, স্মৃতি ও প্রতিবাদ
বইয়ে ইতিহাস কোনো তারিখ-সংবলিত দলিল হিসেবে আসে না। তা আসে নাম, স্থান ও বর্তমান-কালে। ‘নদীর নাম বিপুল চাকমা’ নাম-নির্ভর কবিতা: ‘বিপুল চাকমা এক বারুদের নাম’ [পৃষ্ঠা ৩৩]। ‘যখন বুটের মচমচ আওয়াজ কাঁপন তোলে পাহাড়ি জমিনে’ [পৃষ্ঠা ৩৩]। শিরোনামে ‘নদী’, প্রথম পঙ্ক্তিতে ‘বারুদ’ শব্দের ব্যবহার পানি ও আগুনের এই দ্বৈততাই কবিতার কেন্দ্র। কবিতার ভেতরে প্রতিরোধের ভাষা স্লোগানের কাছাকাছি: ‘অধিকার চাই সিনা টানটান করে দাঁড়াবার’ [পৃষ্ঠা ৩৩]।
এখানে মনে রাখা দরকার, শিরোনাম-কবিতা স্লোগানকে দুঃখের বিপরীতে বসিয়েছিল। এই কবিতা দেখায় স্লোগান-ও দুঃখের ভেতর থেকেই ওঠে, শুধু তার প্রকাশ্য রূপ। উত্তর-ঔপনিবেশিক পাঠে ‘পাহাড়ি জমিন’ ও বুটের ছবি অভ্যন্তরীণ উপনিবেশের নিদর্শন হতে পারে। ‘বিপ্লবীর বাসনা’ কবিতাটি বামপন্থি স্মৃতির অন্য চেহারা: ‘প্রেমপত্রের বদলে লিফলেটে খুঁজেছি জীবন!’ [পৃষ্ঠা ১৯]। কৃষক পিতার কাছ থেকে বিপ্লবের প্রথম পাঠ নেওয়ার কথা কবিতায় উঠে আসে [পৃষ্ঠা ১৯]। ঐতিহাসিক স্মৃতি এখানে পারিবারিক স্মৃতির সঙ্গে গেঁথে গেছে। ‘ভাগাড়’ কবিতাটি ইতিহাসের সমাধিস্থল: ‘নিজের হারানো মেরুদণ্ড খুঁজতে গিয়েছিলাম ভাগাড়ে’ [পৃষ্ঠা ৩৮।] ‘বুদ্ধিজীবীদের চোখ, কবির কবিতা / গেরিলা সৈনিকের বন্দুক’। এখানে কবিতা নিজেই ভাগাড়ে-পড়া বস্তু। কবি ধ্বংসপ্রাপ্ত সংস্কৃতির তালিকায় নিজের শিল্পকে গুনে ফেলেন। আর ভুলে-যাওয়ার শেষ ছবি ‘শুধু সন্ধ্যা নামে’ কবিতায় কবি লিখেছেন, ‘আমরা শুধু নাম লিখে যাই / মুছে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকা দেয়ালে’ [পৃষ্ঠা ৬১]।
‘বিপ্লবীর বাসনা’ কবিতাটি শারীরিক-কৃষিজ উৎস থেকে শুরু হয়ে নগরে ক্ষয়ের দিকে যায়। শুরুতে বিপ্লব শরীরের ভেতরের নদী ও স্লোগান: ‘শিরায় শিরায় ওঠে স্লোগান বিপ্লবে ডাক আসে বিপ্লবের।’ ‘বিপ্লবীর বাসনা’, [পৃষ্ঠা ১৯]।
পিতার চিত্র: ‘ঘোরলাগা এ শহরে চোখে ভাসতো বাবার শান দেওয়া কাস্তে’ ‘বিপ্লবীর বাসনা’, । এখানে শহর ‘ঘোরলাগা’, আর মাঠের কাস্তে স্মৃতিতে শান-দেওয়া, ধারালো। পরে কবিতা আত্ম-ব্যঙ্গে নামে: ‘আমাদের নাম ছিল লাল কমরেড / মধুর ক্যান্টিনে ওয়েটার চিনেছিল ‘কম রেট’ ‘বিপ্লবীর বাসনা’। কখন যে ‘কম রেট’ হয়ে গেছি বুঝতে পারিনি!’ ‘কমরেড’ থেকে ‘কম রেট’, ধ্বনিগত সাদৃশ্যে আদর্শের ক্যান্টিন-মূল্যে অবনমন। আমার কছে মনে হয়েছে, এটি বইয়ের সবচেয়ে সফল রাজনৈতিক ব্যঙ্গ, কারণ প্রতিবাদ এখানে বাইরের শত্রুর দিকে তাক করা নয়, নিজের পরিণতির দিকেও ঘোরানো।
লুটের তালিকায় গণতন্ত্র ও শিশির পাশাপাশি: ‘লুট হচ্ছে গণতন্ত্র, সকালের কোমল শিশির’ ‘হত্যার দিনলিপি’, [পৃষ্ঠা ১৫]। রাজনৈতিক ও প্রাকৃতিক ক্ষতি একই ক্রিয়ায় বাঁধা। পারিবারিক অর্থনীতিও যুক্ত: ‘আমার বাবার টাকা নিত্য লুট হচ্ছে- লুট হচ্ছে ফসলের মাঠ’ ‘হত্যার দিনলিপি’। আর হত্যার স্থান ফুলের সঙ্গে জড়িয়ে যায়: ‘হত্যা করা হবে লাল ফুলের বাগানে / ফুলের দোকানে। অর্থাৎ সৌন্দর্যের পরিসরই হত্যার মঞ্চ। ‘লাল’ এখানে বিপ্লবের রঙ ও রক্তের রঙ একসঙ্গে। ‘হাওয়ার শরীর কিংবা গন্ধম’ কবিতায় ‘হাওয়ার শরীর কবিতা হয়ে যায়!’ ‘এখানে ‘গন্ধম’ (নিষিদ্ধ ফল) শরীর, আর শরীর কবিতা। কবিতার শেষে আদমের গন্তব্য: ‘সে কান পাতে হাওয়ার কাছে দুঃখগুলো বলবে বলে’ [পৃষ্ঠা ৪৫]। দুঃখের শ্রোতা তাই একাধারে নারী ও প্রকৃতি।
‘আদমের দুঃখগুলো’ একটি শোকের বই যা নিজেকে ব্যক্তিগত শোকে আটকে রাখে না। উৎসর্গের ‘শোকের পায়রা’ থেকে শেষ কবিতার ‘সন্ধ্যা’ পর্যন্ত, পিতার সাইকেল থেকে জাতিসংঘের মিটিং পর্যন্ত, বইটি একটি ধারণায় স্থির থাকে: মানুষ মাটির সন্তান, স্বর্গের স্মৃতি নিয়ে একা, এবং সেই একাকিত্ব থেকেই প্রেম, কবিতা ও প্রতিবাদের জন্ম। আদমের দুঃখগুলো বইয়ের গঠনে যে সংহতি আছে, তা কবির নিজের মধ্যে একটি কাব্যপ্রকল্পের জন্ম দেওয়ার প্রমাণ।

