॥ পর্ব-০৯ ॥
সেটা কী ঠিক হবে? গ্লাসে ঢালা অ্যালকোহলের শেষটুকু গলায় ঢেলে তাকায় মাত্রার দিকে অনাবিল। অনেক ভালোবেসে শহীদুল আলিম আমার জন্য গোপনে যোগাড় করেছে। ওর স্ত্রী এসব পছন্দ করে না, কিন্তু আমার জন্য ঝুঁকি নিয়েছে। আর এই পরিবেশে একটু পান আমাকে স্বর্গের দুয়ারে নিয়ে গেছে মিসেস মাত্রা মধুরিমা।
ঠিক আছে, হাতের বোতল টেবিলের ওপর রাখে। কিন্তু আমাকে আপনি বলা চলবে না, পাশে নিচে শানের ওপর বসে মাত্রা।
আরে এখানে বসলেন কেন? চেয়ার ছেড়ে দাঁড়ায় অনাবিল।
আমি এখানেই বসবো, পা দুটো নামিয়ে দেয় সুইমিং পুলের জলে। আপনার কোনো সমস্যা আছে?
আছে?
কী সমস্যা?
এটা শহীদুলের বাড়ি। এলাকাটা গ্রামীণ। লোকজন যদি কোনোভাবে দেখে আপনার সঙ্গে আমি এখানে অ্যালকোহল পান করছি, আমরা সুটিং শেষে চলে যাবো আগামীকালের পরই, কিন্তু বিপদে পড়বে ছেলেটা। আপনি নিচে চলে যান, বিশ্রাম নিন মাত্রা। নাটকের ভাইটাল সুটিং আগামীকাল আপনার…
চুপ করে বসে থাকে মাত্রা, ঝিরঝিরে বাতাসে চুল উড়ছে। চাঁদের আলোয় মাত্রাকে মানুষ মনে হচ্ছে না, সুন্দরের এক টুকরো আগুন হয়ে জ্বলছে। মাত্রা খালি গ্লাসে বোতল থেকে তরল ঢালে, পানি মেশায়, এক টুকরো মাংস মুখে দিয়ে চুমুক দেয় গ্লাসে, বাহ দারুণ লাগছে।
এটা তো আমার মানে একমাত্র গ্লাস মাত্রা! বিস্মিত অনাবিল।
আর চুমুক খেয়ে তাকায় তীর্যক দৃষ্টিতে, কেন এক গ্লাসে খাবেন না?
বসে চেয়ারে অনাবিল, না মানে আপনি খাবেন…
আমি মাঝে মধ্যে একটু আধটু খাই। বাড়িয়ে ধরে গ্লাস, নিন পান করুণ এমন সুন্দর জায়গা, আকাশে চাঁদ, মিষ্টি বাতাস; এখানে না এলে খুব মিস করতাম।
হাত বাড়িয়ে গ্লাসটা নেয় অনাবিল, পুরোটা শেষ করে আবার গ্লাসে আবার ঢালতে থাকে। ঢালা শেষে এক টুকরো মাংস মুখে দিয়ে বাড়িয়ে ধরে মাত্রার দিকে। মাত্রা অন্যদিকে তাকিয়ে ছিল, গ্লাসটা সামনে এগিয়ে ধরে অনাবিল, নিন। পান করুন।
মাত্রা গ্লাসসহ অনাবিলের ডান হাতটা দুহাতে আঁকড়ে ধরে চোখদুটো বড় বড় করে তাকায়, আমাকে কষ্ট দিতেই হবে? আমার মুখটা দেখে আপনার একটুও মায়া লাগছে না? আপনি বুঝতে পারছেন না, আমি কত যন্ত্রণায় বেঁচে আছি!
মাত্রা!
আমাকে আর আপনি বলবে না, বলো?
ঠিক আছে!
মাত্রা সুইমিং পুল থেকে পাদুটো চেনে তুলে শানের ওপরে হাটু গেড়ে বসে, নিজের মুখ নিয়ে যায় অনাবিলের মুখের কাছে, একহাতে অনাবিলের হাত থেকে অ্যালকোহলের গ্লাসটা নিজের হাতে নিয়ে অন্যহাতে জড়িয়ে ধরে অনাবিলের গলা, গভীর আবেগে চুমু খায় অনাবিলের ঠোঁটে। একটা নয়, পরপর কয়েকটা। তুমি খুব ভালো একজন পুরুষ। কিন্তু তোমাকে চিনতে ভুল করেছিলাম, মাফ করে দিও। হাতে ধরা গ্লাসটার অর্ধেক শেষ করে বাকিটাসহ গ্লাসটা বাড়িয়ে ধরে অনাবিলের মুখের সামনে, এক চুমুকে তলটুকু গিলে নেওয়ার পর গ্লাসটা রাখে টেবিলের ওপর। ডান হাত মুক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দুই হাতে জড়িয়ে ধরে অনাবিলের গলা। মাত্রা পুরো শরীরটা টেনে ছেড়ে দেয় অনাবিলের বুকের মধ্যে। পুরো ঘটনাটা ঘটতে ত্রিশ সেকেন্ড সময় নিয়েছে। মাত্রার শরীর নিজের বুকের ওপর স্থাপিত হওয়ার পর অনাবিল কী করবে বুঝতে পারছে না। অবশ্য ভীষণ ভালো লাগছে এই মুহূর্তের অসম্ভব সুন্দরী এক নায়িকা বুকের ওপর!
তোমার দুহাত দিয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরো… আলতো আবেগে ভাসমান গলা মাত্রা মধুরিমার।
অনাবিল অবাক হয়ে দেখে নিজের দুটি হাত ওপরে তোলা, অনেকটা নিজেকে রক্ষা করার অভিপ্রায়ে। অথচ বুকের ওপর নিবেদিত মেয়েটির শরীরের সব ওম পৌঁছে যাচ্ছে নিজের শরীরের ঘাসবিন্দুর মর্মে মর্মে। নিজেকে আর রক্ষা করতে পারে না অনাবিল, দুহাতে জড়িয়ে ধরে মাত্রাকে।
মাত্রা মুখের কাছে মুখ আনে, আমি তোমাকে ভালোবাসি। ভীষণ ভালোবাসি, মনে করো না, এটা কোনো নাটকের সংলাপ! এটা আমার হৃদয় থেকে উত্থিত সংলাপ, আমি তোমাকে ভালোবাসি। আমার অভিনয় সর্ম্পকে তোমার এত আস্থা, আমার প্রতি তোমার যত্ন; আমাকে বাধ্য করেছে তোমাকে গত দুই দিনে তোমার বুকে জায়গা করে নিতে। আবার চুমু খায় অনাবিলের মুখে। আমি খুব ভালো একটা মেয়ে, আমাকে কষ্ট দিও না।
তুমি আমার সম্পর্কে কী জানো?
আমি কিচ্ছু জানতে চাই না, শুধু আমাকে ভালোবাসা দিও… আমি তোমার কাছে টাকা পয়সা গয়নাগাটি খাওয়া দাওয়া কিচ্ছু চাই না, এভাবে একটু জায়গা দিও, জানো, আমার কেউ নাই!
তোমার স্বামী।
নাই।
কেন কী হয়েছে?
বুকের ওপর থেকে মুখটা সাপের ছোবলের গতিতে অনাবিলের মুখের ওপর নিয়ে আসে মাত্রা। গলায় আহলাদি ঝাঁজ, সব এখন শুনতে হবে? আবার মাথাটা রাখে অনাবিলের বুকের ওপর।
মাথার ওপর ক্ষয়ে যাওয়া ক্লান্ত চাঁদ। সেই চাঁদের হালকা আলোয় শহিদুলের বাড়ির তিনতলার সুইমিংপুলের পাশের এই মুহূর্তটাকে মনে হচ্ছে, অবাক মুহূর্ত। বাস্তব না অবাস্থব বুঝতে পারছে না অনাবিল আনন্দ। সত্যি কি মাত্রা মধুরিমা আমার বুকে? মেয়েটির অভিনয় দেখে যত সাহসী আর বাস্তবানুগ মনে হয়েছিল, এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে বুনোলতার মতো একটা বৃক্ষের আশ্রয় লাভের প্রাণপণ চেষ্টায় সে রত। ও কি আমার মধ্যে আশ্রয় বৃক্ষ খুঁজছে? মাত্রা বুকের মধ্যে একটা বিড়ালের মতো জড়িয়ে আছে।
মাত্রা?
সাড়া দেয়, ওহু…
আগামীকাল তোমার সুটিং আছে।
আমি ঠিকই তোমার সুটিং ঠিক সময়ে করে দেবো।
সুটিং আমার না, তোমার।
বুকের ওপর থেকে মুখ তুলে সরাসরি তাকায় অনাবিলের দিকে, তো এখন আমাকে কী করতে হবে?
রাত প্রায় দুটো। তোমার একটু ঘুম দরকার।
তোমার নাটকের গুড অভিনয়ের জন্য?
হাসে অনাবিল, নাটক আমার না, ডিরেক্টর আর তোমার। আমি স্ক্রিপ্ট লিখে টাকা নিয়ে নিয়েছি। এখন তুমি কী অভিনয় করবে, তোমার ব্যাপার। কিন্তু আমি চাই কোনোভাবেই যেন পেশার প্রতি অযত্ন না থাকে।
তুমি খুব ভালো একটা বেড়াল। চুমু খায় ঠোটে মধুরিমা, আমার খুব ইচ্ছে করছে…
কী ইচ্ছে করছে?
এইখানে খোলা আকাশ ও চাদের নিচে আমি আমাকে তোমার সামনে উন্মুক্ত করি… গলা ছেড়ে দিয়ে দাঁড়ায় মাত্রা, দেখো আমার সৌন্দর্যটুকু! বুকের ওপর জামার বোতাম খুলতে শুরু করে মাত্রা। দ্রুত চেয়ার ছেড়ে উঠে দুহাতে বুকের সঙ্গে ঝাপটে ধরে অনাবিল, কী হচ্ছে এসব?
আমার খুব ইচ্ছে করছে অনাবিল, কতদিন আমার এই সুন্দর শরীরটা আদর থেকে বঞ্চিত, ঘাড়ের ওপর মাথা রেখে হু হু কান্নায় ভেঙে পড়ে মাত্রা মধুরিমা। জানো, আমি একটা দুঃখী মেয়ে। সবাই রুপালি পর্দায় আমার অভিনয় দেখে, আমার শরীর দেখে কিন্তু শরীরের মধ্যে দুঃখের অপমানের যে নদী বয়ে চলছে, কেউ দেখছে না। জানতেও চায় না।
চুপচাপ বুকের সঙ্গে ঝাপটে ধরে দাঁড়িয়ে অনাবিল। টেনশন আর ভীষণ ভালোলাগার এক অনিবর্চনীয় সুখ নিয়ে দাঁড়িয়ে ও। কয়েক মিনিট আগেও জানতো না, এমন পবিত্র সুন্দর সময় আসবে শহিদুলের বাড়ির ছাদে নির্জন আলো ও আধারির ঢেউয়ে। সিনেমার বা নাটকের দৃশ্যের চেয়েও অসীম বাস্তব আর অভাবনীয়। সত্যি কি মাত্রা মধুরিমা আমার বুকে? আমি ওকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি আকাশ তেপান্তরের নিচে? দেখছে কী কেউ আমাদের? দেখলে কী ভাবছে? ভাবছে, নাটকের সুটিং হচ্ছে? আরে বাবা, জীবনের সবটাই সুটিং নয়। সুটিংয়ের বাইরের জীবনের যে বাহারি বিচিত্র রূপ, এই মুহূর্তটা সেই রূপ অতিক্রান্ত করছে দারুণ আমোদে আর করুণ যন্ত্রনায়।
আমাকে এভাবে রাখবে তো? ফিসফিসিয়ে প্রশ্ন করে মাত্রা।
কে যে কাকে রাখে, বলা যায়? আমার তো মনে হয়, তুমিই আমাকে তোমার বুকের মধ্যেখানে রেখে দিয়েছো অমৃত আনন্দে!
আমার খোলা বুকটা দেখবে? সেতারের সংকেতে বলতে বলতে এক হাতে কামিজের বোতাম খুলতে শুরু করে মাত্রা, আমি খুব তৃষ্ণার্ত অনাবিল। বুকটা দেখো। খা খা করছে।
চাঁদের মৃদু আলোয় নারী খুলে দিয়েছে বুকের দুয়ার, নিজেকে রুখতে পারে না অনাবিল, মুখ ডুবিয়ে দেয় দুই মাংসল গোলাপের মধ্যেখানে, অনাঘ্রাতা নিটোল কাম গন্ধে মুখর হয়ে ওঠে অনাবিলের শরীরের সব সত্তা, সব গ্রন্থি। মাত্রা মধুরিমার উন্মুক্ত বুকটা চাটতে শুরু করে অনাবিল আনন্দ পরম আনন্দ সুখে। কেঁপে ওঠে মাত্রার শরীর যমুনা। নিচের দিকটা দ্রুত এগিয়ে দেয় অনাবিলের নিচের দিকে, দুটো শরীরের সঙ্গে মিশে একটি শরীরে রূপান্তরিত হলে, সুইমিং পুলের পাশে শানের ওপর শুয়ে পড়ে মাত্রা মধুরিমা। মাত্রা মধুরিমার ওপর নিজেকে স্থাপিত করে অনাবিল আনন্দ!
রাত আড়াইটার দিকে মাত্রা উঠে বসে শরীরে স্যালোয়ার কামিজ পরে ধাক্কা দেয় অনাবিলকে, ওঠো। কেউ দেখার আগে রুমে যাওয়া দরকার।
না গেলে কী হবে? সকালটা এখানে ফুল হয়ে ফুটুক।
হয়েছে, শরীরটাকে দুমড়ে মুচড়ে দিয়ে এখন সকালের অপেক্ষায় আছে! ওঠো… নিজে দাঁড়িয়ে সলাজ হাত বাড়িয়ে দেয় মাত্রা।
মাত্রার হাত ধরে উঠে প্যান্টটা দ্রুত পরতে থাকে অনাবিল। অন্যদিকে ফিরে দাঁড়ায় মাত্রা। অনাবিল প্যান্ট পরতে পরতে ঘুরে ওর সামনে যায়।
অসভ্য! ফিরে দাঁড়ায় পেছনে মাত্রা।
প্যান্ট পরা শেষ করে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে মাত্রাকে, কী দিয়ে কী হয়ে গেলো মাত্রা?
মাত্রা মাথা রাখে অনাবিলের প্রশস্ত বুকে, এটাই হওয়ার ছিল, হয়েছে। কিন্তু আমাকে ফেলে দিও না। এভাবে রাখবে তো?
মাথার চুলের ওপর থুতনি রাখে অনাবিল, মাত্রা কেমন করে তোমার সঙ্গে জড়িয়ে গেলাম বুঝতে পারছি না। কিন্তু বিশ্বাস করো তোমাকে আমি ভীষণ পছন্দ করতাম, অভিনয় তো বটেই, তোমাকে নিয়ে আমার কল্পনার বাসর ছিল। ছিল স্বপ্নমোহর। কিন্তু এমন বাস্তব হবে ভাবিনি… তুমিও আমাকে দূরে রেখো না। হয়তো অনেক সমস্যা হবে, কিন্তু দুজনকে বুঝে চলতে হবে।
ঠিক আছে, সমস্যা যখন আসবে তখন দেখা যাবে। এখন চলো… বোতল, মাংসের বাটি, গ্লাস নিয়ে দুজনে নিচে নেমে যায়। বিশাল ড্রয়িংরুমের শূন্য। দুই প্রান্তে দুটি রুমে থাকার ব্যবস্থা থাকায় দুজনে রুমে ঢুকে দরজা দেয়। অনাবিলের ঘুম ভাঙে দুপুরের পরে। ঘুম ভাঙলেও বিছানা থেকে ওঠে না। চুপচাপ শুয়ে থাকে। গতরাতটা কি সত্যি ছিল? মাত্রা মধুরিমার সঙ্গে সত্যি ঘটনাটা ঘটেছিল? না কি নিজের মনের কল্পনা বিলাস? উঠে বসে অনাবিল, টেবিলের ওপর অ্যালকোহলের অর্ধেক বোতল, মাংসের বাটি দেখে বুঝতে পারে, হ্যাঁ একটা কিছু ঘটেছে। একটা সিগারেট ধরিয়ে রুম থেকে বের হয় অনাবিল, কেউ নেই ড্রয়িংরুমে। ধীরে ধীরে উঠে যায় সিঁড়ি বেয়ে ওপরের দিকে। তিনতলায় উঠে দাঁড়ায় সুইমিং পুলের সামনে। চেয়ার টেবিল নেই। নিশ্চয়ই শহিদুল সরিয়ে নিয়েছে। বসে পড়ে গতরাতের জায়গায়। দুপুরের ভ্যাপসা গরম কিন্তু আকাশজুড়ে কালো মেঘের আনাঘোনা।
বৃষ্টি নামলে খুব ভালো হতো… কী আশ্চর্য! ভাবনার সঙ্গে সঙ্গে দু’এক ফোঁটা বৃষ্টি নামতে শুরু করে। সঙ্গে একটু বাতাসও। সুইমিং পুলে পা ঝুলিয়ে দিয়েছে অনাবিল, মাত্রা কোথায়? ওর তো কল ছিল বারোটায়? রাতে ঘুমুতে পেরেছিল? না ঘুমিয়েই চলে গেলো সুটিংয়ে? পারবে তো ঠিক…। বৃষ্টির তোড় বাড়ছে একটু একটু করে, অনাবিল কিছুটা ভেজা শরীরেই নিচে নেমে আসে। সুটিংয়ের কয়েকজন খেতে এসেছে শহিদুলের বাড়িতে।
সুট্যিং ঠিক মতো হচ্ছে? জিজ্ঞেস করে অনাবিল।
জি স্যার, জবাব দেয় তিন নম্বর সহ-ডিরেক্টর মমিন মৃধা।
তোমাদের নায়িকা গেছে?
ম্যাম তো এগারোটায় সেটে গেছে।
ও! সুটিং কেমন হচ্ছে?
খুব ভালো হচ্ছে। মনে হচ্ছে সময়ের আগেই আমরা সুটিং শেষ করতে পারবো।
তাই নাকি?
জবাবের অপেক্ষা না করে বাইরে চলে যায় অনাবিল। বৃষ্টির তোড় বাড়ছে, দ্রুত উঠে আসে ছাদে। বৃষ্টির মধ্যে নিজেকে ভাসিয়ে দিতে দিতে সুইমিং পুলে পা দুলিয়ে বসে বসে বৃষ্টি মাখছে। নিজেকে মনে হচ্ছে সম্রাট, প্রেমের। প্রেম একটা খুব দরকার ছিল, দুই-একজনের সঙ্গে সঙ্গত করতে যে চেষ্টা করেনি, করেছে কিন্তু জমছিল না। কিন্তু সেই প্রেমটা জমে ক্ষীর হয়ে যাবে মাত্রা মধুরিমার সঙ্গে… কী করে সম্ভব হলো? এটা কী মাত্রার ক্ষণিকের কোনো মোহ? জালে আটকে ফেলে খেলা খেলবে? কিন্তু কেন? আমার সঙ্গে ওর সঙ্গে তো শত্রুতা নেই। জীবনে প্রথম দেখা।
দু’দিকে দুহাত ছড়িয়ে দিয়ে ঝাপ দেয় সুইমিং পুলে। গলা পর্যন্ত পানি। হালকা সাঁতার কাটে, কিন্তু মাথা থেকে গতরাতের লীলা তো যাচ্ছে না। চোখের তারায়, শরীরের কোষে কোষে তীব্র স্রোতে ভেসে আসছে অসীম তরঙ্গে মাত্রার শরীর মন্থনের সুখ! বৃষ্টির তোড় প্রবলভাবে বাড়ছে, বৃষ্টি পাগল অনাবিল সুইমিং পুলের মধ্যে আবার সাঁতার কাটতে থাকে। পানির মধ্যে বৃষ্টির শব্দ অনুভব করবার জন্য ডুব দেয় পানির মধ্যে। কান পেতে শোনে, পানির ওপর ঝরে পড়া বৃষ্টির শব্দ, মর্মর মর্মর নিবিড় শব্দে বৃষ্টির শব্দে ফিরে যায় শৈশবে। পুকুরে, খালে কতবার ডুব দিয়ে বৃষ্টির ঝর ঝর ঝর শব্দ শুনেছে, আবার কতদিন পর… স্মৃতির সুখপাখি বুকের মধ্যে নিয়ে পানির ওপর জেগে ওঠে অনাবিল। বৃষ্টি প্লাবিত চোখের সামনে দাঁড়িয়ে অপূর্ব এক পাখি, পাখির শরীরে সবুজ শাড়ি। হাতে ছাতা। মুখে সুটিংয়ের মেকাপ। মুখে কৌতুকমাখা আনন্দ, দৃষ্টিতে সমুদ্রের উচ্ছাস। পুলের কাছে আসে অনাবিল, তুমি?
বৃষ্টিতে ভিজছো সেই কখন থেকে, যদি জ্বর আসে? গলায় একটু শাসনের সুর।
আমার জ্বর আসবে না।
কেন?
বৃষ্টির সঙ্গে আমার চুক্তি আছে।
আপনি বৃষ্টির দেবতা?
জি, আমি বৃষ্টির দেবতা। তুমি ভিজবে, এসো।
না, বৃষ্টিতে একটু ভিজলেই আমার জ্বর আসে। তুমি উঠে এসো, খিদে পেয়েছে…
আসছি, দ্রুত উঠে আসে অনাবিল। মাথা ভরা চুল চুইয়ে বৃষ্টি নামছে। তোমাকে জড়িয়ে ধরি?
আমারই জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করছে কিন্তু বললাম যে, বৃষ্টি আমাকে কষ্ট দেয়। তার ওপর সুট্যিং আছে।
ঠিক আছে, চলো।
সিঁড়ির দিকে যেতে যেতে হাতের ছাতা বাড়িয়ে ধরে অনাবিলের দিকে, ভিজছো কেন অনু? ছাতার মধ্যে আসো।
থমকে দাঁড়ায়, মাত্রা আমাকে অনু ডাকছে! অনাবিল থেকে অনু? সত্যি মেয়েটা আমাকে ভালোবেসেছে। থমকে দাঁড়ানোয় মাত্রা হাসে, তোমাকে আমি অনু ডাকবো। তোমার জামা কাপড় কোথায়?
ব্যাগে, আমার রুমে।
তুমি এখানে দাঁড়াও, আমি নিয়ে আসছি। দ্রুত পায়ে নিচের দিকে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায় মাত্রা।
শোনো।
পেছনে ফিরে তাকায় মাত্রা, কী?
মাত্রার সবুজ শাড়ির অনেকটাই বৃষ্টিতে ভেজা। ঘাড়ের ওপর কয়েক ফোঁটা বৃষ্টি জোনাক পাখির মতো জ্বলছে। অনাবিল এগিয়ে গিয়ে ফোঁটাগুলো চুক চুক শব্দে খেয়ে নিয়ে তাকায় ঘুরে, তুমি যে আমার জামাকাপড় আনবে, সবাই তো দেখবে।
দেখলে?
দেখলে তোমার ক্ষতি হবে মাত্রা। মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়বে, অনাবিল আনন্দের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে মাত্রা মধুরিমা।
ছড়িয়ে পড়লে?
তোমার ক্যারিয়ারের সমস্যা হতে পারে।
এক মুহূর্ত ভাবে মাত্রা, আমার ক্যারিয়ারের সমস্যা হলে হোক, তোমার কোনো সমস্যা হবে না তো?
পারিবারিকভাবে তো হবেই, কিন্তু আমি সবকিছু প্রতিরোধ করার জন্য প্রস্তুত। আমি মাত্রার সঙ্গেই থাকবো।
জুঁই ফুলের মিষ্টি হাসি ফোটে মাত্রার ঠোটে, বৃষ্টির মধ্যে এগিয়ে এসে আচমকা জড়িয়ে ধরে ঠোটে চুমু খায়, আর কী চাই সোনা? আমি তো সব পেয়েছি। আর ডিরেক্টরকে বলেছি, অনাবিলকে ছেড়ে দিয়ে অর্ধেক ভেজা হয়ে সিঁড়ির দিকে নামতে নামতে বলে।
ডিরেক্টরকে কী বলেছ?
তোমার ঘরে আমার খাবার দিতে…। ভেজা ছাতা হাতে দ্রুত নেমে যায় মাত্রা মধুরিমা। ভেজা শরীরে ছাদের ওপর সিঁড়ির গোড়ায় দাঁড়ায়। বুঝতে পারছে অনাবিল, মাত্রা ভালোবাসার যাত্রায় বেপোরোয়া হয়ে উঠছে। সব কিছুর জন্য প্রস্তুত ও। কেন আমার মতো একজন অসফল মানুষকে নিয়ে বাজি ধরছে? আমি তো জানি, ও বিবাহিত। সম্পর্ক নেই স্বামীর সঙ্গে। আলাদা থাকছে বছর দুয়েক ধরে। কিন্তু আমার তো সংসার আছে। সংসার ছেড়ে আমি আসতে পারবো না। কী হবে এই সম্পর্কের?
চলবে…
অঙ্গার ॥ পর্ব-০৮ ॥ মনি হায়দার

