মানবজাতির ইতিহাস মূলত এক দীর্ঘতম নির্বাসনের ইতিহাস। স্বর্গের সুনিশ্চিত নিরাপত্তা ও অনন্ত সুখ থেকে মর্ত্যের কোলাহল, সংশয় আর মৃত্যুভয়ের পৃথিবীতে ছিটকে পড়ার যে আখ্যান, তা যুগে যুগে সাহিত্য, দর্শন ও শিল্পের অন্যতম প্রধান উপজীব্য। ব্রিটিশ কবি জন মিল্টন তাঁর মহাকাব্যিক রচনা ‘প্যারাডাইস লস্ট’-এ এই স্বর্গচ্যুতির আখ্যানকে এক অসামান্য দার্শনিক রূপ দিয়েছিলেন। মিল্টনের সেই মহাকাব্যে আদি পিতা আদম ও মাতা ইভের পতন কেবল ঐশী অবাধ্যতা ছিল না, তা ছিল এক অর্থে ‘মানুষ’ হয়ে ওঠার সূচনা। যেখানে যুক্ত হয় স্বাধীন ইচ্ছা, প্রেম, এবং অবশ্যম্ভাবী বিষাদ।
এই একই সমান্তরালে সম্পূর্ণ নিজস্ব এক কাব্যিক স্বর নিয়ে কবি কবীর আলমগীর, হাজির হয়েছেন ‘আদমের দুঃখগুলো’ কাব্যগ্রন্থে। বইটি যেন প্যারাডাইস লস্ট-এর এক আধুনিক, মনস্তাত্ত্বিক ও উত্তর-ঔপনিবেশিক পাঠ। তবে এখানে কোনো মহাকাব্যিক আড়ম্বর নেই, আছে পৃথিবীতে প্রথম মানুষের পদার্পণের পর জন্ম নেওয়া এক গভীর, নীরব ও অস্তিত্ববাদী হাহাকার।
স্বর্গ থেকে নামার পর আদমের সবচেয়ে বড় কষ্ট কী ছিল? ঐশ্বর্যমহিমা হারিয়ে ফেলা, নাকি একা হয়ে যাওয়া? কবীর আলমগীর তাঁর নতুন কবিতার বইয়ে বেছে নিয়েছেন দ্বিতীয় উত্তরটা। আদমের দুঃখগুলো তাই ধর্মগ্রন্থের পুনর্কথন নয়। বইয়ে পঞ্চাশটির বেশি কবিতা। শুরু ‘জিকির হোক তোমার নামে’ দিয়ে, শেষ ‘শুধু সন্ধ্যা নামে’-তে। মাঝখানে প্রেম, বিরহ, প্রার্থনা, যুদ্ধ, মৃত্যু আর বাবার স্মৃতি। বিষয় নানা রকম, কিন্তু সুরটা এক: মানুষ একা।
এই কবিতার শুরুটাই বইয়ের সেরা অংশগুলোর একটি। ‘আদমের দুঃখগুলো খুব চুপচাপ/তোলে না স্লোগান, আর হাঁটে না মিছিলে/বরং সন্ধ্যার মতো ধীরে তার কাঁধে বসে।’ দুঃখকে সন্ধ্যার সঙ্গে মেলানো সহজ নয়। অথচ পড়লে মনে হয়, ঠিকই তো, দুঃখ আসলে হইচই করতে করতে আসে না।
পরে কবি নিষিদ্ধ ফলের গল্পও অন্যভাবে পড়েন: ‘স্বর্গের আপেল ছিল না শুধু ফল / আপেলটি রহস্যকে জানার সাহস।’ এই পাঠে আদমের অপরাধ কৌতূহল, আর তার শাস্তি নিঃসঙ্গতা। মানুষ হয়ে ওঠার দাম হিসেবে একাকিত্ব, দর্শনের পাঠকের কাছে কথাটা চেনা, কিন্তু কবিতায় এমন সরল করে বলা চোখে পড়ার মতো।
ফরাসি দার্শনিক জঁ-পল সার্ত্র কিংবা আলবেয়ার কামুর অস্তিত্ববাদ আমাদের শেখায়, মানুষ এই পৃথিবীতে স্বাধীন হিসেবে নিক্ষিপ্ত হয়েছে এবং এই স্বাধীনতা আসলে এক ধরনের দণ্ড। কারণ, এর ফলে সৃষ্টি হয় এক ভয়ংকর অর্থহীনতা ও নিঃসঙ্গতা। কবীর আলমগীরের কবিতাজুড়ে এই অস্তিত্ববাদী সংকটের ছায়া প্রবল। ‘আদমের দুঃখগুলো’ কবিতায় কবি মানবজীবনের এই নিঃসঙ্গতাকে চিত্রিত করেছেন দারুণ মুন্সিয়ানায়: ‘মাটির গন্ধে জন্মানো নাদান মানুষ/মাটির কাছেই বড় বেশি একা-একা…স্বর্গ ফেরত আদম জেগে থাকে একা/বড় একা।’
এই যে ‘একা’ জেগে থাকা, এটি আসলে আধুনিক মানুষেরই প্রতিচ্ছবি। চারপাশের কোলাহলে, ভিড়ের ভেতর মানুষ আসলে অনন্তকাল ধরে একা। এই একাকিত্ব এতটাই প্রখর যে, একসময় মানুষ একেই ভালোবেসে ফেলে, একেই তার পরম আরাধ্য মনে হয়। ‘নিঃসঙ্গতা দাও প্রভু’ কবিতায় কবির প্রার্থনা তাই অস্তিত্বগামী এক চরম স্বীকারোক্তি: ‘তবে আমি খুঁজতাম পৃথিবীর/সবচেয়ে সুন্দর জিনিসটি/পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর জিনিস/সে নিঃসঙ্গতা।’
পুরোনো গল্প নতুন করে বলার চেষ্টা আরও কয়েকটি কবিতায় আছে। ঈশ্বর শূন্যতা ছুঁয়ে বেরিয়ে এলেন-এ স্রষ্টা নিজেই একা: ‘আমি একা- আমি একটি পৃথিবী তৈরি করব।’ অর্থাৎ সৃষ্টির শুরুই একাকিত্ব থেকে, আর মানুষের নিঃসঙ্গতা সেই ধারারই অংশ।
হাওয়ার শরীর কিংবা গন্ধম-এ হাওয়া আর কবিতা মিলেমিশে যায়। ‘আদম স্বর্গ নয়, হাওয়ার ভেতর খুঁজেছিল কবিতা।’ ‘হাওয়া’ শব্দের দুই অর্থ, ইভ ও বাতাস, কবি বারবার কাজে লাগিয়েছেন। আদমের সন্তান-এ লেখেন, ‘হাওয়ার শোকেই, বিরহগুলো হাওয়াতে ওড়াই।’
বইয়ের বড় একটা অংশ প্রার্থনার ঢঙে লেখা। সেই প্রার্থনা বিনীত, কিন্তু প্রশ্নহীন নয়। নত হও প্রার্থনায় মানুষ ঘুড়ির মতো ওড়ে, আর দুঃখের নাটাই ঈশ্বরের হাতে। কবি প্রশ্ন তোলেন, দুঃখগুলো তো তিনি মুছে দিতে পারতেন। তবু শেষে ভরসাও আছে: ‘হাওয়ার আঁচল দিয়ে তিনি মুছে দেবেন দুঃখগুলো।’ দাও উপহার-এ কবি নিজের পরিচয় দেন, ‘আমি ফেরেশতা নই, মানুষই আমি’, আর চান একটা কলম, যার কালির ভেতর গুটিয়ে দেওয়া যাবে আদমের দুঃখগুলো। কলমটা আসলে কবিতা লেখারই রূপক। নিঃশব্দে হেঁটেছো প্রভু-র আবদার আরও ঘরোয়া, আরও নিকটতম: ‘হে প্রভু দয়াময় একবার এসে বসো এই কাঙালের উঠানে।’
প্রেমের কবিতায় কবি ভক্তির ভাষা ধার করেন, প্রিয়জনের নাম সেখানে ঈশ্বরের নামের জায়গা নেয়। মৃত্যুর আগে-তে দরজায় যমদূত দাঁড়িয়ে, তবু মৃত্যুর মুখেও জেগে থাকে ‘কালেমার পরিবর্তে কেবল তোমার নাম প্রিয়।’ রাধা-কৃষ্ণ-তে ভুল থেকেই ফুল ফোটে: ‘কী ভুল করিল রাধা, করলো কী যে ভুল! / সেই ভুলেতে জন্ম নিলো প্রেমকাননের ফুল।’
তবে বইটা শুধু ব্যক্তিগত দুঃখের নয়, কবি চারপাশের পৃথিবীর দিকেও তাকিয়েছেন। ভাগাড়-এ হারানো মেরুদণ্ড খুঁজতে গিয়ে তিনি পান ‘সাংবাদিকের প্যান্ট-জুতা, বুদ্ধিজীবীদের চোখ, কবির কবিতা, গেরিলা সৈনিকের বন্দুক।’ কয়েকটি লাইনে একটা সময়ের ছবি ধরা পড়ে। মানুষ মরছে-তে ফিলিস্তিন ‘যেন এক বারুদ জমানো বোমার নাম’। মরিয়মের প্রতি কবিতায় যুদ্ধের ক্ষুধায় মরছে ‘একেকটি যিশু’। নদীর নাম বিপুল চাকমা-য় আছে পাহাড়ের মানুষের অধিকারের স্লোগান।
বইয়ের সবচেয়ে ব্যক্তিগত জায়গা শুরুতে আর শেষের দিকে। উৎসর্গপত্রে কবি পিতার কণ্ঠে রামিসাকে ডাকেন, আর শেষ করেন এই লাইনে: ‘তোমার কপালে এঁকে দিচ্ছে পিতা আদমের চুম্বন।’ বাবার সাইকেল-এ সন্তানের চোখে বাবার সাইকেলের রং মেটে হয়ে যায়, আর একটা প্রশ্ন কখনো করা হয় না: ‘কখনো জানা হয়নি, বাবা তোমার দুঃখ কিসের?’ আদম আদি পিতা, তাই এই না-করা প্রশ্ন যেন সব বাবা-সন্তানের মধ্যেই থেকে যায়।
‘আদমের দুঃখগুলো’ কবিতার বইয়ের ভাষা সহজ, মুখের কথার কাছাকাছি। কবি কোনো একক ধর্মের গণ্ডিতে আটকে থাকেননি, সব ধর্মের কিসসাকেই, সব সভ্যতার মিথগুলোকে মানুষের দুঃখ বলার ভাষা করে নিয়েছেন।
সব কবিতা অবশ্য সমান জোরালো নয়। নাম-কবিতায় কবি নিজেই বলেছেন, আদমের দুঃখ স্লোগান তোলে না। অথচ জল্লাদ মিসাইল বা হত্যার দিনলিপির মতো লেখায় প্রতিবাদ কখনো কখনো স্লোগানের মতো জোরালো হয়ে ওঠে। আবার আহ্বান, জোয়ার বা হারানো পাখিরা গানের কথার মতো হালকা ঠেকে। পাখি, হাওয়া, নদী, ঘুম, এই প্রতীকগুলো এত ঘুরেফিরে আসে যে এক বসায় পড়লে কবিতাগুলো কিছুটা মিশে যায়। আদমের ভাবনা বারো-তেরোটি কবিতায় বেশ শক্ত, বাকিগুলোতে সেটা ঢিলেঢালা ছাতার মতো। বাছাই আরেকটু কড়া হলে বইটি আরও ঘন হতো।
তবু বইটি পাঠকের মনে থেকে যায়। শেষ কবিতা শুধু সন্ধ্যা নামে-তে জীবন নদীর বুকে ভেসে থাকা নৌকা, আর ‘আমরা শুধু নাম লিখে যাই /মুছে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকা দেয়ালে।’ এই বইয়ে কবীর আলমগীর শুধু দেখিয়েছেন মানুষ কতটা একা। সেটুকু বলার জন্য তিনি বেছে নিয়েছেন খুব নিচু, অস্ফুট স্বর। আর সেই উপলব্ধির বারতাই এই বইয়ের সারকথা।

