সাহিত্যিকের কলম কখনো সমাজের নিখুঁত দর্পণ, কখনো বা একান্ত নিজস্ব অনুভবের একাকী উদ্যাপন। নাহিদা আশরাফী মূলত কবি, কথাসাহিত্যিক ও সাহিত্যের নিবেদিতপ্রাণ সম্পাদক। ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর লেখকের মননে রয়েছে বিশ্বসাহিত্যের এক বিস্তৃত ক্যানভাস। তার রচিত প্রবন্ধ সংকলন ‘নীরবতার নোটবুক’ মূলত একটি বহুমাত্রিক চিন্তার আধার। জীবনদর্শন, কবিতার ব্যবচ্ছেদ, পুরাণের রহস্য, সমাজবাস্তবতা এবং সাহিত্যের গঠনশৈলী—সবকিছুই এই গ্রন্থে স্থান পেয়েছে সুনিপুণ বিন্যাসে। প্রবন্ধের মতো একটি গুরুগম্ভীর শাখায় তিনি সৃজনশীলতার সমন্বয় ঘটিয়েছেন।
ভাবনার করিডোর ও সৃজনের দায়বদ্ধতা
বইটির একেবারে সূচনালগ্নে ‘পঞ্চবটীর ছায়ায় খুঁজি অক্ষত অক্ষর’ প্রবন্ধে লেখক তাঁর লেখালেখির পেছনের দর্শন উন্মোচন করেছেন। তাঁর মতে, ভাবনাগুলো স্বাধীনচেতা, বাউন্ডুলে কিশোরের মতো। আলোকে চার দেয়ালে বন্দি করা সম্ভব নয়, একইভাবে মানুষের অবচেতন মনকেও শেকল পরানো যায় না। লেখকের কাছে লেখালেখি কেবলই শখের বশবর্তী কোনো কাজ নয়; এটি তার আত্মার প্রশান্তির মাধ্যম।
তিনি প্রকৃতিকে নিজের একমাত্র শিক্ষাগুরু হিসেবে মেনেছেন। জেলের মাছ ধরার দৃশ্যে তাঁর মন একই সাথে জেলের প্রাপ্তিতে আনন্দিত হয়, আবার মাছের মৃত্যুতে বিষাদগ্রস্ত হয়ে পড়ে। এই দ্বান্দ্বিক অনুভূতিই একজন প্রকৃত স্রষ্টার মূল পুঁজি। সমাজে ঘটে যাওয়া নানা অসঙ্গতি, মানুষের বুকপকেটে জমে থাকা অভিমান এবং হারানোর বেদনাকে তিনি শব্দের পর শব্দ সাজিয়ে মূর্ত করতে চান। ইংমার বার্গম্যানের ‘উইন্টার লাইট’ চলচ্চিত্রের প্রসঙ্গ টেনে তিনি ফ্রাঁসোয়া ত্রুফোর একটি বিখ্যাত উক্তি স্মরণ করেছেন। প্রেক্ষাগৃহে দর্শক থাকুক বা না থাকুক, নির্মাতাকে তার সৃষ্টি অব্যাহত রাখতে হবে। নাহিদা আশরাফীও ঠিক একই দর্শনে বিশ্বাসী। পাঠক তাঁর লেখা পড়বে কি পড়বে না, তা নিয়ে তাঁর কোনো আক্ষেপ নেই। তিনি কেবল মহাকালের কাছে নিজের অনুভবটুকু রেখে যেতে চান। এই নির্লিপ্ততা এবং শিল্পের প্রতি বিশুদ্ধ প্রেম তাঁর প্রবন্ধের পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে।
আধুনিকতার স্বরূপ ও দশকের বন্দিদশা
গ্রন্থে কবিতার সমালোচনা এবং ইতিহাস নিয়ে অত্যন্ত জ্ঞানগর্ভ আলোচনা স্থান পেয়েছে। ‘বিশ শতকের বাংলা কবিতায় আধুনিকতা’ প্রবন্ধে তিনি আধুনিকতার প্রকৃত সংজ্ঞা খোঁজার চেষ্টা করেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘আধুনিক কাব্য’ প্রবন্ধে বলেছিলেন, আধুনিকতা সময়ের ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং এটি একটি মর্জি বা ভাবের বিষয়। নাহিদা আশরাফী এই মতকে সমর্থন করে দেখিয়েছেন, কালানুক্রমিক হিসেবে নয়, বরং চিন্তার অগ্রগামিতায় জীবনানন্দ দাশ বা বুদ্ধদেব বসুরা আধুনিক।
বিশ শতকের শুরুতে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, রুশ বিপ্লব এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা মানুষের মনোজগতে এক বিশাল পরিবর্তন আনে। সিগমুন্ড ফ্রয়েডের মনস্তাত্ত্বিক তত্ত্ব এবং চার্লস ডারউইনের বিবর্তনবাদ পূর্ববর্তী রোমান্টিক ধারণাকে ভেঙে চুরমার করে দেয়। শার্ল বোদলেয়ারের ‘লে ফ্ল্যুর-দ্যু-মাল’ থেকে শুরু হওয়া আধুনিকতার যে হাওয়া ইউরোপ থেকে বাংলায় প্রবেশ করেছিল, তা কল্লোল, কালিকলম ও পরিচয় পত্রিকার হাত ধরে এক নতুন মাত্রা পায়। লেখকের এই ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ অত্যন্ত নিখুঁত এবং তথ্যবহুল।
পরবর্তী ধাপে ‘নব্বইয়ের কবিতা: দশকে নিমগ্ন চেতনা নাকি নিমগ্ন চেতনার দশক’ প্রবন্ধে তিনি বাংলা কবিতায় ‘দশকওয়ারি’ বিভাজনের কঠোর সমালোচনা করেছেন। শিল্পকে নির্দিষ্ট দশকে বন্দি করা কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন। খোন্দকার আশরাফ হোসেনের একটি চমৎকার রূপক তিনি ব্যবহার করেছেন, যেখানে দশকগুলোকে একেকটি বাসের সাথে তুলনা করা হয়েছে। ভিড় এড়িয়ে ফাঁকা বাসে ওঠার এই প্রবণতা মূলত কবিদের সস্তা জনপ্রিয়তার দৌড়কেই ইঙ্গিত করে।
নব্বইয়ের দশকের কবিতায় মিথের ব্যবহার, নাগরিক বিচ্ছিন্নতা এবং প্রযুক্তি নির্ভরতার মতো বৈশিষ্ট্যগুলো উঠে এলেও, লেখক অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে সমসাময়িক সাহিত্যিক রাজনীতির দিকে আঙুল তুলেছেন। কিছু চাটুকার ও সুবিধাভোগী কবির ‘গুরুবাজি’ এবং ‘দলবাজি’র কারণে প্রকৃত কবিতা কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তা তিনি স্পষ্ট ভাষায় ব্যক্ত করেছেন। তোষামোদের মাধ্যমে গড়ে ওঠা এই সাহিত্যিক বলয় সাহিত্যের মূল প্রাণশক্তিকে শুষে নেয়। বিজ্ঞাপনধর্মী এবং অসুস্থচর্চার ভিড়ে আলফ্রেড খোকন বা শামীম রেজার মতো কবিরা যখন জীবনের সোঁদা মাটির গন্ধ কবিতায় তুলে আনেন, তখন লেখক তাদের পঙ্ক্তিগুলো উদ্ধৃত করে আশার আলো দেখিয়েছেন। এই প্রবন্ধে লেখকের সমালোচক সত্তা অত্যন্ত প্রখর এবং আপসহীন।
স্লাভিক মিথোলজির অন্তরালে
‘রাশিয়ান মিথ ও স্লাভিক ধর্মচর্চা- এক রহস্যময় ও অনাবিষ্কৃত অধ্যায়’ নামক প্রবন্ধটি পাঠকের জন্য সম্পূর্ণ ভিন্ন স্বাদের এক বৌদ্ধিক খোরাক। মিথ বা পুরাণ নিয়ে জোসেফ জন ক্যাম্পবেলের বিখ্যাত উক্তিটি এখানে প্রণিধানযোগ্য: ‘Myths are public dreams, dreams are private myths.’ সংস্কৃতি বিজ্ঞানীরা পুরাণকে ১৪টি ভিন্ন ক্যাটাগরিতে ভাগ করেছেন, যার মধ্যে জগৎ সৃষ্টি, দেব-দানবের দ্বন্দ্ব, স্বর্গ-নরক ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।
গ্রিক বা রোমান মিথোলজি নিয়ে আমাদের সমাজে প্রচুর চর্চা থাকলেও স্লাভিক পুরাণ প্রায় অনালোচিতই রয়ে গেছে। নাহিদা আশরাফী এই অজানা জগৎটিকে অত্যন্ত সাবলীল ভাষায় পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন। আনুষ্ঠানিক খ্রিষ্টধর্ম প্রচারের বহু আগে রাশিয়ায় প্রকৃতি পূজার প্রচলন ছিল। সভারগ (স্বর্গের দেবতা), পেরুন (যুদ্ধের দেবতা), লেয়াশিহ (বনের দেবতা)-এর মতো চরিত্রগুলো সেসময় সাধারণ মানুষের বিশ্বাসে মিশে ছিল। স্লাভিকরা বদ্ধ কোনো উপাসনালয়ে বিশ্বাসী ছিল না; তারা উন্মুক্ত স্থানে প্রকৃতির মাঝে আরাধনা করতো।
দুঃখজনক বিষয় হলো, জোরপূর্বক খ্রিষ্টধর্ম চাপিয়ে দেওয়ার সময় এই প্রাচীন স্লাভিক সংস্কৃতি ও তাদের উপাসনালয়গুলো ধ্বংস করে দেওয়া হয়। ইতিহাসের এই নির্মম সত্যটিকে লেখক অত্যন্ত দরদের সাথে উপস্থাপন করেছেন। ৮৬২ খ্রিষ্টাব্দে প্রিন্স রুরিকের শাসনামল থেকে শুরু করে স্লাভিক রাজবংশের বিলুপ্তি পর্যন্ত একটি সংক্ষিপ্ত অথচ তথ্যবহুল ঐতিহাসিক রূপরেখা এই প্রবন্ধে পাওয়া যায়। ভিন্ন সংস্কৃতির ইতিহাসকে বাংলা ভাষায় এমন সহজবোধ্য করে উপস্থাপন লেখকের গবেষণাধর্মী মননের পরিচয় বহন করে।
ভাষার সংকট ও প্রতিবাদের ব্যাকরণ
সাহিত্যের গণ্ডি পেরিয়ে লেখক নজর দিয়েছেন রাষ্ট্রকাঠামো এবং সমাজের দিকে। ‘আইনচর্চায় বাংলা ভাষা প্রয়োগে সংকট ও সম্ভাবনা’ প্রবন্ধে তিনি যৌক্তিক একটি সংকটের কথা তুলে ধরেছেন। যে দেশ মাতৃভাষার জন্য রক্ত দিয়েছে, সেই দেশের উচ্চ আদালতে আজও ইংরেজি ভাষার নিরঙ্কুশ আধিপত্য। সাধারণ মানুষ, বিচারপ্রার্থী হয়ে আদালতে এলে ভাষাগত দূরত্বের কারণে নিজের অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার এক নীরব মানসিক চাপে ভোগেন।
লেখক এখানে ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে বিচারব্যবস্থার ঐতিহাসিক পটভূমি বর্ণনা করেছেন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনামল, ১৮৬১ সালের ইন্ডিয়ান হাইকোর্ট অ্যাক্ট, ১৯৪৭ সালের ফেডারেল কোর্ট এবং ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পর বিচারব্যবস্থার বিবর্তন—সবকিছুই তিনি বস্তুনিষ্ঠভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। বর্তমানে দেশে প্রায় ৭৪০টি আইন এবং ৫০৭টি অধ্যাদেশ প্রচলিত আছে। নিম্ন আদালতে বাংলার ব্যবহার কিছুটা বাড়লেও উচ্চ আদালতে এর প্রয়োগ আজও প্রান্তিক পর্যায়ে। ঔপনিবেশিক মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে বিচারব্যবস্থাকে সর্বসাধারণের বোধগম্য করার এই জোরালো দাবি প্রবন্ধটিকে এক অনন্য মাত্রা দিয়েছে।
অন্যদিকে, ‘প্রতিবাদের ভাষা- সুবোধরা আর কত পালাবে?’ প্রবন্ধে প্রতিবাদের মনস্তত্ত্ব ও বিবর্তন নিয়ে এক অসাধারণ আলোচনা করা হয়েছে। ঢাকার দেয়ালে আঁকা বিখ্যাত গ্রাফিতি ‘সুবোধ তুই পালিয়ে যা’ থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ব্যঙ্গচিত্র, ভিয়েতনাম যুদ্ধের প্রতিবাদে বৌদ্ধ সন্ন্যাসী থিক কোয়াং ডুকের আত্মাহুতি, উগান্ডায় নারীদের নগ্ন প্রতিবাদ কিংবা হালের ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’ আন্দোলন—সবকিছুই তিনি একই সুতোয় গেঁথেছেন।
সময়ের সাথে সাথে প্রতিবাদের রূপ বদলায়। কখনো তা হয় স্লোগানে, কখনো গানে, কখনোবা পোশাকে (যেমন ট্রাম্প বিরোধী গোলাপি টুপি বা জুলাই ছাত্র আন্দোলনে লাল রঙের ব্যবহার)। মানুষের চরম হতাশা যখন দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দেয়, তখন আত্মাহুতির মতো চূড়ান্ত পথ বেছে নেওয়ার মনস্তাত্ত্বিক কারণগুলো ইতিহাসবিদ রালফ ইয়ংয়ের মতামতের ভিত্তিতে লেখক চমৎকারভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। প্রতিবাদের এই বিবিধ রূপ ও ভাষার এমন সমাজতাত্ত্বিক ব্যবচ্ছেদ বাংলা প্রবন্ধে খুব একটা চোখে পড়ে না।
লিটলম্যাগের দ্রোহ
সাহিত্যের রূপতত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে লেখক ছোটগল্প এবং লিটল ম্যাগাজিনের চরিত্র উন্মোচন করেছেন। বারবারা কিংসলভারের মতানুযায়ী, লেখকের উচিত দরজা বন্ধ করে নিজের মনের কথা শোনা, পাঠকের প্রত্যাশার চাপে নিজস্বতা না হারানো। ছোটগল্পের তাত্ত্বিক সংজ্ঞায়নে ব্র্যান্ডার ম্যাথিউজের ‘Unity of time, place and action’-এর প্রসঙ্গ টেনে লেখক দেখিয়েছেন কীভাবে ছোটগল্প তার জন্মলগ্ন থেকে আজকের উত্তর-আধুনিক যুগে এসে বাঁকবদল করেছে।
শাহাদুজ্জামানের ‘মামলার সাক্ষী ময়না পাখি’ বা ‘ক্রাচের কর্নেল’-এর মতো লেখায় উত্তর আধুনিক গল্পের যে নিরীক্ষা এবং লোকগল্পের ফিউশন দেখা যায়, তার দার্শনিক ভিত্তি তিনি গিলে দেলেউজের তত্ত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করেছেন। জীবনানন্দের নৈরাশ্যবাদী দর্শনের বিপরীতে শাহাদুজ্জামানের রাজনৈতিক সাহসিকতার তুলনামূলক আলোচনাটি অত্যন্ত প্রশংসনীয়। একইসাথে আকিমুন রহমানের ‘রক্তপুঁজে গেঁথে যাওয়া মাছি’ উপন্যাসে জার্মান ‘Bildungsroman’ (চরিত্রের নৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক বিকাশের ধারা) উপাদানের ব্যবহার সাহিত্যের ছাত্র ও সমালোচকদের জন্য একটি নতুন ভাবনার দুয়ার খুলে দেয়।
গ্রন্থের অন্যতম শক্তিশালী প্রবন্ধ হলো ‘লিটল ম্যাগাজিনের সক্ষমতা ও অক্ষমতার দ্বন্দ্ব’। বড় বড় কর্পোরেট হাউস বা এস্টাবলিশমেন্টের বিপরীতে লিটল ম্যাগাজিন সবসময়ই এক বিদ্রোহী চেতনার প্রতীক। লেখক তীব্র ভাষায় সমালোচনা করেছেন সেইসব ভাঁড়ামিপূর্ণ সাহিত্য পত্রিকার, বিজ্ঞাপন আর দলবাজির জোরে সাহিত্যাঙ্গন কলুষিত করে রাখে। এদের বিপরীতে লিটলম্যাগ হলো আবদুল মান্নান সৈয়দের ভাষায়—‘জঙ্গলের মধ্য দিয়ে একটি ব্যক্তিগত সুঁড়িপথ’।
লিটল ম্যাগাজিন জন্মলগ্ন থেকেই বুর্জোয়া মানসিকতার বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। এটি জনপ্রিয়তার সস্তা পেছনে দৌড়ায় না। বুদ্ধদেব বসুর ভাষায়, লিটল ম্যাগাজিন মন জোগাতে চায় না, মনকে জাগাতে চায়। আর্থিক দৈন্য এবং প্রচারের অভাবে হয়তো অনেক লিটলম্যাগ অকালেই গুটিয়ে যায়, তবুও তোষামোদের রৌদ্রে ঝলসে যাওয়ার চেয়ে এই অক্ষমতার মৃত্যুতেই তারা প্রকৃত শান্তি খুঁজে পায়। প্রতিষ্ঠানের কাছে মাথা নত না করে সত্য ও সৃজনের এই আপসহীন জয়গান লেখকের নিজস্ব সাহিত্যিক আদর্শেরই প্রতিফলন।
নাহিদা আশরাফীর গদ্যরীতি প্রাঞ্জল, মেদহীন এবং গতিশীল। প্রবন্ধের মতো শুষ্ক বিষয়েও তার বাক্যবিন্যাসে এক ধরনের কাব্যিক মায়া জড়িয়ে থাকে। কঠিন দার্শনিক বা মনস্তাত্ত্বিক তত্ত্ব (যেমন ফ্রয়েড বা দেলেউজের দর্শন) তিনি এমন সহজ উপমায় বুঝিয়েছেন, সাধারণ পাঠকের তা বুঝতে কোনো বেগ পেতে হয় না।
লেখকের সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা হলো তার বিস্তৃত পড়াশোনা এবং ক্রস-রেফারেন্স টানার ক্ষমতা। গ্রন্থটিতে কোনো অতিকথন নেই। প্রতিটি প্রবন্ধের একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য রয়েছে। সমালোচনার ক্ষেত্রে তিনি যেমন নির্ভীক, তেমনি ইতিহাস বর্ণনায় তিনি সম্পূর্ণ নৈর্ব্যক্তিক। নব্বইয়ের দশকের সাহিত্যিক গোষ্ঠীবদ্ধতা নিয়ে তাঁর সাহসী উচ্চারণ প্রমাণ করে, তিনি সত্যনিষ্ঠা এবং সাহিত্যের প্রতি দায়বদ্ধ।
‘নীরবতার নোটবুক’ কেবল কয়েকটি প্রবন্ধের সমষ্টি নয়; এটি একজন চিন্তাশীল, সমাজসচেতন এবং সংবেদনশীল লেখকের মস্তিষ্কের মানচিত্র। যারা গতানুগতিক ধারার বাইরে গিয়ে সাহিত্য, সমাজ, ইতিহাস এবং পুরাণের এক বুদ্ধিবৃত্তিক সংশ্লেষ খুঁজছেন, এই বইটি তাদের জন্য। সাহিত্যের গভীরে প্রোথিত শেকড় সন্ধানে এবং পাঠকের চিন্তার জড়তা ভাঙতে এই গ্রন্থ নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন।

