বাংলা ভাষার একজন অনন্য কবিকে পাঠকের দিকে উসকে দেওয়ার জন্যেই আমার এই লেখা। এটি কোনো পরিপূর্ণ লেখা নয়, লেখার ভূমিকা মাত্র।
কবি মোহাম্মদ নূরুল হক, অনেকের কাছেই তেমন একটা পরিচিত নন। তার কারণ, তাকে কোনো প্রচারের মঞ্চেই পাঠক-শ্রোতা খুঁজে পান না। এই মিডিয়া ও প্রচারসর্বস্বতার যুগে আড়ালে থাকা ভীষণ কঠিন হলেও, এমনকী নিজে মিডিয়ার সঙ্গে সংযুক্ত থাকার পরেও মোহাম্মদ নূরুল হক তার কবিতাকে পাঠকের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছেন বলে অভিযোগ করতে পারি। যদিও আমি বিশ্বাস করি, নতুন কবিতা এবং প্রকৃত কবিতা নিজেই নিজেকে বয়ান করে; তার জন্য কোনো ব্যাখ্যা-টীকার দরকার পড়ে না। কিন্তু সেটি তো পাঠকের নজরে আসতে হবে! এই কাজটি তো কবির নয়। আলোচকের। কিন্তু দুর্ভাগ্য এই জাতির যে, বাংলাভাষায় যত কবি,তার তুলনায় আলোচকের সংখ্যা নিতান্তই উদ্বেগজনকভাবে কম।
মোহাম্মদ নূরুল হক একজন কবি, গল্পকার, প্রাবন্ধিক, সাংবাদিক। একসময় লিটল ম্যাগাজিন করেছিলেন। তার গদ্য-প্রবন্ধের বইয়ের সংখ্যাও কম নয়। আকারে ও সংখ্যায় সেগুলো কবিতাকে ছাড়িয়ে গেছে, কিন্তু গুণগত দিক থেকে গুরুত্ব বিচারে আমি তার কবিতার পক্ষেই রায় দেবো। যদিও অন্য দিকগুলোও কম ওজনদার নয়।
বেশ ক’বছর আগে আমি তাঁর কাব্যগ্রন্থ ‘মাতাল নদীর প্রত্নবিহার’ (২০১০), ‘উপবিকল্প সম্পাদকীয়’ (২০১৬) ও ‘লাল রাত্রির গান’ (২০২১) গ্রন্থ তিনটি পাঠের সুযোগ পাই। এর বাইরে আরও অসংখ্য কবিতা, সাহিত্য সমালোচনা ও নানা বিষয়ে প্রবন্ধ পাঠ করে চলেছি বহু বছর ধরে।
কোনো এক বা একাধিক গ্রন্থ আলোচনার ক্ষেত্রে সমালোচকের সীমাবদ্ধতা অনস্বীকার্য। হতে পারে সেটি তার সময়ের স্বল্পতা, পাঠের অগভীরতা অথবা কম জানা। হতে পারে তার বিশ্লেষণ শক্তির অপর্যাপ্ততা, অদূরদর্শিতা। হয়তো আমিও তার বাইরের নই। কিন্তু একথা নির্দ্বিধায় বলতে পারি,বিগত ৪৪/৪৫ বছর ধরে, অবিরত স্বভাষা-বিভাষার কবিতা ও অন্যান্য সাহিত্য পাঠে বাংলা সাহিত্যের একজন বিদ্যার্থী ও শিক্ষক, একজন কবি-লেখক অথবা একজন সচেতন পাঠক হিসেবে, আমার যে বিবেচনা বোধ, যে ‘দিব্য কান, চোখ অথবা চেতনা’র একটি মন তৈরি হয়েছে, সেটিকে এত সহজেই কেউ তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতে পারবেন না।
মোহাম্মদ নূরুল হকের অনেক কবিতাই আমার প্রিয়। সেই পরিপ্রেক্ষিতে বিচ্ছিন্নভাবে ভালো লাগার কিছু কবিতা আলোচনা করতে চাই। ‘যেভাবে সময় কাটে’ কবিতাটিতে কবির দিন যাপনের গ্লানির চিত্রটি আমাকে বিমর্ষ করে তুলেছে। যদিও জানি যেকোনো ব্যক্তি বিশেষের ক্ষেত্রে দেখার চোখ একমাত্রিক নয়। আবার কোনো অনুষঙ্গও সবকিছু ছাড়িয়ে কোনো একা-একক নয়। যে কারণে ক্ষেত্রবিশেষে ক্ষুদ্রও অক্ষুদ্র, সামান্যও অসামান্য, অসামান্যও তুচ্ছ ক্ষুদ্র। এই যে দেখা ও বোঝার চাতুর্য, ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে এইটির দূরত্ব, পার্থক্য ও সৌন্দর্যানুভূতির নতুন মাত্রা দেওয়াই সমালোচকের কাজ।
শহরের ইট-কাঠের ভেতর কত কত নিঃসঙ্গ মানুষের প্রতিচ্ছবি রয়েছে এই বেদনাদীর্ণ কবিতায় ‘যেভাবে সময় কাটে’! নাগরিক জনজীবনের ব্যস্ততায় ফাঁপা হৃদয়হীন সময়ের হাহাকার কবির একার নয়; এটি এই শহরেরই বোবা আহাজারি। এখানে কত কত মানুষের চুলায় যুগের পর যুগ হাঁড়ি চড়ে না। একজন সাধারণ মানুষ বাজার থেকে ফেরে ঘৃণা নিয়ে! কার ঘৃণা? নিজের, নিজের প্রতি নিজের, সমাজের, শূন্য ব্যাগের হতাশায় স্বপরিবারের। সেই দৃশ্যটি আর তার কার্যকারণ খুঁজলে হতাশা, ক্ষোভ, ব্যর্থতা জাগবে। যে মানুষগুলো নিজেকে সমাজ কারিগরে সাজায়, ফাঁপা সেই মানুষগুলোর ঘৃণা-তাচ্ছিল্যের কী অপূর্ব রূপায়ন এই কবিতা! বাজারের ব্যাগ একটি অর্থনৈতিক ক্ষমতার প্রতীক। হয়তো সম্মানেরও। সেটি যে পথেই অর্জিত হোক, এই মূল্যবোধহীন সমাজ তা বিচার করতে যায় না বা চায় না। কেবল তোয়াজ করে।
কার বাড়িতে কত বছর হাড়ি চড়ে না, সেই খবর তো বহু দূরের বাতচিত, কেউ কারও খবরটুকুও রাখে না! সবাই ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌঁড়োচ্ছে, সবাই বিজ্ঞতার মুখোশ পরে আছে, সবাই নিজের মতো স্বার্থপর ভাবছে অন্যকেও। জীবনানন্দীয় এক হাহাকারব্যাপ্ত এই কবিতায়,
‘আমার রাতেরা নিদ্রাহীন, ঘুম গেছে স্বেচ্ছা নির্বাসনে।
দিনগুলো নির্বান্ধব-দৃষ্টিতে ধূসর দৃশ্য ভেসে ওঠে।
সকালে বাজার থেকে কিনে আনি ব্যাগ ভর্তি ঘৃণা।’
কী ভয়ঙ্কর এই গায়ে কাঁটা দেওয়া উপমা—‘বাজার থেকে কিনে আনি ব্যাগ ভর্তি ঘৃণা।’
এ এক অদ্ভুত শহর! এখানে অসংখ্য বন্ধু থাকে, থাকে সেলফোনজুড়ে অসংখ্য সংযোগ নাম্বার, তবু যোগাযোগ নেই, নেই হৃদয়ের উষ্ণ আলিঙ্গন। অতএব, ‘পাতিলেরা কালো কালো দাঁত বের করে হাসে। আর সিঁড়িঘরে ঠ্যাং তুলে শিশ্ন দেখায় সারমেয়র ছানা।’ ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে চলেছে সবাই। এখানে যে যাকে চেনে বলে দাবি করে, সেও মূলত অচেনা। সময়হীনতার বাহানায় খসে পড়ে বন্ধুত্ব, আত্মার বন্ধন। সেই ক্রন্দন কে শোনে, এক কবি ছাড়া? পদ পদবি, জ্ঞানগম্যির মুখোশ খুলে ফেলে না কেউ। পাছে তার ভেতরটি ধরা পড়ে যায়! খোলনলচে খুলে পড়ার ভয়ে দূরত্বে চলে; সকলকে ভিখিরি মনে করে, যেন মানুষের আর কিছু চাওয়ার নেই। মূলত এক বোধবিবেকহীন অস্পর্শিক নিষ্ঠুরতায় ঢুকে পড়েছে এই সমাজ। গভীর থেকে গভীরতর তার ক্ষত। সেখানে যে পুঁজির পুঁজ জমেছে, এই মেকি সমাজ তা বোঝে না বা বুঝতে চায় না। এতটুকু সময় তাদের নেই।
তীব্র শ্লেষের এই কবিতা আজকের শাহুরিক সমাজকে অল্প কটি পঙ্ক্তিতে উলঙ্গ করে ছেড়েছে। এরকম একটি কবিতার পাঠ আমাদের নাড়িয়ে দেওয়ার জন্যে যথেষ্ট। কবি মোহাম্মদ নূরুল হকের এই কবিতার শেষাংশটুকু বুকে আটকে থাকে এক গভীর দমবন্ধ করা দীর্ঘশ্বাসে—‘হা ইশ্বর! এই দুঃস্বপ্নের রাত্রিগুলো আর কত দীর্ঘতর হবে!’
এই কবিতাটি অনেকটাই ‘নবাবের একদিন’ গল্পের বিষয়ভাবনার। মূলত মোহাম্মদ নূরুল হকের গল্প কবিতার একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে গ্রাম থেকে সদ্য শহরে আগত শিক্ষিত তারুণ্যের জীবন সংগ্রামের মর্মদাহী কাহিনি, যার পরতে পরতে রয়েছে, আত্মমর্যাদার অপমান, জীবনধারণের করুণ লড়াই, স্বপ্ন চুরমারের তছনছ গল্প।
তার প্রেমের কবিতাগুলো কী কোমল! কোথাও কোথাও জীবনানন্দীয় ভঙ্গিবচন, কোথাও তার নিজস্ব স্বরের প্রগাঢ়তা। তবে ব্যক্তিগতভাবে যে কবি-সম্পাদক তার ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছেন, তিনি কবি আবু হাসান শাহরিয়ার। আর সেটি তার কবিতার ভাষাভঙ্গিতে দৃশ্যমান হলেও মোহাম্মদ নূরুল হকের কবিতা নিজস্ব স্বরে এতটাই উজ্জ্বল যে, তাকে শনাক্ত করতে আমাদের বেগ পেতে হয় না। আমরা তো জানি, সৃজনশীল কাজের ধর্মই হচ্ছে বৃত্ত ভেঙে নতুন মাত্রার নির্মাণ, নতুনত্বের উদ্ভাসন, দিশা উন্মোচন। আর সেই নতুন মাত্রা বা উন্মোচনের সঙ্গে নতুন চিন্তাবর্গের দুয়ার খুলে দেওয়ার কাজটি যদি মোহাম্মদ নূরুল হকের মতো দক্ষ ও পরিণত মস্তিষ্কে সৃজিত হয়, তবে তা এই ডামাডোলের কাব্যসম্ভারেও বিশেষ হয়ে ওঠে।
‘রোদের আঁচড়’ নামের কবিতাটিতে দুঃখ-প্রেমহীনতা, ব্যর্থতা শুয়ে আছে পাশাপাশি, ‘সম্পর্কের বেণী ধরে পতনের পাণ্ডুলিপি পাঠ’ করে করে
‘চিৎ হয়ে শুয়ে থাকা মানুষের চোখ আঁকে ছাদের আকাশ
তারাগুলো মরে গেলে গলে যাওয়া রাতগুলো ঠিক জেনে
যায়—
একবার নদীদের ধর্মঘটে কবিতারা ঢেউ এনেছিল।
সেবার শিখেছিলাম—চূড়ায় উঠতে নেই; চূড়া খুব ছোট
আমি জানি মুঠোভর্তি নদীগুলো কোনোদিন চূড়ায় ওঠেনি।’
কেননা কবি জানেন পতনের নীতি আর ঘৃণার ইতিহাস! আর তাই বলেন,
‘আমাকে উন্মাদ ভেবে মাইল-মাইল রাত গিলে গিলে খায়।’
কবি বিনম্র প্রার্থনা শেষে আঁজলা ভরে তুলে দেন প্রেয়সীকে সান্ধ্যনদী, যেন সে চুমুকে উন্মাতাল হয়ে উঠতে পারে, যদিও নিঃস্ব-রিক্ত কবির নিজের জন্যে রয়েছে কেবল ‘পকেট ভর্তি তৃষাতুর’ হাহাকারের মতো বেদনার এক ‘চৈত্রের আকাশ’। কেননা ‘মুঠোভর্তি নদীগুলো কোনোদিন চূড়ায় ওঠেনি।’ ‘চূড়ায় ওঠে না নদী—যে ওঠে সে পুড়ে মরে তুমুল ঘৃণায়।’
প্রিয় পাঠক, একে কোন ধরনের কবিতা বলবেন? প্রেমের? রাজনীতির, না কি নিসর্গের কবিতা? আর এর শব্দবুনন, উপমা? উপমার ক্যামোফ্লাজে এর বহুগামিতাকে কিভাবে ব্যাখ্যা করবেন? তার কবিতার ভেতর থেকে উঠে আসে হাজার বছরের প্রেমোপাখ্যান, লোককাহিনি, পুরাণ কথা। আর কবিতায় ‘নদী’ প্রায়শই তার মূল সহচরী। তার প্রেম নিটল সমাহিত। তবে ব্যতিক্রমও আছে। কোথাও কোথাও তিনি কেবল ব্রতচারী নন, আগ্রাসী, স্বেচ্ছাচারী, পৌরুষদীপ্তও বটে। তার কবিতার প্রধান সুর ও স্বর বিরহ। বিরহই তার কাব্যের অন্যতম দ্যোতনা, হৃদয় জ্বলা-আলো। আর তিনি একা ও আড়ালের– ‘আমাকে পায় না খুঁজে মিছিলের আগে-পরে গোয়েন্দা/ বায়স!’
‘রোদের আঁচড়’, এই একটি মাত্র কবিতা দিয়েই দেখুন, কী অসাধারণ তার কাব্যশক্তি! এসব পঙ্ক্তি খুব সহজ মাপের নয়। যেমন, ‘একবার নদীদের ধর্মঘটে কবিতারা ঢেউ এনেছিল’ দৃশ্যকল্পটি একটু ভাবুন তো প্রিয় পাঠক! তার কবিতাগুলো এমনই। প্রতিটি লাইন ধরে ধরে আলোচনা করা যায়। ভাষার পরিমিতি, গীতলতা, লিরিক্যাল লাবণ্য, রূপক; সব মিলিয়ে তার কবিতা জীবনের উত্তাপ ও শৈত্যকে যুগোপৎ ধারণ করেছে।
মোহাম্মদ নূরুল হকের কবিতায় নিসর্গ, নদী, মাঠ, আকাশ, তারা, পুরাণের কাহিনি অথবা চরিত্রেরা নতুনত্বে আবির্ভূত হয়, যেন এন্টিক, ঘষে-মেজে নতুন করে সাজানো হয়েছে। প্রায়শই নদী, ঢেউ, নিসর্গ তার কবিতায় রীতিমতো চরিত্র হয়ে দেখা দিয়েছে ঐতিহ্য ও পুরাণের চরিত্রের পাশে।
‘আমরা সমুদ্রগামী’ কবিতায় প্রেম আরও দুর্বার-দুর্মর বেদনাদায়ী আকুতির হয়ে উঠেছে, যেন জলের বাকল ছুঁয়ে প্রেয়সীর ‘খোঁপা থেকে আন্ধার না ঝরে’। কখনো
‘নীরবতা ভেঙে আমি
জেগে উঠি—
জেগে ওঠা সমকালে অতীতের দ্রোহী ক্ষুদিরাম।’
সেই তিনিই আবার যখন রঙহীন ধুলোর বিকেলের ক্লান্তি নিয়ে দেখেন ‘ধূলিজোছনায় স্নান করে আয়নার পুরাণশকুন’ আর তখন ‘হারমোনিয়ামে গলা সাধি মৃত লখিন্দর;/ আমার লাশের গন্ধে বিব্রত ঈশ্বর কাঁদে বেহুলার কোলে।’
পুরাণ বাঙালির লৌকিক জীবনেরই অনুষঙ্গ। সামাজিকভাবেও এর ভূমিকা অশেষ। বহু বছরের মানুষের আচরণ, চেতনার স্তর, বিকাশ মিথকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে। অবচেতনার একটি স্তরে এই মিথের মোটিফ তৈরি হয়েছে, যা আজও বংশ-পরম্পরায় মানুষ বিশ্বাস করে। কাজেই বাঙালির এই বিশ্বাসের আবেদন তার কবিতায় নানা সঙ্গে- প্রসঙ্গে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য হয়ে উঠেছে। শুধু তাই নয়, সেটি পাঠকের কল্পনাশক্তিতে প্রখরভাবে নতুন জীবনচেতনার উন্মোচন ঘটাতে পেরেছে।
এভাবে তার বহু কবিতাজুড়ে আমরা শব্দের অতুল বিন্যাসে প্রাচীন বাংলার পুরাণ, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, প্রেম ইত্যাকার বিষয়গুলোদেখতে পাই।,যা চিরনিকট ও অতীতের, দূরের ও কাছের, কালের ও মহাকালের হয়ে উঠেছে।
মোহাম্মদ নূরুল হকের কাব্যশক্তি এখানেই যে, কেন্দ্র ও বিস্তার মিলে শব্দ যোজনায় রূপকল্পে ধ্বনিসাম্যে যেন একটি দীর্ঘ মনোলোগ তৈরির পরও তারা স্বতন্ত্র দৃশ্যে ভাগ হয়ে যায়।তার কবিতা অনুভূতির দরজা খুলে দেয়, তার কবিতা দাঁড়ায় ঋজু অথচ খণ্ড খণ্ডভাবেও।
বৃত্তাকার জলবৃন্তে জেগেছে বাতাস।
অসীম জটিল জলে ডুবছে হৃদয়।
আমার বুকের নদী ঢেউ তোলে আজ কারো তিল বরাবর!
আহা প্রেম! চমকিত হয়ে উঠি! কবির বুকের নদী কার তিলের জন্যে এমন উছলায়! হায়! এমন আকুল আহ্বানেও সখীর মন ভেজে না। তবু কবি বলেন,
‘হেঁটে যাই—
বাংলার মেঘগ্রামে গান গেয়ে একালের অতুল প্রসাদ। ’
এই নষ্ট সমাজে কবির কীই আর মূল্য যখন সব কিছুর নির্ণায়ক হয় অর্থ? কবি দেখেন এই সমাজের মানুষগুলো কেঁচোর মতো মেরুদণ্ডহীন,
‘কারও-কারও মেরুদণ্ড খুলে পড়ে অবিকল কেঁচোর মতোন।
আর তারা গড়াগড়ি খায় অর্থেশ্বরের পায়ে চুমো খেতে-খেতে!’
(ক্রীতদাসের ইতিকথা)
আমার আলোচনা কবি গল্পকার মোহাম্মদ নূরুল হকের কোনো একটি গ্রন্থ নিয়ে নয়। সেই কাজটি আরও নিমগ্নতায়, ধীরে করার প্রত্যাশা রাখি। আমি শুধু তার দুয়েকটি কবিতা গল্প বুড়িছোঁয়া করে পাঠকের তৃষ্ণাকে উসকে দিতে চাইছি। এত সংক্ষিপ্ত আলোচনায় তাকে ধরা একেবারেই সম্ভব নয়। আবার এরকম বুড়িছোঁয়ারও সমূহবিপদ রয়েছে জানি, সেটি একরৈখিক হওয়ার আশঙ্কাও থাকে। তবু বলবো তার কবিতা প্রতীকের সনিষ্ঠ ব্যবহারে, বাক্-প্রতিমা, শব্দযোজনা, রহস্যময়তা, রূপকল্প ও জাদু বাস্তবতায় বাংলাসাহিত্যের নতুন কবিতার যে ধারা জীবনানন্দ-আবু হাসান শাহরিয়ারে আমরা পাই, সেটিকেই যেন হাত ধরে আরও এগিয়ে নিয়ে চলেছে।
তার কবিতাগুলো গীতল। কবিতাগুলোর সিম্ফনি, অনুভূতির পরম্পরা এগুলোকে করে তুলেছে বহুগামী। এখানেই হাছন-লালনরূপী মোহাম্মদ নূরুল হকের বাহাদুরি।
‘এসো সখী রজকিনী, জলসত্র খোলো
হাঁটু গেড়ে বসে আছি হাছন-লালন।’
(উত্তর বাঁকের মেঘ)
কারণ কবি সেই অমোঘ সত্য জানেন,
‘শরীরের ক্ষুধা যত বাড়ে,তত কমে পাপ-পুণ্য ভয়।’ (সম্ভ্রান্ত রাত্রির দীর্ঘশ্বাস)
যেকোনো ভাষায় যেকোনো সাহিত্যে কবিতা গদ্যের অধিক। অর্থাৎ কবিতা গদ্যের চেয়ে বেশি বয়ান করতে পারে অল্প শব্দেই। তাই তার মূল্য গদ্যের চেয়ে বেশি। কেননা সেটি ব্যঞ্জনায় বলার অধিক বলে। এখানেই আমরা তার ‘যেভাবে সময় কাটে’ কবিতা আর গল্প ‘নবাবের একদিন’ আলোচনা করে দেখতে পাবো, বিষয়গতভাবে অনেকখানি এক হয়েও কবিতাটির ব্যঞ্জনা কত গভীর। আসলে নতুন ও প্রকৃত কবিতা নিজেই নিজেকে বয়ান করে।
তার বেশ কিছু কবিতায় কবি আবু হাসান শাহরিয়ারের মতো তিনি শব্দের দ্বিরুক্তির দ্যোতনা কাজে লাগিয়েছেন। যেমন, ‘মাঠ-মাঠ’, ‘ঢেউ-ঢেউ’, ‘মাইল-মাইল’ ইত্যাদি। সামাজিক অবক্ষয়, নেতিবাচকতার প্রকাশেও তিনি গাঢ়বদ্ধ আবেগের সংহত প্রকাশ ঘটান। অপ্রয়োজনীয় শব্দ অথবা বাক্য ব্যবহারে কবিতাকে বাকবহুল করে তোলেন না।
‘জলধি’ থেকে ২০২৪ সালে প্রকাশিত হয়েছে মোহাম্মদ নূরুল হকের ৮ টি গল্প নিয়ে গল্পের বই ‘নবাবের একদিন’। তার কয়েকটি গল্প পাঠে আমি অভিভূত হয়েছি এ কারণে যে, গল্পের ভাষা, প্লট, বিন্যাস, শুধু নয়, শব্দ চয়নেও বিশেষত গ্রামবাংলার চিত্রণে তিনি অত্যন্ত সচেতন ও পারঙ্গম, ইনসাইটফুল ও ভিশনারি। তার কারণ হতে পারে, তরুণ বয়স অব্দি তার গ্রামের জলহাওয়ায় বেড়ে ওঠা। গ্রামীণ সংস্কৃতি, জনপদের সঙ্গে আমাদের লেখকদের যে বিচ্ছিন্নতা, পেশার কারণে শহুরে হয়ে উঠলেও মোহাম্মদ নূরুল হকের সেই সম্পর্কটি আজও অক্ষুণ্ণ রয়েছে। বইটির প্রচ্ছদ করেন কমল ঠাকুর নামের যে ব্যক্তি, অনেক কাছে থেকে জানার কারণে অনুমান করি সেই ব্যক্তি লেখক নিজেই।
‘নবাবের একদিন’ নাম গল্পটির নায়ক নবাব। এক সাইকেলই তার জীবনের বিশ্বস্ত সঙ্গী- বন্ধু। সাইকেল চালিয়েই সে অফিস করে। গল্পটি মেঘনা পাড়ের গ্রামের নদীভাঙনে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের নিঃস্ব থেকে নিঃস্বতর হওয়া বি,এ পাস এক যুবকের জীবনযুদ্ধের করুণ কাহিনি। গল্পে ভাষার বাঁধুনি ঝরঝরে, নিটোল কিন্তু সহজেই দৃশ্যমান, ‘যখন অজগরের পেটের মতো পিচ্ছিল কালো মধ্যরাতে মেঘের আড়ালে চাঁদমুখ লুকিয়ে যায়, তখন নদীরও ক্ষুধা বাড়ে। একেক রাতে প্রচণ্ড আক্রোশে আছড়ে পড়ে একেকটা ফসলি জমির ওপর। অমনি জমিগুলোও পরাজিত মল্লযোদ্ধার মতো লুটিয়ে পড়ে মেঘনার ঘোলা জলে। মেঘনার এই সর্বগ্রাসী নির্লজ্জ নিষ্ঠুরতা নবাব দেখেছে। কিন্তু খোদার দুনিয়াতেই খোদাই যেখানে নদীর গতিরোধ করতে পারে না, সেখানে নবাব তো নবাব, তার চৌদ্দ পুরুষেরই কী সাধ্য জমিজিরাত রক্ষা করে?’ এই নদীময় দেশের নদীভাঙনে শত সহস্র নবাবের মর্মন্তুদ কাহিনি যেন এই গল্প।
একটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির মোটামুটি বড় কর্তা হয়েও তাকে কলুরবলদের মতো সারাদিন খাটতে হয়, এমনকী চালচলনে কেতাদুরস্ত ভাব নেয় না বলে কখনো কখনো নিম্নস্তরের কর্মচারীদেরও কটাক্ষ সইতে হয়। সামান্য কারণে যার বেতন কাটা হয়, মাসান্তে বৌকে পুরো সেলারি দেওয়ার পরেও বৌয়ের অকথ্য গালি, সন্দেহের নোংরা কথা সন্তানদের সামনেই তাকে শুনতে হয়। আসলে টানাপড়েনের জীবনে বৌয়ের একতরফা গালাগাল, সন্দেহে নবাবকে তার সন্তানরাও আর সম্মান করে না। অফিসের অমানবিক পরিবেশ, বেতন কেটে রাখা, মা, স্ত্রী, সন্তান সবার চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে অসহায় নবাবের মুখ থুবড়ে পড়ার ভেতর দিয়ে এই গল্পটি শেষ হয়। নবাবের জীবনে কোনো ভালোবাসা নেই, আশ্রয় নেই, এমনকী এক্সিডেন্টের পরেও স্ত্রীর নিষ্ঠুরতা এই সমাজের রূঢ় কঠিন নির্মমতাকেই চিত্রিত করে। মূলত আমাদের সব বন্ধন,সমাজ-সম্পর্ক যে অর্থের মাপকাঠিতেই দাঁড়িয়ে আছে, গল্পটিতে সেই দিকটিই উন্মোচিত হয়েছে। নবাবদের মতো শিক্ষিত সরল যুবকেরা পথেঘাটে, অফিসে, সংসারে সর্বত্র যেন তিরস্কার শোনার জন্যে জন্ম নেয়। এখানে সামাজিক স্ট্যাটাসে সাইকেলও একটা বড় প্রতীক হয়ে উঠেছে। সাইকেলে চড়ে অফিসে আসায় সিকিউরিটি ম্যানও তাকে কর্মকর্তা মনে না করে ‘তুই-তোকারি’ করতে দ্বিধা করে না। পথ চলতেও মোটরগাড়ির চালকের গালি শুনতে হয়। অফিস কলিগ, বন্ধু, সন্তান, স্ত্রী বা মায়ের কারও কোনো অন্যায় কথার প্রতিবাদ করাই জেনো সে ভুলে যায়। কারণ সে জানে, এইসব প্রতিবাদ অর্থহীন।
স্ত্রী রাশেদা নবাবের মাথায় ব্যান্ডেজ দেখেও এক্সিডেন্টের কথা বিশ্বাস না করে বলে, ‘সারারাত কোন মাগির ঘরে কাটাইলা। আর এখন আসছ অ্যাকসিন্ডের নাটক কইরতে?’ তারপর টেনে ব্যান্ডেজ খুলে ফেলতেই ঝরঝর করে রক্ত বেরিয়ে আসতে থাকে। নবাব বেহুঁশ হতে হতে ঘোরের ভেতর তার মৃত বাবাকে দেখতে পায়। বাবা তাকে কুরুক্ষেত্রের মতো লড়াই করতে বলে, সান্ত্বনা দেয়, ‘তোমার কাজ ছিল লড়াই করার। তুমি করেছ। জিততে পারোনি, এটা ব্যর্থতা নয়। নিয়তি। মানুষ তার নিয়তি লঙ্ঘন করতে পারে না।’
এই গল্প মূলত আমাদের সমাজের অমানবিক নির্মম,নিষ্ঠুর চিত্র। যে সমাজে সম্পর্ক রচিত হয় মূলত টাকায়। গল্পটি পাঠান্তে নবাবের ভেতরকার হাহাকার, বেদনা, অক্ষমতায় পাঠকও আক্রান্ত হন। এই সমাজচিত্র বুননে, ভাষায়, চিত্রকল্পে মোহাম্মদ নূরুল হকের মুন্সিয়ানায় চোখের সামনে যেন দেখতে পাই গ্রাম ছেড়ে এসে শহরে পানকৌড়ির মতো নাক উঁচু করে বাঁচতে চাওয়া নবাবদের। পাঠকের অন্তর ছেড়ে সেই ‘নবাব’ নামটি যেন ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ আর অট্টোহাসিতে মসৃণ মেঘের পাপড়ির চাদ্দিকে ছড়িয়ে পড়ে।
মোহাম্মদ নূরুল হকের আরও যে কটি গল্প পাঠ করেছি, সেখানেও একজন শ্রেণিসচেতন সমাজ ও সময়ের রূপকার হিসেবে তাকে দেখতে পাই; ভাষা যার করায়ত্ত। বোঝা যায়, দেরিতে হলেও ভেতরে ভেতরে গল্পকথকের প্রস্তুতি তার আগেই ছিল। গ্রন্থের বাকি গল্পগুলো হচ্ছে, ‘একদা এক চন্দননগরে’,‘ঠাণ্ডা মার্বেল’, ‘কালো মেঘের দুপুরে’, ‘জতুগৃহ’, ‘আজিমুদ্দিনের দোষ’, ‘জঙ্গল উপাখ্যান’ ও ‘আসাদের শেষ দিন’।
শুদ্ধতাবাদী আর ব্যাকরণমগ্ন সাহিত্যবোদ্ধা দলের অনেকেই যেকোনো রচনাকে নির্ধারিত মানদণ্ডে ফেলে বিবেচনা করতে স্বস্তিবোধ করেন। কিন্তু এর বাইরেও শিল্পের বহু প্রকার-আকার থাকে। কাজেই শিল্পকে কোনো ছকে বেঁধে নিলে আলোচকের পক্ষে সুবিধা হলেও আলোচ্য শিল্পটির প্রতি সব সময় সুবিচার হয় না।
আমরা এবারে মোহাম্মদ নূরুল হকের নীরব নিভৃতের বিশাল কাজগুলোর দিকে একটু দৃষ্টি দিতে পারি। মোহাম্মদ নূরুল হক জন্মগ্রহণ করেন ১৯৭৬ সালে। তিনি কবি-সমালোচক-প্রাবন্ধিক-গবেষক-ছোটকাগজ সম্পাদক। বহু পত্রপত্রিকায় সাংবাদিকতার শেষে বর্তমানে দৈনিক জাতীয় অর্থনীতির অনলাইন বার্তা সম্পাদক। সম্পাদনা করেছেন: সাহিত্যবিষয়ক ছোটকাগজ, মেঠোপথ (১৯৯৬ থেকে), চিন্তাসূত্র (১৯৯৬ থেকে), প্রাকপর্ব (২০০০ থেকে ২০০৫) ও অনুপ্রাস (২০০১-২০০৫)। প্রকাশিত কবিতার বই: মাতাল নদীর প্রত্নবিহার, স্বরচিত চাঁদ, উপ-বিকল্প সম্পাদকীয়, লাল রাত্রির গান। প্রবন্ধগ্রন্থ: সাহিত্যে দশক বিভাজন ও অন্যান্য, সমালোচকের দায়, অহঙ্কারের সীমানা ও অন্যান্য, সাহিত্যের রাজনীতি, সমকালীন সাহিত্যচিন্তা, কবিতার সময় ও মনীষার দান, আহমদ ছফার বাঙালিদর্শন ও অন্যান্য; বাংলা উপন্যাসে বিধবা:বঙ্কিম-রবীন্দ্রনাথ-শরৎ; আধুনিক বাংলা কবিতা: ছন্দের অনুষঙ্গে; কথাসাহিত্যের চিন্তাসূত্র; বাক্স্বাধীনতার সীমারেখা। গল্পগ্রন্থ: নবাবের একদিন; আত্মজীবনী: জীবনের যতিচিহ্নগুলো।
এইসব লেখার জন্যে দুটো উল্লেখযোগ্য স্বীকৃতি পেয়েছেন তিনি। প্রবন্ধের জন্য ‘বগুড়া লেখক চক্র পুরস্কার-২০২০’ পদক ও ঢাকা সাব এডিটর্স কাউন্সিল সম্মাননা। মোহাম্মদ নূরুল হকের সাহিত্য আরও আলোচিত সমালোচিত হোক। আর তাতে পাঠক লেখক দু’পক্ষই উপকৃত হবেন বলে প্রত্যাশা রাখি।

