॥ প্রথম আসমানে॥
১৫.
প্রথম আসমান ধোঁয়ায় ধোঁয়াকার
ডেরাটা গমগমে লালন ফকিরের
প্রশ্ন ছুড়ে দিই ধাঁধায় কাব্যের
‘মেয়ের গর্ভেতে মাতার জন্মের
তত্ত্ববোধনের উপায় বাতলান’
‘জানেন রব্বানা জানেন রহমান
জন্মচক্রতে নানান কথা ঢের’
১৬.
বলছি, ও লালন, যাবে না ছেঁউড়িয়া?
অমনি সুর করে কান্না ডুকরিয়া
‘সেদিন ছিল বটে গান ও গঞ্জিকা
সুরেতে ফানা ফানা ভুলেছি পঞ্জিকা’
‘তিনের পাগলামিতত্ত্ব বলো গুরু
সৃষ্টিতত্ত্বের যেখানে হলো শুরু’
লালন হেসে কহে, ‘মানুষ ভজ বাবা’
১৭.
এখানে কদবেল কুমড়ো লাউ নেই
এখানে একতারা কীভাবে বানাবেই
বাউল আবদারে বাংলা থেকে আনা
রয়েছে একতারা মাত্র হাতে গোনা
লালন হাতে নিলে বারামখানা তার
ভাবের লহরিতে হয়েছে জারেজার
আরশি নগরকে খুঁজছে বাউলেই
১৮.
সিরাজ সাঁই ডাকে, ‘শোন রে ও লালন
একটু ধর গান উঠুক ভরে মন’
চক্ষু মুদে গাহে, ‘দরজা সাড়ে নয়,
সাঁইজি, ঈশ্বর-মিলন কোথা হয়?’
‘এমন ঘরে থাকে শূন্যে একাকার
কুঠরি মূলাধার ভাসছে খুঁটি তার’
হামানদিস্তায় বিশাখা দুকে পান…
১৯.
ডাকার মতো যদি সে ডাক পারিতাম
স্বরের আফসোসে নিচ্ছে হরিনাম
প্রথম আসমানে বিষাদ কাঙ্গালে
বলছে, ‘দিন গেল এ কোন পার দিলে
কত যে সন্ধ্যায় পারের গাই গান
অপার হয়ে আজ পেয়েছি আসমান’
পাগল, সুখ নেই, গাইছে হরিনাথ
কবি জিললুর রহমানের ‘এক সে মেরাজের রাত্রে ঘুমিয়েছি’ কাব্যগ্রন্থের ‘প্রথম আসমানে’ অংশে যে তাত্ত্বিক ও আধ্যাত্মিক ভাবনাবলি প্রতিধ্বনিত করেছেন, সেই নির্বাপিত কথাগুলি হচ্ছে মূলত বাংলা সুফি-বাউল দর্শন, দেহতত্ত্ব, সৃষ্টিতত্ত্ব এবং আত্ম-অনুসন্ধানী মরমি চেতনার এক জটিল ও বহুস্বরিক কাব্যভাষ্যের আলোকপ্রাপ্ত কথা। এই পর্বে কবি কেবল লালন, সিরাজ সাঁই কিংবা হরিনাথকে স্মরণ করেননি, কবি এসব আধ্যাত্মিক সাধকদের এক অতিলৌকিক আসমানি পরিসরে স্থাপন করে বাঙালি আধ্যাত্মিকতার এক মহাজাগতিক সংলাপ নির্মাণ করেছেন।
‘প্রথম আসমানে’র সূচনাতেই লালনের প্রতি নিক্ষিপ্ত প্রশ্ন—‘মেয়ের গর্ভেতে মাতার জন্মের’ এই কথাটি দিয়ে চিরন্তন কালের মরমি দর্শনের অন্যতম গভীর পরস্পরবিরোধী তত্ত্বের দিককে ইঙ্গিত করেছেন। এই তত্ত্ব কোনো জৈবিক বাস্তবতার প্রশ্ন নিয়ে নয়, বিষয়টি সৃষ্টি ও স্রষ্টাকে ইঙ্গিত করে রচিত হয়েছে। এই মরমি দর্শনটি হচ্ছে— কারণ ও কার্য, উৎস ও উৎপত্তির পারস্পরিক নির্ভরতার এক আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা। বাউলতত্ত্বে জগৎকে সরল কার্যকারণ সম্পর্কের মধ্যে ব্যাখ্যা করা হয় না, এই তত্ত্বে অস্তিত্বকে দেখা হয় এক চিরচক্রাকার আত্মপ্রকাশের প্রক্রিয়া হিসেবে। সেই অর্থে ‘মাতার জন্ম মেয়ের গর্ভে’ তত্ত্বটি হলো— সৃষ্টির মধ্যেই স্রষ্টার পুনরাবির্ভাবের সংকেত। এখানে জন্ম একটি জৈব ঘটনা নয়, বরং মহাজাগতিক পুনরুৎপত্তির প্রতীক।
‘জানেন রব্বানা জানেন রহমান’—এই পঙ্ক্তি মানবজ্ঞান ও পরমজ্ঞানকে পৃথক করে দিয়েছে। মানুষ তত্ত্বের অনুসন্ধান করতে পারে, কিন্তু চূড়ান্ত রহস্যের অধিকারী কেবল পরম সত্তা। এই দৃষ্টিভঙ্গি সুফি দর্শনের ‘মারিফত’ ধারণার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত, যেখানে জ্ঞান অর্জনের শেষ বিন্দুতে এসে মানুষ নিজের অজ্ঞতাকেই উপলব্ধি করে। পরবর্তী স্তবকগুলোতে লালনের স্মৃতিচারণ—‘গান ও গঞ্জিকা’, ‘সুরেতে ফানা ফানা’— বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। এখানে ‘ফানা’ শব্দটি একটি সুফি পরিভাষা, যার অর্থ আত্মসত্তার বিলয়। সঙ্গীত, প্রেম এবং আধ্যাত্মিক বোধের মাধ্যমে ব্যক্তি অহংকারের বিলুপ্তি ঘটে। লালনের কণ্ঠে উচ্চারিত ‘মানুষ ভজ বাবা’ তাই সমগ্র বাউল দর্শনের সারমর্ম হয়ে উঠেছে। মানুষই এখানে ঈশ্বর অন্বেষণের কেন্দ্র, মানবদেহই সাধনার ক্ষেত্র, মানবপ্রেমই মুক্তির আসল পথ। কবিতাটি অতীন্দ্রিয় কোনো স্বর্গীয় সত্তার দিকে নয়, মানুষের ভেতর অন্তর্নিহিত অনন্ত বোধকে বিশুদ্ধচেতনায় তুলে ধরেছে।
এখানে ‘তিনের পাগলামিতত্ত্ব’ উপস্থাপনাটি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। বাউল ও সুফি তত্ত্বে বহু ক্ষেত্রে সত্তার ত্রিবিধ স্তর আছে, তা এক বিশেষ তাত্ত্বিক কাঠামো নির্মাণ করেছে— দেহ, মন ও আত্মা; অথবা সৃষ্টি, স্থিতি ও লয় । কবি সেই প্রাচীন আধ্যাত্মিক গণিতের দিকে ইঙ্গিত করেছেন, যেখানে সংখ্যাও এক ধরনের প্রতীকী ভাষা।
সপ্তদশ অংশে একতারা একটি গুরুত্বপূর্ণ রূপক। ‘এখানে কদবেল কুমড়ো লাউ নেই / এখানে একতারা কীভাবে বানাবেই’— এই উক্তি পৃথিবী ও পরলোকের ভেদরেখাকে চিহ্নিত করেছে। একতারা কেবল বাদ্যযন্ত্র নয়, এটি আবার সাধনারও প্রতীক। মৃত্যুর পর আসমানি বা অতীন্দ্রিয় জগতে একতারা বানানোর জন্য প্রয়োজনীয় বস্তুগত উপকরণ (যেমন লাউ, বাঁশ, কাঠ ইত্যাদি) আর নেই, কিন্তু সাধকের অন্তর্গত সাধনা, সঙ্গীতপ্রেম এবং পরমসত্যের অনুসন্ধিৎসা বিলীন হয়নি। ফলে একতারা এখানে স্মৃতি, সংস্কৃতি এবং আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকারের রূপক হয়ে উঠেছে। দেহ ও বস্তু হারিয়ে গেলেও চেতনার আকাঙ্ক্ষা, ভাবের অন্বেষণ এবং আত্মার সাধনা অটুট থাকে। কবি এইভাবেই দেখিয়েছেন যে, আধ্যাত্মিক অনুসন্ধান কোনো পার্থিব উপকরণের ওপর নির্ভরশীল নয়। তা আত্মার গভীরে বহমান এক চিরন্তন তৃষ্ণা। ‘আরশি নগর’ অনুসন্ধানের মধ্যে আত্মদর্শনের যে ধারণা লালন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, কবি সেই অনুসন্ধানকেই আসমানের স্তরে প্রসারিত করেছেন।
অষ্টাদশ অংশে সিরাজ সাঁইয়ের আহ্বান এবং ‘দরজা সাড়ে নয়’ গানের উল্লেখ দেহতাত্ত্বিক সাধনার দিকে পাঠককে নিয়ে যায়। বাউল দর্শনে মানবদেহকে এক রহস্যময় স্থাপত্য হিসেবে কল্পনা করা হয়, যার ভেতরে রয়েছে গুপ্ত কুঠরি, গোপন দ্বার এবং চৈতন্যের স্তরসমূহ। এখানে ‘মূলাধার’ শব্দটি যোগতত্ত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত, ফলে এখানে সুফি, বাউল এবং তন্ত্রযোগের এক সমন্বিত ভাবধারা ক্রিয়াশীল আছে। ‘শূন্যে একাকার’ হওয়ার আকাঙ্ক্ষা মূলত ব্যক্তিসত্তার সীমা অতিক্রম করে মহাসত্তার সঙ্গে মিলিত হওয়ার বাসনা।
উনিশতম অংশে এসে কবিতার সুর আরও বিষণ্ন ও অস্তিত্ববাদী হয়ে উঠেছে। ‘ডাকার মতো যদি সে ডাক পারিতাম’— এই পঙ্ক্তি আধ্যাত্মিক অক্ষমতার বেদনা বহন করে। সাধক জানেন, পরমের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের জন্য যে গভীর আহ্বান প্রয়োজন, তা তাঁর কণ্ঠে সম্পূর্ণরূপে ধ্বনিত হয়নি। ফলে এখানে এক ধরনের অধরা মুক্তির আকুলতা প্রতিফলিত হয়েছে। ‘অপার হয়ে আজ পেয়েছি আসমান’— এই পঙ্ক্তি এখানে বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। পৃথিবীতে যে ‘পার’ ও ‘অপার’-এর বিভাজন আছে, মৃত্যুর পরে তা বিলুপ্ত হয়েছে, কিন্তু তবুও এতে পরিপূর্ণ তৃপ্তি আসেনি। আসমান প্রাপ্তির মধ্যেও এক অভাববোধ রয়ে গেছে। এই বোধই মরমি দর্শনের চিরন্তন বৈশিষ্ট্য— প্রাপ্তির মধ্যেও অপ্রাপ্তির অনন্ত তৃষ্ণা।
সামগ্রিকভাবে ‘প্রথম আসমানে’র কবিতাগুচ্ছ হচ্ছে— বাংলার ত্রিকালজ্ঞ মরমি ঐতিহ্যের এক অনন্য কাব্য-উপস্থাপনা। এখানে মেরাজের আসমান কোনো ধর্মীয় স্বর্গমাত্র নয়, প্রথম আসমান হচ্ছে— অবিস্মরণীয় বাঙালির আধ্যাত্মিক স্মৃতির এক প্রতীকী নভোমুখী ভূগোল। যেখানে লালন, সিরাজ সাঁই, হরিনাথ প্রমুখ সাধক আত্ম অনুসন্ধান, সৃষ্টির রহস্য, মানবতত্ত্ব এবং পরমসত্তার প্রশ্ন নিয়ে অবিরাম সংলাপে আসক্ত। কবি জিললুর রহমান এই সংলাপকে এমন এক কাব্যিক উচ্চতায় উন্নীত করেছেন, যেখানে জীবন ও মৃত্যু, দেহ ও আত্মা, মানুষ ও ঈশ্বর— সব দ্বৈততা ক্রমে বিলীন হয়ে এক মহাসংহত নিস্তরণ চেতনার অভিমুখে অগ্রসর হয়েছে।

