ফাইজুল্লাহ কৌশিক একজন বিচক্ষণ, জ্ঞানপিপাসু ও বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্ব। দীর্ঘদিন ধরে তিনি লেখালেখির সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। লেখালেখির পাশাপাশি গত ছাব্বিশ বছর ধরে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন। ভ্রমণের প্রতিও তাঁর রয়েছে গভীর আগ্রহ। তাঁর অষ্টম গ্রন্থ অনুশীলন কোষ-এ জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, উপলব্ধি ও পর্যবেক্ষণের সুনিপুণ সমন্বয় ঘটেছে। গ্রন্থটি মূলত জীবনকে বোঝা, নিজেকে গড়ে তোলা এবং সঠিক পথে এগিয়ে যাওয়ার একটি কার্যকর রোডম্যাপ হিসেবে পাঠকের সামনে উপস্থাপিত হয়েছে।
অনুশীলন কোষ গ্রন্থের পঞ্চাশটি অধ্যায়ে লেখক জীবনের নানা স্তর ও সংকট অতিক্রম করে কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছানোর পথনির্দেশ করেছেন। অধ্যায়গুলোতে তিনি মূলত দেখাতে চেয়েছেন—একজন মানুষ আন্তরিকভাবে কোনো কিছু অর্জন করতে চাইলে অধ্যবসায়, সঠিক পরিকল্পনা ও সুস্পষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণের মাধ্যমে তা সম্ভব।
লেখকের দৃষ্টিতে সাফল্যের প্রথম শর্ত হলো নিজের জন্য একটি স্থির লক্ষ্য নির্ধারণ করা। লক্ষ্যই মানুষকে তার গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যেতে প্রেরণা ও দিকনির্দেশনা দেয়। তাই অনুশীলন কোষ-এর প্রথম অধ্যায়েই তিনি পাঠকের দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছেন জীবনের একটি সুস্পষ্ট ও স্থির লক্ষ্য নির্ধারণের ওপর। এরপর সেই লক্ষ্যকে উপলব্ধি করে পরিকল্পিতভাবে এগিয়ে যাওয়ার ওপর তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, “যা অর্জন করতে চান, তা যদি ভালো করে বুঝতে পারেন, তবে তা ঘটে যাবে।”
অর্থাৎ, কাঙ্ক্ষিত অর্জনের জন্য প্রথমেই জানতে হবে—কী চায় এবং কেন চায়। লক্ষ্য নির্ধারণে অস্পষ্টতা থাকলে পরবর্তী পথচলাও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। লেখকের মতে, জীবনের শুরুতেই যদি এই জায়গায় গলদ থাকে, তবে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েও কাঙ্ক্ষিত সাফল্যে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে স্থির লক্ষ্য, আত্মবিশ্বাস, অধ্যবসায় ও সুশৃঙ্খল প্রয়াস—এই সমন্বিত অনুশীলনই হয়ে ওঠে জীবনের অগ্রযাত্রার অন্যতম ভিত্তি।
তৃতীয় অধ্যায়ের নাম—‘কাজ একটি, পেশন বিকশিত করা’। এই অধ্যায়ে লেখক জীবনের সঙ্গে নিজের পছন্দ ও প্রবল অনুরাগের কাজের সামঞ্জস্যের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, “জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল পেশনের কাজ নিয়ে চেষ্টা না করা।” অর্থাৎ, যে কাজের প্রতি মানুষের গভীর আগ্রহ ও অনুরাগ রয়েছে, সাফল্যের জন্য সেই কাজকেই যথাযথভাবে চিহ্নিত ও বিকশিত করা প্রয়োজন।
বিষয়টি পাঠকের কাছে সহজভাবে তুলে ধরতে লেখক কাঠঠোকরা পাখির উদাহরণ ব্যবহার করেছেন। কাঠঠোকরা একই গাছের নির্দিষ্ট স্থানে বারবার ঠোকর দিতে থাকে। তার এই নিরন্তর ও একাগ্র প্রচেষ্টার ফলেই একসময় সেখানে নিরাপদ বাসা তৈরির উপযোগী স্থান তৈরি হয়। এই উদাহরণের মধ্য দিয়ে লেখক বোঝাতে চেয়েছেন, নিজের পছন্দের কাজের সঙ্গে একাগ্রতা ও নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টা যুক্ত হলে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করা সম্ভব।
অন্যদিকে, নিজের পছন্দ ও অনুরাগের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন কোনো লক্ষ্যকে আঁকড়ে ধরে এগিয়ে চলা অনেকটা ভুল ট্রেনে ওঠার মতো। সময়মতো গতিপথ পরিবর্তন না করলে মানুষ ধীরে ধীরে অর্থ, সময়, স্বাস্থ্য, সামাজিক অবস্থান এবং জীবনের প্রকৃত সৌন্দর্য—সবকিছুরই মূল্য দিতে পারে। তাই যে কাজকে বোঝা বা যুদ্ধক্ষেত্র বলে মনে হয়, সেটি থেকে সরে এসে নিজের সামর্থ্য, আগ্রহ ও অনুরাগের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কাজকে বেছে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন লেখক।
চতুর্থ অধ্যায়ে ফাইজুল্লাহ কৌশিক পাঠকের আত্মমূল্যায়নের জন্য ১০০টি প্রশ্ন উপস্থাপন করেছেন। এসব প্রশ্নের উত্তর ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’-এর মাধ্যমে দেওয়ার সুযোগ রেখে তিনি পাঠককে নিজের অবস্থান অনুধাবন এবং সঠিক পথ বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে সহায়তা করেছেন। পঞ্চম অধ্যায়ে তিনি ‘ওয়ান মাইন্ডসেট’-এর গুরুত্বের প্রতি আলোকপাত করেছেন। অন্যদিকে, ষষ্ঠ অধ্যায়ে মানুষকে একটি নির্দিষ্ট গণ্ডি বা সীমার মধ্যে আবদ্ধ না থেকে সেই সীমা অতিক্রম করে সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত উন্মোচনের তাগিদ দিয়েছেন। এভাবেই গ্রন্থের প্রতিটি অধ্যায়ে লেখক পাঠকের উদ্দেশ্যে এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা উপস্থাপন করেছেন, যা যথাযথভাবে অনুসরণ করলে একজন মানুষ জীবনের বিভিন্ন পর্যায় সাফল্যের সঙ্গে অতিক্রম করার পথনির্দেশ পেতে পারেন।
এই গ্রন্থের সবচেয়ে শিক্ষণীয় দিক হলো—জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে মানুষ বুঝতে পারে না, কোনটি তার জন্য সঠিক আর কোনটি ভুল। এই অনিশ্চয়তা ও দ্বিধা দূর করার লক্ষ্যে লেখক গঠনমূলক আলোচনা ও বাস্তবধর্মী দৃষ্টান্তের মাধ্যমে পাঠককে জীবন পরিচালনার প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। গ্রন্থটি মনোযোগসহকারে পাঠ করে এর পরামর্শ ও কৌশলগুলো বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করতে পারলে ব্যক্তিজীবনে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনা সম্ভব বলে প্রতীয়মান হয়।
যেকোনো বয়সের শিক্ষার্থী কিংবা সাধারণ পাঠক—বিশেষত যারা বই পড়তে ভালোবাসেন, জ্ঞান অর্জনে আগ্রহী এবং নিজেদের নতুন দক্ষতায় সমৃদ্ধ করতে চান—তাদের জন্য গ্রন্থটি গুরুত্বপূর্ণ। লেখক বিভিন্ন অধ্যায়ে ‘অনুশীলন পদ্ধতি’, ‘কাজের ট্রিগার বাটন’, ‘অনড় সৃষ্টি তত্ত্ব’, ‘টাইম কোড’, ‘Most Successful Failure Code’, ‘রূপান্তর ভ্যাকসিন—দামি আকার’, ‘জোড়া লাগান’, ‘সাকসেস রহস্য ডাকছে আপনাকে’, ‘নিউ নর্মাল—এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই’, ‘রিজেকশনে ক্ষতি নেই’, ‘একচেটিয়া দক্ষতা: পিগমিলিয়নের পাগলামি’, ‘চোখ এবং ব্রেইনের উপরে লেন্স লাগানো—ভিশনের মূল কথা’, ‘স্কিন অপারেশন’, ‘প্রতিদিন নতুন কিছু’, ‘হুক থেকে বলছি’ এবং ‘হেজহগ হিউরি—এক অব্যর্থ কৌশল’-এর মতো বিষয় উপস্থাপনের মাধ্যমে পাঠকের চিন্তা, কর্মপ্রবণতা ও আত্মউন্নয়নের বিভিন্ন দিক উন্মোচন করেছেন। প্রতিটি অধ্যায়েই রয়েছে জীবনকে আরও সুসংগঠিত, গতিশীল ও লক্ষ্যনির্ভর করার কোনো না কোনো নির্দেশনা। এসব নির্দেশনা অনুসরণ করে ব্যক্তি তার কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে আরও একাগ্র ও সচেতন হতে পারেন।
লেখকের জীবনদর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জটিলতা পরিহার করে সহজ ও সরল চিন্তার চর্চা করা। তিনি বলেছেন, ‘জীবন থেকে জটিল চিন্তা, কুটিলতা, ধূর্ততা, ক্ষোভ ইত্যাদি ছেঁটে ফেলে দিয়ে সহজ-সরল চিন্তায় থাকুন। জীবন সহজ এবং সরল হবে…।’ এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে লেখক মূলত নেতিবাচকতা ও অপ্রয়োজনীয় মানসিক জটিলতা পরিহার করে ইতিবাচক, স্বচ্ছ ও বাস্তবমুখী জীবনবোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন। ফলে গ্রন্থটি কেবল সাফল্য অর্জনের কৌশলনির্ভর নয়; বরং আত্মউন্নয়ন, ইতিবাচক চিন্তা, দক্ষতা বিকাশ এবং জীবনকে সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনার একটি ব্যবহারিক নির্দেশনাগ্রন্থ হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।
ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ আবীর পাবলিকেশন্স থেকে প্রকাশিত অনুশীলন কোষ গ্রন্থটির বহুল প্রচার ও প্রসার কামনা করি। গ্রন্থটির জীবনমুখী চিন্তা, আত্মউন্নয়নের কৌশল এবং বাস্তবভিত্তিক দিকনির্দেশনা পাঠকের ব্যক্তিজীবন ও কর্মজীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সহায়ক হবে—এমন প্রত্যাশা করা যায়।

