লাল আকাশ
একদিন তুমি তরমুজ কেটে নিয়ে এলে
খেতে খেতে ভাবলাম—
তরমুজ কাটলে দু’ভাগ হয়ে পড়ে থাকে তার লাল আকাশ
কিন্তু হৃদয় দু’ভাগ হলে মাথার ওপরে কোনো আকাশ থাকে না।
আজ তুমি নেই
আমি আলো-আঁধারির মধ্যে বসে কাঁদলাম
কেউ আর তরমুজ কেটে নিয়ে আসে না এখন
আজ সত্যি সত্যি মাথার ওপরে কোনো লাল আকাশও আর থাকলো না।
শীত আমার মা
নাকফুলে শিশিরের স্মৃতি এখনো উজ্জ্বল।
শীত আমার মা। কুয়াশা তার চুল। তাকে, ধীরে ধীরে, অবয়ব দিলেন প্রভু। বরফের চাকুতে বানানো হলো তার চোখ। গাছের হারানো পত্র-পল্লব দিয়ে হাত পা, পাহাড়ের উচ্চতা দিয়ে তৈরি হলো মায়ের হৃদয়। তারপর প্রভু বললেন হও—অমনি আমার পাঁজরের মধ্যে তাকে অনুভব করলাম।
এখন সে দূরের মিনার কোনো।
তবু
. নাকফুলে শিশিরের স্মৃতি এখনো উজ্জ্বল।
বউ ও ভাতের গন্ধ
একটি শিশুর কিংবা একটি গাছের
প্রতি মুহূর্তের বেড়ে ওঠা দেখবার লোভে
দিনরাত অপলক চেয়ে থাকি।
পোকার প্রসব বেদনার শব্দে ঘুম আসে না আমার।
একবার অঙ্কুরোদগমের শব্দে ঘুম ভেঙেছিল।
একদিন সমুদ্রের জলে কান পেতে শুনেছিলাম
মাছে ও ঝিনুকে কথোপকথন।
আজ ভাত রান্নার আদিম গন্ধে সাঁতার কাটছি।
বউ ও ভাতের গন্ধে আজ
পাহাড়ি গুল্মের মতো মনে হচ্ছে চারিদিক।
পরিত্রাণের ঘাটে
বহুদিন পর পুরনো শার্টের ভাঁজে পাওয়া গেল অমাবস্যার গান, প্রথম প্রেমের ছেঁড়া স্ক্রিপ্ট, বাদুড়ের ঠোঁটে ঝুলে থাকা চাঁদ, আর মৃত বন্ধুর চিঠি। আমরা দুজন ফিনফিনে সেই শার্টের ভেতর ঢুকে পড়লাম। আমাদের প্রথম শীতের মধুচন্দ্রিমায়।
সমুদ্রের ডাক ছিল, পাহাড়ের সবুজ সংকেতও ছিল—এসবের মায়া ছেড়ে, দূরে, বেদনা ও বাঁকা-বাঁকা শূন্যতার দেশে, এসে পৌঁছুলাম।
আর সেই পুরনো শার্টের ঘ্রাণ শুঁকে শুঁকে আমাদের মৃত স্বজনেরা জড়ো হলো, পরিত্রাণের আঠালো এক ঘাটে।
একটি সবুজ পাতা
ছায়াপথ পেরিয়ে
গ্রহ নক্ষত্র পেরিয়ে
পৃথিবীতে এসে থমকে দাঁড়ালো আলো—
একটি সবুজ পাতা ফ্রক বদলাচ্ছে।
ভুল
চাঁদ—
পরমেশ্বরের অন্ধ আঁখি
রাত্রি—
কিশোরীর দেহজাগা ফুল
দুঃখ—
প্রেমে ব্যর্থ নারীর সমাধি
স্বপ্ন—
জীবন-মৃত্যুর যৌথ ভুল
নিষিদ্ধ প্রোফাইল
এক নিষিদ্ধ ঋতুর নাম শীত।
যার গহ্বরে জমা থাকে পথভ্রষ্ট নক্ষত্রের ঘুম, বসন্তের হলুদ ট্রাউজার, আর সিঁদেল চোরের নিশুতি রাতের মান অভিমান।
এক নিষিদ্ধ ফলের নাম আপেল।
যার কোষে কোষে আত্মগোপনে আছে সভ্যতার চকচকে ছুরির তুহিন। আছে নারীদের তৈরি আদিম জানালা। সৃষ্টি ও ধংসের মধুচন্দ্রিমা।
জন্ম এক মনোলোভা নিষিদ্ধ প্রান্তর।
সন্দেহের উদ্রেক করে যা। যেখানে গরু ও গোয়েন্দা চরে। আর পাখিদের পাতা ফাঁদে পা দেয় হরিণশাবক।
মৃত্যু? সে তো এক আবহমান হরিণের নদী।
যা ভীষণ ভবিতব্যময়। একদিন যা ফিরে আসতে পারে উৎসের দিকে।
প্রেম, ফুসফুসে সঞ্চিত দু’ফোঁটা হেমলক।
যা সুপেয়, রক্তে দ্রুত দ্রবণীয় বিষাদের নদী, নিগৃহীত সন্ধ্যার অক্ষরমালা, যা অভাবনীয়, যা ভাবতে গেলে পতঙ্গ ও প্রণয়ীর কোনো তফাৎ থাকে না।
অস্তিত্ব
আমার অস্তিত্ব ছিল ছড়ানো ছিটানো—
ছিল বীর্যে, বাবা মা’র প্রেমে ও বিরহে,
ছিল খাদ্যে, দেশ দেশান্তরে কৃষকের
ঘর্মাক্ত আঙুলে, ছিল পিতামহ আর
প্রপিতামহের রক্তে, আমার অস্তিত্ব
লুকিয়েছিল হাজার বছরের পুরনো
কোনো অশ্বত্থের আড়ালে। হয়তো কোনো
দস্যু একদিন লুট করেছিল গ্রাম,
সেই খুনের লোহিত কণিকায় ছিল
আমার অস্তিত্বের ঘ্রাণ, জড়িয়ে ছিলাম
শৈবালে, আদিম জলে, ভূমধ্যসাগরে।
জড়িয়ে ছিলাম আরো নিষিদ্ধ আপেলে।
এ সমস্ত জটিল কুহক থেকে কেউ
আমাকে একত্র করে নিক্ষেপ করলো
অবিমৃষ্য পৃথিবীতে। সেই থেকে আজও
গেঁথে আছি অপলক তোমার দৃষ্টিতে।
নদী এক জন্মান্ধ আয়না
কার পথে গোধূলি ভাসিয়ে তুমি সূর্যাস্ত দেখেছ?
সে তো এক জন্মান্ধ আয়না।
প্রেম নেই, প্রহেলিকা নেই,
অনুভবে আছে শুধু অনঙ্গ-বাসনা।
তবু তারই রক্তে গোধূলি ভাসিয়ে,
প্রত্যাবর্তনের কোন পথ কেন খোলা রাখোনি হে?
কবরের তল দিয়ে বয়ে যায় নদী।
লোকালয় দিয়ে কত বয়ে গেছে নদী।
প্রতিবেশী দেশ থেকে ধাওয়া করে নদী।
অর্থহীন পায়ে পায়ে মরুভূমি জাগে, তৃষ্ণার্ত হোসেন হায়!
কার জলে গোধূলি ভাসিয়ে তুমি সূর্যাস্ত দেখেছ?
নদীও কূটনীতি জানে,
কথা দিয়ে কোনোদিনও জল সে দেয় না,
কোনোদিনও সমুদ্রে মেশে না,
তৃষ্ণার্ত হোসেন হায়! নদী এক জন্মান্ধ আয়না।
গণতান্ত্রিক
ধরো আমি ইঁদুর
আর তুমি উদ্ধত বিড়াল
ধরো তুমি আমাকে ধরতে চাইছ
আমি লুকিয়ে আছি পালঙ্কের আড়ালে
বাগে পেয়েও আমাকে ধরছ না তুমি
এরকম খেলতে খেলতে ক্লান্ত হয়ে
একসময় আমার ওপর আছড়ে পড়লে তুমি
ধরো তোমার থাবায় আমার কপাল চিরে রক্ত বেরুল
এ পর্যায়ে আরেকটি বিড়াল এল, আরও উদ্ধত,
তবে তোমার বিরুদ্ধে
আমারই পক্ষে মাঠে নামলো সে,
আমার দুঃখে দুঃখিত হলো
আমার কান্নায় তার চোখজোড়াও ভিজে এলো
একদিন তোমাকে হটিয়ে সে আমার বন্ধু হলো
ধরো তারপর একদিন খেলাচ্ছলে সেও হামলে পড়লো আমার ওপর
ছিন্নভিন্ন হয়ে গেলো আমার নাড়িভুঁড়ি
তখন তুমি এসে আমাকে অশ্রুজলে সমাধীস্থ করলে
অতঃপর, ধরো, আমার শোণিতের ধারা সমুদ্রে গড়ালো
আর সমুদ্রের নীল জলে ফুটে উঠল এক রক্তিম গোধূলি
ধরো, তোমরা দু’জন একসঙ্গে উপভোগ করছ সে-গোধূলি।

