
মানুষের চারাগাছ
একটি রোদপোড়া বীজ
যার কার্নেলে লুকিয়ে থাকে
অনাগত কালের জীবন
কৃষকের চাষবাস
একটি বীজ বেড়ে ওঠে; সতেজ সবুজ
সৃষ্টির পর সৃষ্টি, দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ প্রান্তর
ছায়াঘন বন পাখির কলতান ফুলের সৌরভ
যার সৌন্দর্য সুষমায় মোহিত হয় ঝর্ণা; হ্রদের ধূসর ফেনা
শাদা শাদা পাখিদের ডানা ঝাপটানোতে
নেচে ওঠে আদি পিতার মন
মুহূর্তে কেটে যায় স্বর্গ হারানোর বেদনা।
তবুও কিছু প্রাপ্তির অন্বেষা মনে জাগে
কারও উপস্থিতি…
যার কাছে বলা যায় পৃথিবীর সৌন্দর্যের আদ্যোপান্ত
হঠাৎ শব্দেরা নেচে ওঠে
পাহাড়চ্যুত নুড়ির মিছিলে শোনা যায়
মুক্তাদানার মতো হাসি
সে হাসির প্রতিধ্বনি কথা বলে ঝর্ণার গানের মতো
চোখ ফিরে তাকাতেই মা হাওয়ার মন নেচে ওঠে
ভরে যায় আদমের শূন্য হৃদয়
বীজ বুনে টেনে নেয় বংশধারা
মানুষের চারাগাছ ডানা মেলে মহাকালে।
আত্মার বসতি
আমাকে পৌঁছে দাও অনন্তের কাছে
যেখানে আত্মার সঙ্গে আত্মার বসতি
কেরামতি ভুলে গেছি বহুকাল আগে
বুকে নেই মোজেজার কারিশমা
লাঠি সাপ হয় না, জায়নামাজ ছোটে না অনন্ত সমুদ্রের পানে
নরম বাতাসে ভেসে চলা সোলেমান নবির তখত…
শুধু আকাশচারী হতে পারি না আমি।
পাড়ে বসে আছি বহুকাল
মাফিয়ারা লুটে নিয়েছে জীবনের কারবার
সাগর নাবিকেরা পথ ভুলে গেছে
মরু-মুষিকের উপত্যাকায় শার্দুল হাঁটে প্রতিদিন
কূপে পানি নেই
ওষ্ঠাগত প্রাণ চেটে খায় নুড়ির মিছিল
শাবলের আঘাতে পাজর ফাটে না
মৃত্তিকা গলে না মুষল বৃষ্টিতে
চোখের মণি গলে ঝরে যায় অশ্রু
নিঃশ্বাসে পুড়ে যায় সবুজ বিটপী
এখানে আর নয় মুহূর্তের বিকিকিনি
কালের অবক্ষয়
তসবির গোটাগুলো ঝরে গেছে
কর্পুরের মতো উড়ে গেছে মনুষ্যত্ব
আমাকে পৌঁছে দাও অনন্তের কাছে
প্রার্থনায় গড়ে তুলি আত্মার বসতি।
রেখে যাওয়া এক টুকরো তাচ্ছিল্যের হাসি
বাতাসের ঝাপটায় সিঁথি করা চুল এলোমেলো হয়ে যায়
চুলের সাথে এলোমেলো হয় মন
(জানি না মনকে চুল দিয়ে বাঁধা যায় কি না)
স্মৃতি এলোমেলো হয়, এলোমেলো হয় ভাবনা
সন্ত্রাসীর টার্গেটও এলোমেলো হয়ে যায়
না হলে মানুষ আহত হবে কেন?
টাকার তোড়া এলোমেলো হয়
টাকা দিয়ে কেনা মাস্তান এলোমেলো হয়
এলোমেলো হয় বন্দুকের গুলি বোমা গ্রেনেডের হামলা…
এলোমেলো হয় মিছিল বক্তৃতা সভা সভার এজেন্ডা
এলোমেলো হয় প্রতিবাদ দোষীদের নাম ঠিকানা
সেখানে বাতাস থাকে; বাতাসের ঝাপটা থাকে কি না জানি না
লাশেরাই ভালো
তাদের বিলিকাটা চুল এলোমেলো হয় না
(লাশদের চুল কেউ আঁচড়ে দেয় না বলে হয়তো)
তাদের ভাবনা এলোমেলো হয় না
দৃষ্টি এলোমেলো হয় না
শুধু সবকিছু এলোমেলো করে দিয়ে
দুই ঠোঁটে রেখে যায়
এই পৃথিবীর প্রতি এক টুকরো তাচ্ছিল্যের হাসি।
জীবনের পলেস্তরা
আমার জীবনের দেয়ালে নোনা ধরেছে বহুকাল আগেই
টের পাইনি কখন যে খসে পড়েছে জীবনের পলেস্তারা
ক্ষয়ে যাওয়া ইটের পাঁজরে পোকা-মাকড়ের বাস
তমসার কালো মেঘ গিলে খায় চত্বর
তবুও দেয়ালের ভাঁজে ভাঁজে আমার স্মৃতিচিহ্ন
কথা বলে নিভৃতে
একাকী রাতের অভিসারে
মেঝেতে পদচিহ্ন চিনে গেছি আমি
দেয়ালের চারপাশে দৃষ্টির রেখা
বিনিময় ছিলো পূর্ব পুরুষের কিংবা নারীর সঙ্গে
কখনো সময়কে বয়ে যাওয়া প্রেয়সী
এখানে ঘুঙুরের বাজনা ছিল
ছিল গায়কির ঢঙ; নৃত্য সংগীত
দেয়ালে ঠেস দিয়ে বসতো রাজ-রাজরা
বাইজির পেটে ছিলো মহারাজ
তখতের পোড়ামাটি, কয়েদখানার গলিত লাশ
কথা বলে সৌর্য-বীর্যের
তেজস্বী যুবকের প্রকম্পিত আওয়াজ
প্রতিধ্বনিত হতো এই দেয়ালে
রক্তের ছাপচিহ্ন অক্ষত আছে আজও
নারীর ক্রন্দনধ্বনি প্রতিধ্বনিত হয় এখানে
জীবনের পলেস্তারা খসে খসে জমা হয় স্মৃতির মেঝে।
প্রিয় স্বদেশ আমার
স্নিগ্ধতায় মেলে ধরি ভোরের জানালা
আমপাতার সৌরভ নাকে আসে সবুজ চায়ের মতো
পুবালি কুসুম আভা চায়ের কাপে যেনো জ্বাল দেওয়া ঘন দুধের সর
ঠোঁট ছোঁয়াতেই দু’ঠোঁটে লেগে যায় প্রকৃতির স্বাদ
সবুজ ঝালরের মতো দুলছে নারকেল পাতা
উঁচু ভবনের ফাঁক দিয়ে, জিরাফের মতো মাথা বাঁকিয়ে
এই ইটের উষ্ণতায় ওরা যদি ভিজাতে পারে সুদৃঢ় পায়ের পাতা
দেয়ালের রস শুষে পায় যদি সূর্যের সাক্ষাৎ
হতে পারে যদি বিরহী পাখিদের ঠিকানা
তবে আমিও পারি—
নদীর মতো আগলে রাখতে নৌকা
আকাশের মতো আগলে রাখতে সূর্য
বৃক্ষের মতো আগলে রাখতে প্রকৃতি
নারীর মতো আগলে রাখতে গৃহ
দেশপ্রেমিকের মতো আগলে রাখতে প্রিয় স্বদেশ আমার
