০১.
শিবপুরের আকাশে ঘোরে আয়না,
সূর্য দেখে, মুখের ভিতর জ্বলে আরেক সূর্য।
দশখামারির খামারঘর থেকে
কে যেন চিঠি পাঠায়—
‘এবার আমায় ছুটি দাও।’
হাতের লেখা ঈষৎ ভীত,
অথচ অক্ষরগুলো উড়তে জানে;
বাতাসের পিঠে চড়ে তারা পৌঁছে যায়
ধানবাড়ির থানে।
রুবেন মুর্মুর বাড়িতে ভিড় জমে,
উঠোনে আর্দ্র হয়ে থাকে
কত না-বলা কথার ছায়া।
কেউ বলে মৃত্যু,কেউ বলে দীর্ঘ যাত্রা,
কেউ জানে না—কোন ঘড়িতে
থেমে গেছে মায়া।
সাঁওতাল বালকটি আমাকে এগিয়ে দেয়
ছাতিমগাছের কাছে;
দূরের কাঁঠালবন দেখিয়ে বলে—
ওই পথ ধরুন।
সড়ক দিয়ে গেলে
হয়তো দ্রুত পৌঁছে যেতাম,
কিন্তু আজ আমার পায়ে
কাদাজলের নিয়তি।
ধানবাড়ির কাদা আমাকে ডাকে
আমারই প্রাকৃত নামে—
যে নাম একদিন ধুলোয় লেখা ছিল,
বাতাস মুছে দিয়েছে অক্ষর।
রৌদ্রের ভিতর দাঁড়িয়ে আমি শুনি—
মৃত মানুষেরাও কখনো কখনো
ছুটির আবেদন করে।
তাদের কোনো খাম নেই,
কোনো ডাকঘর নেই,
নেই কোনো দপ্তর।
শুধু পৃথিবীর বুকের গভীরে
জমে থাকে পদযাত্রার ধ্বনি—
যেন বহুদূর থেকে হেঁটে আসা
কোনো অন্তহীন বিদায়ের শব্দ।
০২.
কাদায় পা রাখতেই দুপুর নেমে আসে আমার শরীরে, যেন হলুদ আলোর প্রাচীন কোনো স্নান।
পায়ের পাশে সাপ চলে, কেঁপে ওঠে জল,
তার ফণায় সূর্য—অন্ধকারের স্মৃতি মুদ্রা।
শামুক গুটিয়ে থাকে নিজের নিঃসঙ্গতার ভিতর,
মরা ঝিনুকের মুখে সমুদ্রের হারানো ঠিকানা।
ধানবাড়ির মাঝখানে, শ্যাওড়ার তলায়, একটি থান; রক্তজবা পড়ে আছে—
যেন কেউ রেখে গেছে গোপন সাক্ষ্য।
কে দিয়েছে ফুল?
মৃত, না জীবিত?
প্রশ্নটি জলের ভিতর নেমে যায়,
আর ফিরে আসে না।
দুপুরের আকাশে ফুটে ওঠে নক্ষত্রেরা,
তাদের গুনতে গিয়ে হারিয়ে ফেলি নিজের বয়স।
ধানক্ষেতের মাঝখানে লাটিম ঘোরে,
তার মাথায় পৃথিবী,
তার তলায় অনন্ত শূন্যতা।
দূরে তিনটি তরণী সরে যায়,
নিঃসঙ্গ দাঁড়ের শব্দে—
অথচ এখানে কোনো নদী নেই,
কোনো ঘাটও ছিল না কোনো কালে।
জলের আয়নায় দেখি, রুবেন হেঁটে যায়,
তার পেছনে শালবন,
সামনে অচেনা এক নগর।
সেই রূপনগরের পাঁচিলে ধুলোয় লেখা নাম,
যে নামে পুরোনো বন্ধুরা আজও ডেকে ওঠে।
আমি হাত বাড়াই—
বাতাস আমাকে সরিয়ে দেয়,
বলে, সব সাক্ষ্য একদিন
পরম্পরাহীন হয়ে যায়।
০৩.
যোগেন মিঞ্জির বাড়ির পেছন দিয়ে
শিবপুরে উঠি—
পায়ের কাদা শুকিয়ে গিয়ে
ধূসর স্মৃতি হয়ে ওঠে।
রুবেনের উঠোনে মানুষের মুখগুলো নিস্তব্ধ,
প্রত্যেকের চোখে জ্বলে
আলাদা এক গোধূলি।
কাঁচা বাঁশের খাটে শুয়ে আছে রুবেন মুর্মু,
তুলসীপাতা ওর চোখের ওপর
সবুজ চশমা হয়ে থাকে।
ও কি এখন দূরের নক্ষত্র দেখতে পায়,
নাকি অন্ধকারের ভিতর
নিজের শৈশব খুঁজে ফেরে?
আমি কেওড়াজল ছিটিয়ে দিই
ওর নিথর কপালে—
এক বিন্দু জল থেকে উঠে আসে
দক্ষিণ সমুদ্র।
কৃষ্ণা মুর্মুর কান্না উঠোন ছাড়িয়ে যায়,
পুরোনো স্কুলের ঘণ্টায়
তার প্রতিধ্বনি বাজে।
সেই ঘণ্টা বলে—
এখনো সময় হয়নি;
এত আগে কেউ কি সত্যিই
এসে পৌঁছেছে?
রিতা হেমব্রম ঝাড়জঙ্গল থেকে
বিছাপোকা ছাড়ায়,
ক্ষুদ্র পায়ে তারা অতিক্রম করে
মৃত্যুর সীমানা।
তাদের হুলে জেগে ওঠে
ঝাড়খণ্ডের পাহাড়,
আগুনের ভিতর দাঁড়িয়ে থাকে
বিস্মৃত পূর্বপুরুষ।
কেউ একজন প্রশ্ন করে—
প্রেম কি আমাদের সাক্ষ্য মানে?
কবরের মাটি নীরব,
বাতাসও উত্তর দিতে ভয় পায়।
রুবেনের মুখে কোনো অভিযোগ নেই,
অথচ ওর নীরবতা
সমস্ত গ্রামের বিরুদ্ধে
সাক্ষ্য দিয়ে যায়।
০৪.
তীরধনুকের নৃত্য আজ আর আমাকে টানে না,
উৎসবের বৃত্তের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে
ক্ষতবিক্ষত ইতিহাস।
আমি চাই হুল—
মাটির অধিকার ফিরে পাওয়ার ডাক,
শালপাতার শিরায় শিরায় জেগে ওঠা
আদিম বজ্রধ্বনি।
হুল, হুল—
শব্দ দুটি পাহাড় পেরিয়ে যায়,
রুবেনের বন্ধ চোখে
হঠাৎ বিদ্যুৎ জ্বলে ওঠে।
হাতে ওর তীর নেই,
তবু কেঁপে ওঠে পাহাড়,
ওর নীরবতা ভেঙে পড়ে
শোষকের পাথুরে প্রাচীরে।
দূরের মেঘে উড়ে যায় নীল পরিচ্ছদ,
বৃষ্টির পরে ভালোবাসা
আরও ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ে।
যে প্রেমকে একদিন
প্রতিশ্রুতির মতো মনে হয়েছিল,
সে আজ কবরের পাশে দাঁড়িয়ে
নিজের নাম ভুলে যায়।
নক্ষত্র ফোটার আগে মৃত্তিকা আমাকে ডাকে,
বলে—তুমি একা নও,
তোমার ভিতরেও বহু মৃতের বাস।
বৃষ্টির জলে ধুয়ে যায় অক্ষর,
মুছে যায় পরিচয়;
তবু শেকড়ের গভীরে
থেকে যায় আগুনের ভাষা।
আমি দেখি, রুবেনের কবর থেকে
উঠে আসছে ঘাস,
প্রতিটি সবুজ ডগায়
একটি করে অদৃশ্য তীর।
কোনো রথ চালকহীন ছুটে যায় অন্ধকারে,
কোনো নৌকো বাঁধা থাকে
এমন এক ঘাটে, যার নাম নেই।
মৃতেরা নিষ্পাপ কি না, জানি না;
শুধু জানি—
তাদের অনুপস্থিতিও
আমাদের চারদিক থেকে ঘিরে রাখে।
০৫.
কবরবাড়ির মাটি খোঁড়া হয় ধীরে ধীরে,
পৃথিবী যেন নিজের বুক থেকে
খুলে নিচ্ছে শেষ দরজা।
রুবেনকে শুইয়ে দেওয়া হয়
মাটির গভীর আশ্রয়ে—
উপরে মানুষের ভিড়,
নিচে অনন্তের নীরবতা।
কৃষ্ণার কান্না নদী হয়ে নামে,
সেই নদীতে ভেসে যায় ছাতিম,
কাঁঠাল, ধানবাড়ি— রক্তজবা ভেসে যায়,
তার লাল রং কিছুতেই নিভে না;
যেন সমস্ত শোকের গভীরে
সিধু-কানহুর হুল বেঁচে থাকে।
আমি দেখি, জলের ওপারে
রুবেন উঠে দাঁড়ায়,
ওর চোখে তুলসীপাতা নেই,
নেই মৃত্যুর কোনো চিহ্ন।
ও আমাকে ডাকে না,
তবু শুনতে পাই—
বাতাসের ভিতর আমার নিজের নাম
বদলে যাচ্ছে ক্রমাগত।
দূরে কোনো নৌকো বাঁধা,
মাঝি তার নাম জানে না;
সমুদ্রের জালে ধরা পড়ে
আকাশের ভাঙা আয়না।
আমি ফিরি না সড়কে,
ফিরি না পরিচিত পৃথিবীতে—
কাদামাখা পায়ে হেঁটে যাই,
যতক্ষণ পথ নিজেই মুছে যায়।
শিবপুরের রোদ নিভে গেলে
ধানবাড়ি জেগে থাকে,
রূপনগরের পাঁচিলে বসে
দুটি পায়রা পাশাপাশি।
তাদের ডানায় জমে আছে
গত বর্ষার রক্তপাত,
তাদের চোখে ভোর সাড়ে ছ-টার
ঝাড়খণ্ড উড়ে যায়।
ভোগনাডিহতে চিঠি তখনও
বাতাসে ভাসে—
‘এবার আমায় ছুটি দাও’,
অক্ষরগুলি কাঁপে।
আমি জানি,
কোনো বিদায়ই সম্পূর্ণ বিদায় নয়,
যতক্ষণ মাটির নিচে
ঘুমিয়ে থাকে হুলের আগুন।
রুবেন মুর্মু মাটির নিচে,
আর আমার ভিতরে হুল—
ধানবাড়ির জলে আজও
সূর্য নিজের মুখ খুঁজে ফেরে।

