বাংলা চলচ্চিত্র জগতের কিংবদন্তী ‘ঋত্বিক ঘটক’। এনামেই তিনি পরিচিত। চলচ্চিত্রপ্রেমীদের কাছে এখন পর্যন্ত তাঁর পরিচালিত ছবিগুলো একেকটি ইতিহাস। তিনি ছিলেন যুগ সচেতন চলচ্চিত্রকার, গল্পকার, নাট্যকার ও অভিনেতাস।
এই কিংবদন্তী চলচ্চিত্রকার জন্মগ্রহণ করেন ১৯২৫ সালের ৪ নভেম্বর ঢাকার ঋষিকেশ দাশ লেনে ঐতিহ্যময় ঘটক বংশে। তিনি ইন্দুবালা দেবী ও সুরেশ চন্দ্র ঘটক দম্পতির ১১তম ও কনিষ্ঠতম সন্তান। ঋত্বিক ঘটকের বংশের আদি পুরুষ পণ্ডিত কবি ভট্ট নারায়ণ। তাঁরই বারেন্দ্রশ্রেণীর শাণ্ডিল্য গোত্রের জমিদার বংশের নীলরক্ত ধারণ করেই জন্মেছিলেন ঋত্বিক। কিন্তু তাঁর মাঝে জমিদারী বংশের লেশ মাত্র পাওয়া যায় না। মানুষকে তিনি দেখেছেন, মানুষের সংগ্রাম নিয়ে তিনি ভেবেছেন, নিপীড়িত মানুষের দুঃখে তিনি কেঁদেছেন, আর তাই মাত্র অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র অবস্থাতেই শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন প্রতিবাদীরূপে।
উল্লেখ্য, ঋত্বিক ঘটকরে শ্রেষ্ঠ উত্তরসূরি তাঁর বড় ভাই মনিষ ঘটকের জ্যেষ্ঠ কন্যা প্রখ্যাত সাহিত্যিক মহাশ্বেতা দেবী।
একসময় তাঁর বাবা সুরেশ চন্দ্র ঘটক ছিলেন ঢাকার ডিসট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট, তাঁর চাকরির কারণে তাঁরা ঘুরেছেন দেশের নানা প্রান্তে। তাঁর বাবা অবসরের পর রাজশাহীতে গিয়ে স্থায়ীভাবে বাড়ি করেন। তাদের রাজশাহীর বাড়িটাকে এখন ‘ঋত্বিক ঘটক হোমিওপ্যাথিক কলেজ’ করা হয়েছে। ঋত্বিক ঘটকের শৈশবের একটা বড় সময় কেটেছে রাজশাহী শহরে। তিনি রাজশাহীর কলেজিয়েট স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন। পরে বহরমপুরে বড় ভাই মনিষ ঘটকের কাছে চলে যান। সেখানে কৃষ্ণ নারায়ণ কলেজে পড়াশুনা করেন। ১৯৪৭ দেশ ভাগের সময় ঋত্বিক ঘটক ও তাঁর পরিবার কলকাতায় পাড়ি জমান। তিনি রাজশাহী কলেজে পড়া অবস্থায় নাটক শুরু করেন।
ঋত্বিক ঘটক তাঁর প্রথম নাটক ‘কালো সায়র’ লেখেন ১৯৪৮ সালে। একই বছর তিনি ‘নবান্ন’ নামক পুনর্জাগরণমূলক নাটকে অংশ গ্রহণ করেন। এরই মাঝে তিনি নাটকের প্রতি এতই আকৃষ্ট হয়ে পড়ে যে ১৯৪৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যে ভর্তি হয়েও এই নাটকের নেশাতেই পড়া-লেখা ছেড়ে দেন।
১৯৫১ সালে তিনি ভারতীয় গণনাট্য সংঘে (IPTA) যোগদান করেন। এ সময় তিনি অনেক নাটক লিখেন, অভিনয় করেন ও নির্দেশনা দেন। এব নাটকের মাঝে উল্লেখযোগ্য নাটকগুলো হলো–জ্বালা,অফিসার,দলিল,সাঁকো,সেই মেয়ে ইত্যাদি। এ সময় তাঁর বেশকিছু লেখা গল্প ও নাটক পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়।
ক্যালকাটা (বর্তমানে কোলকাতা) ফিল্ম সোসাইটির আন্দোলনের ফসল হিসেবে ১৯৫০ সালের শুরুতে কলকাতায় শুরু হয় বিশ্বের ধ্রুপদী এবং অন্যান্য ভালো ছবি দেখানো। এ সময় তিনি ছবি নিয়ে প্রচুর পড়াশোনা করলেন এবং বুঝতে পারলেন জনমানুষের বড় অংশের কাছে নিজের বক্তব্য তুলে ধরার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার তথা শক্তিশালী মাধ্যম হলো ‘চলচ্চিত্র’। এই বোধ থেকে উদ্বুদ্ধ হয়েই নিমাই ঘোষের ‘ছিন্নমূল’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে সেলুলয়েড ফ্রেমের দুনিয়াতে প্রবেশ ঘটে ঋত্বিক ঘটকের। এই ছবিতে তিনি একইসঙ্গে অভিনয় করেন এবং সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করেন।
ঋত্বিকের প্রথম অমর সৃষ্টি ‘নাগরিক’। ১৯৫২ সালে তাঁর একক পরিচালনায় তৈরি হয় নাগরিক চলচ্চিত্রটি। কিন্তু; সবচেয়ে দুঃখের বিষয় হচ্ছে ছবিটি তাঁর জীবদ্দশায় মুক্তি পায়নি ১৯৭৬ সাল অবধি। ‘নাগরিক’ চলচ্চিত্রটি মধ্যবিত্ত সমাজের জীবন জটিলতা, নগর যন্ত্রণা, উদ্বাস্তু জীবন, যুব প্রজন্মের বেকারত্ব, হতাশা-বিচ্ছিন্নতা বোধ, আত্মকেন্দ্রিকতা, সুখ-দুঃখ-দুর্দশার উত্থান-পতন, শ্রেণী বিভাজনের অসুখ-বিসুখ, রাষ্ট্রের হাতে মানুষের পুতুল হয়ে পড়ার আবহই ছিল ঐ কালোত্তীর্ণ চলচ্চিত্রের মূল উপজীব্য। এই সিনেমার কেন্দ্রীয় চরিত্র ‘রামু’। পরের বছরেই অর্থাৎ ১৯৫৩ সালে ঋত্বিক ঘটকের ‘দলিল’ নাটকটি গণনাট্য সংঘের সর্বভারতীয় বোম্বে সম্মেলনে প্রথম পুরস্কার জিতে নেয়।
এরপর ১৯৫৭ সালে নির্মিত হয় ঋত্বিকের প্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র ‘অযান্ত্রিক’। ছবিটি মুক্তি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সফল চলচ্চিত্রকাররূপে খ্যাতিলাভ করেন তিনি।
এরপর ঋত্বিক শরণার্থীদের নিয়ে তাঁর ‘ট্রিলজি’ নির্মাণ করেন ‘মেঘে ঢাকা তারা’ (১৯৬০) ‘কোমল গান্ধার’ (১৯৬১) ও ‘সুবর্ণরেখা’ (১৯৬২)। শক্তিপদ রাজগুরুর কাহিনী অবলম্বনে ‘মেঘে ঢাকা তারা’ যেন অসীম অন্ধকারে আলোর পথ এবং বাঁচতে চাওয়ার ছবি। ‘কোমল গান্ধার’ ছবিতেও উঠে এসেছে সেই একই সুর-জীবনের জয়গান। দেশভাগ-উদ্বাস্তু-ছেলেমেয়েদের নিয়ে নির্মিত নাটকের দলেও ভাগাভাগি। একদল ক্লাসিক নাটকের পক্ষে, অন্যদল চায় বাস্তবতার মঞ্চ-রূপ। ছবিটিতে ব্যবহৃত হয়েছে দ্রুতগতি, উচ্চ শব্দের চিৎকার, বাফার। এগুলো সেই সময়কার দর্শকদের এক নতুন চিত্র ব্যাকরণের সঙ্গে ভালোভাবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। সুবর্ণরেখা’র বিষয়বস্তুও ছিল উদ্বাস্তু জীবনের গল্প।
১৯৬৫ সালে ‘সুবর্ণরেখা’ মুক্তি পাওয়ার পর চলচ্চিত্র থেকে আট বছরের বিরতি নেন ঋত্বিক। নিজের প্রতিভার যশ খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ার পর ১৯৬৬ সালে পুনের বিশ্ববিখ্যাত প্রতিষ্ঠান ‘ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়া’-তে প্রথমে ফিল্ম ডিরেকশন-এর শিক্ষক পরে অধ্যক্ষ হিশেবে দায়িত্ব পালন করেন ঋত্বিক ঘটক।
উল্লেখ্য, সেসময় মুম্বাই-এর হিন্দি ছবিতে চিত্রনাট্য রচনার কাজও তিনি করেছেন। এরপর ১৯৭২ সালে বাংলাদেশে এসে নির্মাণ করেন অদ্বৈত মল্লবর্মণের লেখা প্রখ্যাত উপন্যাস অবলম্বনে তাঁর বিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘তিতাস একটি নদীর নাম’। এটি ভারত বাংলাদেশের যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত হয়। অদ্বৈত মল্লবর্মণের ধ্রুপদ উপন্যাস থেকে নেওয়া এ ছবিটি পেয়েছিল ব্যাপক প্রশংসা। এ ছবিতে অসাধারণ অভিনয় করেন বাংলাদেশের শক্তিমান অভিনেতা প্রবীর মিত্র। প্রবীর মিত্র ঋত্বিক ঘটক সম্পর্কে এভাবেই স্মৃতিচারণা করেন -‘এই মাকড়া, এই ছোঁড়া এদিকে আয়—এই সব বলেই তিনি (ঋত্বিক) আমাকে ডাকতেন। কখনোই আমার নাম ধরে ডাকতেন না। বলতেন, এডিটিংয়ের সময় তুই আসিস। তোর সঙ্গে আমার কথা আছে। আমি গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। তিনি কিছুই বলেন না। কাজের ভেতরেই ডুবে থাকেন। মুখ তোলেন না। ঋত্বিক-দা চলে গেলেন। তাঁর না-বলা কথাটা আমার আর শোনা হয়নি।’
এরপর ১৯৭৪ সালে মুক্তি পায় ঋত্বিকের শেষ ছবি ‘যুক্তি, তক্কো আর গপ্পো’। চলচ্চিত্রটির কাহিনীর ছলনায় তিনি নিজের জীবনের অব্যক্ত অনেক কথা বলে গেছেন। ছবিটিতে নিজের রাজনৈতিক মতবাদ ‘ঐতিহাসিক বস্তুবাদ-সাম্যবাদ’ তথা মার্ক্সইজমকেও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় দ্বিধাহীনভাবে প্রকাশ করেছেন আপসহীন শোষিত জীবনের ত্যাগের ইতিহাস।
ঋত্বিক ঘটকের ছবি যুক্তিতর্ক আর গপ্প
এরপর অনেক দিন তিনি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে চিকিৎসাধীন ছিলেন মানসিক হাসপাতালে। এরপর ১৯৭৬ -এর ৬ ফেব্রুয়ারি মাত্র ৫০ বছর বয়সে চলচ্চিত্রের এই মহামানব পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ইহজগৎ থেকে তিনি চিরদিনের ছুটির টিকিট কাটলেও, তাঁর অমর সৃষ্ট কীর্তিগুলো আজও বিশ্ব চলচ্চিত্র জগতের সম্পদ। আজীবন বলতে গেলে দেশভাগের পর ১৯৪৭ থেকেই দুই বাংলার মিলনের জন্যে আমৃত্যু সংগ্রাম আন্দোলন করে গেছেন এই মহান পুরুষ, কখনো প্রত্যক্ষভাবে কখনো বা চলচ্চিত্র নির্মাণের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে সমগ্র বাঙালি জাতিকে পুনরায় ঐক্যবদ্ধ করবার জন্যে।
ঋত্বিক জন্ম নিয়েছেন ও বেড়ে উঠেছিলেন এক বিড়ম্বিত সময়ে। একদিকে দেশভাগ-সাম্প্রদায়িকতা-যুদ্ধ-মন্বন্তর, পদ্মা-গঙ্গার জল লাল হলো মানুষের রক্তে; অন্যদিকে দ্বিগবিজয়ী রবীন্দ্রনাথ-কল্লোলগোষ্ঠী-জাতীয় আন্দোলন, বারো মাসে তেরো পার্বণের বাংলা। এসব ঘটনার আল ধরে, খাঁড়ি ধরে এগিয়ে যেতে যেতে বেড়ে উঠতে উঠতে একই সঙ্গে বেদনা, নিঃসঙ্গতাকে আর সম্ভাবনাকে সঙ্গী করে দাঁড়িয়ে থাকা ঋত্বিক হাতিয়ার বানিয়েছেন লড়াইয়ের, সশস্ত্র যুদ্ধের। নাগরিক, মেঘে ঢাকা তারা, কোমল গান্ধার, সুবর্ণরেখা, যুক্তি তক্কো গপ্পো তাঁর একেকটি বিষবাণ।
চলচ্চিত্র সম্পর্কে ‘নিজের পায়ে নিজের পথে’ বইতে ঋত্বিক ঘটক লিখেছেন—
‘আমি প্রতি মুহূর্তে আপনাকে ধাক্কা দিয়ে বোঝাব যে, ইট ইজ নট এন ইমেজিনারি স্টোরি বা আমি আপনাকে সস্তা আনন্দ দিতে আসিনি। প্রতি মুহূর্তে আপনাকে হাতুড়ি মেরে বোঝাব যে যা দেখছেন তা একটা কল্পিত ঘটনা, কিন্তু এর মধ্যে যেটা বোঝাতে চাইছি আমার সেই থিসিসটা বুঝুন, সেটা সম্পূর্ণ সত্যি, সেটার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্যই আমি আপনাকে এলিয়েন্ট করব প্রতি মুহূর্তে। যদি আপনি সচেতন হয়ে উঠেন, ছবি দেখে বাইরের সেই সামাজিক বাধা দুর্নীতি বদলের কাজে লিপ্ত হয়ে উঠেন, আমার প্রোটেস্টাকে যদি আপনার মধ্যে চাপিয়ে দিতে পারি তবেই শিল্পী হিসেবে আমার স্বার্থকতা।’
তাঁর মাহাত্ম্য শুধু চলচ্চিত্রেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, মানবতার প্রতি তাঁর অসীম ভালোবাসা ছিল। তিনি সবসময় স্বপ্ন দেখতেন ও দেখাতেন এমন এক সমাজ ব্যবস্থার যেখানে শোষক ও শোষিত সম্পর্ক থাকবে না, শ্রেণী বিভাজন থাকবে না, সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মান্ধতা, কুসংস্কারচ্ছন্নতা, সংস্কৃতিহীনতা থাকবে না। মানুষ শব্দটির স্বার্থকথা প্রমাণে মানবতার টানে নিজের অন্তরের সাথে নিজের উদাত্ত আহ্বানে তাইতো ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধকালীন তাঁকে কোলকাতার রাস্তায় রাস্তায় বাংলাদেশি শরণার্থীদের জন্যে ত্রাণকার্যে সক্রিয় অংশগ্রহণ করতে দেখা যায়।
পূর্ব বাংলার তথা বাংলাদেশের নিরীহ শরণার্থীদের সেসময়কার ত্রাণকার্যে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের কিছু কথোপকথন:
ঋত্বিক হাসলেন। স্পষ্টস্বরে বলতে লাগলেন, এখন খাওয়ার সময় কই সুচিত্রা (বাংলা চলচ্চিত্রের মহানায়িকা সুচিত্রা সেন), এখন একটা যুদ্ধ চলছে …ভারী অন্যায় যুদ্ধ; যুদ্ধটাকে ঘিরে পৃথিবী এখন পশু আর মানুষে দু-ভাগে ভাগ হয়ে পড়েছে। আর পদ্মা-মেঘনার দেশে কত যে রক্ত ঝরছে এই মুহূর্তে … এই মুহূর্তে আগুনে পুড়ে যাচ্ছে শিশুর কচি হাত আর পা। সুতীক্ষ্ম বেয়োনেটে এফোঁড় -ওরফাড় হয়ে যাচ্ছে শিশুর মায়ের বুক। পুড়ে যাচ্ছে আজন্ম পরিচিত মমতায় ঘেরা ঘরবাড়ি … বাংলার পলিমাটিতে জমে আছে লাশের স্তূপ … বাংলার নীলাভ আকাশে ক্ষুধার্ত শকুনের উড়াল। বহু নীচে নদীর জল … সে জলে লাশ … নদীর পাড়ে লাশ … রাস্তায় লাশ … কলাঝোপে লাশ … উঠানে লাশ … কুয়ায় লাশ … বাড়ির ভিতরে লাশ … বাড়ির বাইরে লাশ …. লাশ লাশ আর লাশ আর লাশ আর লাশ আর লাশ আর লাশ আর লাশ……
সুচিত্রা আবার ব্যাগ খুলতে-খুলতে বলল, আমার ব্যাগে রাংতায় মোড়ানো একটা প্যাঁড়া থাকার কথা। দাঁড়ান দেখছি। এই যে, এই নিন। এখন এটা টপ করে খেয়ে নিন তো। গাড়িতে জলের বোতল রয়েছে। এনে দেব?
ঋত্বিক প্যাঁড়া নিলেন বটে, কিন্তু খেলেন না। বরং ম্লান হেসে পাঞ্জাবির পকেটে ভরলেন।
আপনি আচ্ছা মানুষ যা হোক। সুচিত্রার বিস্ময়ভরা কণ্ঠে অভিমানের সুর!
সুচিত্রা তুমি একসঙ্গে কত লাশ দেখেছ? ১০০? ২০০? ৩০০? ৪০০? ৫০০? ৬০০? ৭০০? ৮০০? ৯০০?
সুচিত্রার কথাটা শুনে ঋত্বিক ম্লান হাসলেন। ভাবলেন, মানুষ হিসেবে, শিল্পী হিসেবে আমার ভিতরকার যন্ত্রণা কি এই বাহারি আর্ট-কালচারে ডুবে থাকা মেয়েটি টের পাচ্ছে? মেয়েটি একসঙ্গে কত লাশ দেখেছে?
সুচিত্রা বলল, আমি তাহলে যাই ঋত্বিকদা। সৌগত অফিসে অপেক্ষা করছে………।
যুদ্ধের ময়দান ছেড়ে যাবেন না ঋত্বিক!
সুচিত্রা গাড়িতে উঠতে-উঠতে ভাবল: যে ভূখন্ডের অসহায় মানুষের জন্য এই ঋত্বিকদা এই মুহূর্তে তীব্র তাপদাহে পুড়ে যাচ্ছেন, সেই ভূখন্ডে তো ঋত্বিকদা আর কখনোই ফিরে যাবেন না। ঋত্বিকদারা পরিবারসহ ’৪৭ সালেই এ পাড়ে চলে এসেছেন । তবুও … এত বড় ফিল্ম ডিরেক্টর, ভাবলে আশ্চর্য হতে হয়, যে ঋত্বিক ঘটককে জগদ্বিখ্যাত চলচ্চিত্রকারদের সঙ্গে তুলনা করা হয়…সে মানুষটি কেমন নাওয়া-খাওয়া ভুলে জ্বলন্ত ফুটপাতে দাঁড়িয়ে পূর্ব বাংলার শরণার্থীদের জন্য ভিক্ষে করছেন।
এই ভাবনার সঙ্গে দু ফোঁটা অশ্রু যেন পিচ রাস্তায় গড়িয়ে পড়ল।
একে কি বলে? ভালোবাসা? দেশাত্মবোধ? এই একটা জিনিস যা হোক। এ আছে বলেই সব আছে। নইলে পৃথিবী এতদিন টিকে থাকত না। কবে শেষ হয়ে যেত সব!
সুচিত্রা গাড়িতে উঠে বসে।
তারপর সাদা রঙের অ্যাম্বাসেডরটি যান্ত্রিক গুঞ্জন তুলে ধোঁয়া উড়িয়ে চলে যায়।
দেখুন ঋত্বিকের ছবি: তিতাস একটি নদীর নাম
মধ্যাহ্নে তাপদাহে পুড়তে থাকে পার্কস্ট্রিট। আর গনগনে সূর্যের নিচে আহত ক্ষুধার্ত বাঙালি উদ্বাস্তুদের সাহায্যের জন্য ফুটপাতে হাত পেতে দাঁড়িয়ে থাকেন সমসাময়িক বিশ্বের একজন শ্রেষ্ট চলচ্চিত্র পরিচালক।
ঋত্বিক ঘটক তাঁর মনের কথাকে কখনোই তথাকথিত সভ্য মানুষের মুখোশ আঁটা বুলির মতো করে বলতে পারেননি। যা বলতে চেয়েছেন কোনো রকম ভীতি কিংবা ভদ্রতার তোয়াক্কা না করেই বলেছেন সরাসরি। তিনি একবার বলেছিলেন—
‘ছবি লোকে দেখে। ছবি দেখানোর সুযোগ যতদিন খোলা থাকবে, ততদিন মানুষকে দেখাতে আর নিজের পেটের ভাতের জন্য ছবি করে যাবো। কালকে বা দশ বছর পরে যদি সিনেমার চেয়ে ভালো কোনও মিডিয়াম বেরোয় আর দশবছর পর যদি আমি বেঁচে থাকি, তাহলে সিনেমাকে লাথি মেরে আমি সেখানে চলে যাবো। সিনেমার প্রেমে নেশায় আমি পড়িনি। আই ডু নট লাভ ফিল্ম…।’
তাঁর সমালোচকরা বলে থাকেন, ঋত্বিক সিনেমার নেশায় কি পড়বে? বাংলা মদ আর বিড়ির ধোঁয়ার নেশায়ই তো বুঁদ হয়ে আছে। সমালোচকরা সব যুগেই থাকে এবং তারা সমালোচনাও করবে এটাই স্বাভাবিক। তাঁর শুধু সমালোচকই ছিলো না অনেক শুভাকাঙ্ক্ষী ও গুণমুগ্ধ মানুষ ও ছিল। বাংলার অপর কিংবদন্তী পরিচালক সত্যজিৎ রায়কেও বলতে শোনা যায় ঋত্বিকের ভেতর সত্যিকারের শিল্পীর যন্ত্রণা ছিলো।
তবে এটাও ঠিক ঋত্বিক যে মানের নির্মাতা ছিলেন তাঁর যোগ্য সন্মান সে সময় তিনি পাননি, তাই তো তাঁর সময়ের অনেক কুখ্যাত নির্মাতাও তাঁর থেকে বেশি পদক পেয়েছেন। ভারত সরকারের কাছ থেকে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র পরিচালক হিশেবে তিনি ‘পদ্মশ্রী’ পদকে ভূষিত হন ১৯৭০ সালে। যদিও কোন পুরস্কার বা পদকের তোয়াক্কা করতেন না তিনি। কিন্তু, ঋত্বিকরা শতাব্দীতে একবারই জন্মান এবং তাঁরা পদক পাওয়ার জন্যে কাজ করেন না, তাঁরা নিজের মনের তাগিদে, সমাজ ব্যবস্থা পরিবর্তনের তাগিদে কাজ করে যান। আর কাজের মাধ্যমেই তাঁরা নিজেদের প্রমাণ করে যান। তাই তো আজো চলচ্চিত্র জগতের প্রতিটি মানুষের কাছে তাঁর ছবি শিক্ষার জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য মাধ্যম হিসেবে টিকে আছে মাথা উঁচু করে। বাঙালি হিসেবে আমাদের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হলো বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর অসামান্য অবদানের কোনো রকম স্বীকৃতি আমরা দিতে পারিনি আজো! যদিও বর্তমান সরকারের আমলে বাংলাদেশের অনেক অকৃত্রিম বন্ধুকে ভূষিত করা হয়েছে বিভিন্ন সম্মানে বা খেতাবে। দুই বাংলার মিলনের জন্যে নিজের জীবন-মেধা সবকিছু বিলিয়ে দিয়েও ঋত্বিক হয়তো তাদের কাছে এখনো গ্রহণযোগ্যতা পাননি, যেমনটি মূল্যায়ন হননি তিনি ও তাঁর অসামান্য ক্ষুরধার প্রতিভা আমাদের তরুণ প্রজন্মের কাছে। যদিও ঋত্বিক, সত্যজিতের মতো অবিনশ্বর প্রতিভার ‘সিনেমার ইমেজ’-এর সমকালীন সমাজ ব্যবস্থায় নির্মানের প্রচণ্ড গ্রহণযোগ্যতা থাকার পরও বিজ্ঞ নির্মাতার অভাবে বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে নির্মানের পরিমাণ খুবই কম কোন ইমেজকে সম্যকভাবে দর্শকের সামনে তুলে ধরে। চলচ্চিত্র নির্মাণের মহান কারিগর ঋত্বিক ঘটকের কর্ম কালে-কালে বেঁচে থাকবে চলচ্চিত্রপ্রেমীদের মাঝে।

