বই ছাড়া আরও নানা অনুষঙ্গ-উপকরণে একটি মেলা যেভাবে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে, আমাদের বইমেলাগুলো এ পর্যন্ত কখনোই তেমন রূপ পায়নি। কেন পায়নি? তাহলে একটি বইমেলার সার্থকতা পেতে কী-কী ডিসকোর্সের অভাব রয়েছে? অবশ্য যা রয়েছে, তা কিন্তু আমাদের বইমেলাকে ঘিরেই, যেখানে বইবিষয়ক নানা ভাবনার আদান-প্রদান হবে—লেখক-পাঠক-প্রকাশক সম্মিলিতভাবে এমন কোনো সভা সেমিনার কি হয় কখনো? এমন কোনো আয়োজনই হয় না। যেখানে শুধু আলোচনা আর বিতর্কের মধ্যে উচ্চারিত হবে প্রকাশনা শিল্পের সমৃদ্ধির কথা। যেখানে সুদৃঢ় হবে লেখক-প্রকাশক মৈত্রী আর পাঠকে-পাঠকে তৈরি হবে পাঠকবন্ধন।
স্পেস-জনিত মূল সমস্যা তো রয়েছেই। স্বল্প পরিসরের একটি খুপরি স্টলে, বইমেলার যে তাৎপর্য—যাকে বলে, বই প্রদর্শন এবং বিক্রয়-এর পুরোপুরি বাস্তবায়ন সম্ভব হচ্ছে না। এতে আমাদের বইমেলা শুধু বাজারেই পরিণত হচ্ছে না। মোদ্দাকথা মেলার ইমেজ খুঁজতে আসেন যে মানুষগুলো, তারা কখনোই সেই বইমেলা পাচ্ছে না। সেই মেলা হচ্ছেও না। তবে যা হচ্ছে—শুধু বিক্রয় ও বিক্রয় হচ্ছে। এতে করে ক্রমশই বেনিয়া মনোবৃত্তিদের জমায়েতে কাতরাচ্ছে আমাদের বইমেলা। ঐতিহ্যও হারাচ্ছে। কেননা এখনকার বইমেলায় জ্ঞানের পরিচর্যা, পাঠকের কল্যাণ, বিক্রেতাদের সহৃদয়তা লেশমাত্র নেই। অথচ ইউরোপ আমেরিকার সমস্ত পেশার অন্যতম বলে মূল্যায়িত হয় একজন প্রকাশকের কাজকে। কারণ তাঁরা শিল্পের পরিচর্যা করে, গ্রন্থরুচি ও দেশের মান বৃদ্ধি করে, উন্নত ও রুচিশীল লেখা প্রকাশ করেন বলেই তাঁদের এতটা সম্মান দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে আমাদের প্রকাশকরা করেন উল্টোটি। কেউ করেন ‘পাইরেট এডিশন’। কেউ কেই তো বই প্রকাশনার রীতিনীতির তোয়াক্কাই করেন না। উপরন্তু পাঠককে ছাড় দেওয়া, সুযোগ করে দেওয়ার পরিবর্তে নিজেরাই কে কতটা সুবিধে আদায় করে নেওয়া সম্ভব, এমন চিন্তার আবর্তেই ব্যস্ত কেন্দ্রিভূত সবাই।
অন্তত যে স্পেসে প্রকাশক তার সমস্ত বইয়ের কভার মেলে রাখবেন, যা দেখে পাঠক রং-বেরংয়ের বর্ণিল জেল্লায় নিমিষে চোখ জুড়িয়ে নেবেন। মেলাপ্রাঙ্গণে প্রতিদিন যে অগণন বইপ্রেমী, গুণগ্রাহী পাঠক আসবেন, তারা যেন স্বাচ্ছন্দ্যে প্রাণখুলে ডানামেলে উড়তে পারেন প্রত্যেক স্টলের সামনে। বইমেলার আয়োজনে অন্তত সেই অভিকর্ষটুকু থাকা দরকার। মেলা প্রান্তরে চিত্রশিল্পীরা রং-তুলি ক্যানভ্যাস ছড়িয়ে ছবি আঁকবেন, আর যত্রতত্র গায়কী আড্ডায় বসে গান গাইবেন একজন গায়ক, গলা ছেড়ে কবিতা পড়বেন কবি ও আমি—হয়তো বা আমরা সবাই।
মেলায় অবশ্যই বহেরাতলাজুড়ে উন্মুক্ত থাকবে ছোটকাগজের সদ্য প্রকাশিত সংখ্যাগুলোর জন্য। কেননা, সবচেয়ে আকর্ষণীয় এবং সম্ভ্রান্ত হয়ে, এখানেই নিহিত হয় মেলার তীর্থস্থান। যে তীর্থে সারাদেশের লিটলম্যাগকর্মীরা এসে একত্রিত হন। শুধু তাই নয়, সারাদেশের তরুণ, অতিতরুণ, চিরতরুণ সেইসব লেখক-কবি, যারা গাঁটের টিউশনির পয়সায় নিজের একটি বই প্রকাশ করেছেন, তারাও যেন স্বচ্ছন্দেই নিজেদের বইটির পসরা বিছিয়ে বসতে পারেন, এটিও যেন গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করা হয় মেলার নীতিমালায়।
সর্বোপরি বইমেলার বিক্রি ও নিয়মকানুন শৃঙ্খলা ও নীতিমালাগুলো বাস্তবায়নের জন্য সরকারের একচেটিয়া ভূমিকার সঙ্গে যেন একটি সামাজিক কমিটি থাকে, যেখানে প্রকাশক-কবি-লেখক-শিল্পী বইপ্রেমী পাঠকেরাও যুক্ত থাকবেন। তাহলেই আমাদের প্রাণের এমেলা, অন্তত বাণিজ্যমেলা ‘ট্রেড ফেয়ার’ কিংবা বইয়ের বাজার হয়ে উঠবে না। এমন একটি সার্বিক বইমেলা হয়ে ওঠার স্বপ্ন দেখতে ক্ষতি কি!

