জানুয়ারির ২৪ তারিখ এলে আমার মনে পড়ে স্বৈরাচারী এরশাদশাহী কর্তৃক লালদীঘির জনসভায় বোমা হামলায় অনেক মানুষের হতাহত হওয়ার কথা। কিন্তু এটাও সত্য যে, এই ২৪ জানুয়ারি বাংলা সাহিত্যের কবি খালেদ হামিদীর জন্মদিন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যবস্থাপনায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর, কর্মজীবনে জনসংযোগ কর্মকর্তা খালেদ হামিদী একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, গল্পকার, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক এবং সময়ে সময়ে গায়কও।
বাড়ি চট্টগ্রাম হওয়ার সুবাদে তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল সেই আশির দশকে, আমাদের নিয়মিত দুবেলা আড্ডার ঠিকানা সবুজ হোটেলে। মানুষটা ছিলেন মৃদুভাষী, হালকাপাতলা গৌরাঙ্গ তরুণ, বয়সে আমার বছর তিনেক বড় হবেন। সেই তখন থেকে লক্ষ করেছি, মহীবুল আজিজের প্রতি তাঁর বিশেষ পক্ষপাত। তবে হাফিজ রশিদ খান এবং এজাজ ইউসুফীর সঙ্গে বেশ দহরম মহরম ছিল, বিশেষত স্নেহলতার যমুনা থেকে যখন তাঁরা মন রাঙিয়ে ফিরতেন। অপেক্ষাকৃত অনুজ হওয়ায় আমি ঠিক তেমন কাছে ঘেঁষতে পারিনি সেসময়। তারপর ১৯৯১ সাল থেকে তিনি আড্ডায় আসা ছেড়ে দিয়েছিলেন। পরে জানতে পেরেছিলাম, তিনি জীবিকার সন্ধানে সৌদি আরব চলে গিয়েছিলেন। সেই থেকে দীর্ঘদিন আমার সঙ্গে আর যোগাযোগ ছিল না। তিনি ফিরে আসেন ১৯৯৭ সালে। ততদিনে আমি পোস্ট গ্রাজুয়েট কোর্সের শেষ পর্বে থিসিস নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছি ঢাকায়। হামিদী ফিরে আসেন প্রবাসজীবনের ব্যতিক্রমী ভয়ঙ্কর সব অভিজ্ঞতা সঙ্গে নিয়ে, ব্যক্তিজীবনেও ছিল বেশ টানাপোড়েন, যা কবিকে আকন্ঠ নিমজ্জিত করে রেখেছিল বেশ কিছুদিন।
আমি ১৯৯৭ সালের শেষ দিকে চট্টগ্রাম ফিরে আসি। জানতে পারলাম, লিরিক সম্পাদকসহ বেশ কয়েকজন কবি ও সাংবাদিকের সাহচর্যে তাঁরা নিত্য আড্ডায় মেতে উঠতেন বিভিন্ন জায়গায়। অবশ্য তা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। সংসার জীবন তাঁকে সুন্দর ভাবে বাঁচিয়ে তোলে। এরই মধ্যে ১৯৯৯ সালে প্রকাশিত হয় প্রথম কবিতার বই ‘আমি অন্তঃসত্ত্বা হবো’। খালেদ হামিদীর পরের বই ‘হে সোনার এশীয়’ (২০০৪)। এই দুই বইয়ের কবিতা আশির দশকের কবি খালেদ হামিদীকে একজন স্বকীয় কাব্য ধারায় যাত্রার সূচনা করে দেয়, যদিও এই বইটির শব্দ ব্যবহার এবং কিছু কিছু পঙ্ক্তি সেই দিন আমি সেভাবে হজম করে উঠতে পারিনি। আজ বেশ উপলব্ধি করি, সেসময় আমি হয়তো নৈতিকতাবাদে বেশি বেশি আক্রান্ত ছিলাম। যে অভিজ্ঞতার যেমন বিষোদগার প্রয়োজন তা কবিতায় ফুটিয়ে তোলা সম্ভব হয়েছিল বলেই আমি হয়তো বিরূপ প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেছিলাম। কবিতার কাব্যগুণ বাদ দিয়ে শ্লিলতা বিষয়ে বেশি উচ্চকন্ঠ হয়ে উঠেছিলাম। পরে টের পেয়েছি, শব্দ ব্যবহার, ভাষাশৈলী এবং কবিতার বুননের ক্ষেত্রে কবি খালেদ হামিদীর একটা নিজস্ব প্রাঙ্গণ রয়েছে।
এখানে উল্লেখ না করলেই নয় যে, ২০০১ সালে যখন আমার প্রবন্ধের বই “উত্তর আধুনিকতা : এ সবুজ করুণ ডাঙায়” প্রকাশের কাজ চলছিল, তখন কবি খালেদ হামিদী নিজে থেকে এগিয়ে এসে এই বইয়ের প্রুফ দেখে আমার বইটিকে নির্ভুল বানানে প্রকাশের ক্ষেত্রে অসামান্য সহযোগিতা করেন। তাঁর সে ভূমিকা অবশ্য বইটির প্রাককথনে আমি উল্লেখ করেছিলাম।
এদিকে ২০০৩ সাল থেকে আমি কুমিল্লা, সিলেট, আবার কুমিল্লা, বরিশাল, ঢাকায় বদলি হয়ে হয়ে চট্টগ্রাম শহরের সাহিত্য সংস্কৃতি জগতের সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি। তাই হামিদীর পরের বই ‘মুখপরম্পরা’ (২০০৭) আমার হাতে পৌঁছে অনেক দেরিতে। বইটির কবিতাগুলো পড়ে বুঝতে পেরেছিলাম, কবি তাঁর প্রবাস-অভিজ্ঞতা ভুলতে পারেননি। কবির প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা ফুটে উঠেছিল মারাত্মকভাবে, যার জন্য আমি পাঠক হিসেবে কতটা প্রস্তুত ছিলাম তা বলা কঠিন। প্রতিটি কবিতার ভেতরে দৃশ্যকল্পের আড়ালে একটা ইশারায় বলা গল্পের ইংগিত থাকে, যার বাকি অংশ কবিতা বা ইতিহাস নয়, নিজের মনের কল্পনায় পড়ে নিতে হয়। কখনও কোনও শেখের বাড়ির সামনে চলাচলে বাধা, কখনো ঊরসন্ধিতে হাত রেখে তরুণের নিষিদ্ধ আবাহন,
ক)
জগৎ কি মাগো তাহাদেরই শুধু, আমরা কি নই কেউ?
শিখর হইতে শিকড়ে বহিছে উচ্ছিষ্টের ঢেউ।
শীর্ষে তারকা, ঢেকুরের ফেনা, নিম্নে কচুরিপানা;
শ্যাওলার শাক গুঁড়ি গুঁড়ি, খাই, ক্ষোভে কভু হই ফানা।
পুরুষ পশুও তার নারীদের না করে বলাৎকার;
যে কোনো মানবী হত্যা এবং নিগ্রহে ছারখার!
আমাদের কারো অপমরণেও অনেকে নির্বিকার;
নিহত কাকেরও সঙ্গীরা তোলে প্রতিবাদ, হাহাকার।
পৃথিবীর ধন অল্প মানসে বিদ্বেষ কবে পোঁতে?
নদীর সাঁতারু মাছেরাও কহে হাত ধরে চলো স্রোতে।
কারুর বাড়ির সামনে আমার চলা অপরাধ, ক্লিশে!
পিঁপড়েরাও তো প্রাপ্ত খাবার খায় আজো মিলে মিশে।
(জগৎ কি মাগো / মুখপরম্পরা)
খ)
পকেট হইতে ওয়ালেট টেনে অর্থ দেখায় তরুণ;
নিজ উরুসন্ধিতে হাত রেখে নেভাতে চায় কি অরুণ?
এ কী আহ্বান বোধ-অগম্য রিয়াদে নতুন ব’লে;
ক্রমাগত ভাবা –
এরকমই থাবা
আঁকতাম নাকি দীর্ঘ জামায়, বিশাল রুমালে আদতে আরব হলে?
রক্তের নয় নিষিদ্ধ খুশি, রাজার মুলুকে সকলে যে রাজা!
গরিব দেশের নর, তাই পাই খোলা ইশারায় বাজারে নারীর সাজা।
যুদ্ধ বিনাই বিজিত বিধায় পুরুষও মালে-গনিমত;
সাম্প্রদায়িক অভিন্নতায় কী অবিশ্বাস বলবৎ?
(পুরুষেরও পণ্যায়ন/মুখপরম্পরা)
গ)
বহির্দেশের জনসম্পদে ধন্য তোমার ভূমি;
আরবের পথে একদা সে কবে পিছু নিয়েছিলে তুমি?
দু’রিয়াল নিতে অসম্মতির নাছোড় বিশাল দেহ;
ভীষণ বোরকা আপাদমুণ্ডু, চোখও দেখে না কেহ।
তোমারই তুমুল আরবির ঝড়ে বুঝি শুধু দশ রিয়াল;
আইল্যান্ডের খেজুর-বৃক্ষ আমার নয়নে পিয়াল।
বুঝতে পারাই স্বার্থপরতা ব’লেই কি নিজে মঞ্জুল;
আমিও তোমারই মতো মিসকিন
কহিয়া, কৃপণ আমি, সেইদিন,
ছুটে বাঁচি ক’রে ভিক্ষা তোমার ভণ্ডুল?
(আরবের পথে / মুখপরম্পরা)
এদিকে কবি হাফিজ রশিদ খানের অনুরোধে আশির দশকের দশ কবির কবিতা বিষয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সমালোচনামূলক প্রবন্ধ লেখেন হামিদী, যা নিয়মিতভাবে প্রকাশিত হয়েছে ‘সুপ্রভাত বাংলাদেশ’ পত্রিকার সাহিত্য পাতায়। পরে সেসব লেখা সংকলিত হয়েছে ‘কবির সন্ধানে কবিতার খোঁজে’ (২০০৭) বইটিতে। এটা নিঃসন্দেহে বাংলা কবিতার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। হামিদীর পরের বই ‘ধান থেকে শিশু হয়’ কাব্যগ্রন্থটি ২০১০ সালে প্রকাশিত, যা সম্ভবত আমার পড়া হয়ে ওঠেনি।
আমার তিনটি বই একসঙ্গে প্রকাশিত হয়েছিল আমি চট্টগ্রাম ফিরে আসার পর ২০১০ সালে। এপর্যন্ত প্রকাশিত মোট পাঁচটি বইয়ের সব ক’টা একসঙ্গে খালেদ হামিদীকে উপহার দিয়েছিলাম। মাঝে মধ্যে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে খালেদ হামিদীর সঙ্গে দেখা হতো, কথা হতো খুব কম, অনেকটা সৌজন্য বিনিময় যথা। উনি যে এর মধ্যে গল্প লিখেছেন তা আমার অজানা ছিল। হঠাৎ ২০১২ সালে যখন প্রকাশিত হয় তাঁর একমাত্র ছোটগল্প সংকলন ‘আকব্জিআঙুল নদীকুল’, আমি বিস্মিত হয়েছিলাম। এই গ্রন্থ পাঠ করলেই টের পাওয়া যায় গল্পগুলো ছোটগল্পের আঙিনায় নতুন মাত্রা যুক্ত করার প্রয়াস নিয়ে রচিত হয়েছে। যেমন গল্পের ভেতরের কাহিনি, তেমনি তাদের শিরোনাম— ‘সম্পর্ক, লা হাউলা ওয়ালা কুয়াতা, কুয়োপাড়ে উম্মা, ফি নারে জাহান্নামা, আকজিআঙুল নদীকূল, মৃত্যুপরম্পরা, শিরশ্ছেদ, আশরাফুল মাখলুকাত, অনার্যের দৌড়’।
পরের বছর অর্থাৎ ২০১৩ সালে প্রকাশিত হলো নতুন কবিতার বই ‘স্লামডগ, মিলিয়নার নই’, যা কবির কাব্যভাষার স্বকীয়তা এবং ছন্দজ্ঞানের পরিচয় বহন করে। বছর তিনেকের বিরতি সম্ভবত নিবেদিত অনুবাদকর্মের জন্য। হামিদী ‘ওঅল্ট হুইটম্যানের কবিতা’ অনুবাদ করেছেন এবং তা প্রকাশিত হয়েছে ২০১৬ সালে। তাঁর অনুবাদ ছিল বেশ মূলানুগ, আবার তিনি কাব্যিক দ্যোতনাও রক্ষা করেছেন।
একটা বেশ লম্বা সময় কাল ধরে ফরিদ কবির সম্পাদিত মাসিক সাহিত্য পত্রিকা ‘নতুনধারা’তে প্রকাশিত হতে দেখেছি খালেদ হামিদীর অনেক প্রবন্ধ, যেখানে তিনি বাংলা কবিতার অনেক গুরুত্বপূর্ণ লেখকের বই ও কবিতা নিয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন। এই লেখাগুলো ২০১৬ সালে সংকলিত হয় ‘না কবিতা, হাঁ কবিতা’ শিরোনামে। এই বইও স্বাক্ষর রেখেছে কবিতার কারিগরি, উপস্থাপনা এবং ভাবার্থ বিষয়ে লেখকের গভীর অভিনিবেশ। আমরা টের পাইনি, এর মধ্যে ভেতরে ভেতরে কবি লিখে চলেছেন আত্মজৈবনিক অভিজ্ঞতার নিরিখে এক অনন্য উপন্যাস ‘সব্যসাচী’, যা প্রকাশিত হয় ২০১৭ সালে। এই উপন্যাসে লেখক তাঁর অভিজ্ঞতার বর্ণনার সঙ্গে সঙ্গে জীবনচলার পথে যাদের সঙ্গে অম্লমধুর সম্পর্কে জড়িয়েছেন তাদের চরিত্রকে খুব সুক্ষ্ম পর্যবেক্ষণে অবলোকন করেছেন। যখন উপন্যাসটি পড়ছিলাম, তখন মনে হচ্ছিল ঘটনা পরম্পরাগুলো আমি যেন স্বচক্ষে দেখছি। এই উপন্যাস পাঠ শেষে, যতদূর মনে পড়ে, ফেসবুকে আমি ছোট করে মন্তব্য করেছিলাম। এই সময়ে কবি খালেদ হামিদীর সঙ্গে আমার যোগাযোগ অপেক্ষাকৃত ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠে এবং তাঁর সঙ্গে ঘন ঘন দেখা সাক্ষাৎ ও আলাপ আড্ডা জমে ওঠে। আমি যখন প্রাগৈতিহাসিক যুগ ও পৃথিবীর জীববিবর্তনকে মাথায় রেখে কিছুটা ভিন্নধর্মী কবিতাগুলো লিখতে শুরু করেছিলাম, তখন প্রথম তেরটি কবিতা লেখার পরে একদিন তাঁকে আমার বাসগৃহে কবিতা শোনার জন্য আমন্ত্রণ জানাই। তিনি সেদিন সেই কবিতাগুলো পাঠ করে সে রাতেই একটি গদ্য লেখেন ‘নতুন বিজ্ঞান চেতনার কবিতা’ শিরোনামে।
পরবর্তীকালে ২০২২ সালে এই কবিতাগুলোর সঙ্গে শিল্পী তাসাদ্দুক হোসেন দুলুর চিত্রকর্ম সহযোগে বাতিঘর থেকে “পপলার বন মরে পড়ে আছে” শিরোনামে কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। প্রায় সমসময়েই আমি অনুবাদ করি এমিলি ডিকিনসনের প্রায় চল্লিশটি কবিতা। এই অনূদিত কবিতাগুলো কতটা মূলানুগ হলো তা যাচাই করার জন্য কবি খালেদ হামিদীকে অনুরোধ করলে, তিনি সানন্দে সম্মতি জানান এবং আমাদের বেশ কয়েকটি দীর্ঘ সেশনের পরে আমি বইটির পাণ্ডুলিপি চৈতন্য প্রকাশনীকে হস্তান্তর করি।
এদিকে তখন মায়ানমার থেকে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ এবং দেশের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তের অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে কবির কাছ থেকে আমরা উপহার হিসেবে পেয়েছি ‘তুমি কি রোহিঙ্গা মাছি’ (২০১৮)। পরের বছর, অর্থাৎ ২০১৯-এ আবার আমরা পাই প্রবন্ধ গ্রন্থ ‘চেনা কবিতার ভিন্ন পাঠ’ এবং কবিতার বই ‘ঘুমোই চশমা চোখে’। এই কবিতাগুলোতে দেশে বিদেশে বিদ্যমান ও বর্ধিষ্ণু সামাজিক অসঙ্গতির পরিপ্রেক্ষিতে মধ্যবিত্তের নির্বিকার জীবনযাপনকে কটাক্ষ করা হয়েছে। এই ২০১৯ সালে কবি খালেদ হামিদী তাঁর দীর্ঘ কাব্যসাধনা এবং পরিশ্রমসাধ্য সৃজনকর্মের স্বীকৃতি পান। তাঁকে ‘চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন একুশে পদক-২০১৯’ এবং ‘শালুক বিশেষ সম্মাননা পদক-২০১৯’-এ ভূষিত করা হয়।
সাল ২০২০ সারা পৃথিবীর জন্য এক ভয়ঙ্কর অভিশপ্ত কাল। নভেল করোনা ভাইরাসের কারণে সারা বিশ্ব স্তব্ধ-স্তম্ভিত হয়ে পড়ে। সকলের মতো আমিও নিজেকে আড়ালে আবদ্ধ করি। এই বছর হামিদীর কোন বই প্রকাশ হতে দেখিনি। কিন্তু তিনি এ সময় নিজেকে ব্যস্ত রেখেছেন আত্মজৈবনিক ডকুফিকশন রচনায়, যা ২০২১ সালেই প্রকাশিত হয় ‘কিছুই যাবে না ফেলা’ শিরোনামে। এখানেও আমার বেশ কিছু চেনা চরিত্রের সুন্দর উপস্থাপন টের পাই।
কবি খালেদ হামিদীর কবিতা সবসময়ই জীবনঘনিষ্ট এবং সমাজমনস্ক, যার প্রতিফলন আগে যেমন মিলেছে, তেমনি তার নজির মেলে ২০২২ সালে প্রকাশিত ‘আমি কি টাকা তবে?’ গ্রন্থে। তার সঙ্গে সঙ্গে লক্ষ করি, নারীবাদী এবং পুরুষের মর্ষকামিতার বিপরীতে বলিষ্ঠ উচ্চারণ। কয়েকটি উদাহরণ নীচে যুক্ত করা হলো—
ঘ)
অদেখা আগুনের চান্দ্র বিগলন
কিভাবে দুর্লভ হঠাৎ সম্প্রতি,
জানার আগেভাগে, পাঁজর গলে আজ
ফুটিছে নানা ফুল বিরল রঙে খুব।
অথচ এরই নিচে আমারই রক্তের
প্রবাহে ভেসে আসে নিথর কন্যার
অনন্তর দেহ, বলাৎকার কি বা
অগ্নিসংযোগে অকালহৃতপ্রাণ।
এমন ঘটনায় পুষ্প অবনত,
শোণিত ও ফুলের মধ্যে জিজ্ঞাসা:
নারীই থাকে ভ্রূণ আদিতে মানুষের।
পুরুষ তোরা এতো এলি বা কোত্থেকে!
(নারীই থাকে ভ্রূণ)
ঙ)
নিজের মালিকানা হারাই কবে আমি, কোন্ সে মন্দিরে, জানে কি পুরোহিত? হারানো ব্যাবিলনে সেবায় সন্তের বাধ্য নিয়োজনে খোয়াই স্বভাষাও! কেবল তা-ই নয়, দেহের ব্যবসায় ক্রেতার অপঘাতে বদলে যায় মুখ। নিজেকে না চিনেও আয়না জুড়ে হেসে মেখেই চলি চোখে, ঠোঁটেও প্রসাধন।
তবুও কৈশোর থেকে কি ডাকে কেউ আমারই নাম ধরে এখনো, আচানক? নাই তো বিশেষ্য, শুধুই নম্বর। জবাব দিতে তাই সত্যি অক্ষম! কার সে আহ্বান, পুরুষ নাকি নারী? নির্ণয়ের আগে কেন যে স্মৃতি ফুঁড়ে ইশারা ফিরে আসে বখাটে ছেলেদের! তথাপি শুনি তাকে ডিঙিয়ে সবকিছু।
তুমি কি শিস দেবে বাতাসে ঢেউ তুলে? পাখির ভাষা শিখে আসবো চুল খুলে।
(তুমি কি শিস দেবে)
চ)
আমি কি টাকা তবে চাহিবা মাত্রই
বাধ্য সাড়া দিতে? ক্ষেত্র-ফসলের
কর্তা তুমি জানি। যে কোনো সময়েই
চষবে তাই বলে? অষ্টমাংশের
লোভে তো পড়ি নাই তোমার প্রেমে আগে।
ভ্রাতার সম্পদে হিসসা অর্ধেক
মেলে না কখনোই। তবুও ভাই তার
আহত হলে কভু বোনেরই চোখে নামে
মায়ার কোন্ নদী জানার আগেভাগে
বিধবা জননীও নিজেরই ছেলেদের
এ-ঘর ও-বাড়িতে নিয়ত যাযাবর।
(আমি কি টাকা তবে)
আমার কোভিড-বন্দিকালে মহাকাব্যিক আবহে রচিত কবিতার সিরিজ ‘এক সে মেরাজের রাত্রে ঘুমিয়েছি’ লেখার পরে খালেদ হামিদী তা গভীর মনোযোগ সহকারে পাঠ করেছিলেন। পরে ২০২৩ সালে যখন লেখাটি গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হতে যাচ্ছে, তখন খালেদ হামিদীকে ফ্ল্যাপ লেখার অনুরোধ করা হলে তিনি একটি দীর্ঘ তাৎপর্যপূর্ণ সমালোচনা লিখে ফেলেন। পরে তার থেকে নির্বাচিত অংশ ফ্ল্যাপে ছাপা হয়েছিল। আর, মূল লেখাটি একটি অনলাইন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল।
পরিশ্রমী লেখক খালেদ হামিদী সম্ভবত প্রতিদিন প্রতিটি মুহূর্তেই নিজেকে সৃজনশীল রাখেন। তারই ফলশ্রুতিতে ২০২৩ সালে প্রকাশিত হলো আরেকটি উপন্যাস ‘হেলিকপটার ও সোনার তলোয়ার’। তবে, পেশাগত ব্যস্ততার কারণে উপন্যাসটি পাঠ শুরু করেও মাঝপথে বিঘ্ন ঘটায় পড়া শেষ করতে পারিনি। তবে, মনে হয়েছে, এতে আবার ফিরে এসেছে প্রবাসজীবনের অভিজ্ঞতা। এবার দেখছি, শুধু পূর্বাভিজ্ঞতাই নয়, সঙ্গে সংশ্লেষ হচ্ছে বিশ্বরাজনীতি এ মধ্যপ্রাচ্যের প্রেক্ষিত। সর্বশেষ প্রকাশিত কবিতার বই ‘তবুও উপনিবেশ’ (২০২৪) এমন কিছু লক্ষণ ধারণ করেছে।
ছ)
০১.
দিঘল চোঙায় কুকিজ, আবার প্যাকেটে মোজাও, হায়-
বড় দিনপ্রীতি- পেয়ে খুশি মন তখন কোথা হারায়!
কিশোরী হ্যাদার যত উপহার দিয়েই পালালে কাছে
তাদের ভিলার সামনে আলোক জ্বলে ক্রিসমাস গাছে।
বাঙালি মালিরা দৃঢ়চেতা ওর নাম দিলে হায়দার
আড়ালে ওদের কী ঘটে জানার আগেই চমৎকার
বাইকিং সেরে আনে নীল শার্ট তৈরি বাংলাদেশে;
কে কোথায় জানা নেই, তবু ফিরি আজও সে-জামার রেশে।
০২.
ওয়াদি লেবানে মার্কিনিদের আঙিনায় বড় দিনে
কম মজুরির প্রশ্নে সহজে বব থরম্যান কহে:
তেল লুণ্ঠনকারী সরকার পাপের সংগঠন;
রাষ্ট্রগুলোর দংশনে দেখো মজুরের লোহু বহে।
(মধ্যপ্রাচ্যে স্মৃতির ক্রিসমাস)
গতবছর ২০২৫ সালে তাঁর আরও একটি অনুবাদগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। ওরহান পামুকের প্রবন্ধগুলো তিনি খুব সহজপাঠ্যরূপে সাবলীল ভাষায় অনুবাদ করেছেন। প্রকাশিত মৌলিক সৃজনশীল সাহিত্যের বাইরে খালেদ হামিদী সম্ভবত দুটি গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন; তার মধ্যে আলম খোরশেদের সঙ্গে আলাপচারিতা বেশ দীর্ঘ এবং গভীর অনুধাবনের বিষয়। কয়েকদিন আগে ফেসবুক বিজ্ঞাপন থেকে জানতে পারি, এবছর খালেদ হামিদীর কাব্যগ্রন্থ ‘এখনও হইনি ফাঁপা’ প্রকাশিত হতে যাচ্ছে। এমন যার গভীর অভিনিবেশ, সুক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ, তার সঙ্গে যখন যুক্ত হয়েছে স্বকীয় কাব্যভাষা, স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর, তখন তিনি ফাঁপা হবেন কী করে! তিনি কবিতা, গল্প, উপন্যাস, অনুবাদ এবং প্রবন্ধ, সকল ক্ষেত্রেই সিগনেচার রেখে গিয়েছেন, তাই তিনি সময়ে দৃশ্যমান অনেকের মতো ফাঁপা নন, তিনি নীরেট। কবিকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা। শতবর্ষ সৃজনশীল ও সুস্থ থাকুন।

