॥ পর্ব-১১ ॥
রুমের মধ্যে প্রবেশ করে মাত্রা। দাঁড়ায় অনাবিলের সামনে, মন খারাপ কেনো? কার সঙ্গে কথা বলছিলে?
বসে খাটের ওপর অনাবিল, বাসায় কথা বলছিলাম। সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন ছোড়ে আবার, শ্যুটিং হবে না? চলে এলে কেন?
হাসে মাত্রা, বসে অনাবিলের শরীর ঘেঁষে, শ্যুটিং হবে। কিন্তু ইলেকট্রিক কী একটা সমস্যা হয়েছে, মিস্ত্রি ডাকা হয়েছে। ঠিক করছে, আধাঘণ্টা সময় লাগবে। আমি লুসাই ভাইকে বলে চলে এসেছি। আড়চোখে তাকায় অনাবিলের দিকে, হঠাৎ এসে পড়ায় রাগ করেছ?
কেন রাগ করবো? হাত বাড়িয়ে মাত্রার মাথার এলোমেলো চুল ঠিক করতে করতে পাল্টা প্রশ্ন করে অনাবিল, তুমি কী শুইয়ে বিশ্রাম নেবে?
না।
কেন? আদুরে গলায় বলে, আমার ধারণা আধাঘণ্টা শুয়ে বিশ্রাম নিলে তোমার ভালো লাগবে। চোখের সামনেই তো দেখছি, কী পরিশ্রম করছ দুদিনে! হাত ধরে মাত্রার, আমি শুইয়ে দেই, মেকাপ নষ্ট হবে না। চোখ বন্ধ করে শরীর সোজা রেখে শুয়ে থাকো, আমি বসে বসে তোমাকে দেখবো আর লিখবো। লুসাই ফোন দিলেই তোমাকে তুলে দেবো।
কিন্তু মাত্রার মাথাটা নুয়ে আছে অনাবিলের হাতের ওপর। ওর হাতের ওপর মাত্রার শরীরটা হালকা কাঁপছে। বিস্মিত অনাবিল আনন্দ। কাঁদছে মাত্রা। হঠাৎ কী এমন ঘটলো যে কাঁদছে মাত্রা? খুব অপ্রস্তুত লাগছে নিজেকে। কী করবে বুঝতে পারছে না। আবার ইউনিটের কেউ যদি ঢোকে, মহাসর্বনাশ হয়ে যাবে।
মাত্রা, কী হয়েছে তোমার? আমি কী কোনো ভুল করেছি?
দ্রুত নিজেকে সামলে নেওয়ার চেষ্টা করতে করতে মাত্রা মধুরিমা খাট থেকে নামে। হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে ঢোকে বাথরুমে। অনাবিল বোকার মতো রুমের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকে, কেন হঠাৎ কান্নায় ভেঙে পড়লো? নায়িকাদের নানা ধরনের সুপ্ত ইগো থাকে, থাকে মনের বিচিত্র প্রশ্ন, কোথায় কী করলাম? মাত্র দুদিনের সম্পর্ক; একজন মানুষকে এত অল্প সময়ে সম্ভব না। বিপরীতে যদি হয় নারী! আমি কি কোনো চক্রে পতিত হলাম? মাত্রা মধুরিমা ক্ষণে ক্ষণে পাল্টে যায়।
দরজা খুলে বের হয়ে আসে মাত্রা। অনেকটাই স্বাভাবিক। সামানে দাঁড়ায় অনাবিলের, খুব ভয় পেয়েছিলে?
হ্যাঁ, কেনো হঠাৎ কান্নায় ভেঙে পড়লে…
শরীর ঘেঁষে দাঁড়ায় অনাবিলের, রাতে বলবো। এখন যাই শ্যুটিং স্পটে।
যাও কিন্তু আমি তো স্বাভাবিক থাকতে পারবো না মাত্রা।
দুহাতে জড়িয়ে ধরে অনাবিলের গলা, বুকটা রাখে অনাবিলের বুকের ওপর, মুখটা রাখে ওষ্ঠের সঙ্গে, আমার এই নয় দশ বছরের অভিনয় জীবনে কেউ তোমার মতো বলেনি, তুমি ক্লান্ত, একটু বিশ্রাম নাও। আমি ধরে শুইয়ে দেই, ফোন আসলে তুলে দেবো। অনাবিল, কিছুই না তোমার এই অনুভব কিন্তু আমার কাছে অনেক বড়। অনেক বড় পাওনা। চোখে চোখ রাখে, আমি যত অপরাধ করি না কেন, আমাকে সারাজীবন এই প্রেমটুকু দিও, প্লিজ! নিবিড় শান্ত গভীর জলের ভাসান থেকে অমৃতলোকের সুরের মতো মাত্রার প্রকাশকে অনুভব করে অনাবিল আনন্দ।
আমি যাই, ঘণ্টাখানেকের মধ্যে ফিরবো তোমার কাছে, খুব মনোহর যৌনগন্ধে ঠাসা একটা চুমু দিয়ে দ্রুত রুম থেকে বের হয়ে যায় মাত্রা মধুরিমা। স্থানুর পাথরের আনন্দে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে বিছনার ওপর চিৎ শুয়ে নিজের মতো হাসে অনাবিল…জীবন! তুমি এত মধুর কেন?
শুয়ে শুয়েই নিজেকে প্রশ্ন করে অনাবিল, আমি এত সহজে ঢুকে গেলাম মাত্রার ভেতরে? কিংবা মাত্রা আমার ভেতরে? এই সম্পর্ক কি ক্ষণিকের মোহ? দুজনে কিছুই জানা হলো না দুজনার। নায়িকাদের অনেক প্রলোভন থাকে, আমি কি সেই প্রলোভনের সহজ শিকার? অস্বীকার করছি না, মাত্রা মধুরিমা শারীরিক খেলায় অনবদ্য। সৌন্দর্য্যে অতুলনীয়। কিন্তু শরীরের খেলা ও শরীরের চাক চাক মধুভাণ্ডের সৌন্দর্য জীবনযাপনের জন্য সব সময়ে অপরিহার্য নয়। কখনো কখনো বিপদও ডেকে আনে এই অপরিণামদর্শী সম্পর্ক। আমি কী কোনো অপরিহার্য বিপদের দিকে যাচ্ছি? সংসারটা মোটের ওপর ভালোই যাচ্ছে স্ত্রী অনামিকা আলো আর মেয়ে দুটো নিয়ে। কিন্তু গণ্ডগোল পাকায় আলো, আমার বাবা আর ভাইবোনদের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক রাখার ব্যাপারে। জীবন অতিষ্ঠ করে ফেললো।
ভাবনার মধ্যে রুমে ঢোকে শহীদুল, ভাই আমাকে খুঁজছিলেন?
হ্যাঁ বসো।
শহীদুল আলীম পা ছড়িয়ে বসে সোফায়, বিছানা থেকে বসে অনাবিল, আগামীকাল আমি ঢাকা যাচ্ছি না। তোমাদের চট্টগ্রাম আসি আর পাখির মতো উড়ে যাই। এবার দুটো দিন থাকবো।
রহস্যময় হাসি শহীদুলের মুখে, বুঝতে পারছি।
তুমি হাসছ কেন?
হাসতে হাসতে পাল্টা প্রশ্ন করে, কই হাসছি ভাই?
হাসিতে পেটে পড়ে অনাবিল, তুমি একটা পাকা বদমাইশ।
এখন আমাকে কী করতে হবে, বলেন।
চট্টগ্রাম শহরে একটা হোটেলে রুম লাগবে। খুব বড় হোটেল না, মাঝারি মানের হোটেল। আর নিরাপত্তা লাগবে।
রুম কি সিঙ্গেল?
তোমার কী মনে হয়?
আমার তো মনে হয় ডাবল সিট লাগবে।
সবই যখন বোঝো তখন ঝামেলা কর কেন? একটা ডাবল বেডের ব্যবস্থা করো। আবার বলছি, নিরাপত্তার বিষয়টা মাথায় রাখো।
চা খাবেন? উঠে দাঁড়ায় বাংলাদেশের বিশিষ্ট ফল ব্যবসায়ী শহীদুল আমিন।
এক কাপ চা পেলে মন্দ হয না!
বসুন, আমি আসছি, রুম থেকে বের হয়ে যায় শহীদুল।
নিজেকে খুব ফুরফুরে লাগছে অবাবিল আনন্দের। জীবনের বাঁকে বাঁকে কত ফুল, কত কাঁটা লুকিয়ে থাকে, বলা যায় না আগে থেকেই। এই মুহূর্তটাকে যতটা আনন্দদায়ক মনে হচ্ছে, সকালের মুহূর্তগুলো বিষাক্ত হয়ে উঠতে পারে, কোনো কারণ ছাড়াই। জানালার দিকে তাকিয়ে পশ্চিমের লালিমায় মাখা আকাশ দেখছে অনাবিল। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যার দিকে ধাবিত হচ্ছে। ঘড়ির দিকে চমকে ওঠে অনাবিল, প্রায় দু ঘণ্টা হয়ে গেছে মাত্রা গেছে। এতক্ষণ তো লাগার কথা নয়। লুসাই জানিয়েছিল, একটা দৃশ্যর শ্যুটিং হবে বড় জোর এক ঘণ্টা লাগবে। কিন্তু দু ঘণ্টা?
ভাই কী ভাবছেন?
শহীদুল নিজেই ট্রে ভরে চা আর প্রচুর খাবার নিয়ে ঢোকে, এই নিন আপনার চা ও টা।
এত খাবার কে খাবে?
শ্যুটিং শেষ তো! সবাই আসছে।
তাই? এক কাপ হাতে তুলে নিতে নিতেই রুমের সামনে এসে দাঁড়ায় রহমান লুসাই। চোখে মুখে উচ্ছাস, অনাবিল ভাই, আজকে জীবনের শ্রেষ্ঠ শ্যুটিং করলাম।
হাসে অনাবিল, সত্যি?
একেবারে তিন সত্যি। মুক্তিযুদ্ধের এই নাটকটা সেরা নাটক হবে, আর সবটার জন্য আপনিই দায়ী।
চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে প্রশ্ন করে, আমি দায়ী?
নিজে বিস্কুট খেতে খেতে মাথা নাড়ায়, আপনি না বললে তো আমি নাটকে মাত্রাকে নিতাম না। মাত্রা অভিনয় ভীষণ ভালো করে। কিন্তু আজকে সব অভিনয় ছাড়িয়ে গেছে। অসাধারণ।
দৃশ্য কোনটা?
পাকিস্তানের আর্মিরা যখন ওর হাত থেকে চিন্ময়ের খাঁচাবন্ধ ময়না, মানে শাইরকে নিয়ে যায় গুলিবিদ্ধ তপতীর হাত থেকে, সে কী করুণ মর্মান্তিক অভিনয় করেছে, আমার চোখ ফেটে পানি আসছে।
লুসাইয়ের সহকারী হাসান পিঠা খেতে খেতে বলে, আমি তো কেঁদেই ফেলেছিলাম। সত্যি, আপা দারুণ অভিনয় করছে। এই নাটক হিট হবেই।
শুনলেন, সেটের অনেকেই কেঁদেছে।
কিন্তু সেই কান্নায় ভাসানো নায়িকা কই?
রাস্তায়, এ কদিন তো এলাকার ছেলেমেয়েদের ঠেকিয়ে রাখা হয়েছিল অটোগ্রাফের যন্ত্রণা থেকে। বলেছিলাম, শ্যুটিং শেষ হলে অটোগ্রাফ দেবে, ছবি তুলবে। ছেলে বুড়ো বুড়ি সবাই এখন আপনার নায়িকার সঙ্গে ছবি তুলছে, অটোগ্রাফ নিচ্ছে, লম্বা করে চায়ে চুমুক দেয় লুসাই।
ইতোমধ্যে সেটের সবাই বাসায় এসে গেছে। শ্যুটিংয়ের সব কিছু নিচে নামাচ্ছে। গাড়িতে তুলছে। এলাকার কয়েকজন মুরব্বি এসে অনাবিলের সঙ্গে আলাপ করছে। আধাঘণ্টার মধ্যে ডিরেক্টর লুসাই দলবল নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে চলে যায়। ওদের বিদায় দিয়ে রুমে ঢোকে মাত্রা। চোখে মুখে হাসি, বিজয়ের।
মুখোমুখি দাঁড়ায়, জানো শেষ দৃশ্যের শ্যুটিং খুব ভালো হয়েছে।
কে বললো তোমাকে?
লুসাইসহ সেটের যারা ছিল, সবাই বলেছে।
আমিও বলছি, তোমার অভিনয়ের মধ্যে পাকিস্তানি হায়েনা আর্মির গুলিতে নিহত তপতীর ভূমিকায় তোমার অভিনয় অসম্ভব ভালো হয়েছে।
ঠোঁটে রহস্যময় হাসি, তুমি রুমে বসে কিভাবে জানলে?
এভাবে জানি, দুহাতে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে, তুমি অনেক ভালো অভিনয় শিল্পী তপতী চরিত্রের মধ্যে দিয়ে আরও একবার প্রমাণ করলে। মাত্রা?
উহু!
আমাকে ছেড়ে যাবে না তো?
বুকের ওপর থেকে মাথা তোলে, এমন কথা বলছ কেন?
তোমাকে নিয়ে বড় ভয় হয়। আমি লেখক তো, কত চরিত্র আমার লেখায় ফোটে, আমি জানি।
আমি তোমার লেখার চরিত্র হয়ে থাকতে চাই না, আমি তোমার জীবনের সঙ্গে রক্তমাংসের চরিত্র হয়ে থাকতে চাই অনাবিল। বিশ্বাস করো, আমি বড় দুঃখী একটা মানুষ। আমাকে আর দুঃখের নদীতে ছেড়ে দিও না।
মাথার চুলে ওষ্ঠ রাখে অনাবিল, এভাবেই রাখবো তোমাকে।
শহীদুল ফোনে কথা বলতে বলতে রুমের দিকে আসলে দুজনে আলাদা হয়ে সোফায় বসে। রুমে ঢুকেই ফোন কেটে দিয়ে জানান দেয়, কাপ্তাইয়ের প্রায় পাশেই হোটেল কাপ্তাই ইন-এর আটতলার দশ নম্বর রুম আপনাদের জন্য বুকড করে দিলাম।
ভাড়া কত রুমের?
শহিদুল তাকিয়ে হাসে, রুমের ভাড়া এক লাখ টাকা।
বুঝতে পারছে অনাবিল, দুষ্টমি করছে ও।
শহীদুল, ইতোমধ্যে তোমার অনেক খরচ হয়েছে। অন্তত হোটেল ভাড়াটা আমাকে দিতে দাও।
রাইট, সমর্থন করে মাত্রা। গত দুদিনে যা দেখলাম, অবিশ্বাস্য। কত ধরনের যে খাবার আপনি খাইয়েছেন, প্রত্যেকে সুবিধা অসুবিধার দিকে নজর রেখেছেন। নিজের চোখে দেখেছি তো, আপনি খুব ভালো একজন মানুষ ভাই।
আপনি আমাকে ভাই ডাকলেন না?
মাথা ঝাঁকায় মাত্রা, ভাই ছাড়া কী ডাকবো আপনাকে? যেহেতু, অনাবিল স্যারের আপনি প্রিয় ভাই, সেই সূত্রে আমারও ভাই।
এবং ছোট ভাই?
মাথা ঝাঁকায় মাত্রা মধুরিমা, হ্যাঁ ছোট ভাই।
সুতরাং ছোট ভাইয়ের সঙ্গে বেয়াদবি করবেন না।
তিনজনে একসঙ্গে হাসিতে ফেটে পড়ে। হাসির শেষে শহীদুল বলে, অনাবিল ভাই, আমি খুব সকালে একটা কাজে বের হয়ে যাবো। আপনাদের জন্য গাড়ি পাঠিয়ে দেবো ন’টার দিকে। আপনারা যখন ইচ্ছে চট্টগ্রামে চলে যাবেন। ড্রাইভার সুশান্ত হোটেল চেনে। আপনাদের নিয়ে যাবে।
ঠিক আছে, তুমি রুমে দুটি গ্লাসের ব্যবস্থা করো।
মাত্র তো সন্ধ্যা, এখনই শুরু করবেন?
একটু টানি…
ঠিক আছে, ব্যবস্থা করছি, দাঁড়ায় শহীদুল, ভাবী ভালো থাকবেন।
প্রথম মাত্রা মধুরিমাকে ভাবী ডাকে শহীদুল। বিষয়টা খেয়াল করে না অনাবিল কিন্তু মাত্রা হাসে, আপনি একটা মহা শয়তান মানুষ।
হাসে শহীদুল, ভাবী শয়তানীর কী করলাম?
কিচ্ছু করেননি, আপনি খুব ভালো মানুষ। অনাবিল সাহেবের ছোট ভাই না?
তোমাদের মধ্যে আমাকে ঢুকাচ্ছ কেন? প্রতিবাদ করার চেষ্টা করে অনাবিল।
তুমিই তো মূল।
আমি? আমি কী করলাম? ভান করে অনাবিল আনন্দ।
আমি বলি ভাই, দরজার সামনে দাঁড়ায় শহীদুল। আপনি ঢাকা থেকে আসলেন একা, যাবেন দুজন। এটাই তো ইতিহাস! আমার সৌভাগ্য, অমর এই ইতিহাসের সাক্ষী আমি।
শহীদুল, কড়া গলায় ডাক দেয় অনাবিল। বড় বেড়ে গেছ তুমি। যাও, তাড়াতাড়ি দুটো গ্লাস নিয়ে আসো।
যাচ্ছি, শহীদুল চলে যায়।
সঙ্গে সঙ্গে দাঁড়ায় মাত্রা, আমি শাওয়ার নেবো।
আমিও নেবো, অনাবিল গম্ভীর কণ্ঠে বলে।
তুমি আগে যাবে? থমকে দাঁড়ায় মাত্রা।
না, আমি তোমার সঙ্গে শাওযারে যাবো।
দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ায় মাত্রা, তোমার চরিত্র তো জানতাম ভালো। দিন দিন ভালো চরিত্রের প্রকাশ হচ্ছে।
মানে কী? আমি তোমার সঙ্গে শাওযার নিতে পারি না? অভিমানী গলা অনাবিলের।
এগিয়ে এসে সামনে দাঁড়ায়, তুমি যেভাবে চাইবে আমি সেভাবেই তোমার কাছে ধরা দেবো। কিন্তু এটা ছোটভাই শহীদুলের বাসা। ও যেকেনো সময়ে আসতে পারে।
হাসে অনাবিল, আমি মজা করছিলাম মাত্রা। তুমি বাথরুমে যাও, অনেক সময় নিয়ে শাওয়ার নাও। রাতে ছাদে বসে গল্প করবো।
কপালে চুমু খায় মাত্রা, লক্ষ্মী ছেলে।
পরের দিন সন্ধ্যার আগে আগে হোটেল থেকে বের হয়ে পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে যায় মাত্রা ও অনাবিল। মাত্রা নিজের মুখটা কালো ওড়নায় ঢেকে, ওপরে পরেছে ক্যাস্ত্রো ক্যাপ। সকাল দশটার দিকে হোটেলে আসে ওরা। সারাদিন রুমে সময় কাটিয়ে পতেঙ্গার তীরে উদ্দাম হাওয়ার মধ্যে বসে একটা ছাওনির নিচে। বাদাম খুঁটছে, খাচ্ছে টুকটাক গল্প করছে।
অনাবিল?
বলো।
তোমাকে একটা ঘটনা বলি?
নিশ্চয়ই, বলো।
বিয়ে হয়েছে একটা মেয়ের। পারিবারিকভাবেই বিয়ে হয়েছে। মেয়েটি ইন্টারমিডিয়েট পাস করার সঙ্গে সঙ্গে বিয়ে হওয়ার কারণে জীবনের বাস্তবতার অনেক কিছুই বুঝতে পারে না। স্বামী দেখতে শুনতে ড্যাম স্মার্ট। বিদেশে মানে মালয়েশিয়া চাকরি করে। বিয়ের আগে কথা হয়েছিল, বিয়ে করেই মালয়েশিয়া নিয়ে যাবে নতুন বৌকে ছয় মাসের মধ্যে। মেয়েটি হেসে খেলে বেড়ায়, আনন্দে আছে। স্বামী মালয়েশিয়া যাওয়ার আগে বৌয়ের পেটে বাচ্চা দিয়ে যায়। মেয়েটি বুঝতেই পারে না, পেটে বাচ্চা দিয়ে স্বামী ফাঁদ তৈরি করেছে। এত তাড়াতাড়ি বাচ্চা নিতে চায়নি মেয়েটি। কিন্তু পেটে যখন আসছে কী করবে? ইচ্ছের বিরুদ্ধে পেটের শিশুকে মেনে নিতে হয় মেয়েটির। কিন্তু স্বামী মালয়েশিয়া থেকে কোনো খরচ পাঠায় না। নিম্নমধ্যবিত্তের পিতার সংসারে মেয়েটি হয়ে উঠলো আর একটি বড় বোঝা। মেয়েটি সবই বুঝতে পারে কিন্তু নিজের কাছেই নিজে বন্দি হয়ে যায়। পেটের বাচ্চার বয়স যখন পাঁচ মাস, তখন বাচ্চার বাপ অবৈধভাবে থাকার জন্য গ্রেপ্তার হয়ে চলে যায় মালয়েশিয়ার জেলে। স্বামীর বাড়ি থেকে মেয়েটির বাবা মায়ের কাছে চাপ আসে, জামাইকে ছাড়িয়ে আনার জন্য আট লাখ টাকা দিতে হবে।
বলো কী? চমকে ওঠে অনাবিল।
হ্যাঁ, কিন্তু মেয়েটি বিয়ে সংসার সন্তানধারণের মধ্যে দিয়ে জীবনের নির্মম বাস্তবতা বুঝে যায়। ফলে, মেয়েটি পিতা মাতার সামনে দেয়াল হয়ে দাঁড়ায়, ওদের টাকা দেওয়া যাবে না।
বাবা মায়ের বড় আ্দরের সন্তান মেয়েটি। মেয়েটির শান্তি ও সুখের জন্য পিতা জমি বিক্রি করে চার লাখ টাকা দেওয়ার প্রস্তুতি নেয়। মেয়েটির আরও দুটি ভাই বোন। কিন্তু প্রতিরোধের মুখে পিতা পিছিয়ে গেলে শ্বশুর বাড়ি থেকে শেষ অস্ত্র প্রয়োগ করে, টাকা না দিলে তালাক দিয়ে দেবে।
মেয়েটির বাবা মা আত্মীয় স্বজন প্রচণ্ড ভয় পায়। আঠারো বছরের মেয়ে, পেটে বাচ্ছা, ভবিষৎ ভেবে সবাই যখন চিন্তিত তখন রুখে দাঁড়ায় মেয়েটি, আমার জীবন আমার। তালাকের আমি পরোয়া করি না। কিন্তু আমার ছোট দুই ভাইবোনকে বঞ্চিত করে বাবার জমিজমা বিক্রি করতে দেবো না।
আমি মেয়েটির সৎ সাহসের প্রশংসা করি মাত্রা, দারুণ। এভাবে যদি প্রতিটি মেয়ে রুখে দাঁড়ায়, সংসারের অনেক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। কিন্তু অধিকাংশ মেয়েই রুখে দাঁড়াতে পারে না। তো তুমি কি মেয়েটিকে চেন?
চলবে…
অঙ্গার ॥ পর্ব-১০ ॥ মনি হায়দার

