॥ পর্ব-১০ ॥
ভাই! ঘটনাতো আপনি ঘটাই ফেলিচ্ছেন! মজার ছলে বলতে বলতে রহমান লুসাই রুমের মধ্যে এসে বসে বিছনার পাশে। কেমনে কী, কিছুই বুঝতে পারলাম না। আমি তো জানি, আপনি গতকালই প্রথম দেখেছেন ট্রেনে, কিন্তু জাদুমন্ত্র কী করলেন?
শরীর কাৎ করে তাকায় অনাবিল, কী হয়েছে লুসাই? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।
হাসে লুসাই, আপনি কিছুই বুঝতে পারছেন না?
না, তুমি আমাকে আসতে বলেছ, আমি এসেছি তোমার নাটকের শ্যুটিং স্পটে। এইটুকু জানি…
আপনি মাত্রাকে কী করেছেন?
মানে?
কালকের চেয়ে আজকে খুব মনোযোগ দিয়ে কাজ করেছে, বিশ্বাস করবেন কি না, একবারও দৃশ্যের মাঝখানে কাট বলতে হয়নি। দারুণ উৎসাহে ডায়লগ ডেলিভারি দিয়েছে। খুব চেষ্টা করেছে, যেন নাটকটা ভালো হয়। আমাকে আলাদা করে ডেকে আরও বলেছে, গতরাতের একটা দৃশ্যর শ্যুটিং ভালো হয়নি, আমরা সবাই ক্লান্ত আর অধৈর্য হয়ে উঠেছিলাম। বললো, সেই দৃশ্যটা আজকে শ্যুট করার জন্য।
কেন? অবাক অনাবিল।
কেন আবার? নাটকটা যেন আরও ভালো হয়, আমি জানি না আপনি কী করছেন, বিটলামি হাসি লুসাই রহমানের মুখে।
আমি কী করলাম? আমি একজন সাধারণ মানুষ, একটু-আধটু লিখি বটে অনেক বছর ধরে। তেমন খ্যাতিট্যাতি অর্জন করতে পারিনি। যা করার সবই তোমরা করছো!
সবই তো আপনি করছেন।
খুলে কও।
গতরাতে আপনারা ছাদ থেকে কখন নেমেছেন?
মনে নেই। অ্যালকোহল খেতে খেতে মাথাটা ফাঁকা হয়ে যায়…কিছুই মনে নেই আমার।
নেমেছেন আড়াইটার দিকে।
তোমাকে কে বললো?
আমার ইউনিটের একটা ছেলে দেখেছে। ও বাথরুমে যাওয়ার জন্য উঠেছিল।
আরে ধুর! শ্রাগ করে আনন্দ, কী না কী দেখেছে! তুমি আছ…
ভাই, আপনার সঙ্গে ওকে মানাবে কিন্তু!
লুসাই, মারবো কিন্তু তোমাকে! কপট রাগ দেখায় অনাবিল।
মারতে পারেন কিন্তু আমি সত্য। ঢাকায় গিয়ে আপনাদের সম্পর্ক আমি উদযাপন করবো শ্যাম্পেনের বোতল খুলে, আপনারা দুজনেই অতিথি থাকবেন।
লুসাই, একদম চুপ। কেউ যেন না জানে। ওর ক্যারিয়ারের কোনো সমস্যা হোক সেটা কিন্তু আমি একদম চাই না।
আমিও চাই না, কিন্তু আপনার একটা কাজ করতে হবে, রহস্যে ভরা চোখে তাকায় রহমান লুসাই। না করতে পারবেন না কিন্তু বস। না করলে আমি ঢাকায় গিয়ে সাংবাদিক সন্মেলন করে জানিয়ে দেবো।
কী কাজ আগে বলোনা! সিগারেট ধরায় অনাবিল।
আপনি একটা মেগা সিরিয়াল লিখবেন, সিরিয়ালের প্রধান নায়িকা মাত্রা মধুরিমা। আমি ডিরেক্ট করবো এবং সব শালার ল্যাজ কেটে দেবো।
মানে? ল্যাজ কাটাতো বুঝলাম না।
একটু থেমে তাকায় জানালা দিয়ে বাইরে লুসাই, অনাবিল ভাই আপনি জানেন, আমি প্রায় সাত বছর ধরে নাটক ডিরেকশন দেই কিন্তু সবই এক ঘণ্টার। অথচ আমার পরে অনেকে ডিরেকশনে এসে দুই চার দশটা একক নাটক ডিরেকশন দিয়ে সিরিজ নাটক ডিরেকশন দিয়েছে, তাও অনেকটা। কিন্তু একটা সিরিয়াল কী মানুষ বা দর্শক মনে রেখেছে? ওইসব নাটকে মৌলিক কোনো উপাধান আছে? আমি শুধু অপেক্ষা একটা সত্যিকারের স্কিপ্ট আর কয়েকজন প্রকৃত শিল্পীর। আমার মনে হয়, সেই সময় ও সুযোগ আমার কাছে এসেছে, হাত ধরে অনাবিলের, আপনি আমার ইচ্ছে পূরনের রাজা হবেন না?
সিগারেটে টান দিয়ে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকে অনাবিল আনন্দ করুণ মুখের রহমার লুসাইয়ের মুখের দিকে। ওর মুখের সামনে সিগারেটের ধোঁয়া উড়ছে কুণ্ডুলি পাকিয়ে। রহমান লুসাইয়ের প্রস্তাবটা মাথার মধ্যে ঢুকিয়ে অনুভব করার চেষ্টা করে, একটা বড় সিরিয়াল নাটক লিখলে মন্দ হয় না! অনেক দিন ধরে একটা সিরিয়ালের আইডিয়া মাথার মধ্যে পাখির ডানা ঝাপটিয়ে ছটফট করছে। কিন্তু ভালো ডিরেক্টর আর স্পন্সর না পেলে হবে না। পুরোনো দিনের জমিদার বাড়ির ঘটনা।
কী ভাবছেন ভাই? তাড়া দেয় লুসাই, দেখেন একটা ভালো সিরিয়াল হলে আপনি টাকা পেলেন, আমিও পেলাম। সঙ্গের ছেলেপেলেরাও বাঁচলো। অনেক দিনের ইচ্ছে আমার।
কিন্তু স্পন্সর পাবে কোথায়?
আপনি লিখলে আমি স্পন্সর পাবো, স্পষ্ট গলায় বলে রহমান লুসাই। আমার কাছে স্পন্সর আছে। কথা দেন ভাই, আপনি আমার সঙ্গে থাকবেন?
চ্যানেল কোনটা?
এখন চ্যানেল নিয়ে ভাবনার দরকার নেই ভাই। আপনি স্ক্রিপ্ট লিখলে শ্যুটিং শুরু করার আগে আগে একটা ভালো চ্যানেলের সঙ্গে যোগাযোগ করলেই হয়ে যাবে।
বলছ তুমি?
ঘাড় খাড়া করে জবাব দেয় রহমান লুসাই, জি ভাই বলছি। কিন্তু আইডিয়া হতে হবে নতুন আর আকর্ষণীয়। কিন্তু কোনো হাসির নাটক না।
লুসাই, সিগারেটের শেষ অংশ অ্যাসট্রেতে গুঁজে দিয়ে জানালা দিয়ে বাইরে দৃষ্টি রাখে অনাবিল, হাসির নাটকও খারাপ না। কারণ হাসি মানুষকে বেঁচে থাকার প্রেরণা জোগায় কিন্তু এখন হাসির নাটকের নামে যা হচ্ছে টোটালটাই ভাঁড়ামি। ইতরামি। নোংরামি আর ভয়ানক অশ্লীল। তুমি জানো আমি কখনো ভাঁড়ামির নাটক লিখবো না।
আমি জানি ভাই, আপনার একটা কমিটমেন্ট আছে!
দরজায় এসে দাঁড়ায় মাত্রা। গোসল সেরে এসেছে। শরীর ভেজা। মাথার চুলে তোয়ালে প্যাঁচানো। কমনীয় পবিত্র একটা মুখ। চোখ দুটি পদ্মপাতার মতো ভেসে আছে, ঠোঁট দুটো থির থির কাঁপছে, কী হচ্ছে এখানে? আমার খুব খিদে পেয়েছে ডিরেক্টর সাহেব!
আপা, সব রেডি। শুধু আপনার অপেক্ষায় ছিলাম, দাঁড়ায় লুসাই, খাবার এখানে ভাইয়ের রুমে দিতে বলবো?
দরজা রেখে ভেতরে ঢোকে বসে খাটের ওপর, এখানেই দিতে বলুন।
হাই তুলে খাট থেকে নামে আনন্দ, বিষযটা ঠিক হবে না লুসাই।
যেতে যেতে দাঁড়িয়ে যায় লুসাই, কী ঠিক হবে না?
চোখ রাখে অনাবিল খাটের ওপর বসা মাত্রার দিকে, আমাদের ম্যাম বললেন এই রুমে আমাদের জন্য আলাদা করে খাবার দিতে। আমি মনে করি একটি ইউনিটের প্রতিটি মানুষ, যখন সুযোগ থাকে একসঙ্গে পাশে বসে খাওয়ার, সেটাই করা উচিত। আমি ঠিক জানি না, মাত্রা আমার সঙ্গে একমত হবে কি না!
লুসাই আটকে যায় দ্বিধার দুয়ারে। নাটকের প্রধান চরিত্র নায়িকার ইচ্ছের বিরুদ্ধে সব সময়ে যাওয়া যায় না। কিন্তু এখন কোন দিকে যাবে, বুঝতে পারছে না।
মাত্রা উদ্ধার করে, নাট্যকার যথার্থ বলেছেন। চলুন, আমরা সবাই মিলে একসঙ্গে খাই।
অনাবিল আনন্দ মাথা নুইয়ে বো করে, আমি কৃতার্থ ম্যাম।
মুচকি হাসে লুসাই, শহিদুল আলীমের ডাইনিং রুমের বিশাল টেবিলে আপনারা আসুন। চলে যায় লুসাই। অনাবিলের হাত ধরে মাত্রা, মহাশয়ের কাছে অনেক শেখার আছে। চলো, রুমের বাইরে আসতে আসতে হাত ছেড়ে দুজনে ডাইনিং টেবিলের সামনে যায়। খালি দুটি চেয়ারে বসে প্লেটের ভাত মাখতে মাখতে অনাবিল আনন্দ এদিক ওদিক তাকিয়ে হাক ছাড়ে, শহীদুল স্যার?
শহীদুল আলীম রান্না ঘর থেকে উঁকি দেয়, ভাই!
তুমি আসো, একসঙ্গে খাই।
এক মিনিট। আমি আসতেছি, আপনি শুরু করুন।
ওকে। খেতে শুরু করে অনাবিল। পাশে বসা মাত্রাও ভাত ইলিশ মাছের সঙ্গে মিশিয়ে মুখে দেয়। মুখে দিয়েই উচ্ছাসে ফেটে পরে, দারুণ টেস্ট।
লুসাই পানি খাওয়ার পর গ্লাস টেবিলের ওপর রেখে তাকায় মাত্রার দিকে, মাত্রা গতকালের যে দৃশ্যটা তুমি আজকে আবার করতে চাইছো, আমি অনেক ভেবে দেখলাম, করলে ভালোই হয়। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, এই দৃশ্যটা করতে আমাদের কমপক্ষে একঘণ্টা সময় লাগবে। কারণ, একাত্তরের যুদ্ধের সময় পাকিস্তানি আর্মির নৃশংসতা ফুটিয়ে তুলতে আমার মাথায় আরও নতুন আইডিয়া এসেছে। সেটা আমি এই দৃশ্য যুক্ত করতে চাই, যদি তুমি রাজি থাকো। কারণ তোমার কষ্টও বাড়বে।
লুসাই ভাই, কষ্ট আমি করবো, সঙ্গে সঙ্গে সাড়া দেয় মাত্রা, যত কষ্টই হোক। কারণ, আমি চাই মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে এত চমৎকার ও করুণ নাটকটা আরও স্বার্থক হোক।
মাথা নাড়ায় রহমান লুসাই, আরও সমস্যা আছে।
হাসে মাত্রা, লুসাই ভাই আপনি সমস্যার নামতা নিয়ে বসেছেন মনে হয়।
না, গম্ভীর হওয়ার চেষ্টা করছে লুসাই, একঘণ্টা শ্যুটিং করে ঢাকার উদ্দেশে গাড়ি ছাড়তে আরও একঘণ্টা লেট, ঢাকায় পৌঁছুতে রাত হয়ে যাবে অনেক।
লুসাই, মাত্রার ঢাকা পৌঁছানোর ব্যাপারটা আমার ওপর ছেড়ে দাও। তুমি শ্যুটিংটা করো মনের মতো করে। যেহেতু আমাদের প্রিয় এবং সম্মানিত নায়িকা আমাদের একটা গোল্ডেন সুযোগ দিয়েছেন, সেই সুযোগের সৎ ব্যবহার করা উচিত। কী বলো?
গরুর মাংসের হাড় চিবিয়ে হাড় সামনের প্লেটে রেখে লুসাই তাকায় অনাবিলের দিকে, আপনি মাত্রার ঢাকা যাওয়ার দায়িত্ব নিলে আমার শ্যুটিং নিয়েই আমি এগিয়ে যাবো। ও চট্টগ্রামে শ্যুটিংয়ে আসার আগে আমাকে বারবার বলেছে, আগামীকাল ঢাকায় ওর শ্যুটিং আছে। আমার সেটে আসার পর কারও শ্যুটিংয়ের ঘাপলা হোক, আমি চাই না।
লুসাইয়ের সিরিয়াস কথায় মৃদু হাসে মাত্রা মধুরিমা।
তুমি হাসছ কেন?
আমার ভালো লাগছে লুসাই ভাই, আমার মতো ছোটখাটো নায়িকাকেও আপনি গুরুত্ব দেন।
হো হো হো হাসিতে ফেটে পরে রহমান লুসাই, তুমি ছোটখাটো নায়িকা? বাংলাদেশের অর্ধেক নাটক চলে তোমার ওপর, একক আর সিরিয়াল। তোমার ফ্যান ফলোয়ার প্রায় কোটি। তোমাকে গুরুত্ব না দিলে অনাবিল ভাই আমাকে আস্ত রাখবে?
বুঝতে পারলাম এতক্ষণে, খাওয়া প্রায় শেষ করে এনেছে মাত্রা।
কী বুঝলে?
আপনার বড় ভাই, বড় রাইটার অনাবিল ভাইয়ের জন্য আমাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন! দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে একটা মাত্রা, মেয়েদের সত্যিকারের মূল্য কেউ দেয় না।
টেবিলের সবাই হেসে ওঠে।
শহীদুল রান্নাঘর থেকে একটা প্লেট নিয়ে এসে রাখে অনাবিলের সামনে, ভাই আপনার বেগুন ভাজা।
খাওয়া-দাওয়া শেষ, এখন আনলে বেগুন ভাজা? বলতে বলতে একটা পিস তুলে মুখে দেয়, গরমে জিহবা প্রায় পুড়ে যাওয়ার অবস্থা, হা করে বেগুনটা খাওয়ার চেষ্টা করে অনাবিল, আবারও হাসির হল্লা ছোটে খাওয়ার টেবিলজুড়ে।
দেখি কেমন বেগুন ভাজা হলো, এক টুকরো বেগুন ভাজা হাতে নেয় মাত্রা। নিয়েই মুখে দিয়ে খেতে শুরু করে, খাওয়া শেষ করে তাকায় অনাবিল আনন্দের দিকে, কই তেমন তো গরম না।
তুমি বীর, বলেই আর এক টুকরো মুখে দেয় ও, ইতোমধ্যে ভাজা বেগুনের গরম অনেকটা থিতিয়ে এসেছে। ভাজা বেগুনের সঙ্গে দুমুঠো ভাত মিশিয়ে খেয়ে উঠে পড়ে। সঙ্গে সঙ্গে লুসাইও, ভাই আপনি এখন কী করবেন?
আমার কোনো কাজ নেই, রুমে বসে একটা বই পড়তে হবে, আর সময় পেলে একটা ঘুম দেবো।
ঠিক আছে, আমরা শ্যুট করে আসছি… রুম থেকে দলবল নিয়ে বের হয়ে যায় লুসাই রহমান। সঙ্গে সঙ্গে অনাবিলের রুমে ঢুকে জড়িয়ে ধরে মাত্রা, মুখে চুমু খেয়ে চোখে চোখ, বুকের ওপর বুক রাখে, শোনো ঢাকায় আমার যে নাটকের দুদিনর শ্যুটিং ছিল, ক্যানসেল হয়েছে। সুতরাং দুদিন তোমার সঙ্গে চট্টগ্রাম কাটিয়ে ঢাকা যাবো। বুঝতে পেরেছ?
পাল্টা আদর করে অনাবিল, সবই ঠিক আছে কিন্তু ঢাকায় আমার কাজ আছে পরশু, খুব জরুরি।
কয়েক মুহূর্ত অনাবিল আনন্দের চোখের দিকে তাকিয়ে মেনে নেয় মাত্রা, ঠিক আছে। কাজ থাকলে তো যেতেই হবে।
মনটা ভয়ানক খারাপ হয় অনাবিলেব, মাত্রার প্রথম একটা আবদার রাখা যাবে না?
আমি যাই, শ্যুটিং শেষ হলে আমরা সন্ধ্যায় ঘুরতে বের হবো।
নিশ্চয়ই বের হবো।
আবার আদর করে, যাই।
অনাবিলকে ছেড়ে দরজার কাছে যেতে যেতে এগিয়ে গিয়ে হাত ধরে মাত্রার। শোনো, ঢাকায় কাজ যাই থাক, তুমি-আমি আগামী দুটি দিন একসঙ্গে চট্টগ্রামেই কাটাবো।
হাসিতে উদ্ভাসিত মাত্রা, বুকের ওপর মাথা রাখে, শুধু রিস্ক নেওয়ার কী দরকার, যদি তোমার কাজ থাকে ঢাকায়?
কাজই তো জীবন কিন্তু এই মুহূর্তে তোমার সঙ্গে সময় কাটানো আবার বড় কাজ।
আবার জড়িয়ে ধরে পরপর কয়েককটা চুমু খায় মাত্রা মধুরিমা, তুমি আমার যোগ্য প্রেমিক পুরুষ। তুমি ভীষণ সুন্দর।
তুমি আরও সুন্দর।
কারও পায়ের শব্দ পেয়ে ছেড়ে দেয় আলিঙ্গন। দরজায় শ্যুটিং বয়, আপা, লুসাই স্যার…
হাসে মাত্রা, তুমি যাও। এখনই আসছি…
ছেলেটা চলে গেলে মাত্রা আবারও জড়িয়ে ধরে অনাবিলকে, জানো তোমাকে ছেড়ে আমার শ্যুটিংয়ে যেতে ইচ্ছে করছে না। কিন্তু যাবো, বলতে বলতে অনেকগুলো আদর করে এক দৌড়ে রুম থেকে বের হয়ে যায় মাত্রা। দাঁড়িয়ে হাসে অনাবিল আনন্দ, মেয়েটার মধ্যে এক ধরনের তীব্র সরলতা বাসা বেঁধে আছে।
কেবল বিছনায় শরীর দিয়ে মুখের সামনে হাসান আজিজুল হকের আগুনপাখি উপন্যাস খুলেছে, কটকটকট করে মোবাইল বাজে। তাকিয়ে দেখে বউ অনামিকা আলো। ফোন কানে নিতেই ওপাশে রাগত গলা, বাসা থেকে বাইরে গেলে আর বাসার কাউকে মনে থাকে না! চট্টগ্রাম পৌঁছে একবার ফোন দিলে, আর কোনো খবর নাই, সবই বুঝি, নায়িকার সঙ্গে থাকলে সংসার ভুলে জলসা সাজাও! বয়স হয়েছে কত, ছেলেমেয়েরা বড় হয়েছে এখনো লটরপটর গেলো না!
চুপচাপ শুনে যায় অনাবিল, তোমার বলা শেষ?
কেন কী করবা?
কী আর করতে পারি তোমাকে, আমি কিন্তু গতকালও তোমাকে ফোন দিয়েছি, তুমি ফোনের কাছে ছিলে না। ফোন ধরেছে তোমার কন্যা রূপকথা!
ও আমাকে বলেনি।
ঠিক আছে, বলো কী করতে হবে এখন?
তোমার ভাই ফোন দিয়েছে, টাকা চেয়েছে পাঁচ হাজার।
পাঁচ হাজার টাকা কেন?
কেন আবার? লাগবে। তোমার টাকা নিয়ে বউ নিয়ে মৌজ করবে। এখন ভাইয়ের সংসার সামলাও।
ঠিক আছে, আমি ফকরুলকে ফোন দিচ্ছি। আর কী করতে হবে, বলো।
তুমি আসবে কবে?
আমার আসা দিয়ে তুমি কী করবে? তুমি কি বাসায় ঢুকলে আমার দিকে ফিরে তাকাও?
নায়িকারা তাকালেই হয়, আমিতো নায়িকা না, রঙঢং বুঝি না।
রিমঝিম কই? অন্যদিকে নিয়ে যেতে চায় আলোকে।
ঘুমায়।
মেয়েটি কী ঘুমিয়ে জীবন পার করে দেবে?
জানি না, তোমার মেয়ে তুমিই ভালো জানো। শোনো, রিমঝিমের ইউনিভার্সিটির টাকা লাগবে, বিশ হাজার। টাকা না দিলে মেয়ে তোমার অ্যাডমিট কার্ড পাবে না, পরীক্ষাও দিতে পারবে না।
আলো, আমি একসঙ্গে এত টাকা কোথায় পাবো?
সেটা আমি কী করে বলবো?
ফকরুল হারামিটা এখন টাকা চাইলো কেন?
তোমার পেয়ারের ভাই, টাকাতো চাইবেই। বলছি, আর দিও না। দিতে দিতে লাই দিয়ে মাথায় তুলেছো। এতগুলো ছেলেমেয়ে নিয়ে বেকার রাজকীয় জীবন কাটাচ্ছে। সমস্যা কী, ঘাড়ের ওপর বড় ভাই আছে। সে টাকা দেবে নিজের বউ ছেলেমেয়েদর না খাইয়ে!
আলো, ফকরুলের চারটে ছেলেমেয়ে, বয়স মাত্র দশ বছর থেকে তিন বছর। কী মিষ্টি মুখ, ওরা না খাওয়ার অভাবে থাকলে আমি স্থির থাকতে পারি না। ফকরুলকে ঢাকায় চাকরি দিলাম তিন তিনবার, কয়েক মাস করে চলে যায়, খুব বিপদে আছি ওকে নিয়ে।
এসব আমাকে শোনাও কেনো?
আলো, তুমি আমার স্ত্রী। দুটো সন্তানের মা। তোমার দায়িত্ব আছে না? সৌভাগ্য হোক, দুভার্গ্য হোক, আমি সংসারের বড় সন্তান। চারটা ভাইবোনের দায় দায়িত্ব যত কষ্টই হোক, আমার তো! আমার সঙ্গে তোমারও। তুমি বুঝতে চাও না কেন?
তীব্র বেগে রেগে যায় অনামিকা আলো, আমি বুঝে কী করবো? তোমার ভাইবোনের জন্য, তোমার বাবা-মায়ের জন্য আমি কম করেছি? কেউ কোনোদিন আমার পক্ষে একটা কথা বলেছে? সব সময়েই আমার দোষ খুঁজে বেড়ায়! আবার আমি তাদের সেলাম দেবো?
আলো! তোমার ওষুধ আছে?
তুমি কথা ঘোরাবার চেষ্টা করবে না। আর যেন তোমার ভাইবোন আমার বাসায় না আসে!
ভাইয়ের বাসায় ভাইবোন আসবে না কেন আলো?
আমার তিনবোনের কারও বাসায় তো এতো মেহমান, ভাইবোন আসে না গুষ্টিসুদ্ধ! আমি অনেক সহ্য করেছি। আর না।
আলো!
তোমার সঙ্গে আমার কথাই বলতে ইচ্ছে করছে না, ফোন রেখে দেয় অনামিকা আলো। কানের কাছ থেকে ফোনটা সরিয়ে দরজার দিকে দৃষ্টি দিলে, দেখতে পায় স্থির চোখে তাকিয়ে আছে মাত্রা মধুরিমা। হতবাক অনাবিল, তুমি? শ্যুটিং হচ্ছে না?
চলবে…
অঙ্গার ॥ পর্ব-০৯ ॥ মনি হায়দার

