॥ পর্ব-০৭ ॥
আফসার মামা অজু করে উঠোন ছেড়ে সামনের বারান্দায় ঢুকে বলে, নামাজের ওগলাডা দাওতো বনি।
বনি দ্রুত উঠে ঘরের ভেতর থেকে নামাজের হোগলা এনে দেয় মামার হাতে। মামা থেকে থেকে হা-হুতাশ করছে আর খোদা, খোদা আপনি সকল জান পরানের মালিক । আপনি সকলকে দেইখা রাইখেন…বলতে বলতে নামাজের হোগলার ওপর কেবল দাঁড়ায়। সঙ্গে সঙ্গে বাড়িটার দিকে ধেয়ে আসে আলোর বন্যা আর অজস্র মানুষ। প্রত্যেকের হাতে হেরিকেন, ল্যাম্ব নয়তো টর্চ লাইট। অন্ধকারের মধ্যে, নীরবতার মধ্যে কয়েক মুহূর্তে বাড়িটা আলোয় ও মানুষে ভরে যায় জাদুমন্ত্রের মতো।
বনি হতবাক হয়ে তাকিয়ে দেখছে, আসলে কী ঘটছে বুঝতে পারছে না। কয়েকজন মানুষ সাদা কাপড়ে মোড়ানো একটা লাশের খাটিয়া বহন করে সামনের বারান্দায় রাতে উত্তর-দক্ষিণমুখী করে। আগে থেকে একটা চেয়ারে বসে সবকিছু দেখছে বনি, খাটিয়া সামনে রেখে। ঘরের মধ্যে থেকে বড় মা চিৎকার করে বের হয়ে আসে, ভাই এত রাইতে তুমি আমার বাড়ি ক্যা আইচো, বুঝতে পারচি… লাশের মুখের ওপর থেকে কাপড় সরিয়ে জড়িয়ে ধরে। বনি দেখে, লাশটা আব্বার। মা মাসুদা বেগম, ভাই দীপক, বোন মায়া ছায়া কোথায়, জানে না। মনেও পড়ে না ওদের।
বাড়িটা মানুষে মানুষের পরিপূর্ণ। বনি বসে বসে দেখছে আব্বার লাশ। দেখছে মানুষের আসা যাওয়া। একটু আগের খিদে আর মনে নেই। বুঝতে পারছে না, কী করবে? ঘরের মধ্যে মায়ের কান্নার শব্দ পাওয়া যায়। চেয়ার ছেড়ে উঠে যায় মায়ের কাছে। মা আলুথালুভাবে মাটিতে শুয়ে শুয়ে কাঁদছেন। মায়ের মাথার কাছে পাশের বাড়ির ভাবি। ভাবির কোলে ছায়া। পাশেই, মায়ের মাথার কাছে বসে আছে মায়া। বড় মা ফিট। জ্ঞান নেই। আশপাশের নারী পুরুষ মিলে বড় মায়ের জ্ঞান ফেরানোর চেষ্টা করছে। বনির দিকে কেউ ফিরেও তাকায় না। মনে হচ্ছে এই বাড়ির কেউ নয় ও।
মা, বড় মাকে রেখে উঠোনে নামলে দেখতে পায় অজস্র মানুষ জটলা করছে। এগিয়ে আসে পাশের বাড়ির মান্নান চাচা। হাঁটু মুড়ে বসে বুকে জড়িয়ে ধরে শোকার্ত গলায় বলে, তোমার বাবা চইলা গেলো, আমি কবে যামু?
সঙ্গে সঙ্গে বাড়ির উঠোনে সমেবেতজনরা ঘিরে দাঁড়ায়। বনি কাঁদছে না। আসলে সপ্তম শ্রেণীতে পড়ুয়া বনি বুঝে উঠতে পারছে না, মৃত্যু কী? আব্বা না থাকলে ভবিষতের পরিণতি কী হবে, দুই মায়ের সংসারে?
চাচা, আপনে এই রহম হরলে বনিতো কষ্ট পাইবে, পেছন থেকে মান্নানকে দুহাতে ধরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে পাশের বাড়ির দলাই। উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে আবার জড়িয়ে ধরে দলাইকে, তৈয়ব তো কইছিল আগামী মঙ্গলবার আমারে লইয়া ভান্ডারিয়া যাইবে! আমার ট্রানজিস্টারটা ভালো মেকাররে দেহাইয়া ঠিক কইরা দেবে? এহন আমার কী অইবে?
আমরা তো জানি আপনেরা দুই জনে জানের দোস্ত আছিলেন, মন্তব্য করে পূবের বাড়ির বেলালের বাবা রশীদ মিস্ত্রি। কিন্তু মরা বাড়িতে কানতে নাই, ফেরেস্তা আয় না, তুমি তো জানো সবই।
জানি, সবই জানি, কিন্তু আপনে কন তৈয়ব তো আমার চাইয়া তিন বচ্চরের ছোড…
হায়াত ম্উয়াত কারও আতে আছে? রশীদ মিস্ত্রি হাত রাখে আবদুল মান্নানের পিঠে। তুমি শক্ত অও। বনির সামনে কাউন্দো না। ও ছোড মানুষ, কিচুই বুঝতে পারতেছে না। হকলের মুহের দিকে চাইয়া রইচে।
একটু দূরে অনেকের সঙ্গে কথা বলছিল পান্না। পান্নাদের বাড়ি বনিদের বাড়ির দক্ষিণ পাশে। একই মোহন হাওলাদারদের বংশ। সকালে তবিবুর রহমান তৈয়ব বাড়ি থেকে বের হয়ে তেলিখালি গিয়েছিল। সেখানে ছিল পান্না, পান্নার বড় ভাই কাঞ্চন। আগেই থেকেই ঠিক করা ছিল-তিন জনে মিলে তেলিখালি থেকে লঞ্চে রায়েন্দা যাবে। সেখানে পান্নাদের এক আত্মীয়দের জমি আছে। ধানি জমি। সেই বিক্রি করবে। পান্নারা সেই জমি দেখাতে নিয়ে গেছে চাচা তৈয়বকে। যদি পছন্দ হয়,ওদের সঙ্গে তৈয়বও কিনবে।
পান্না কাছে আসতেই প্রশ্ন করে দলাই, পান্না ভাই কনতো কী অইচে?
তেলিখালি থেকে লঞ্চে উঠলাম তিন জনই। আমরা সন্ন্যাসী নামলাম দুপুরের দিকে। নাইমা একটা কেয়ারা নৌকা ভাড়া হরলাম। আমাগো নানাবাড়ি নৌকায় যাইতে ঘন্টাখানেক লাগবে। নৌকায় ছৈয়ের মধ্যে তৈয়ব চাচা আর বড় ভাই কাঞ্চন বইচে। মাঝি নৌকা বাইতেছে। একটু ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা বাতাস। মুই সামনের দিকে বইয়া তৈয়ব চাচার লগে কতা কইতেছি। কতা কইতে কইতে চাইয়া দেহি, চাচায় কেমন জানি মোচারামুচরি করতেছে। মুই জিগাই, কী অইচে আপনের?
দুই আতে চাচায় প্যাড চাইপা ধইরা কইলো, বুঝতে পারতেছি না। পেডে কামড় দিছে।
কাঞ্জন ভাই জিগাইলো, চাচা ঘাডে যাইবেন?
যাইতে পারলে ভালো অইতো, চাচার গলা এক্কেরে করুণ লাগলো।
তোমরা কী হরলা? জিজ্ঞেস করে আবদুল মান্নান।
ভাগ্য ভালো, সন্ন্যাসী খালের মধ্যে ঢোহার মুহেই দুই পারে ঘন জঙ্গল দেইলা মাঝিরে নৌকা ভিড়াইতে কইলাম। মাঝি নৌকা বিড়াইলে নৌকায রাহা একটা বদনায় পানি লইয়া চ্চাা উপরে গেছে জঙ্গলের মইধ্যে। কিছুক্ষণ পর ঘাডের কাম সাইরা চাচা আইসা নৌকায় ওঠে। কিন্ত দেখলাম চাচার শরীলডা ছাইরা দেছে। কোনোভাবে ছৈয়ের মধ্যে ঢুইক্যা শুইয়া পড়লো। আমি চাই কাঞ্চন ভাইয়ের দিকে। কাঞ্চন ভাই চায় আমার দিকে। বুঝতে পারচি পরিস্থিতি খুব খারাপ। যাইতেছিলাম জমিজমার একটা শুভ কামে- এহন পথের মইধ্যে এই বিপদ!
পান্না, মনে অয় মোগো ফিইরা যাওয়া উচিত।
কাঞ্চন ভাইর কতায় আমার একটু রাগ অইলো, আমি কইলাম, ক্যা? চাচায় নৌকায় হুইয়া থাকবে, মোরা যাইয়া জমি দেইখা আইয়া পরমু। লাগে নৌকায়ই বাড়ি যামু।
তৈয়ব চাচার অবস্থাডা ভালো মনে অইতেছে না আমার!
আমি কইলাম, এই রহম ঘাটে আপনে যান নাই? দুই তিন ঘন্টা পর আবার ঠিক অইচেন না? চাচায় ঠিক অইয়া যাইবে। দেহেন, মোরা গিরস্থ মানুষ। সন্ন্যাসী অনেক দূরের পত। লঞ্চেই আগে দেড় দুই ঘন্টা। হের পর নৌকার পথ, আডা পথ। এত কষ্ট কইরা, টাহা পয়সা খরচ কইরা আইলাম।
আহ! তৈয়ব চাচার একটা কষ্টের শব্দ পাইয়া কাঞ্চন চাচা ছৈয়ের মধ্যে ঢুইকা আমারে ডাক দেয়, পান্না!
আমিও ছৈয়ের মইধ্যে মাতা হান্দাইয়াই দেহি তৈয়ব চাচার মুখটা ডাইন পাশে হেইলা গেছে। মুখটা হা, পরানডা নাই… পান্না হাউমাউ কান্নায় ভেঙে পরে। প্রত্যেকে কাঁদছে, পাশে দাঁড়িয়ে পিতার মৃত্যুর করুণ পরিস্থিতি শুনতে শুনতে ভেতরটা একদম গলে যায় এবং কাঁদতে শুরু করে। প্রথম পিতার মৃত্যুর শোক কিশোর মনের মধ্যে তীব্র রেখাপাত করে। বুঝতে পারে, পিতা আর ফিরবে না। কবরের দেশে হারিয়ে যাবে এবং আজ থেকে আমি এতিম। আমার ওপর কোনো ছায়াবৃক্ষ নাই।
বনির মেঝো ভাই শামীম হোসেন বাড়িতে ছিল না। শামীম ছিল ঝিউধারা। মোড়েলগনজ থানার মধ্যেই সন্ন্যাসী ইউনিয়ন। সন্ন্যাসী থেকে প্রায় পনেরো বিশ মাইল দূরের গ্রাম ঝিউধারায় বড় চাচা জালালউদ্দিনের বাড়ি বেড়াতে গেছে। মৃতু জালালউদ্দিনের দ্বিতীয় স্ত্রী বিধবা সুরাইয়া বেগমকে তৃতীয় স্ত্রী হিসেবে বিয়ে করেছে তৈয়ব। তৃতীয় পক্ষেও রয়েছে এক পুত্র সন্তান।
বুদ্ধি করে কাঞ্চন আর পান্না মামা বাড়িতে তৈয়বের মৃত্যুর খবরটা পৌঁছে দেয়। এবং অনুরোধ করে, আপনারা কেউ ঝিউধারা গিয়ে তৈয়ব চাচার মৃত্যুর খবরটা পৌছে দিবেন। মামা বাড়ির একজন সেই দুপুরের পরই রওয়ানা হয়ে যায় ঝিউধারা। এবং সবাই খবর পেয়ে যায় তবিবুর রহমান তৈয়বের মৃত্যুর খবর। মজার ঘটনা, নিজের বাড়ির লোকদের জানার আগেই জেনে যায় বোথলা গ্রামের তবিবুর রহমান তৈয়বের মৃত্যুর খবর।
কাঞ্চন এবং পান্না হঠাৎ অকূল দরিয়ার মধ্যে পরে যায়। সুস্থ একজন মানুষ সকালের নাস্তা খেয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে এলো, দুপুরের পর পরই সেই মানুষটি মৃত! মানুষ কী বলবে? কাঞ্চন ও পান্নার মধ্যে যে দ্বন্দ্বটা ফেনিয়ে উঠেছে, বছর খানেক আগে বনিদের ঘরের সঙ্গেই এক শরিকের জায়গা কিনে বাড়ির মধ্যে ঢুকে পরেছে। এক বাড়ির শরিকের জমি কিনে বাড়ির মধ্যে ঢুকে পরাটা খুবই আপত্তিজনক। সেই আপত্তিজনক কাজটাই করেছে তিন ভাই মিলে। তিন ভাই কাঞ্চন, পান্না আর চুন্নু। চুন্ন আবার বিডিআর এ চাকরি করে। অনেক লড়াই আর চড়াই উৎড়াই পার হয়ে তিন ভাই একটু টাকা পয়সার মালিক হয়েছে। তিন ভাই এক সারিতে তিনটি বাড়িও করেছে। যা এলাকার মানুষের নজর কেড়েছে। কিন্তু এখন এই মৃত তবিবুর রহমান তৈয়বকে নিয়ে কী করবে? তাও গ্রামের বাড়ি থেকে অনেক দূরে, নৌকায় যেতে লাগবে কয়েক ঘণ্টা।
শেষ পর্যন্ত দুই ভাই মিলে আর একটা টাপুরে নৌকা ভাড়া করে, তৈয়বের লাশ তুলে নদী পথে যাত্রা করে ভানডারিয়া থানার বোথলা গ্রামের দিকে। মাঝির সঙ্গে দশ এগার বছরের ছেলে থাকায় সুবিধা হয়েছে। বাপ বৈঠা চালায়, ছেলে গলুইয়ে বসে দাঁড় টানে। সন্ন্যাসীর মোড়ে তিনটি নদীর অনেক বড় মোহনা; পানগুছি নদী, কচানদী আর তুষখালীর খালের পানি মিলে, সমুদ্রের দিকে ছুটতে থাকে স্রোত। সেই স্রোত অতিক্রম করে একটি লাশ বাহী নৌকা চলছে সামনের দিকে।
দাদো, মোর মাতায় তো কিচুই আইতেছে না, পান্না মৃত তৈয়বের পায়ের কাছে বসে বিমর্ষ মুখে নিজেকে প্রকাশ করে।
আমিও বুঝতে পারতেছি না, কারে কি কমু? ক্যামনে কমু? মাইনষে বিশ্বাস করবে মোগো কতা? বদনাম অইবে, সব চাইয়া বড় কতা, তৈয়ব চাচার পোলারা কী কইবে? কী জবাব দিমু? একলগে অনেক প্রশ্ন সামনে রেখে থামে কাঞ্চন, পান্নার বড় ভাই।
বেশি সমস্যা হরবে মাহবুব।
হয়,গত বছর শীতের সমায়ে আমরা যে অগো বাড়ি যাইয়া আমাগো কেনা পোতায় গাছপালা লাগানোর সমায় মাহবুব অনেক ঝামেলা করছে।
ভয়ডা তো হেইহানে। শামীমরে কইলে হয়তো বোঝবে, কিন্ত ম্হাবুব তো বোঝবে না। মামলা হরলে তো শ্যাষ মোরা। মার্ডার কেসের আসামী অইয়া রাস্তায় রাস্তায় ঘোরতে অইবে, একটা কাম হরা যায় না, ফিসফিসিয়ে প্রশ্ন করে পান্না।
কী করতে চাও? নদীর চলমান স্রোতের দিকে তাকিয়ে পাল্টা প্রশ্ন রাখে কাঞ্চন।
লাশটা নদীতে হালাইয়া দিয়া মোরা বাড়ি চইলা যাই।
কাঞ্চন অবাক চোখে তাকিয়ে আছে ছোট ভাইয়ের দিকে। কাঞ্চনের বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। লেখাপড়াও একটু করেছে। বিবেচনাবোধ ভালো।
কেউ টের পাইবে না দাদো।
কাঞ্চন চোখের ইশারায় মাঝি আর মাঝির ছেলেকে দেখায়, ওদের কী হরবি?
অগো হাজার তিনেক টাহা দিয়া দিমু। অরা জীবনেও মুখ খোলবে না।
মৃদু হাসে কাঞ্চন দুঃখের মধ্যেও, এই মাঝিই অইবে আমাগো বিরুদ্ধে পরথম সাক্ষী।
টাহা লাগে বাড়াইয়া দিমু।
কত দিবি?
পাচ হাজার দিমু। পাচ হাজার টাহা মাঝি জীবনে চোহেও দেহে নাই। টাহা পাইলে একদম চুম অইয়া যাইবে।
দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করে কাঞ্চন, না রে পান্না এটা ঠিক অইবে না। কপালের লিখন আমাগো, নাইলে তৈয়ব চাচা আমাগো শত্রুই, হের বাড়ির মইধ্যে শরিকের জমি আমরা কিনমু ক্যা? কিনলামই যদি, হেরে লইয়া সন্ন্যাসী মোগো মামার দ্যাশে জমি কিনতে আমু ক্যা? আইলামই যদি, তয় চাচা তৈয়ব- ভালো মানুষটা মরলো ক্যা? কপালে ছিল এই দুর্ভোগ, কিচু করার নাই। তাকায় মাঝির দিকে, আপনের নৌকায় আর বৈডা আছে?
মাঝি ঘাড় নাড়ায়- আছে। হরবেন?
দেহি কী হরা যায়? কই, কন।
চরাডির নীচে আচে।
চরাডি তুলে আর একটা বৈঠা বের করে কাঞ্চন বাড়িয়ে দেয় পান্নার দিকে, তুই মাথায় যা। দুই দিকে পাও ছড়াইয়া দিয়া বৈডা বাইতে শুরু কর। সন্ধ্যার আগে মোগো বোতলা যাইতে অইবে।
বৈঠা হাতে নিয়ে পান্না আবার বলে, আপনে মোর কতা হোনলেন না?
তোর কতা হোনলে জেলে পচতে অইবে।
ক্যামনে?
মোরা যে তেলিখালি দিয়া লঞ্চে উটছি, গ্রামের অন্তত তিন চাইরজন দেখচে না? আমজেদ চাচা, রেজা ভাই আর কামালের লগে মোরা কতা কইছি। তৈয়ব চাচায় চা খাইলো না, সোমেশ্বর দাদার দোকান দিয়া? চা খাইতে খাইতে তোরে আর মোরে ডাকছে না? সোমেশ্বর দাদা জিগাইলো না, কই যাইতেছেন? তৈয়ব চাচা কয় নাই, কাঞ্চনের লগে সন্ন্যাসী যাইতেছি একটা জমির লেনদেনে,কয় নাই?
পান্না অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে বড় ভাইয়ের মুখের দিকে।
ধর তৈয়ব চ্চাার লাশটা এই নদীতে ফালাইয়া মোরা আত পাও ধুইয়া বাড়ি গেলাম। এক মুহুর্তের জন্য স্থির থাকতে পারবি? তোর মনের মধ্যেই যন্ত্রনা ওঠবে, কামডা কী ঠিক হরলাম? ঘুমাইতেই পারবি না। মাহবুবরা মামলা করলে পুলিশ ধরলেই আমি তুই কইয়া দিমু,তহন ঝামেলা কয়েকশো গুন বাড়বে। আমাগো বউ ছেলেমেয়েরা পড়বে বিপদে। তহন শত শত মানুষ স্বাক্ষী বার অইবে। কইবে , মুই দেকচি পান্না কাঞ্চন আর তৈয়ব চাচারে এক লগে যাইতে ব্যানে..
বুজছি, পান্না ঘাড় বাঁকা করে নৌকার মাথায় গিয়ে দুই পাশে পা ছড়িয়ে দিয়ে নৌকা বাইতে শুরু করে। পাশ দিয়ে বিশাল একটা মালটানা জাহাজ পো পো বাঁশি বাজিয়ে চলে যায়। জাহাজের কারণে নৌকাটা দুলতে থাকে।
কাঞ্চন মনে মনে ঠিক করে, বাড়ি পৌঁছে লাশ ঘাটে রেখেই যেতে হবে আফসার সিকদার মামার কাছে। এই মানুষটা মুরব্বী। বুঝিয়ে বললে, সব বুঝবে। আগে আফসার শিকদারকে তৈয়ব চাচার বাড়ি পাঠিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রেখে, লাশ বাড়িতে ঢোকাতে হবে।
তিন বৈঠার কারণে নৌকা একটু দ্রুত চলছে। বিকেল নেমে আসছে। দুই ভাই, কাঞ্চন বা পান্না কেউ ঘড়ি ব্যবহার করে না। বুঝতে পারছে না, বিকেল ক’টা ভাজছে।
বোঝলেন, মাঝি আরশাদ মিয়া বৈঠা চালাতে চালাতে মুখ খোলে।
কী?
মুই ক্যান আইতে চাই নাই, আপনাগো লগে!
টাহা বাড়াইয়া নেওয়ার লাইগা আইতে চান নাই। সন্ন্যাসীতে এই সমায়ে টাপুরে নৌকাও ছিল মাত্র তিনডা। হেই সুযুগে দাম বাড়াইয়া দিছেন, একটু উষ্মা কাঞ্চনের গলায়।
ঠিক কইলেন না, মুই আইতে চাই নাই,লাশের নৌকা সামনে যাইতে চায় না। গাঙ্গের নবী খোয়াজ খিজির আটকাইয়া রাহে আর কয়, লাশটা মোরে দিয়া যা!
হঠাৎ এক অশরীরী ভয়ে কাঞ্চনের শরীরের লোম খাড়া হয়ে যায়!
চলবে…

