ইতিহাসের পাতায়ও ধুলো জমে, সেই ধুলো কখনো কখনো জমাট বেঁধে যায় শক্ত পাথরের মতো। কখনো কখনো কোনো কোনো সত্যনিষ্ঠ গবেষক-রাজনৈতিক কর্মী এসে সেই ধুলো কিংবা পাথর সরিয়ে ইতিহাসকে বিকৃতি থেকে রক্ষা করে। তবে, সবসময় তা সম্ভব হয় না, আর্থ-সামাজিক-ধর্মীয়-রাজনৈতিক কারণে। আর্থ-সামাজিক-ধর্মীয়-রাজনৈতিক কারণে সৃষ্ট বাস্তবতার আড়ালে যে আপাত বিষয়টি সত্য বলে চালিয়ে দেওয়া হয়, জনতার কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলা হয়, সে ‘মেকি সত্যের’ বিরুদ্ধে দাঁড়ানো প্রবলসত্যসন্ধানীর পক্ষেও সম্ভব হয় না। কথাগুলোর মনে পড়লো ‘জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা’ উপন্যাসটি এই মুহূর্তে পাঠ শেষে। উপন্যাসটির লেখক শহীদুল জহির। এই উপন্যাসটি প্রথাগত উপন্যাসের মতো কোনো একক নায়ক বা কেন্দ্রীয় চরিত্রকে কেন্দ্র করে আবর্তিত না হলেও একটি চরিত্র অবশ্যই রয়েছে। যে চরিত্রটি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অর্থাৎ ১৯৭১ থেকে ১৯৮৫ পর্যন্ত প্রতিটি ঘটনা ও চরিত্রের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত, সেটি আব্দুল মজিদ।
আব্দুল মজিদের যার স্মৃতিচারণ, মানসিক যন্ত্রণা ও ১৯৮৫ সালে উপস্থিত কালের অসহায়ত্বের মধ্য দিয়ে পুরো কাহিনি এগিয়ে চলে। আব্দুল মজিদ মুক্তিযুদ্ধের সময় বদু মাওলানার হাতে তার বোনসহ অসংখ্য নারীকে ধর্ষণের শিকার হয়ে শহীদ হতে দেখেছে। আরও দেখেছে লক্ষ্মীবাজার মহল্লা থেকে পালানোর উদ্দেশ্যে তারা বুড়িগঙ্গা পার হয়ে জিনজিরায় আশ্রয় নিয়েছিল। কিন্তু সেখানেও হানাদার বাহিনী ও তাদের এই দেশীয় দোসর রাজাকাররা হামলা চালায়। মজিদ দেখেছে তাদের আসলে কোথাও পালানোর জায়গা নেই। ফলে নিজের ভিটেমাটিকেই কিছুটা নিরাপদ মনে করে ফিরে এসেছিল।
যুদ্ধের সময় দেশপ্রেমিকরা, মুক্তিযোদ্ধারা একই উদ্দেশ্যে মিলিত হয়েছিল। তখন তাদের শত্রু অভিন্ন ছিল। কিন্তু যুদ্ধশেষে ক্ষমতাবানদের কাছে শত্রুতা-বন্ধুত্বের সংজ্ঞা বদলে গেছে। ফলে ভোটের রাজনীতি, প্রভাবপ্রতিপতিত্বের কৌশলের কাছে শত্রুতা-বন্ধুত্ব নতুন সংজ্ঞা-ব্যাখ্যা তৈরি হয়। সেই ব্যাখ্যার কাছে আব্দুল মজিদরা অসহায় হয়ে পড়ে।
অথচ দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আব্দুল মজিদ ভেবেছিল রাজাকারদের বিচার হবে। কিন্তু রাজাকারদের আর বিচার হয় না। উল্টো আজিজ পাঠানের মতো মেকি দেশপ্রেমিকরা একাত্তরের ঘাতক বদু মাওলানার পুনর্বাসনের সহায়তা করেন। আর বদু মাওলানারাও ভোল-বোল দুটাই বদলে ফেলে। পরন্তু বদু মাওলানা বড় রাজনৈতিক নেতায় পরিণত হয়। অন্যদিকে, মজিদ ও তার মতো সাধারণ মুক্তিযোদ্ধারা সমাজে কোণঠাসা এবং অসহায় হয়ে পড়ে। মুক্তিযোদ্ধারা দেখে, সে বদু মাওলানারা মুক্তযোদ্ধাদের হত্যা করেছিল, সে জন্য কোনো অনুশোচনা নেই, বরং নিজের ছেলের পোষা কুকুর আর রাজাকার আব্দুল গনির মৃত্যুর জন্য শোক করে। পরন্তু রাজাকার আব্দুল গনিকে শহীদ তকমাও দেয়।
আব্দুল মজিদরা দেখে, যে দেশের স্বাধীনতার জন্য তারা লড়েছিল, সেখানে আদর্শের পরাজয় ঘটেছে। বিপরীতে একাত্তরের খুনিরাই সমাজ ও রাজনীতির নিয়ন্ত্রক। তারা ধর্মের দোহায় দিয়ে, শত্রুতা-বন্ধুত্বের নতুন সংজ্ঞা তৈরি করে সমাজে প্রভূত্ব বিস্তার করে। রাজাকারদের গাড়িতে এখন পতপত করে এখন জাতীয় পতাকা ওড়ে। ক্ষমতার পালাবদলে একাত্তরের ঘাতকরা পুনর্বাসিত হয়। সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ‘রাজনৈতিক বাস্তবতা’র যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে হারিয়ে যায়। এসব দেখে-শুনে আব্দুল মজিদের মনে তীব্র ক্ষোভ, ঘৃণা জন্মায়। জন্মায় পরাজয়ের গ্লানি। তাই সে লক্ষ্মীবাজারের জন্মভিটা ত্যাগ করে চিরদিনের জন্য চলে যেতে চায়।
এই উপন্যাসে জীবন ও বাস্তবতার যে চিত্র শহীদুল জহির দেখিয়েছেন, মোটা দাগে, তাকে ৫টি ভাগ করা যায়। সেগুলো হলো:
১। মুক্তিযোদ্ধার নির্মম স্মৃতি ও ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি
২। স্বাধীনতার পর রাজনৈতিক বাস্তবতার নামে রাজাকারদের পুনর্বাসন
৩। মুক্তিযোদ্ধাদের আদর্শিক পরাজয় ও প্রান্তিকীকরণ
৪। ক্ষমতার রাজনীতিতে ইতিহাস ও নৈতিকতার বিকৃতি
৫। তথাকথিত রাজনৈতিক বাস্তবতার কাছে মুক্তিযোদ্ধার ব্যক্তিগত বেদনা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরাজয়
উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র আব্দুল মজিদ। যুদ্ধে সে তার স্বজনদের হারিয়েছে। দেখেছে রাজাকারদের তাণ্ডব। দেখেছে দলে দলে নারী-শিশু জীবনের মায়ায় ভিটেবাড়ি ছেড়ে পালিয়েছে, আশ্রয়ের সন্ধানে। কেউ পেয়েছে, কেউ পায়নি। যারা নিরাপদ আশ্রয় পায়নি, তারা আবার ভিটেমাটিতে ফিরে এসেছে। ফিরে এসে কেউ দেখেছে সব লুট হয়ে গেছে। কেউ এসে প্রাণ হারিয়েছে, সম্ভ্রম হারিয়েছে। ফলে মুক্তিযুদ্ধের ঘটনা একদিকে তার নির্মম স্মৃতির, অন্যদিকে ব্যক্তিগত ট্র্যাজিডিরও। আব্দুল মজিদ দেখেছে, মুক্তিযোদ্ধার স্বজন হারানো, ভিটেমাটি হারানোর বেদনা মুছে দিচ্ছে একাত্তরের পরাজিত শক্তি। তারা মুক্তিযোদ্ধার ট্র্যাজিডির প্রসঙ্গ এলে অতীতের স্মৃতি ভুলে যাওয়ার পরামর্শ দেয়। কিন্তু রাজাকারদের জন্য অশ্রুপাত করে, রাজাকারদের শহীদের মর্যাদা দেয়। এমনকি যুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধার কবরের পাশে রাজাকারের পোষা কুকুরকে কবর দিয়ে মুক্তযুদ্ধকে হেয় করেছিল, সেই কুকুরের জন্য শোক প্রকাশ করলেও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি দেখায় অসম্মান, তাচ্ছিল্য, ঘৃণা। রাজাকারদের সেই কর্মে সায় দেয় তথাকথিত মুক্তিযোদ্ধা ও রাজনৈতিক নেতারাও। তারা রাজাকারদের ভোল পাল্টানোকে স্বাভাবিকভাবেই দেখে, প্রতিবাদ করে না, তাদের বিচারের ব্যবস্থা করে না। পরন্তু নতুন মিত্রতা গড়ে তোলে। ফলে মুক্তিযোদ্ধার ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি ও সামষ্টিক চেতনা সেখানে রাজকারদের দম্ভের কাছে চাপা পড়ে যায়।
শহীদুল জহির তার ‘জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা’ উপন্যাসে দেখিয়েছেন, স্বাধীনতার পর রাজনৈতিক বাস্তবতার নামে রাজাকারদের পুনর্বাসন ঘটেছে। এই পুনর্বাসনে বদু মাওলানার মতো রাজাকারদের বেগ পেতে হয়নি। বরং আজিজ পাঠানদের মতো সমাজপতিরা দেশদ্রোহী-খুনি-রাজাকারদের পুনর্বাসনে ভূমিকা রেখেছেন। তারা আব্দুল মজিদদের বুঝিয়েছে, চিরকাল কেউ কারও শত্রু থাকে না। স্থান-কাল-পাত্র ভেদে শত্রুতা-বন্ধুত্ব নতুন রূপ পরিগ্রহণ করে। এসব চিত্র দেখে আব্দুল মজিদরা ভেতরে ভেতরে আহত হয়েছে, ক্ষুব্ধ হয়েছে, কিন্তু প্রতিবাদ করতে পারেনি। শহীদুল জহির দেখিয়েছেন, পরিবর্তিত রাজনৈতিক পটভূমিতে অসৎ রাজনীতিবিদদের কারণে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ দিনে দিনে মুছে ফেলা হয়েছে। বিপরীতে রাজাকাররা শক্ত আসন গেঁড়ে বসেছে। রাজাকাররা একাত্তরেও সদম্ভে ঘুরে বেড়িয়েছে, মুক্তিযোদ্ধারা-সাধারণ দেশপ্রেমিক মানুষ প্রাণ হাতে নিয়ে পালিয়ে বেড়িয়েছে, যুদ্ধ করেছে, প্রাণ দিয়েছে। স্বাধীন দেশেও এই চিত্রের পরিবর্তন ঘটেনি। পরাধীন দেশে রাজাকাররা যেমন মুক্তিযোদ্ধাদের গাদ্দার বলতো, ভারতের দালাল বলতো, দেশটাকে পাকিস্তানের অংশ দাবি করতো, তেমনি যুদ্ধের পরও একই আচরণ করছে। স্বাধীন দেশেও তারা মুক্তিযোদ্ধাদের গাদ্দার বলে, বেদিন বলে, পাকিস্তানি পতাকা ওড়ায়, রাজাকারদের শহীদ তকমা দেয়। জাতীয় পতাকা গাড়িতে উড়িয়ে রাজাকাররাই দেশের শাসনক্ষমতায় বসে।
শহীদুল জহির দেখিয়েছেন, মুক্তিযুদ্ধের পর দেশপ্রেমিকরা যখন দুমুঠো অন্নসংস্থানের জন্য কঠোর পরিশ্রম করছেন, তখন রাজাকাররা ক্ষমতা ভাগাভাগিতে ব্যস্ত। মানুষের ঘরবাড়ি যুদ্ধের সময় যেমন তারা দখল করেছিল, হিন্দুদের পূজাবেদি থেকে তুলসি গাছ যেভাবে উপড়ে ফেলেছিল, স্বাধীন দেশেও তাই করে বেড়াচ্ছে। রাষ্ট্রযন্ত্র রাজাকারদের এই ন্যাক্কারজনক কর্মকাণ্ডে বাধা দেয়নি। বরং পৃষ্ঠপোষকতা করেছে। শাসকগোষ্ঠীও রাজাকারদের সঙ্গে সন্ধি করেছে, ক্ষমতার ভাগাভাগি করেছে। ফলে মুক্তিযুদ্ধের একধরনের আদর্শিক পরাজয় ঘটেছে। মুক্তিযোদ্ধারা নিরুপায় হয়ে প্রান্তিক শ্রেণীতে পরিণত হয়েছেন।
ক্ষমতার রাজনীতিতে ইতিহাস ও নৈতিকতার বিকৃতি ঘটেছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় যারা হত্যা-লুণ্ঠন করেছে, স্বাধীন দেশে যাদের ফাঁসি হওয়ার কথা ছিল, তাদের সেই শাস্তি হয়নি। পরন্তু খুনি-রাজাকারদের বীরের তকমা দেওয়া হয়েছে। খুনি আব্দুল গনিকে বারবার বীর ও শহীদ বলে আখ্যায়িত করেছে রাজাকার-খুনি-ধর্ষক বদু মাওলানা। বিষয়টিতে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সমর্থন ছিল আজিজ পাঠানোর মতো মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের কারও কারও। এমনকি শাসক গোষ্ঠীরও। ফলে ক্ষমতার রাজনীতিতে ইতিহাস ও নৈতিকতার বিকৃতি ঘটেছে। রাজাকারদের মতো ঘৃণ্য গোষ্ঠীকে যখন রাজাকাররা বীর ও শহীদ তকমা দিচ্ছে, তখন সাধারণ মানুষ গোলকধাঁধায় পড়ছে। তারা বুঝতে পারছে না, আসলে কোন কাজটি ন্যায়সঙ্গত। মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারীরা নীতিবান, না কি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি আদর্শিক শক্তি! ফলে ইতিহাস বিকৃত হতে থাকে স্বাভাবিকভাবেই। সেই বিকৃতি ঠেকাতে পারে না আব্দুল মজিদের মতো সাধারণ দেশপ্রেমিক কিংবা মুক্তিযোদ্ধারা।
যুদ্ধ-উত্তর বাংলাদেশে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায়, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, দেশপ্রেম, শাসনক্ষমতা, শাসক গোষ্ঠীর মতো তথাকথিত রাজনৈতিক বাস্তবতার কাছে মুক্তিযোদ্ধার ব্যক্তিগত বেদনা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনারও বিকৃতি ঘটে। একই ঘটে পরাজয়ও। মুক্তিযোদ্ধারা সর্বত্রই নিগৃহীত হতে থাকেন। বিপরীতে রাজাকাররা নিজেদের কখনো মুক্তিযোদ্ধা দাবি করার সাহস দেখায়, কখনো মুক্তিযুদ্ধকে ভারতের ষড়যন্ত্র বলার ধৃষ্টতা দেখায়, কখনো বা পাকিস্তান ভাঙার চক্রান্ত বলতেও সাহস করে।
শহীদুল জহির মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে বড় যে অস্ত্র সেটি হলো চেতনা। কারণ যেখানেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রসঙ্গ আসে, সেখানে রাজাকার-খুনি-দেশদ্রোহীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। সেখানেই তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে বিদ্রূপ করে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে তারা চেতনাব্যবসায়ী বলারও ধৃষ্টতা দেখায়। শহীদুল জহির বিষয়টিকে ফুটিয়ে তুলেছেন আব্দুল মজিদের মৃত বোনের নামে কন্যার নাম মোমেনা রাখার মাধ্যমে। রাজাকার বদু মাওলার সঙ্গে যখন আব্দুল মজিদের দেখা হয়, তখন সে আব্দুল মজিদকে বলে মোমেনাকে ভুলতো পারোনি? বদু মাওলানার এই প্রশ্নে কেবল জিজ্ঞাসা ছিল না, একাত্তরের নয় মাস বাঙালিকে ভুলিয়ে দিতে না-পারার ব্যর্থতার গ্লানিও ছিল। আবদুল মজিদের মেয়ের নাম মোমেনা রাখায় মহল্লার লোকদের কি প্রতিক্রিয়া হয়, আদৌ কোনো প্রতিক্রিয়া হয় কি না অথবা তারা আদৌ ব্যাপারটি জানে কি না, তা সে জানতে পারে না। তবে, আবদুল মজিদ খেয়াল করে, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সবচেয়ে বেশি মনে আছে বদু মওলানার। উপন্যাসের শেষে বর্ণনা করা হয়েছে,
‘বদু মওলানা এই বিষয়টি ভোলে নাই যে, মোমেনাকে রাজাকারেরা ধরে নিয়ে গিয়ে হত্যা করেছিল এবং সম্ভবত দেশ মুক্ত হওয়ার পর মহল্লায় ফিরে আলাউদ্দিনের মায়ের তাড়া খাওয়ার পর বুঝতে পারে যে, এই জনগোষ্ঠীও কোনো কিছুই ভুলে যায় নাই। কারণ, যে বদু মওলানা, আবদুল মজিদের সঙ্গে অপ্রয়োজনে কথা বলে না, সে একদিন তাকে রাস্তায় থামিয়ে তার বাচ্চা মেয়ের কুশল জিজ্ঞেস করে এবং তারপর বলে, বইনের নামে নাম রাখছো, বইনেরে ভুলো নাইকা? আবদুল মজিদ যে মোমেনার কথা কোনোদিন ভুলবে না সেটা তো আবদুল মজিদের জানাই আছে। কিন্তু বদু মওলানার কথা শুনে তার যা মনে হয়, তা হলো এই যে, বদু মওলানা জানে আবদুল মজিদরা একাত্তরের নয় মাসের কথা ভোলে নাই।’
দীর্ঘ এক অনুচ্ছেদের ছোট উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধ ও পরবর্তীকালের অনেক ঘটনা-চরিত্রের ভেতর দিয়ে কাহিনি আবর্তিত হয়েছে। সে-সব ঘটনা ও কাহিনি মুক্তিযুদ্ধ ও পরবর্তী ঘটনাবলির বর্ণনা রয়েছে সত্য, তারও চেয়ে বড় সত্য হলো, এই মুক্তিযোদ্ধারা মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি কখনো কখনো ভুলে গেলেও রাজাকাররা ভুলতে পারে না। তারা ভুলতে পারে না, তাদের পেয়ারে পাকিস্তান ভাঙার বেদনা। তাই তারা প্রশ্ন করে, ‘বইনের নামে নাম রাখছো, বইনেরে ভুলো নাইকা?’ এই প্রশ্ন সব মুক্তিযোদ্ধা ও দেশপ্রেমিকের প্রতি বদু মাওলানা-রাজাকারদের। শহীদুল জহির দেখিয়েছেন এই মোমেনা নাম শুনে যেমন আঁৎকে ওঠে বদু মাওলানারা, তেমনি অন্যান্য রাজাকাররাও ‘জয়বাংলা’ ধ্বনিকে ভয় পায়। তাই তারা দেশের মানুষের মন থেকে ‘জয় বাংলা’ ধ্বনি মুছে ফেলতে চায়। কিন্তু পারে না।
সবচেয়ে জটিল ও কঠিনতম সত্য হলো, শহীদুল জহিরের ‘জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা’ উপন্যাসটি শিল্পমানের চেয়ে বিষয়-বস্তুর কারণে সাহিত্যপ্রেমী, দেশপ্রেমিকদের কাছে যতটা গ্রহণযোগ্য, ততটাই অগ্রহণযোগ্য বদু মাওলানার মতো রাজাকারদের কাছে। বদু মাওলানা যেমন মোমেনা নাম শুনে আঁৎকে ওঠে, তেমনি রাজকাররাও জয়বাংলা শুনলে কিংবা রাজকারদের কীর্তিকলাপের সমালোচনা দেখলে ভয়ে মুষড়ে পড়ে।
শহীদুল জহিরের লেখকসত্তা ও তার উপন্যাস ‘জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা’ শিল্পবোদ্ধা পাঠক ও দেশপ্রেমিক বাঙালির কাছে চিরপ্রণম্য হয়েই থাকবে। বিপরীতে রাজাকার বদু মাওলানা ও তার অনুসারীরা ভাগাড়েই পতিত হবে। এটাই শিল্পের চিরকালীন রীতি।

