জলে ধুয়ে যায় আলামত
জলে ধুয়ে যায় আলামত, অন্ধকারে নামে জল গলগল ধারা বেয়ে ভুতুড়ে ছাদের
ওপর জলের ট্যাংকি থেকে যতটা নিঃশব্দে মুছে নেয়া যায় পাপ, রক্তদাগ—
পঁচে যাওয়া লাশগুলো ময়নাতদন্তে নিয়ে যাবার পর পুলিশ বেষ্টিত পাহারায় সহসাই
বাসার বিদ্যুৎ নিভে যায় আর অজ্ঞাত দুজনকে ঢুকে যেতে দেখে কথিত আসামীর ভাই
পাগলের মতো সে চিৎকার করে মরণ কান্নায়—জড়ো করে পাড়া প্রতিবেশী, সাংবাদিক
‘আমি দেখেছি একজনের গায়ে লালজামা আরেকজনের গায়ে কী, ঠিকমতো ঠাহর করিনি…
জল ছেড়ে দিছে সব আলামত ধুয়ে নিতে, মিথ্যা মামলায় যদি ফাঁসি দেয় আমার ভাইকে
আমি আত্মহত্যা করব পেট্রোল ঢেলে গায়ে!’
নির্ণীয়মান দ্বিতল বাড়িতে, কী ঘটেছিল বাদুড় নৈঃশব্দ্যে ঘেরা নিশুতি প্রহরে
সরব চারটি প্রাণ, অবসরে যাওয়া স্কুল শিক্ষক ও তাঁর পরিবার—হঠাৎ রইলো পড়ে
তালাবদ্ধ সকলের অগোচরে, চারটি নিথর দেহ—পাড়া প্রতিবেশী শোনেনি কি কোনো
আর্তনাদ, যতক্ষণ না পচনগন্ধ এসে নৈঃশব্দ্য তাড়িয়ে করে চৈতন্য প্রহার?
নাকি ঘাতকেরা বাদুড়ের থেকেও নিঃশব্দ হতে জানে—জীবন ও মৃত্যু কি তাদের হাতে
এত অনায়াস? নিমেষেই নিশ্চিহ্ন একটি পরিবার—দূরালাপে না পেয়ে যখন স্বজনেরা
এসে ভিড় করে বন্ধ দরোজার মুখে, দুর্গন্ধে বাতাস ভারী চুপি চুপি বলে,
‘ওরা আছে সকলেই বাড়ির ভিতরে’—
শয়ন কক্ষের মেঝে পড়ে আছে মুখবাঁধা রক্তে ভাসা সনাতনী শিক্ষকের লাশ
নিহত, অর্ধ বিবস্ত্র স্ত্রী ও তরুণী মেয়ের দেহে ধর্ষণের আলামত—
চোখের কোটর ঠেলে বের হওয়া মেয়েটির চোখ—মুখে, চিবুকে মারের কালশিটে দাগ
প্রাণপণ ধর্ষণ ঠেকাতে বুঝি পড়েছিল অবাধ্য ঘাড়ের ’পর অস্ত্রের আঘাত?
গোপন রাখার স্বার্থে সাংবাদিককে বলেছে ডোম, উভয়ের যোনিপথে পেয়েছে বীর্য সে
সংরক্ষণ করেছে নমুনা তার। শিশু পুত্রটিও পায়নি রেহাই, দ্বাদশবর্ষী জীবন গেছে নিভে
ক্ষমাহীন ঘাতকের হাতে—খৎনা করেছে তারা তাকে কতলের আগে;
মুখমণ্ডল বিকৃত, ঝলসানো ছিল সকলের দাহ্য কোনো পদার্থের নির্মম সংযোগে।
শীর্ষস্থানীয় পুলিশ অফিসার জড়ানো গলায় বলে কুম্ভীরাশ্রু ফেলে :
বড় সজ্জন মানুষ ছিলেন স্যার
. শত্রুতা তার ছিল না যে কারো সাথে
. ইয়াবাখোর দুই আসামি নেশার টানে আসে
. পাশের বাড়ির ছাদ টপকে তারই বাড়ির ছাদে।
. ঘুম ভেঙে যায় স্যারের—
. গামছা গলায় ওঠেন সিঁড়ি বেয়ে
. হাতে নাতে ধরা পড়ার লজ্জা ঢাকতে গিয়ে
. তাঁরই গামছা গলায় দিয়ে ফাঁস
. আসামিরা শ্বাসরোধ করে মারে তৎক্ষণাৎ !
আওয়াজ শুনে স্ত্রী তার
. ত্রস্ত হয়ে যেই সিঁড়িতে রাখেন পা—
. একই ফাঁসে জীবনলীলা সাঙ্গ করে তার !
. মেয়েটি যায় পিছন পিছন ধস্তাধস্তি শুনে
. ফাঁসের মৃত্যু বরণ করতে এতই যে তার সাধ।
. আর ছেলেটি ছিল ঘুমে, ঘুম ভেঙে সে উঠল যখন জেগে
. মৃত্যু নাছোড়, তখনি তার হাত দিয়েছে পেতে—
০২.
অস্ত্রহীন দুজন কিশোর কি পারে চারটি প্রাণ বাধাহীন কেড়ে নিতে?
নেশা করাই উদ্দেশ্য যদি হবে, কেন তারা বেছে নেবে পাশের নির্জন
ত্রিতল বাড়ির ছাদ থেকে ‘লাফ দে’ নেমে’ স্যারের দ্বিতল বাড়ির ছাদ?
আর সে রাতে যে বৃষ্টি ছিল, ইয়াবা সেবন করল কীভাবে খোলা ছাদে?
পুলিশের পরনে ছিল যে শার্ট, কিভাবে তা গেলো ধৃত আসামির গায়ে?
এত দ্রুত কিভাবে পড়লো ধরা আর জবানবন্দিও পাওয়া গেলো সাথে সাথে?
গামছা পেঁচিয়ে মারে যদি তারা, আঙুলের ছাপ গামছায় থেকে যাবে—
পুলিশ কি পাঠিয়েছে সেই আলামত ফরেনসিকের কাছে?
কত আলামত জব্দ হলো, কেন তা ছিল পড়ে হিমঘরে বহুদিন?
কোথা থেকে এলো রক্তমাখা ছুরি এলোমেলো সব নিথর দেহের পাশে?
ঘরে ছিল না বিদ্যুৎ সেই রাতে, কারা কেটেছিল তার রাস্তার ওপর পিলারের মাথা থেকে?
আর কত না মোটরসাইকেল দিয়েছে টহল ঘটনার রাত ও পরের দিন—
অপরাধ কি এটাই, আসামিরা দেখেছে ঢুকতে শিক্ষকের ঘরে অস্ত্র হাতে আততায়ী?
জনৈক পড়শী বলে, ‘কে খুলবে মুখ, সবার মনেই ভয়…
তাদের নিয়তি যদি স্যারের মতন হয়!’
শোনা যায়, আইনি সাহায্য দিতে বান্ধবীকে নিয়ে শিক্ষকপত্নী গিয়েছিলেন
পুলিশ অফিসারের কাছে—রক্ষক যখন ভক্ষক হয় বান্ধবীকে গিলে খেতে
তিনি হন প্রতিবাদী আর পড়ে যান রক্ষকের রোষানলে—
নারীঘটিত কেলেঙ্কারিতে ফেঁসে একবার চাকরি গিয়েছে যার
এবং মিলেছে প্রমাণ উগ্রপন্থীদের সাথে প্রগাঢ় সম্পৃক্ততার।
নির্ণীয়মান বাড়ির জন্য চাঁদা চেয়েছিল কারা?
সাধারণ নির্বাচনে ভোট দিয়েছিল কাকে এই নিহতের পরিবার?
স্খলন করতে সেই অপরাধ কী ছিল উপায় ভীত শিক্ষকের হাতে?
মেয়েটির মনে ছিল কোন ভয়, উত্যক্ত করত কারা তাকে পথে ঘাটে?
জিডি সে কেন করতে চেয়েছিল এবং কার নামে?
ঘুরছে এসব প্রশ্ন জনমনে, এসব প্রশ্নের সদুত্তর নেই জেনে
পুলিশের ভাষ্য মেঘবর্ণে পাল্টায় ক্ষণে ক্ষণে—
জনমনে তাই প্রতিপ্রশ্ন, সন্দেহের দানা বাঁধে :
মধ্যরাতে খুন হলো যারা একবার, গল্প পাল্টে তারাই আবার
মরল ভোরের কালে? খুন হবে যদি ভোরে, ময়নাতদন্ত বলে
খাদ্যে ভরা ছিল কেন তবে মৃতদের পাকস্থলী এবং মূত্রথলি খালি?
না, না, না যেভাবে হোক আসামীরা অপরাধী, প্রমাণ করাটা শুধু সময়ের দাবি
এক ঢিলে কত পাখি মরে—যারা মরে, যারা ধরা পড়ে ও যারা তদন্ত করে
এক সম্প্রদায়ের তারা যে সবাই রাষ্ট্রের শকুনি চালে !
ডোপ টেস্টের রেজাল্ট নেগেটিভ: আসামিদের রক্তে মাদক অনুপস্থিত।

