॥ পর্ব-১১॥
ছোটবেলায় রেলগাড়ি স্বপ্নের মতন ছিল সোনালীর কাছে। বাবার কাছে স্টেশন বাজারে গিয়ে রেলগাড়ি দেখতো। এর ভেতরে উঠতে পারা ওর সাধনা ছিল। এখন নিয়মিত রেলগাড়িতে চড়ে কলেজে যায় সোনালী। এখনো রেলগাড়ির কামরা, স্টেশন ওর কাছে আবেগের জায়গা। কিন্তু রেলগাড়ি র জানালা দিয়ে দিগন্তজোড়া মাঠ, গাছপালার ছুটে চলা ওর আর দেখা হয় না।
লোকাল ট্রেন, বেশিরভাগ সময়েই সিট পাওয়া যায় না। সোনালী ডান হাতে ওপরের রিংটা ধরে থাকে আর বাম হাতে ধরা খোলা বইয়ের দিকে আটকে থাকে ওর দৃষ্টি। প্রথম প্রথম একটু হাসাহাসি, বিদ্রূপ করলেও এখন প্রায় সবাই অভ্যস্ত হয়ে গেছে সোনালীকে পড়তে দেখে। এই সময়ে অফিসযাত্রী বা কলেজের শিক্ষার্থী প্রায় একই লোকজন যাওয়া আসা করে। তাই প্রতিদিন দেখে দেখে সোনালীর পড়ার বিষয়টা একদম স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে সবার কাছে। সোনালীকে দাঁড়িয়ে পড়তে দেখলে প্রায় প্রতিদিন কেউ না কেউ সিট ছেড়ে বসতে দেয়। বিশেষ করে মধ্যবয়স্ক নারীরা সোনালীকে সিট ছেড়ে বসতে দিয়ে যেন আনন্দ খুঁজে পায়। হয়তো একটা নারী অন্য নারীর সংগ্রামের কষ্ট বুঝে সহযাত্রী হতে চায়।
কলেজ যাওয়ার পথে সোনালী খেয়াল করলো বাবা যে দোকানে কাজ করতো, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর সেটা আবার খুলেছে। বাবাকে কথাটা জানালো সোনালী।
সত্যনারায়ণ পরেরদিনই রেলে চেপে পৌঁছে গেলো সেখানে। মালিকের ছেলে দীর্ঘদিন পর দোকান খুলেছে। তবে সেটা এখন আর ওষুধের দোকান নেই। সেখানে ছেলেটা কনফেকশনারির দোকান খুলেছে। বাবার পুরনো বিশ্বস্ত কর্মচারীকে পেয়ে ছেলেটি বেশ খুশি হলো। সত্যনারায়ণ মালপত্র বহন করার অবস্থাতে নেই আর। তাই দোকানে বসে মালপত্র বিক্রিতে সাহায্য করার জন্য সত্যনারায়ণকে সে কাজে রাখলো। মৃত বাবার প্রতি সম্মান রেখে সে সত্যনারায়ণকে কাজে রাখলো। না হলে সত্যনারায়ণের শরীরের যে অবস্থা, তাতে কেউ কাজে রাখবে না তাকে। আভা মা কালীর পুজো করে ধন্যবাদ জানালো তাদের দিকে মুখ তুলে তাকানোর জন্য।
আরও একটা বছর পার হয়ে গেছে। সোনালী সংবাদপত্রে বিভিন্ন চাকরির বিজ্ঞাপন দেখে আবেদন করছে। টাইপিস্ট থেকে পিওন, যেকোনো কাজ পেলে সে করতে রাজি। পড়ালেখার পাশাপাশি সোনালী কিছু একটা করে পরিবারের পাশে দাঁড়াতে চায়। তবে তার স্বপ্ন শিক্ষক হবে। তার জন্য আরো পড়তে চায় সোনালী।
অবশেষে সোনালীর অঙ্গনওয়াড়ী কর্মী হিসেবে চাকরি হলো। বর্ধমানে বিভিন্ন গ্রামে ওকে কাজ করতে হবে। এটা সরকারি একটি প্রকল্পের কাজ। অঙ্গনওয়াড়ী কর্মী হিসেবে পাঁচ বছরের নিচের শিশুদের পড়ানোর দায়িত্ব পেল সোনালী। বেতন শুরুতে ১২০০ রুপি। এতটুকু আনন্দ, অথচ সেটা সত্যনারায়ণের পরিবারকে আনন্দের বন্যায় ভাসিয়ে দিলো যেন। এত আনন্দ পায়নি বহুবছর পরিবারটি। সত্যনারায়ণ মেয়েকে জড়িয়ে ধরে কাঁদলেন। সোনালী জোর করে বোনদের গৃহকর্মীর কাজ থেকে ছাড়িয়ে আনলো। তার সামান্য রোজগার, বাবার দোকান থেকে পাওয়া মাইনে মিলে কষ্ট করে হলেও সংসার চালিয়ে নিতে হবে। বোনদের আর মানুষের বাড়িতে বাসন মাজতে পাঠানো যাবে না। এ কষ্ট সোনালীর বুকে সারাক্ষণ কাঁটার মতো বিঁধে থাকতো। আভা এখন দিনের বেশিরভাগ সময় ঠাকুরঘরের কোণায় পড়ে থাকে। সবার মঙ্গল কামনায় সে ঠাকুরকে ডাকতে থাকে, ক্লান্ত হয় না।
সোনালী বোনদের আবার স্কুলে পাঠানোর চিন্তা করলো। কাবেরীকে ভর্তি করালো স্কুলে। বেবিকে স্কুলে পাঠানোর পরিকল্পনা করলো। ওকে মাধ্যমিক পরীক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা করতে কথা বললো বিভিন্ন শিক্ষকের সঙ্গে। ২-৩ টা স্কুলে গিয়ে কথা বললো শিক্ষকদের সঙ্গে। কিন্তু সবাই জানালো যে এ বছর সময় পার হয়ে গেছে।পরের বছরের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। বেবি এ বছর বাড়িতে বসে পড়ালেখা করবে। পরের বছর সময় মতো রেজিস্ট্রেশন করা যাবে। এ সিদ্ধান্তই হলো। বেবি পড়ালেখা শুরু করলো মনোযোগ দিয়ে।
চলবে…
রাস্তার মাস্টার ॥ পর্ব-১০॥ শারমিন রহমান

