॥ পর্ব-৮॥
ওরা যখন এই জঙ্গলে নতুন বাড়ি করে, তখন ছিল ফেব্রুয়ারি মাস। বেশ ফুরফুরে হাওয়া। গরম ছিল না, মশার উপদ্রবও বোঝা যায়নি। মশারি বা পাখার প্রয়োজন হয়নি। তবে এখন গরম পড়তে শুরু করেছে। গরম পড়তেই মশার উপদ্রব শুরু হয়েছে। মশার যন্ত্রণা পাগল করে দিচ্ছে। সারারাত কারও ঘুম হয় না ঠিকমতো। একটা ছোট মশারি আছে। কয়েক জায়গায় ছেঁড়া। সেলাই করে না হয় কাজ চালিয়ে নেওয়া যেতো। কিন্তু ২ জনের শোয়ার উপযোগী মশারিতে তো আর ৭ জন ঘুমানো সম্ভব নয়। তাই সবাই মিলেই কষ্ট করছে একসঙ্গে। পরদিন ভোর থেকে সত্যনারায়ণ শাল পাতার পাখা বানাতো মনোযোগী হলো। যে গরম আর মশার উপদ্রব, সেখানে পাখা না থাকলে আর চলছে না। সত্য নারায়ণ সারাদিন কাজ করে ৪-৫ টা পাখা তৈরি করে ফেললো।
সারারাত ধরে সত্যনারায়ণ পাখা চালায়। ঘুমের মধ্যেও একটা হাত পাখা চালিয়ে যায়। আভা মাঝে মাঝে সত্য নারায়ণের হাত থেকে পাখা নামিয়ে রাখে। কিন্তু খুবই অল্প সময়ের জন্য। একটু পরই সত্য নারায়ণ পাখা হাতে তুলে নেয়। এদিকে সোনালী, বেবি, কাবেরি পালাক্রমে বাতাস করতে থাকে। দীপু, রুম্পা ঘুমায়। দীপুর মুখের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে সোনালী। দীপু, ওদর ভাই, বড় আদরের ভাই।
জঙ্গলের মধ্যে আর কোনো পরিবার নেই। পুরো জঙ্গলের মধ্যে সত্য নারায়ণের পরিবার একা বাস করে। প্রতিবেশী বলতে আধা কিলো এক কিলো দূরে বাস করা কিছু পরিবার। জঙ্গলের অপর প্রান্ত দিয়ে চলে গেছে রেললাইন। তাও জঙ্গলের ভেতর দিয়ে সরু পথ ধরে ১ কিলোমিটার হাঁটলে রেলস্টেশনের দেখা মেলে। সারাদিনে ৩টা রেলগাড়ি যায়। আশেপাশে কোনো মানুষের বাসবাস না থাকলেও বন্ধু হিসেবে পেয়েছে ওরা শত শত বানর। ছেলেমেয়েরা আতঙ্কে থাকে সারাক্ষণ। যখন তখন জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এসে হাতের খাবার, পানির গ্লাস কেড়ে নিয়ে যায়। হঠাৎ করে লাফ দিয়ে সামনে চলে আসে, দাঁত বের করে ভেংচি কাটে। ছেলেমেয়েরা হাতের খাবার, প্লেট, গ্লাস যা থাকে ফেলে দৌড়ে পালায়। বাড়িতে চিৎকার, চেঁচামেচিতে ভরে থাকে সারাক্ষণ। ঘরের চালার লাল টালির ওপর সারাক্ষণ দাপিয়ে বেড়ায় বানর। আভার শরীর খুব খারাপ হয়ে পড়েছে। বুক ধড়ফড় করে সবসময়। জীবনের এ যুদ্ধ কবে যে শেষ হবে জানে না আভা। ভগবানকে দিনরাত ডেকেও কোনো সমাধান হলো না জীবনের।
খরগোশ খুব ভালো লাগে দীপুর। কিন্তু খরগোশ কাছে আসে না। জঙ্গলের ভেতর দিয়ে পাতার ফাঁকে হঠাৎ চোখজোড়া চকচক করে জ্বলে ওঠে খরগোশের। দীপু হাততালি দিয়ে ওঠে। খরগোশের পেছনে ছুট লাগায়। কিন্তু খরগোশ নিমিষেই হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। দীপু তাই খরগোশ দেখার লোভে জঙ্গলে ঘুরে বেড়ায়। তবে দীপু এখন আর খরগোশের পেছনে ছুটে বেড়ায় না। নীরবে তাকিয়ে থাকে, খরগোশও তাকিয়ে থাকে, হাসে। দীপুও হাসে। যেন চোখে চোখে কথা হয়। প্রকৃতির সান্নিধ্যে থাকতে দীপুর ভীষণ ভালো লাগে। একটা ছোট্ট ঘরে সবাই মিলে থাকতে একদম ভালো লাগে না দীপুর। এর থেকে জঙ্গলে কাটানো সময় তার বেশি প্রিয়। বানরগুলোকে এখন আর ভয় পায় না ওরা। দিদিরা, মা এখন খাবার লুকিয়ে রাখে। ঘরের মধ্যে ঝোলানো ঝুড়িতে খাবার তুলে রাখা হয়। দীপু আর ওর দিদিরা মিলে বানরগুলোর নাম দেয়। কিন্তু সবগুলো একইরকম দেখতে হওয়ায় ওরা বুঝতে পারে না কার কী নাম। মাঝে মাঝে ওদের মনে হয় একটি বানরকেই নানারকম নাম দিয়ে ফেলছে হয়তো ওরা। ক্লান্ত হয়ে নাম দেওয়ার খেলা বন্ধ করে দেয় ওরা। বানর ছাড়াও ওদের খেলার সঙ্গী বেজি, লাল রঙের ছোট শেয়াল।
আভা বাইরে একটা কাঁঠাল গাাছের নিচে রান্না করে। সেখানেই উনুন তৈরি করে নিয়েছে। কাঁঠাল গাছে রশি টানিয়ে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ঝুলিয়ে রাখে আভা। বানর, বেজি, শেয়াল দেখে বিরক্ত হলেও এখন অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে সবাই। শুধু আভা বা তার ছেলেমেয়েরা নয় এই প্রাণীগুলোও ধীরে ধীরে সত্য নারায়ণের পরিবারকে মেনে নিয়েছে।
আশেপাশের গ্রামগুলোতে যাওয়ার কোনো পাকা রাস্তা নেই। জঙ্গলের ভেতর দিয়েই চলাচল করতে হয়। গ্রামের বাইরের দিকে বেশ কিছু খামার আছে। তবে সবার বাড়িতেই বিদ্যুৎ নেই। যাদের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো কেবল তাদের বাড়িতেই বিদ্যুতের ব্যবস্থা আছে। কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন দিলে হয়তো সবাই বিদ্যুৎ পেতো কিন্তু সঠিক নেতৃত্ব দেওয়ার মতন তেমন কেউ ছিল না সেখানে। সোনালীর দায়িত্ববোধ অনেক। পড়ালেখার প্রতি ঝোঁক প্রবল। মানুষের বাড়ি থেকে স্লেট, বই, চক জোগাড় করে এনেছিলো আভা। সোনালী, বেবি এসব বই স্লেট নিয়ে ২ কিলোমিটার পায়ে হেঁটে বিদ্যালয়ে যেতে শুরু করে। সোনালী নিজেকেই যেন নিজে কথা দেয়, পড়ালেখা করে তাকে বাবা- মায়ের পাশে দাঁড়াতেই হবে। তাদের অভাব দূর করতে হবে। তাই ২ কিলোমিটার হেঁটে স্কুলে যাওয়া সোনালীর কাছে আনন্দের। সোনালী কোনো অবস্থাতেই স্কুল কামাই করতে চায় না। কিন্তু বেবি ছিল একটু আলাদা। স্কুলে সোনালী গেলেও বেশিরভাগ দিনেই বেবি শেষ পর্যন্ত স্কুল পালিয়ে বাড়ি ফিরে আসে। সপ্তাহে ৪ দিন দিদি সোনালীর সঙ্গে স্কুলে যায় বেবি। কিন্তু ছুটি হওয়া পর্যন্ত স্কুলে বসে থাকার ধৈর্য্য নেই তার। বেবির বাড়ির কাজে মনোযোগ বেশি। বাড়িঘর পরিষ্কার রাখা, গুছিয়ে রান্না করতে ভালোবাসে বেবি। বেবির পড়া খুব দ্রুত মুখস্থ হয় কিন্তু তার মনোযোগ সবচেয়ে বেশি ঘরকন্নার কাজে। কিন্তু সোনালী পড়ালেখা করে চাকরি করবে এবং বাবা মায়ের পাশে থাকতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। সোনালী তার স্কুলের বারান্দা থেকে বাবার দোকান দেখতে পায়। বাবার মুখটা দূর থেকে অস্পষ্ট দেখতে পায় সোনালী। অস্পষ্ট মুখটা দেখে বুকের মধ্যে হুহু করে ওঠে।
চলবে…
রাস্তার মাস্টার ॥ পর্ব-৭॥ শারমিন রহমান

