॥ পর্ব-৭॥
সত্য নারায়ণ ব্যাটারি লাগাতেই রেডিও বেজে উঠলো। ছেলেমেয়েরা সব হাততালি দিয়ে নাচতে শুরু করলো।ভাঙা বাড়িতে, অভাবের সংসারে আলো ঝলমলিয়ে খুশি এলো ভাঙা রেডিওর সঙ্গে সঙ্গে। তবে কয়েকটা দিন যেতেই এই রেডিও নিয়ে শুরু হলো নতুন সমস্যা। রেডিওতে গান বা কোনো অনুষ্ঠান চালালেই ফুলকাকুর রান্নার লোক এসে রেডিও বন্ধ করার জন্য শাসিয়ে যায়। কথার সঙ্গে সঙ্গে তার মুখের চেহারাও বিশ্রী রকমের হয়ে যায় যেন ভেংচি কাটছে। আভা দৌড়ে এসে রেডিও তাকের ওপরে তুলে রাখে। দীপুর ভীষণ রাগ হয়। একটা দিনও ভালো করে রেডিওটা চালাতে পারল না। কিভাবে কথা বের হয়। রেডিওর মধ্যে কি মানুষ আছে? হাজারও কৌতূহল নিয়ে বিরক্ত হয় দীপু। মাঝে মাঝে দিদিদের সঙ্গে রেডিও নিয়ে দূরের জঙ্গলে চলে যায়। ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সবগুলো চ্যানেল বোঝার চেষ্টা করে, সাউন্ড বাড়ানো-কমানো আবিষ্কার করে উচ্ছ্বসিত হয় ওরা।
ফুলকাকু সত্য নারায়ণের ছেলেমেয়ে নিয়ে ভীষণ বিরক্ত। সত্য নারায়ণকে ডেকে জানালো, দূরে জঙ্গলে আমার কিছু জায়গা আছে, সেখানে গিয়ে ঘর তুলে থাকো বাপু। এ বাড়িটা এবার ছাড়ো। শেষ বয়সে আমাকে একটুখানি শান্তিতে থাকতে দাও।
ফুলকাকুর বাড়ি থেকে অনেকটা দূরে ফলবাগানের ভেতরে ১০০০ বর্গফুটের একটি জমি দেওয়া হলো সত্য নারায়ণকে। ঘন জঙ্গলের মধ্যে জমি। আশেপাশে কোনো বসতি নেই। জঙ্গলের পেছনের সরু রাস্তা ধরে এগিয়ে রেল স্টেশনের দেখা মিলবে। ফুলকাকু জমি দিয়েছে। কিন্তু তাতে থাকতে হলে তো ঘর তৈরি করতে হবে। সত্য নারায়ণের হাতে কোনো টাকা পয়সা নেই। আর ঘর তোলা তো অনেক বড় বিষয়। কিন্তু ফুলকাকুর বাড়িতে আর থাকার মতন অবস্থা নেই। আবার এক নতুন যুদ্ধ শুরু হলো যেন জীবনে। প্রতিদিন জঙ্গল পরিষ্কার করতে যায় সত্য। সঙ্গে ছেলেমেয়েও। তাদের আনন্দ আর আনন্দ। নিজেদের নতুন বাড়ি হবে। জঙ্গল পরিষ্কার করে অবশেষে একটা মাটির ঘর তুললো সত্য নারায়ণ। সেটাকে আসলে ঘর বলা চলে না। মাথা গোঁজার জন্য কোনো রকম ব্যবস্থামাত্র। বাজার থেকে ভেঙে যাওয়া ইট সস্তায় কিনে এনে, কিছু ইট কুড়িয়ে তার ওপর মাটির প্রলেপ দিয়ে ঘর তৈরি করেছে সত্য নারায়ণ। খুব ছোট হলেও বেশ শক্ত সে ঘর। ঘরের চালা হলো মাটির তৈরি টালি দিয়ে। সত্য নারায়ণ জঙ্গল থেকে কাঠ কেটে এনে ছোট ছোট জানালা তৈরি করলো। একটাই ঘর। তার সামনে খোলা একটা বারান্দা বানানো হলো। সেখানে হাঁড়ি পাতিল সাজিয়ে রাখলো আভা। বাড়িতে না ছিলো বিদ্যুৎয়ের ব্যবস্থা, না ছিল জল।
সোনালী, বেবি ঘুম থেকে উঠেই দ্রুত কাছাকাছি কুয়ো থেকে জল আনতে যায়। খাবার, রান্নার জিনিসপত্র, হাঁড়িপাতিল সব বারান্দায় রাখা হলো। তাই বেশ শক্ত করে বানানো হয়েছে বারান্দা। বারান্দার চাল ও টালি ব্যবহার করা হলো। ফলে ঘরটিকে আরও ছোট দেখালো। দীপুদের এই নতুন বাড়িতে কোনো খাট বা তক্তপোশ ছিল না। সবাই মিলে একসঙ্গে মাটির ওপর ঘুমাতে হবে, এটা ছেলেমেয়েদের মেনে নিতে খুব কষ্ট হলো। পুরো ঘরটাজুড়েই যেন সত্যনারায়ণের বিছানা। ভাঙা ইটের ওপর মাটির একটা পুরু পরত দিয়ে তৈরি করা হয়েছে ঘরের মেঝে। মেঝের ওপরে পুরনো কাঁথা, ছেঁড়া বিছানার চাদর বিছিয়ে সত্য নারায়ণের পুরো পরিবার একসঙ্গে ঘুমায়। সকাল হলেই কাঁথা, বালিশ গুটিয়ে এক জায়গায় রেখে দেয়। ঘরের চালার সঙ্গে যে বাঁশের খুঁটি ছিল, তার সঙ্গে ছোট ছোট বাঁশ আর বেতের ঝুড়ি বেঁধে দিয়েছে সত্যনারায়ণ। সেই ঝুড়িগুলোতে সবার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র রাখা হলো।
ঘরের ভেতরে আড়াআড়ি রশি টানানো হলো। সেখানে সবার জামাকাপড় রাখা হলো। একসাথে ঘুমাতে গিয়ে প্রায় সবার পা কাঁথার, বিছানার বাইরে বেরিয়ে থাকতো। সত্য নারায়ণ, আভা খেয়াল করলো ভাইবোন সব একজন আরেকজনের বুকের ওপর পা তুলে জড়াজড়ি করে ঘুমিয়ে আছে। এতো অভাব, থাকার জায়গাটুকুও ভালো দিতে পারলোনা সন্তানদের। এই দুঃখে আভা শুধু লুকিয়ে কাঁদে।
এরমধ্যে সত্য নারায়ণ বহু কষ্টে একটি ওষুধের দোকানো কাজ জোগাড় করেছে। বাড়ি থেকে ১ কি.মি. হেঁটে রেলস্টেশনে পৌঁছাতে হয়। এরপর শহরে নেমে আবার পায়ে হেঁটে দোকানে যায় সত্যনারায়ণ। বাজারের বড় ডিলারদের কাছ থেকে লিস্ট অনুযায়ী ওষুধ নিয়ে যাওয়া,ওষুধগুলো দোকানের তাকে সাজিয়ে রাখা, মালিকের নির্দেশমতো ওষুধ নামিয়ে আবার ক্রেতাকে তা বুঝিয়ে দেওয়া; এতসব কাজ করে বেশ ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফেরে সত্যনারায়ণ। সোমবার ওষুধের দোকান বন্ধ থাকে। সত্য নারায়ণ সোমাবরে বাড়ির পেছনের অংশে টমেটো, ফল,সবজি চাষ করে। দিনের বেশিরভাগ সময়েই এই অংশটায় ছায়া থাকে।তাই সত্যনারায়ণ আশেপাশের কিছু গাছ কেটে জায়গাটা পরিষ্কার করে নেয়। হালকা রোদ আসতে শুরু করে। বেশ ভালো জাতের দেশি টমেটো হয়েছে। দেশি টমেটো আর আলুর ঝোল সত্যনারায়ণের পরিবারের প্রধান খাবার হয়ে উঠেছে।
চলবে…
রাস্তার মাস্টার ॥ পর্ব-৭॥ শারমিন রহমান

