॥ পর্ব-৪॥
প্রায় তিন বছর হয়ে গেলো ফুল কাকুর বাড়িতে আভাদের আসার। শরতের আকাশে ভেসে বেড়ানো শুভ্র মেঘের মেঘের মতন হাসিখুশিতে কেটে যাচ্ছে দিন। জীবনের বিভৎস দিনগুলোতে ধুলো জমতে শুরু করেছে। এরমধ্যে ফুলকাকু ১-২ বার এসে ঘুরে গেছেন। আভার হাতের রান্না খেয়ে ভীষণ খুশি। মেয়েদের সঙ্গে সখ্য তৈরি না হলেও ফুলকাকু খোঁজ নিতেন ওদের। খাবার শুরু করেই বলতেন, ‘বৌমা, তোমার মেয়েদের খেতে দাও এবার। বেলা যে অনেক হলো।’
মেয়েরা প্রথম দিকে দাদুর কাছাকাছি যেতে চাইলেও আভা সচেতনভাবে দূরে রাখার চেষ্টা করতো ওদের। গম্ভীর মানুষ বাচ্চাদের আচরণে বিরক্ত হতে পারেন ভেবেই এটা করেছে আভা। মেয়েরাও ফুলকাকুর রাশভারী চেহারা আর ব্যক্তিত্ব দেখে পরবর্তী সময়ে দূরেই সরে থেকেছে।
ফুলকাকুর জঙ্গল হয়ে যাওয়া বাড়িটি পরিষ্কার করতে যখন এসেছিল ওরা তখন ২টা কুকুর ছিল। যেন ওরাই পাহারাদার। নতুন মানুষ দেখে খুব বিরক্ত হয়েছিল। মেয়েরাও প্রথম প্রথম ভয় পেতো। কিন্তু এখন খুব ভালো বন্ধু হয়ে উঠেছে ওরা। নাম রেখেছে বুলু আর ভুলু। সোনালী আর কাবেরী যখন স্কুলে যায় তখন পেছন পেছন বুলু, ভুলুও যায়। ওদের স্কুল পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে বাড়ি ফিরে আসে। যেন নিজেরাই দায়িত্ব নিয়ে নিয়েছে। আভার রান্নাঘরের সামনে গুটিসুটি মেরে শুয়ে থাকে সারাদিন। ওদের স্কুল ছুটির ঠিক আগ মুহূর্তে বুলু-ভুলু বেরিয়ে যায় বাড়ি থেকে। ওদের নিয়ে ফেরে। সোনালী আর কাবেরীর কাছে শুনেছে স্কুলের সামনে বটগাছের নিচেই ওরা দাঁড়িয়ে থাকে। আভা আর সত্যনারায়ণ অবাক হয়। কী করে ওরা বোঝে স্কুল ছুটির সময় হয়েছে। এ বিষয়টা রহস্যই রয়ে গেছে ওদের কাছে। কিছুতেই হিসাব মেলাতে পারে না আভা-সত্যনারায়ণ। ওরা এর অর্থ না বুঝলেও এটুকু বুঝেছে, অনেক মানুষের চেয়ে কুকুর বিশ্বস্ত বন্ধু হয়ে উঠতে পারে।
বসন্তের চমৎকার দিনগুলোতে আভা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লো। বিছানা থেকে মাথা তুলতে পারছে না। ডাক্তার ডাকার পর আভার অন্তঃ স্বত্বার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেলো। আভা ও সত্যনারায়ণ দুজন দুজনের দিকে নীরবে তাকিয়ে রইলো শুধু। এক অজানা ভয় ছিল সে দৃষ্টিতে। এবার কি তাদের ভাগ্যে একটা ছেলে সন্তান আসতে চলেছে। না কি আরেকটা মেয়ে আসবে পৃথিবীতে! মেয়েদের প্রতি আভা বা সত্যনারায়ণের কোনো অবহেলা ছিল না। কিন্তু একটা পুত্র সন্তান পাওয়ার প্রবল ইচ্ছে নিয়ে আরেকটি সন্তান নেওয়ার শেষ চেষ্টা ওরা করেছে। সমাজের মানুষের কাছে ওরা অশুভ, এটা কারোরই ভালো লাগে না।
দিন যায়, মাস যায়; আভার শরীর ভারী হতে থাকে। দিন যত যায় আভার চিন্তা বাড়তে থাকে। ভীষণ ক্লান্ত লাগে। হাত, পা অবশ হয়ে আসে। এবারও যদি মেয়ে হয়! এরপর আর কিছুই ভাবতে পারে না আভা। সবার কাছে সে অশুভ। তার জন্য সত্যনারায়ণ নিজের বাবার ভিটে ছাড়া হয়েছেন। ভগবানকে সারাক্ষণ মনে মনে ডাকতে থাকে আভা। সত্যনারায়ণের মুখে চিন্তার ছাপ স্পষ্ট। কিন্তু আভা বা সত্যনারায়ণ কেউ কাউকে কিছুই বলে না। এ বিষয়ে কোনো আলোচনা হয় না তাদের। মা কালীকে প্রাণপণে ডাকছে আভা। স্টেশন বাজারের পাশে যে কালীমন্দির আছে সেখানকার মা খুব জাগ্রত। সত্যনারায়ণকে একদিন জানায় আভা, যেতে চায় মন্দিরে পুজো দিতে। সত্যনারায়ণ বুঝতে পারেন, কেন আভা সেখানে যেতে চায়। আভাকে একদিন নিয়ে যান সেখানে। ফল, মিষ্টি দিয়ে ভক্তিভরে পুজো করে আভা। মানত করে যে এবারে পুত্রসন্তান দিলে মায়ের কাছে পাঠা নিবেদন করবে আভা। এদিকে সত্যনারায়ণও আলাদা করে মায়ের কাছে মানত করেছে। আভা ও সত্য নারায়ণ খেয়াল করলো দুজনেরই চোখ রক্ত জবার মতন লাল। দুজনেই কেঁদেছে মায়ের কাছে। মুখে হাসি রেখে দুজনের মানত গোপন করে বাড়ি ফিরলো ওরা। যেমন করে দুঃখ গোপন করে সারাদিন মুখে একটা হাসি ধরে রাখার চেষ্টা করে।
ঝুম বৃষ্টি। প্রবলবেগে হাওয়া বইছে। গাছের ডালপালা ভেঙে উঠোন ভর্তি হয়ে গেছে। বাগানের পাশটার মাটির দেয়াল ধসে পড়েছে কিছুটা। গাঢ় অন্ধকার ফুড়ে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে একটু পরপর। বাজ পড়ার আওয়াজে ভয়ের একটা পরিবেশ সৃষ্টি হলো হঠাৎ করেই। আভার শরীরটা বিকেল থেকেই খারাপ। মেয়েদের খাওয়ানো শেষ করে কলতলায় এঁটো থালাবাসন রেখেই ঘরে এসে শুয়ে পড়েছে আভা। পেটে ব্যথা আর সহ্য করতে না পেরে সত্যনারায়ণকে কাছে ডাকলো। বুঝতে পারছে সময় হয়ে এসেছে। কিন্তু সত্যনারায়ণ এই আবহাওয়ায় বাইরে বের হতেও পারছে না। কী করবে বুঝতে পারছে না। কাউকে ডাকা দরকার। জঙ্গল ঘেরা বাড়িটা থেকে লোকালয় একটু দূরে। দাইয়ের বাড়ি কম করে হলেও ২ কিলোমিটার দূরে। দাইকে বলা আছে, কিন্তু এই রাতে তাকে খবরটা পৌঁছাতে তো হবে। কোনো কিছু ভেবে না পেয়ে ছাতা নিয়ে ঝড় জলে বেরিয়ে গেলো সত্যনারায়ণ। দাইকে ডাকতেই হবে। কিন্তু সত্যনারায়ণের ফিরে আসার আগেই আভাকে খুব বেশি কষ্ট না দিয়ে কোন কারও সাহায্য ছাড়াই পৃথিবীতে ভূমিষ্ট হলো সত্যনারায়ণ আর আভার চতুর্থ মেয়ে রুম্পা।
সোনালী, কাবেরী আর বেবি তাদের ছোট্ট বোনটিকে পেয়ে ভীষণ খুশি। রুম্পার হাত নাড়ানো, তাকানো, মুখ দিয়ে নানা রকম শব্দ করা, বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গি দেখে হেসে গড়িয়ে পড়ে তিন বোন। সোনালী এখন অনেক দায়িত্ব নিতে শিখেছে। বোনের জামা কাপড় ধুয়ে পরিষ্কার করা, ঘর গোছানো, মাকে রান্নায় সাহায্য করা আরও অনেক দায়িত্ব পালন করে সোনালী। রুম্পাকে কোলে নিয়ে বসে থাকে কাবেরী। ছোট্ট বোনটার সবচেয়ে কাছে থাকে কাবেরী। বোনকে কাজল পরানো, পাউডার দেওয়া, টিপ পরানো সবটা করে ও। সারাক্ষণ বোনকে সাজিয়ে রাখতে ভালোবাসে কাবেরী।
আভা-সত্য নারায়ণ পড়েছে মহাবিপদে। আবার একটা ঝড় আসতে চলেছে জীবনে। স্পষ্ট বুঝতে পারছে ওরা। ফুলকাকু চতুর্থ মেয়ের কথা শুনে কেমন যেন বদলে গেছেন। তার কথায় বাড়ি ছাড়ার সুর স্পষ্ট। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বাড়িটা ছেড়ে গেলে ফুলকাকু খুশি হবেন, এটা বুঝতে পেরেছে সত্যনারায়ণ। আভার শরীর দিন দিন আরও খারাপ হচ্ছে। মন ভেঙে গেলে, নিজের ওপর বিশ্বাস হারিয়ে গেলে মানুষের শরীরের ওপরও আর নিয়ন্ত্রণ থাকে না। সবচেয়ে উপেক্ষিত হয় তার শরীর। সেই উপেক্ষিত শরীর বয়ে বেড়ানো বড্ড অসহ্য হয়ে ওঠে। সত্যনারায়ণ এরই মধ্যে বুড়িয়ে গেছে অনেকটা। ছোট মেয়ে, অসুস্থ আভাকে নিয়ে কোথায় গিয়ে উঠবে সে! চারটা মেয়ে, অসুস্থ স্ত্রীকে নিয়ে রাস্তায় গিয়ে তো দাঁড়াতে পারে না।
সোমবার সকাল। সুন্দর আবহাওয়া। হালকা মিষ্টি বাতাস বইছে। কেমন যেন শরীরে, মনে আরাম দিচ্ছে সে বাতাস। সোনালী, কাবেরী স্কুলে চলে গেছে। আভা উঠোনের কোণে মাদুর পেতে রুম্পাকে খাওয়াতে ব্যস্ত। বেবি বসে ছোট বোনটার সঙ্গে কথা বলছে আর রুম্পা শব্দ করে হেসে উঠছে। হাসতে গিয়ে মুখের খাবার বেরিয়ে পড়ছে। এসব কাণ্ড দেখে বেবিও হেসে গড়াগড়ি খাচ্ছে। সত্যনারায়ণ বাগানের আগাছা পরিষ্কার করতে করতে চিন্তা করছে, কোথায় যাবে সে! সত্যিই কি চলে যেতে হবে তাদের! এমন সময়ে ফুলকাকু বাইরের দরজা দিয়ে হন্তদন্ত হয়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকলেন। সত্যনারায়ণ হঠাৎ ফুলকাকুকে দেখে হকচকিয়ে গেলো। হাত থেকে মাটি পরিষ্কার করে দৌড়ে যাদবানন্দের কাছে গেলো। যাদবানন্দ ততক্ষণে তার ঘরে গিয়ে বসেছে।
-‘সত্য! কিছু ব্যবস্থা কি হলো! এবার বাড়িটা যে ছাড়তেই হয়।’ ফুলকাকুর মুখের কথা শুনে অসহায় চোখে তাকিয়ে রইলে সত্যনারায়ণ। তার তাকিয়ে থাকার মধ্যে নীরব প্রশ্ন বুঝতে পারলো যাদবানন্দ। নীরবতা ভেঙে নিজেই বলে উঠলো, ‘শোন, তোমার বাবা তোমাকে তার বাড়িতে জায়গা দেয়নি, আমি দিয়েছিলাম। কিন্তু আবারও একটা মেয়ে! আমারও তাই বিশ্বাস এখন, তোমাদের সত্যি অশুভ যোগ আছে। এখানে যদি তোমরা থাকো তাহলে এ বাড়িতেও অশুভ যোগ লাগবে। পরবর্তী সময়ে এ বাড়ির কারোই ছেলে সন্তান হবে না। তোমরা অন্য বাড়ি দেখো বাপু। তাড়াতাড়ি আমার বাড়ি ফাঁকা করো।’
সত্যনারায়ণ কোনো কথা বলতে পারছে না। পা দুটো চোরাবালিতে একটু একটু করে ডুবে যাচ্ছে। বুঝতে পেরেও তার কিছুই করার নেই। অসহায় দৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে রইলো। যেন চোরাবালিতে নিজেকে পুরোপুরি সপে দেওয়ার অপেক্ষায়। কতক্ষণ যে এভাবে দাঁড়িয়ে আছে সত্য নারায়ণ, জানে না সে। দুঃস্বপ্নের মতন লাগছে সবটা। সোনালী-কাবেরী স্কুল থেকে ফিরে বাবাকে না ডাকতে আসলে সত্যনারায়ণের স্বাভাবিক হতে হয়তো আরও অনেক সময় লাগতো। মেয়েদের দেখতে পেয়ে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরলো ওদের। অঝোরে কাঁদতে শুরু করলো। তার মতন অসহায় পিতা বোধহয় পৃথিবীতে আর একটাও নেই।
চলবে…

