॥ পর্ব-৩॥
দিশেহারা সত্যনারায়ণ কী করবেন ভেবে পান না। নির্ঘুম রাত কাটে। আভা আঁচল চেপে কান্না লুকায়। সেদিন ছিল রোববার। একটা অনুষ্ঠান বাড়িতে কাজ করতে যান সত্যনারায়ণ। তার চোখেমুখে চিন্তার ছাপ। মনটা বিষণ্ন। কোথায় যাবেন সন্তানদের নিয়ে? এই এক চিন্তা তাকে এলোমেলো করে দিচ্ছে। হঠাৎ ফুলকাকু অর্থাৎ যাদবানন্দ নায়কের সঙ্গে দেখা। যাদবানন্দ নায়ক সত্যনারায়ণের বাবার খুড়তুতো ভাই। ফুলকাকু তার চিন্তিত মুখ দেখে জানতে চান, কেমন চলছে দিনকাল। সত্যনারায়ণ তাকে জানান, একটা থাকার জায়গা তার ভীষণ দরকার। যাদবানন্দ যেন সত্যনারায়ণের কথা শুনে খুশি হয়ে ওঠেন। নন্দীতে যাদবানন্দের যে বাড়ি, সেখানে দীর্ঘদিন কেউ থাকে না। বড্ড খারাপ অবস্থা সেখানকার। জঙ্গলের মধ্যে বাড়ি বলে কেউ থাকতে চায় না সেখানে। কয়েকদিন আগে খবর পেয়েছেন, বাড়ির জানালা খুলে নিয়েছে চোর। বড্ড চিন্তায় আছেন সেই থেকে। একজন পাহারাদার রাখতে গেলেও খরচ অনেক। তাছাড়া জঙ্গলের মধ্যে বাড়িতে কেউ থাকতেও রাজি হয় না। এমন সময় সত্যনারায়ণের কথায় যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলেন। কিন্তু মুখে তার চিহ্ন পর্যন্ত নেই। একটা ভাবলেশহীন চেহারা করে সত্যনারায়ণকে ভারিক্কি গলায় বললেন, ‘আমার বাড়িটা তো পড়েই আছে, ওখানে এসে থাকতে পারো। নিজের মনে করে গুছিয়ে নিতে হবে কিন্তু!
সত্যনারায়ণ যেন পায়ের তলায় মাটি খুঁজে পেলেন। সমুদ্রে ডুবতে ডুবতে যখন কোনো নাবিক পায়ের নিচে মাটি খুঁজে পায় বা কোনো অবলম্বন খুঁজে পায় ঠিক তেমন। ঠাকুরকে মনে মনে কোটিবার প্রণাম করেন সত্যনারায়ণ।
শুরু হলো অন্যরকম ব্যস্ততা। ফুল কাকুর বাড়িটা জঙ্গলে সেটা জানতেন সত্যনারায়ণ কিন্তু বাড়িটা যে অনাদরে নিজেই জঙ্গলে পরিণত হয়েছে সেটা জানতেন না। কী আর করার! মাথা গোঁজার ঠাঁই পেয়েছেন, এই তো অনেক। শুরু হলো বাড়ি পরিষ্কারের কাজ। বাজার থেকে ৫ কিলোমিটার হেঁটে এসে বাড়ি পরিষ্কারের কাজ করতে শুরু করলেন সত্যনারায়ণ। কিন্তু একা একা কতদিন বসে আর এই জঙ্গল পরিষ্কার করবেন!
এদিকে বস্তি ছাড়ার জন্য চাপ যেন বেড়েই চলেছে। এবার আভাও তিন মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে জঙ্গল পরিষ্কার করতে এলো। ছোট মেয়ে কাবেরীকে বেবির কোলে দিয়ে বসিয়ে রাখলো বাড়ির এককোণে। এরপর স্বামীর সঙ্গে হাত লাগালো আভা। সোনালীর কাছে এটা খুবই আনন্দের কাজ। নতুন বাড়িতে থাকবে তারা। বড় একটা বাড়ি। চুনসুরকি দিয়ে তৈরি করা বড় একটা ঘর। পাশেই মাটির একটা মাঝারি ঘর। মাটির ঘরটাতে সত্যনারায়ণের পরিবার থাকবে। বড় ঘরটি পরিষ্কার করে রাখা হবে ফুলকাকুর জন্য। ছুটিতে এসে থাকবেন তিনি। ১০-১৫ দিন টানা কাজ করার পর বাড়িটি মানুষের বসবাসের উপযোগী হয়ে উঠলো। সত্যনারায়ণ বস্তির পাঠ চুকিয়ে ফুল কাকুর বাড়িতে সংসার সাজিয়ে থাকতে শুরু করেন। আভা আর সত্যনারায়ণের নতুন সংসার।
নতুন সংসারে অন্যরকম জীবন শুরু হলো আভার। কলতলার ভিড় নেই, লাইন ধরার প্রতিযোগিতা নেই। চেঁচামেচি হই হুল্লোড় নেই। একদম শান্ত জীবন। অভাব থাকলেও স্বস্তি আছে। নিজের মতন করে বাঁচার আনন্দ অন্যরকম। সত্যনারায়ণ বাড়ি পাহারা দেওয়ার কাজটি পেয়ে বেশ খুশি। সত্য নারায়ণ আর আভা নিজের বাড়ির মতন ভালোবেসে আগলে রাখতে শুরু করেছেন যাদবানন্দের এই জঙ্গলে ঘেরা বাড়িটিকে।
বেশ খোলামেলা বাড়িটি। আলো বাতাসের কোনো অভাব নেই। বিদ্যুৎ, পানির পাম্প সব সুবিধা পেয়ে মেয়েরাও ভীষণ উচ্ছসিত। সোনালী, কাবেরী দূরের স্কুলে যেতে শুরু করেছে। বেবি মায়ের পেছন পেছন ঘুরে বেড়ায় আর প্রশ্ন করে, মা, ওমা! এইটা আমাদের নিজের বাড়ি! কথাটা বলার সময় বেবির চোখ মুখে যেন আলো ঠিকরে পড়ছিল। আভা তৃপ্তির হাসি হাসে। বেবিকে জড়িয়ে ধরে বুকে। হঠাৎ বুকের ভেতর থেকে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ধরে কী শান্তি! সন্তান ছেলে না মেয়ে তাতে মায়ের কি অনুভূতি বদলায়! অথচ এই মেয়ে হওয়ার জন্য তাকে শ্বশুরভিটে ছাড়তে হয়েছে, জামুরিয়া বস্তি থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তাদের পুরো পরিবারকে অশুভ বলে ধিক্কার জানানো হলো। ভাবতেই বুকটা কেঁপে উঠলো। বেবিকে আরও শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরলো আভা। মেয়ের মুখে আদরে ভরিয়ে দিলো। মায়ের এমন আচরণে অবাক হলো বেবি। চোখ বন্ধ করে মায়ের বুকে মিশে রইলো।
ফুল কাকুর জঙ্গলে পরিণত হওয়া বাড়িটি সত্যিই ফুলের মতন হাসতে লাগলো। আভা নিজের থেকেও বাড়িটির যত্ন করতে শুরু করেছে। একটা মেয়ে তার সংসারকে কতটা ভালোবাসতে পারে, আভাকে দেখে সত্যনারায়ণ এখন সেটা উপলব্ধি করতে পারে। অথচ এটাও তার নিজের সংসার নয়। কিছুই দিতে পারেননি আভাকে তিনি। এসব ভাবলে সত্যনারায়ণ মুষড়ে যান ভেতরে ভেতরে। নিজেকে এক অথর্ব মানুষ মনে হয়। অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন দূরে বসে থাকা আভার দিকে। চোখ ঝাপসা হয়ে ওঠে। কবে যে এ বাড়ি থেকে চলে যেতে হয়! বাড়ির মালিক ফিরলেই তাকে অন্য কোথাও ঠাঁই খুঁজতে হবে। তিনি তো কেবল পাহারাদার, মালিক নন। তার সারাজীবন থাকার অধিকার নেই এখানে। সত্যনারায়ণের বুক হালকা করে এক দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। কচুরিপানার মতন কি ভাসতে ভাসতেই যাবে জীবন? জীবন নামক এ গল্পে তাকে আর কোথায় কোথায় ভেসে বেড়াতে হবে, জানেন না সত্যনারায়ণ। কিন্তু সবাই মিলে যেভাবে বাড়ির সঙ্গে সখ্য তৈরি করছে, মায়ায় জড়িয়ে পড়ছে, তাতে এই মায়া কাটিয়ে অন্য কোথাও যাওয়া ভীষণ কঠিন হবে।
ফুল কাকুর বাড়িতে ইট, সুরকির ঘরটি যত্ন করে প্রতিদিন গুছিয়ে, ঝাড় দিয়ে প্রস্তুত করে রাখে আভা। ফুল কাকুর থাকার ঘর এটা৷ পাশেই আরেকটা বড় মাটির ঘরে আভার সংসার। মাটির ঘর হলেও ভেতরে ছোট ছোট কয়েকটা ঘর রয়েছে। আভার যত্নে মাটির দেয়ালজুড়ে ফুলেরা যেন হাসছে। নানা রঙের আল্পনা করেছে আভা। পাশেই রান্নাঘর। পশ্চিমের দিকে বেশ ফাঁকা জায়গা রয়েছে। সেখানে সবজি চাষ করেছেন সত্যনারায়ণ। নানারকম সবজি পাওয়া যায় সারাবছর। আভা, সত্যনারায়নের সঙ্গে মেয়েরাও বাগান দেখাশোনা করে। বাগান যেন ওদের প্রাণ। সবার আনন্দের কেন্দ্রবিন্দু এই বাগান। ফুল কাকুর থাকার ঘরের সামনেই তুলসীমঞ্চ প্রতিষ্ঠা করেছে আভা। সকাল সন্ধ্যা তাতে পুজো দিয়ে সবার মঙ্গল কামনা করে।
বাড়ি থেকে রেল স্টেশন বেশ কয়েক কিলোমিটার দূরে। সেখানকার স্টেশন বাজার খুব জাঁকজমকপূর্ণ। সপ্তাহের প্রতি মঙ্গলবার সেখানে হাট বসে। সে হাটে সব রকম জিনিস পাওয়া যায়। কেউ কেউ হাটকে মেলাও বলে। সত্যনারায়ণ মাঝে মাঝে মেয়েদের সঙ্গে নিয়ে পায়ে হেটে যায়। আজ মঙ্গলবার। মেয়েরা বায়না ধরেছে বাবার সঙ্গে আজ তারা স্টেশন যাবে। রেলগাড়ি দেখতে বেশি ভালো লাগে ওদের। সোনালী রেলগাড়িতে ওঠার স্বপ্ন দেখে রোজ। কিন্তু কাউকে কিছুই জানায় না। খাতার মধ্যে রেলগাড়ির ছবি আঁকে চুপিচুপি৷ বড় হয়ে চাকরি করবে সোনালী, রোজ রেলগাড়িতে চড়ে অফিস যাবে। এটা তার স্বপ্ন। তাই পড়ালেখায় খুব মনোযোগী সে৷ সত্যনারায়ণ মেয়েদের আবদার ফেলতে পারেন না। এতটা পথ পায়ে হেঁটে যাওয়া-আসা করলে ওদের কষ্ট হবে ভেবেই নিতে চান না সত্যনারায়ণ। তাছাড়া সন্তানদের সঙ্গে করে বেড়াতে কার না ভালো লাগে!
স্টেশনে পৌঁছেই একটা রেলগাড়িকে স্টেশন ছেড়ে যেতে দেখলো ওরা। সোনালী তাকিয়ে রইলো সেদিকে। বড্ড অদ্ভুত লাগে সোনালীর৷ কত কত অচেনা মানুষ রোজ একসঙ্গে যাওয়া-আসা করে এই রেলগাড়িতে। সবার গন্তব্য আছে, ব্যস্ততা আছে। আর রেলগাড়ি সবার গন্তব্যে পৌঁছে দিয়ে প্রতিদিন ছুটে চলে। রেলগাড়ির ভেতরে কেমন তা বাইরে থেকে দেখিয়েছে বাবা। জানালা দিয়ে। তবে ভেতরে ওঠার খুব ইচ্ছে সোনালীর। রেলগাড়ি চিকন পথের ওপর কিভাবে এঁকেবেঁকে চলে এটা একটা বিস্ময় ওর কাছে। সত্যনারায়ণ পেছনে তাকিয়ে দেখেন, মেয়ে চলে যাওয়া রেলগাড়ির দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে তাকিয়ে আছে। মেয়েটা রেলগাড়ি দেখলেই কেমন যেন হয়ে যায়। ওকে একদিন রেলগাড়িতে চড়াতে হবে, নিজেকেই যেন কথা দিলেন সত্যনারায়ণ। বাবার ডাক শুনে দৌড়ে পৌঁছে গেলো সোনালী। সবাই মিলে হাত ধরাধরি করে হাটের মধ্যে ঢুকলো ওরা।
মাটির বাঁশি, পাখি, ঢোল, কথা বলা পুতুল, নানা রঙের চুড়ি, গলার মালা; কী নেই হাটে! মেয়েরা ঘুরে ঘুরে দেখছে। কখনো কখনো হাত দিয়ে ধরে দেখছে। কিন্তু বাবার কাছে কারও আবদার নেই। বেশ বড় একটা মাছ কিনেছেন সত্যনারায়ণ। ফুল কাকু মাসে মাসে যে পয়সা পাঠান, তার টাকাটা গতকালই হাতে পেয়েছেন। মেয়েদের শুধু ঘুরতে নিয়ে আসেন সত্যনারায়ণ। কখনো কিছু কিনে দেন না এখান থেকে। আজ মনটা কেমন হুহু করে উঠলো। মেয়েরা পুতুল, বাঁশি ধরে দেখে, দাম জিজ্ঞেস করে। দাম শুনে রেখে দেয় আবার। সত্যনারায়ণ মেয়েদের রেখে ফিরে যান আবার মাছ বাজারে। বাজারের ব্যাগ থেকে মাছটা বের করে ফিরিয়ে দেন মাছওয়ালাকে। মাছ ফিরিয়ে পয়সাটা ফেরত নিয়ে নেন। মাছওয়ালার কাছে দুটো কটু কথা শুনতে আপত্তি নেই। কিন্তু মেয়েদের আজ হাসতে দেখতে চান সত্যনারায়ণ। তিনজনকেই পছন্দের ঢোল, বাঁশি কিনে দেন। পছন্দের বাঁশি, ঢোল হাতে পেয়ে খুশিতে লাফাতে থাকে ৩ মেয়ে।
সত্যনারায়ণ চোখের জল আর ধরে রাখতে পারেন না। আড়াল করে মুছে নেন সে জল। আজ বড্ড ইচ্ছে করছে আভার জন্য কিছু নিতে। সত্যনারায়ণ আভার জন্য একটা সুগন্ধি তেল কিনে লুকিয়ে রাখেন বাজারের ব্যাগে। এরপর চাঁদের আলোতে মেয়েদের সঙ্গে নিয়ে বাড়ির পথ ধরেন।
চলবে…
আরও পড়ুন: রাস্তার মাস্টার ॥ পর্ব-২॥ শারমিন রহমান

