ওয়ারশ’ শহর থেকে ষাট মাইল দূরের এক গ্রামের স্কুল শিক্ষিকা লিখলেন, আমি ‘কোহ্যাম চিয়ে’ বাক্যটির নতুন অর্থ জানতে শুরু করেছি। একজন ইন্ডিয়ান ফিলোসোফার এই কথাটির অর্থ বদলে দেওয়ার জাদু জানতেন।
তাঁরও বহু আগে, আটলান্টিকের ওপারে ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো এই জাদুর মায়াজালে আটকা পড়েছিলেন—‘ওই দেহ-পানে চেয়ে পড়ে মোর মনে/ যেন কত শত পূর্বজনমের স্মৃতি/ সহস্র হারানো সুখ আছে ও নয়নে/ জন্ম-জন্মান্তরের যেন বসন্তের গীতি।’
রবীন্দ্রনাথ দেহকে মনের আঙিনায় আবদ্ধ করে রেখেছিলেন সর্বতোভাবে। ফলে তাঁর বিপুল রচনায় যৌনতার আবেদন নিতান্তই গৌণ। হৈমন্তী গল্পে ‘তাহার শরীর জাগিয়া উঠিল’ পর্যন্ত লিখে থেমে গেলেন। প্রকৃত শিল্পীকে থেমে যেতে হয়। সম্ভবত এই সত্য রবীন্দ্রনাথই জানতেন সবচেয়ে বেশি। শরীরের আবেদনটি মনের আশ্রয়ে প্রায় বিলীন করে তুলেছেন সর্বত্র। জগৎ-সংসারকে উপলব্ধি করা ও করানোর এ এক ভিন্নতর ম্যাজিক রিয়েলিজম! কেবল বাঙালির মানস গঠনে নয়। বিশ্বের বহুদেশের বহু মানুষের অন্তরে এই বোধ বয়ে চলেছে নিরন্তর।
‘নারীর শরীরেই প্রস্ফুটিত হয় যাবতীয় মানবিক সুন্দরের বৃত্তান্ত’। খুব বড়সড়ো কথা সন্দেহ নেই। চাইলে এক বাক্যে খারিজ করেও দেওয়া যায়। আবার ভাবনার আরশিতে ডুবেও থাকা যায় আকণ্ঠ কয়েক প্রস্থ। কবিতায় কোনো দাঁড়ি কমার ব্যবহার করেননি। জীবন ও কবিতাকে দেখতে ও দেখাতে চেয়েছেন মুক্তছন্দে। বাবার সঙ্গে পরিচয় হয়নি কখনো। মা পোলিশ বাবা ইতালিয়ান। মায়ের আঁচলঘেরা জীবনটাও কৈশোর পেরুনো পর্যন্ত। তবে জীবনের পুরোটাজুড়েই প্যারিস। কবিতার হাতেখড়িও ফরাসি ভাষাতেই। বিস্ময়কর হলো, মা কোনো নাম রাখেননি! ফলে তরুণ বয়সে নিজেই নিজের নামটি ঠিক করে নিয়েছিলেন ‘গিয়ম অ্যাপোলনিয়র’।
নারীর শরীরেই সকল মানবিক সুন্দরের প্রকাশ দেখেছিলেন অ্যাপোলোনিয়র। যদিও বরাবরই প্রেমে ব্যর্থতার মালা গাঁথতে হয়েছে অনিবার্যভাবে। সমকালীন কবি-শিল্পীরা নারী সম্পর্কিত তাঁর অভিব্যক্তিকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন দম্ভের সঙ্গে। নারীর প্রতি এমন মতবাদ প্রচারের জন্যে বোদ্ধাসমাজে চড়ামূল্যও দিতে হয়েছে। সমালোচকরা প্রতিযুক্তি দাঁড় করেছেন, নারীর শরীরে ডুবে থাকা নিতান্তই স্থূল ও মূর্খ চিন্তা ছাড়া আর কিছুই না। এমনকি বিপুল সংখ্যক সৃষ্টিশীল মানুষ অ্যাপোলনিয়রকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে ‘সমকাম প্রবৃত্তির’ পক্ষে শক্ত যুক্তিও দাঁড় করেছেন সে সময়।
মুগ্ধতার কথা, বহু বছর পরেও গিয়মের সে অভিব্যক্তি এবং তার দর্শনে রচিত কবিতাগুলো মলিন হয়নি একবিন্দুও। বরং দিনে দিনে তা আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। কেবল প্যারিসে নয়, সমগ্র বিশ্বেই নারীর প্রতি মানবিক সৌন্দর্য চর্চায় জোরালো ভূমিকা রাখছেন প্যারিসে বেড়ে ওঠা ওই নারীমুগ্ধ ব্যথাতুর কবি।
শার্লিংটনের মধ্যরাত। শীতকাল শুরু হতে চলল। তুন্দ্রাঞ্চলীয় বৃক্ষরাজি ইতোমধ্যে পাতা ঝরানোর কাজ শেষ করেছে। কিছু চিরহরিৎ জাতের গাছ রাস্তার দুপাশে দাঁড়িয়ে আছে বিপুল দাঢ্যতায়। যেন শহরের অবশিষ্ট সবুজের রক্ষা করার দায়িত্ব এখন কেবল তাদের হাতেই!
এ শহর উরুসেভস্কি গার্বেস্তার কবিতা হয়ে যায়। নগরের কোথাও আমি নেই কিছুতেই নেই। অথচ আমি আছি সবখানে, সবখানে। বহুদিন আগের এ নগর রাঙানো পাখিদের ছেঁড়া পালকে অথবা প্রাচীন কোনো জলাশয়ের বুনো শ্যাওলাজুড়ে আমি আছি। আমি আছি। আমি নেই কোথাও, কিছুতেই!
রংবাহারি নিয়ন আলোয় রাতের পানশালাগুলো ডাকছে তার আপন ভুবনে। অন্দরে আসো হে পথিক, আত্মভোলা মাতালের রাত্রি যাপনে। পায়ে চলার প্রশস্ত পথগুলোতে পানপ্রত্যাশীদের উষ্ণতার ব্যবস্থাতো থাকছেই। নানা রঙের পাথরের গা জুড়ে বৈদ্যুতিক আগুনের মনোমুগ্ধকর লেলিহানকেই কেউ কেউ করে তুলছেন চিয়ার্সের সঙ্গী। দু’জন ত্রিশোর্ধ শ্বেতাঙ্গ নারী একে অন্যেকে গভীর মমতায় আলিঙ্গন করে আছেন। যেন ‘তোমা ছাড়া এ জগতে মোর কেহ নাই কিছু নাই’! একজন সার্ভার তাদের সামনের পানপাত্র পূর্ণ করে দিয়ে চলে গেল। সেদিকে কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই। মাঝে মাঝে বিরতি দিয়ে দু’জন দু’জনার ঠোঁটের ওপর ঠোঁট রেখে এঁকে যাচ্ছেন সাত রঙের সুতীক্ষ্ণ রেখাগুলো। কপাল বেয়ে নেমে আসা ব্লন্ডির চুলগুলো ততবারই বেয়াড়া হয়ে উঠছিল!
ঝলমলে আলো অন্ধকারের ওই মধ্যরাতে যুবক বয়সী একজন কাছে ঘেঁষে জানতে চাইলেন, তোমরা কোন অরিয়েন্টের মানুষ? ‘এশিয়া’ বলতেই ইন্ডিয়া পাকিস্তান বাংলাদেশ, কোনটি প্রশ্ন করলেন। বাংলাদেশ শুনে স্মরণ করলেন ‘সম্ভবত ১৯৭১-৭২। তোমাদের মুক্তিযুদ্ধ। একজন লিডার, তাঁর নাম মনে করতে পারছি না। আর একটি ‘বানচোত’ দেশ পাকিস্তান, তারা তোমাদের ওপর হত্যা-ধর্ষণে মেতে উঠেছিল’।
জোনাথন ‘বানচোত’ শব্দটি আগে থেকেই জানত। সে কোথাও শুনেছে বা বইতে পড়েছে, বলল। শব্দটি নেতিবাচক অর্থে ব্যবহৃত হয়, তা সে জানে কিন্তু সঠিক অর্থ তাঁর জানা নেই।
তুঘ্রীল ভাই বোঝালেন, আক্ষরিক অর্থ ‘সিস্টার ফাকার’! গালিটার উৎপত্তি উর্দু ভাষা থেকে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে বহুল প্রচলিত গালি। জোনাথন উচ্চস্বরে বলল, গালিটা কেবল পাকিস্তানের বেলায় প্রযোজ্য হোক। সকলে সমস্বরে বলে উঠল, তাই হোক। তবে গালিটা তাদের বেলায় আমেরিকানদের কনটেন্ট অনুযায়ী হওয়াটা জরুরি ছিল, তাহলে দাঁড়াত—মাদার…!
জোনাথন জন্মসূত্রে মার্কিন নাগরিক। বাবা রাশিয়ান, মা পোলিশ। প্রাণচঞ্চল মানুষ। প্রচুর জ্ঞানগর্ভ কথা বলতে ভালোবাসেন। অল্প কিছুক্ষণের কথাবার্তায় বুঝিয়ে দিলেন তাঁর জানাশোনার দৌড়টা বেশ শক্তপোক্ত। মধ্যরাত পার করে জোনাথনকে ঘরে ফেরার জন্যে ট্যাক্সি কল করতে হলো। কেননা সামান্য পরিমাণ অ্যালকোহোলিক অবস্থাতেও আমেরিকার রাস্তায় গাড়ি চালনা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। ফলে নিজের গাড়ি রাস্তার পাশের পার্কিং-এ রেখে ট্যাক্সিতে ঘরে ফেরাটাই বুদ্ধিমানের কাজ। যাওয়ার আগে খুব উৎকণ্ঠার সুরে কযেকবার বলে গেলেন, বাংলাদেশে লেখকদের হত্যা করা হচ্ছে। তোমরা সাবধানে থেকো। তোমাদের যারা লেখক বন্ধু-স্বজন আছে তাদের বলবে খুব সাবধানে থাকতে।
জোনাথন চলে গেল। মধ্যরাতে শার্লিংটনের বার এরিয়াতে পরিচয় হওয়া একজন প্রাণখোলা মানুষ। কিন্তু তার রেশ থেকে গেলো বহুক্ষণ। শেষ কথাটি কানে বাজছে! কত দূর দেশের একজন মানুষ, বাংলাদেশের মুক্তমনা লেখকদের হত্যা করা হচ্ছে এ নিয়ে তার উৎকণ্ঠার শেষ নেই। একাত্তরে পাকিস্তানের বানচোতগুলোকে বিতাড়িত করা গেছে বটে। কিন্তু তাদের অসংখ্য অশুভ প্রেতাত্মারা আজও ঘাপটি মেরে আছে ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলজুড়ে।
২৬ জুন ২০১৫। রংধনুর সাত রঙে রঙিন হয়ে উঠল হোয়াইট হাউস ও আমেরিকার প্রায় সব শহরের বড় স্থাপনাগুলো। নির্ধারিত সফরসূচি শেষ করে সন্ধ্যার নিয়ন রঙিন ঝলমলে আলোয় উপস্থিত হলেন প্রেসিডেন্ট। হোয়াইট হাউসের ফ্রন্টভিউ সাইডের লাফায়েট স্কয়ারে তখন বিপুল সংখ্যক নারী-নারী, পুরুষ-পুরুষের যুগল সমাগম। সুপ্রিম কোর্টের রায়কে প্রেসিডেন্ট স্বাগত জানালেন, বললেন, আমেরিকা মানুষের ব্যক্তিস্বাধীনতাকে সম্মান জানাতে চায় এবং সম্ভবত আজ আমাদের এমন একটি গৌরবময় অর্জনের দিন।
শ্যাভি মারফি একজন কুমারী মা। তার পুত্র সন্তানটির বয়স তিন বছর। সন্তানের বাবার সঙ্গে তার বিয়ে হবে না। তাদের মাঝে এমন কোনো কমিটমেন্টও নেই। সন্তানের বাবা তার স্বামী হবে এমনটা সে কখনো প্রত্যাশা করেনি। তার কাছে ‘সিঙ্গেল মাদার’ পরিচয়টি অনেক স্বাচ্ছন্দ্যের, কারও বৌ হিসেবে নয়।
শ্যাভি আজ হাতের কবজিতে ‘রংধনু বেস’ পরেছে। কৌতূহল নিয়ে হাতের দিকে তাকাতেই সাফ জানিয়ে দিলো সে লেসবিয়ান না। লেসবিয়ান ও গে বন্ধুদের স্বাগত জানাতেই সে এটা পরেছে। কেননা আমেরিকা বরাবরই মানুষের স্বাধীনতাকে সম্মান জানাতে ব্যাকুল!
আমেরিকা কি সত্যিই মানুষের ব্যক্তিস্বাধীনতাকে সমর্থন করে? শ্যাভি দৃঢ়তার সঙ্গে উত্তর দিতে থাকে, অবশ্যই করে। অন্যসব দেশ থেকে মানুষ আমেরিকাতে এসে বসবাস করে। আমাদের দেশের মানুষ তাঁদের আলাদা করে দেখে না। সকলে আমেরিকান হয়ে যায়।
নাগরিক কিছু সুযোগসুবিধা আর অবাধ যৌনতার চর্চাকে ব্যক্তিস্বাধীনতা বলে? নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল ও সুনির্দিষ্ট দায়বদ্ধতা ছাড়া তোমার সরকার ও রাষ্ট্রব্যবস্থাপনা নিয়ে কথা বলা যায়? সব নাগরিকের কাছ থেকে যেকোনো পরিস্থিতিতে যুদ্ধে যাওয়ার সম্মতি আদায় করে নেওয়া হয়। তোমার দেশের সংবিধানে স্পষ্টভাবে ‘সমাজতন্ত্র’ নিষিদ্ধের কথা বলা আছে। কেউ যদি সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী হয়, কমিউনিজমকে সমর্থন জানাতে চায় তাকে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে অভিযুক্ত হতে হয়।
শ্যাভি এইসব তত্ত্বকথার ধার ধারে না। সে কয়েক মাসের বেতন জমিয়ে একটি সাদা জিপ গাড়ি কিনেছে। এখন তার চাওয়া, গত এক বছরের মতো যেন তেলের দাম নিম্নমুখী থাকে। বেশিরভাগ আমেরিকানের মতো শ্যাভিও জানে না, তেলের মূল্য নিম্ন বা ঊর্ধ্বগতির নেপথ্যের কারণগুলো!
কৃষ্ণাঙ্গ ওয়েন ও শ্বেতাঙ্গ হলস। স্থূল দেহের, কিন্তু কর্মচঞ্চল ও ন্যায়পরায়ণ স্বভাবের ওয়েন প্রকৌশল বিদ্যায় গ্রাজুয়েশন লেভেলে অধ্যায়নরত। ভিন্ন প্রকৃতির প্রেম ও যৌনমনস্ক হলেও আচরণে কোনোরকম অস্বাভাবিকতার লেশ মাত্র নেই। তারা দু’জন বিবাহিত জীবন শুরু করতে যাচ্ছে। দু’জনের টিশার্টে রংধনুর ছাপ, তার মাঝে প্রেসিডেন্ট ওবামার হাস্যজ্জ্বল ছবি। নিচে লেখা ‘থ্যাংকস মি. প্রেসিডেন্ট’।
মেরিল্যান্ডের আকাশে ঝকঝকে রোদ। দিন শেষে ঠিক সন্ধ্যা নামার আগে এক পশলা বৃষ্টি এসে সব ভিজিয়ে দিয়ে গেল। শীত প্রধান দেশগুলোয় বৃষ্টির এক-একটি ফোটা যেন বরফের তীর এসে বিঁধে যাওয়ার দশা। কাজ শেষে প্রতিদিন ওয়েনকে রাইড করে নিয়ে যায় হলস। আজকের সন্ধ্যাটা খানিক ব্যতিক্রম। হলস গাড়ি পার্ক করে বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। ওয়েন গাড়িতে উঠে বসল। হলসের সিল্কি সোনালি চুল বেয়ে বৃষ্টির ফোটা গড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। ওয়েন বেশ কয়েকবার অনুরোধের সুরে ডাকল। হলস কিছুক্ষণ নিরুত্তর থেকে কান্নাজড়ানো কণ্ঠে কিছু একটা বলার চেষ্টা করছে। পরিস্থিতি বুঝে শ্যাভি ও আলেক্সি ছুটে এসে হলসকে বোঝানোর চেষ্টা করল। শেষতক হলস গাড়িতে উঠে বসল তবে প্রতিদিনের মতো ওয়েনকে আলিঙ্গন করা থেকে বিরত থাকতে দেখা গেলো।
রবিবার। ছুটির দিন। ওয়েন এবং হলস আজ স্থানীয় গীর্জায় যাবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ঈশ্বরের কাছে হলস এর একটি বিশেষ প্রার্থনা আছে।
বেশ ক’বছর হলো সান্ড্রা ও চেলসিয়া লুরে কাভার্নের জলপাথরে একটি এক ডলারের কয়েন ছুঁড়ে এসেছে। ছুঁড়ে ফেলার আগে দু’জনের দুই হাতের তালুতে কয়েনটিকে শক্ত করে চেপে ধরে তারা এক মিনিট নীরবে দাঁড়িয়েছিল। এক মিনিটের সেই শপথের মালাটি আজও ছিঁড়ে যায়নি। সান্ড্রাকে এ নিয়ে বেশ আক্ষেপ ও আত্মতৃপ্তি নিয়ে প্রায়ই বলতে শোনা যায়, প্রেমতো আসলে শরীরে থাকে না, থাকে মনে। তা না হলে নারী হয়ে আরেকজন নারীর সঙ্গে দশ-বারোটি বছর পার করে দেয়া তো সহজ কথা না!
যদিও ঈশ্বর সমলিঙ্গের প্রণয়কে অনুমোদন করেননি। ওল্ড টেস্টামেন্টের (বাইবেলের পুরোনো সংস্করণ) বুক অব জেনেসিস এ বলা হয়েছে, ‘স্রষ্টা আকাশ থেকে সাদুম ও গোমারাহ শহরে (মৃত সাগর) সালফার ও আগুনের বৃষ্টি বর্ষণ করলে’ (শাস্তি স্বরূপ)।
ও সন্ধ্যায় হলস-এর বৃষ্টিতে ভেজার রহস্য জানা গেল শ্যাভির কাছ থেকে। ওয়েন তার কলেজের অন্য একটি ছেলের দিকে তাকিয়েছিল। হলস কোনোভাবে জানতে পেরেছে সেই তাকানোর মাঝে ছেলেটির প্রতি ওয়েনের আগ্রহের প্রকাশ ছিল। ‘ইটস অ্যা কোশ্চেন অব লাভ, কোশ্চেন অব লয়ালিটি ‘ফলে হলস’-এর এ নিয়ে ভারি অভিমান হতেই পারে!
শেষ হোক ‘চির বন্ধু চির নির্ভর চির শান্তির’-এর মহান কবি রবীন্দ্রনাথের প্রেমগীতির প্রসঙ্গ টেনে।
সে বছর রবীন্দ্রনাথ গৌরীপুরের জমীদার বাড়ির আতিথ্য গ্রহণ করলেন। সময়টা ১৯২৬ এর ১৮ ফেব্রুয়ারি হবে। প্রতিবেশী এক মৌলানার জমিদারবাড়ির সঙ্গে বেশ হৃদ্যতা ছিল। গ্রামোফোনে তখন বেশ কিছু রবীন্দ্রসঙ্গীতের রেকর্ড বাজানোর প্রচলনও শুরু হয়েছে। মৌলানার স্ত্রী ছিলেন সুকণ্ঠী। জমিদার বাড়ির গ্রামোফোনে শুনে শুনে কয়েকটি গান তিনি আত্মস্থ করে নিলেন। মৌলানা জমিদার সাহেবকে অনুরোধ জানালেন তার স্ত্রী কবিকে একখানা গান শোনাতে চায়। রবীন্দ্রনাথ সম্মতি দিলেন। ঘরের মধ্যে পর্দা টানানো হলো। পর্দার আড়াল থেকে ভেসে আসছে—‘তোমারেই করিয়াছি জীবনেরও ধ্রুবতারা/ এ সমুদ্রে আর কভু হবোনাকো পথহারা….’ রবীন্দ্রনাথ গভীর আনন্দ নিয়ে শুনলেন সে অপূর্ব মূর্চ্ছনা! স্বামী বিবেকানন্দ আগেই গানটিকে প্রার্থনা সঙ্গীত হিসেবে মান্য করা শুরু করেছিলেন। ওই সন্ধ্যায় মৌলানার স্ত্রীর কণ্ঠে গানটি শোনার পর মহাকবি ঘোষণা করলেন, আজ থেকে এ গানটি কেবলই প্রেমের!
পুনশ্চ:
বন্ধুদের মাঝে যদি কেউ ‘অতি বিচক্ষণ’ পাঠক থেকে থাকেন তবে তাঁর বা তাঁদের উদ্দেশে দুই কথা—দৃশ্যপাঠের এ ক্ষুদ্র লেখক ব্যক্তিগতভাবে রবীন্দ্রনাথ এবং গিয়ম অ্যাপোলনিয়রের আদর্শে অনুপ্রাণিত। এই রচনায় অন্যান্য প্রসঙ্গের যে বর্ণনা যুক্ত হলো তা কেবল লেখকের উদার গণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি ও মানুষের ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রতি সম্মান জানানোর অভিপ্রায় মাত্র।

