মাসব্যাপী অমর একুশে গ্রন্থমেলা প্রাথমিকভাবে পাঁচ বছরের জন্য বন্ধ হওয়া উচিত। তাহলে, আমাদের দেশের সৃজনশীল প্রকাশনাশিল্প যে শুধু বইমেলাকেন্দ্রিক হয়ে উঠেছে, এর একটা সত্যিকারের প্রতিকার হবে। মৌসুমি লেখক, প্রকাশকও উধাও হবে এতে। বই প্রকাশ ও বিক্রি হবে বছরব্যাপী। বাংলা একাডেমি তার নিজস্ব কাজে মনোনিবেশ করতে পারবে। এ ছাড়া আরও ক্ষুদ্র-ক্ষুদ্র সুফল পাওয়া যাবে এতে।
কেউ-কেউ আঁতকে উঠতে পারেন আমার এই আকস্মিক প্রস্তাবে—তাহলে বইয়ের প্রকাশনা বা বইয়ের ক্রয়-বিক্রয় বন্ধ হয়ে যাবে না তো! মূলত, এর ফলে বইয়ে বিক্রি আরও বাড়বে। কিন্তু কিভাবে? হয়তো অনেকেই আমার সঙ্গে একমত হবেন না। তাদের জন্য আমি খুব সংক্ষেপে আমার বক্তব্যের পক্ষে কয়েকটি যুক্তি তুলে ধরতে চাই। সত্য হলো এই—প্রকৃত লেখকেরা শুধু একটা মেলাকে উপলক্ষ করে লেখালেখি করেন না। প্রকৃত প্রকাশকেরা অবশ্যই শুধু একটা মেলাকে কেন্দ্র করে বই প্রকাশ করেন না। প্রকৃত পাঠক শুধু মেলায় গিয়ে বই কেনেন না। বিপরীতক্রমে—প্রকৃত লেখক সারাবছরই লেখালেখি করেন। প্রকৃত প্রকাশক সারাবছরই বই প্রকাশ করেন। প্রকৃত পাঠক সরাবছরই বই কেনেন এবং পড়েন। অর্থাৎ, বই লেখা, প্রকাশ, কেনা এবং পড়া একটি বছরব্যাপী প্রক্রিয়া। এটি কোনো মৌসুমি আড়ং নয়।
কিন্তু আমাদের অমর একুশে গ্রন্থমেলা বর্তমানে ‘মৌসুমি হুজুগ’-এ পরিণত হয়েছে। ৯৯.৫ শতাংশ বই এই মেলাতেই প্রকাশিত হয়—এই পরিসংখ্যানই এর প্রমাণ। আর এতে যা হচ্ছে, তা হলো—মৌসুমি লেখকের আধিক্যে প্রকৃত লেখক আড়াল হয়ে যাচ্ছেন। (প্রবাদটি মনে করা যেতে পারে: অধিক সন্ন্যাসীতে গাজন নষ্ট।) মৌসুমি প্রকাশকের দাপটে প্রকৃত প্রকাশক চ্যাপ্টা হয়ে যাচ্ছেন। আবর্জনার স্তূপ (অদরকারি বই) থেকে ভালো বই খুঁজে পেতে পাঠকেরা হিমশিম খাচ্ছেন। বইমেলার যে মূল উদ্দেশ্য, তা মুখ থুবড়ে পড়ছে। আরও যা যা হচ্ছে—সারাবছর বই প্রকাশ হুমকির মুখে পড়ছে।
বাংলা একাডেমি সারাবছর খই ভাজছে। ফলত, বাংলা একাডেমি নামে যে একটা প্রতিষ্ঠান আছে, তা কেবল ফেব্রুয়ারি মাস এলেই মনে পড়ে। আর এই অদরকারি কাজ করতে গিয়ে বাংলা একাডেমি তার নিজস্ব কাজ ভুলতেই বসেছে। ভালো বই কেনার উদ্দেশ্যে মেলায় গিয়ে মৌসুমি লেখকের খপ্পরে পড়ে বাজে বই কিনতে গিয়ে পাঠক ফতুর হচ্ছেন। পরে ভাবছেন, এর চেয়ে মোবাইলে একশ টাকা লোড দিলেই লাভ হতো। কাগজের অপচয় হচ্ছে। বছরের অন্য সময় প্রেস, বাঁধাইকারী, প্রচ্ছদশিল্পী বেকার থাকছেন।
এ কারণেই আমার মনে হয়েছে প্রাথমিকভাবে পাঁচ বছরের জন্য এবং পরবর্তী সময়ে স্থায়ীভাবে অমর একুশে গ্রন্থমেলা বন্ধ করে দেওয়া উচিত।

