১৯৪৭ সাল ভারতবর্ষের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বছর। ১৯০ বছর শাসন করার পরে ব্রিটিশরা ভারত ছেড়ে চলে যায়। তবে যাওয়ার আগে তারা ভারত ভেঙে দুভাগ করে দেয়। আগস্ট মাসের মাঝামাঝি তারা চলে যায়। ১৪ তারিখে পাকিস্তান নামক দেশটি স্বাধীনতা লাভ করে। পরদিন ১৫ আগস্ট ভারতকে স্বাধীনতা দিয়ে ব্রিটিশরা চলে যায়।
ভারতের সঙ্গে বঙ্গও ভাগ হয়ে গেল। পশ্চিমবঙ্গ পড়ল হিন্দু অধ্যুষিত ভারতের ভাগে। আর পূর্ববঙ্গ পড়ল মুসলমান অধ্যুষিত পাকিস্তানের ভাগে। কলকাতা শহর হয়ে গেল হিন্দুদের শহর। আর মুসলমানরা বিকল্প ভাবল ঢাকাকে। সুতরাং কলকাতা থেকে মুসলমানদের ঢাকায় ফিরতে হচ্ছে। আর ঢাকা থেকে হিন্দুদের চলে যেতে হচ্ছে কলকাতায়। পিতৃপুরুষের ভিটেমাটি ত্যাগ করে আরেক দেশে চলে যাওয়ার এ ঘটনা বড়ই মর্মান্তিক। এর প্রভাব হয় সুদূরপ্রসারী। অন্য মুসলমানদের মতো জয়নুল আবেদিনকেও কলকাতা থেকে ঢাকা ফিরে আসতে হলো দেশবিভাগের কারণে।
জয়নুল আবেদিন কলকাতা আর্ট কলেজের শিক্ষকতার চাকরি ছেড়ে এসেছেন। তবে, এখানে বেশিদিন বেকার থাকতে হয়নি। এখানকার শিক্ষিত হিন্দুরা চলে যাওয়ার পরে তাদের শূন্য পদে অনেক মুসলমানের চাকরি হলো। জয়নুল চাকরি পেলেন আরমানিটোলার নর্মাল হাইস্কুলে আর্ট শিক্ষকের পদে। নতুন চাকরিতে যোগদান করে তিনি পরিবার নিয়ে উঠলেন ১২ নম্বর আবদুল হাদি লেনে শ্বশুর বাড়িতে। এ সময় দেখলেন ঢাকা শহর পাকিস্তানের পূর্ববঙ্গ প্রদেশের রাজধানী হলেও এখানে তেমন কিছু গড়ে ওঠেনি। ব্রিটিশরা এ শহরে একটা বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া আর তেমন কিছুই গড়ে তোলেনি। প্রাদেশিক রাজধানীরূপে গড়ে তুলতে হলে এ শহর আধুনিক করে নিতে হবে। একটি আধুনিক শহরে একটি অন্তত আর্টস স্কুল প্রতিষ্ঠা করতে হবে। গ্যালারি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। জয়নুল শুরু থেকেই সে ভাবনা মাথায় রাখলেন। বন্ধুদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা চালিয়ে যেতে লাগলেন।
________________________________________________________________________________________________
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ঢাকায় অবস্থানরত মার্কিন ও অন্য বিদেশি সৈনিকদের জন্য এখানে অল ইন্ডিয়া রেডিওর একটি শাখা অফিস খোলা হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল মূলত জাপানি সৈন্যদের সম্পর্কে খোঁজ-খবর রাখা। যুদ্ধের পরে সৈন্যরা চলে যায়। স্বাধীনতার পরে ব্রিটিশরাও চলে যায়। বেতার অফিস এবং যন্ত্রটি চলে আসে বাঙালি মুসলমানদের হাতে। যুদ্ধের পরে অপ্রয়োজনীয় ভেবে প্রথমে রেডিও অফিসটি বন্ধ করে চলে যেতে চেয়েছিল ব্রিটিশরা।
_________________________________________________________________________________________________
কলকাতা থেকে প্রত্যাগত বাঙালি মুসলমান কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী, অভিনেতা, অভিনেত্রী, সাংবাদিকসহ সুধীজনদের সঙ্গে জয়নুলের ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে। এরা সবাই পূর্ববঙ্গের অথবা পশ্চিমবঙ্গের মুসলমান প্রতিভা। ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ হওয়ার ফলে এদেশের হিন্দু প্রতিভাবানরা চলে যান পশ্চিমবঙ্গে, কলকাতায়। আর কলকাতা থেকে চলে আসেন মুসলমানরা। তবে কলকাতা থেকে ফিরে আসা লোকদের মধ্যে বেশিরভাগ ছিলেন পূর্ববঙ্গের লোক। তাঁরা কলকাতায় পড়াশোনা বা চাকরি-বাকরি করতেন। স্বদেশে ফিরে তারা যার যার কর্মসংস্থান করে নিতে লাগলেন। তবে ঢাকাকে সদ্যগঠিত পাকিস্তানের পূর্ববঙ্গের প্রাদেশিক সরকারের রাজধানী করা হলেও ঢাকা রাজধানী হওয়ার মতো পরিবেশ বা প্রস্তুতি ছিল না। যে কারণে প্রায় রিক্ত একটি মফস্বল শহর হিসেবে ঢাকা নিয়েই বাঙালিদের উন্নয়নের অগ্রযাত্রা শুরু করতে হয়েছে। আর এই অগ্রযাত্রায় বলা যায় কলকাতা প্রত্যাগত বাঙালি মুসলমানদের প্রথম প্রজন্মের শিক্ষিত সুধীজনদের হাতেই ঢাকায় শিল্প-সংস্কৃতির চর্চা শুরু হয়।
কলকাতায় যারা সাংবাদিকতা পেশায় ছিলেন তাদের কেউ কেউ ঢাকায় পত্রিকার অফিস খুলে পত্রিকা প্রকাশের ব্যবস্থা করেন। কেউ পাকিস্তান রেডিওতে যোগ দেন। রেডিও তখন ঢাকায় নতুন চালু হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ঢাকায় অবস্থানরত মার্কিন ও অন্য বিদেশি সৈনিকদের জন্য এখানে অল ইন্ডিয়া রেডিওর একটি শাখা অফিস খোলা হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল মূলত জাপানি সৈন্যদের সম্পর্কে খোঁজ-খবর রাখা। যুদ্ধের পরে সৈন্যরা চলে যায়। স্বাধীনতার পরে ব্রিটিশরাও চলে যায়। বেতার অফিস এবং যন্ত্রটি চলে আসে বাঙালি মুসলমানদের হাতে। যুদ্ধের পরে অপ্রয়োজনীয় ভেবে প্রথমে রেডিও অফিসটি বন্ধ করে চলে যেতে চেয়েছিল ব্রিটিশরা। কিন্তু প্রাদেশিক রাজধানীর গুরুত্ব অনুসারে তা রেখে দেওয়া হয়।
সাতচল্লিশে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরে কলকাতা থেকে ফেরা কবি-শিল্পী ও সাংবাদিকরা পাকিস্তান রেডিওর ঢাকা কেন্দ্রটি অনুষ্ঠান দিয়ে ভরে তোলেন। বলা যায় তারাই এটিকে প্রাণদান করেন। অনুষ্ঠান তৈরি করা, পরিচালনা করার পেছনে শিল্পীদেরও অবদান রয়েছে। কবিরা সেখানে কবিতা আবৃত্তি, কথিকা পাঠ ইত্যাদি কাজে সম্পৃক্ত ছিলেন। যেমন, আব্বাসউদ্দিন, জসীমউদ্দীন, সুফিয়া কামাল, সৈয়দ আলী আহসান, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, সিকান্দার আবুজাফর, বুলবুল চৌধুরী, শওকত ওসমান, ফরুরুখ আহমদ, আহসান হাবীব প্রমুখ। ছোট শহর ঢাকায় এত লোকের কর্মসংস্থান করা কঠিন ছিল। কলকাতা থেকে শুধু পূর্ববঙ্গের কলকাতা প্রবাসীরা ফিরে এলেন— তাই নয়। মুসলমান হওয়ার কারণে পশ্চিবঙ্গের অনেক মুসলমানকে দাঙ্গায় স্বজন-পরিজন ও সর্বস্ব হারিয়ে এখানে চলে আসতে হয়েছে। তাদের মধ্যে অনেক শিক্ষিত এবং উচ্চশিক্ষিত লোকও ছিলেন। লেখক-সাহিত্যিক-অধ্যাপকও ছিলেন। এত বেশি লোকের চাপ ঢাকা সহ্য করতে পারছিল না। তাই ঢাকার বাইরেও অনেককে চলে যেতে হয়েছে।
আরমানিটোলার নরমাল স্কুলটি ছিল তখন টিচার্স ট্রেনিং স্কুল। জয়নুল শিক্ষকদের ছবি আঁকা শেখানোর কাজে লেগে গেলেন। তার বন্ধু ও সহপাঠীদের মধ্যে আনোয়ারুল হক চলে গেলেন চট্টগ্রাম নরমাল স্কুলে। শফিক উল আমীন যোগ দিলেন আরমানিটোলা হাই স্কুলে। হাবীবুর রহমান এবং আলী আহসান গেলেন আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুলে, সফিউদ্দিন আহমদ যোগ দিলেন ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলে। এভাবে তারা কোথাও না কোথাও কাজে লেগে গেলেন।
প্রাদেশিক সরকারের রাজধানী ঢাকাকে নতুন করে গড়ে তোলার সুযোগ পেয়ে সৃষ্টিশীল প্রতিভাগুলো পূর্ণ উদ্যমে কাজে লেগে গেলেন। ঢাকাকে কেন্দ্র করে পূর্ববঙ্গের মুসলমানরা স্বপ্ন দেখতে শুরু করলেন। তাদের স্বপ্নের পাকিস্তান গড়ার কাজে লেগে গেলেন। এ ঢাকায় জন্ম নিতে লাগল তাদের পরের প্রজন্মের শিল্প ও সংস্কৃতিমান সন্তানরা। একের পর এক প্রতিষ্ঠানও গড়ে উঠতে থাকে।
জয়নুল আবেদিন আগে ঢাকা থাকেননি। অনেকেই থাকেননি। তারা এই আধা মুঘল আধা ব্রিটিশ ধাঁচের শহরটা মনের মতো করে সৃষ্টি করতে চাইলেন। এখানে আধুনিক অনেক প্রতিষ্ঠান করতে হবে। চিত্রশিল্পীরা স্বপ্ন দেখলেন, এখানে আর্ট স্কুল এবং আর্ট গ্যালারি গড়ে তোলা হবে। কবি-সাহিত্যিকরা স্বপ্ন দেখেলেন এখানে তাদের জন্য একাডেমি করতে হবে। সাংবাদিকরা ভাবলেন এখানে আধুনিক যন্ত্রপাতি আমদানি করে বাংলা-ইংরেজি পত্র-পত্রিকা চালু করতে হবে, আধুনিক প্রেসকাব প্রতিষ্ঠা করতে হবে। অভিনেতা-অভিনেত্রীরা ভাবলেন এখানে নাট্যমঞ্চ এবং এফডিসি বা চলচ্চিত্র নির্মাণকেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে। শিল্পাঙ্গনের নানা শাখায় তখন স্বপ্ন দেখার পালা। তারা সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে অবিরাম কাজ করতে লাগলেন।
শিল্পী বন্ধু এবং অন্যদের সঙ্গে জয়নুল আলাপ-আলোচনা করতে লাগলেন শিল্পীদের করণীয় এবং শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় বিষয়-আশয় নিয়ে। ঢাকায় একটা আর্ট স্কুল, একটা গ্যালারি এবং শিল্পের জন্য আর্ট কাউন্সিল গড়ে তোলার কথা ভাবলেন। তিনি সরকারের মন্ত্রণালয়ের লোকজনের সঙ্গেও বিষয়গুলো নিয়ে কথা বললেন। কলকাতায় যারা ছিলেন বন্ধুস্থানীয় এবং মুখচেনা তাদের অনেকেই এখন প্রাদেশিক সরকারের কর্মকর্তা এবং মন্ত্রিপরিষদের সদস্য হলেন। তাই স্বপ্ন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও সুযোগ রয়েছে।
প্রাদেশিক সরকারের হাতে এত কিছু করার মতো অর্থ ছিল না। কারণ সরকারি ভবন এবং কর্মকর্তা কর্মচারীদের বাসভবনের বড় অভাব। সংসদ ভবন, সচিবালয় এবং মন্ত্রণালয় চালানোর মতো নতুন নতুন ভবন গড়ে তোলা প্রয়োজন। সরকার হঠাৎ করে এত ব্যয় করবে কোথা থেকে? পূর্ববঙ্গে ব্রিটিশ সরকার বলা যায় উন্নয়নের কিছুই করেনি। এর মধ্যে একটা রাজধানী গড়ে তোলার মতো অর্থ নেই। অর্থাগমের পথও সুগম নয়। শিল্প-কারখানাও গড়ে তোলেনি। সবকিছু নতুন করে করতে হবে। এ অবস্থায় ঢাকা থেকে চলে যাওয়া বনেদি হিন্দুদের পরিত্যক্ত বাড়িঘরগুলো অধিগ্রহণ করে সেখানে বিভিন্ন বিভাগের অফিস বানাতে লাগল।
__________________________________________________________________________________________________
তিনি মানুষের ছবি আঁকলেও সে ছবি যে জনগণের মনে জীবন্ত ও প্রাণবন্ত। দুর্ভিক্ষের ছবিগুলো তাকে জনগণের কাছে যেতে সহায়তা করেছে। তবু দেশের উচ্চমহল থেকে বাধা আসে। কারণ পাকিস্তানে তখন পাকিস্তানকে ইসলামি রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার কথা আলোচনা হচ্ছে। তখনো সংবিধান প্রণীত হয়নি, হলে তা কোরান-সুন্নাহর ভিত্তিতেই নাকি রচিত হবে।
__________________________________________________________________________________________________
ধর্মের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা দেশে ধর্মীয় আবেগ প্রাধান্য পাবে এটাই স্বাভাবিক। কারণ তাদের আবেগের ওপর নির্ভর করে দেশের জন্ম। বাঙালি মুসলমানরা যেমন অনগ্রসর অর্থ-বিত্তে, তেমনই অনগ্রসর ছিল মন-মানসিকতায়। ঢাকার লোকজন ব্রিটিশদের মাধ্যমে আধুনিকতার ছোঁয়া পায়নি। আধা মুঘল এই শহরটায় তাদের সংস্কৃতি ছিল শুধু উচ্চবিত্তের মধ্যে। বাঈজিনাচ, কাওয়ালি গান, উর্দু শের মজলিস, পায়রা ওড়ানো, ঘোড়দৌড়, নৌকাবাইচ ইত্যাদি। মফস্বল ঢাকায় মধ্যবিত্তের বিকাশ তখন সামান্য। হিন্দু মধ্যবিত্তের বিকাশ দ্রুত ঘটলেও মুসলমানরা ছিল পশ্চাৎপদ। নিম্নবিত্তের সংখ্যা ছিল এক সমুদ্র। তাদের সংস্কৃতি প্রায় গ্রামীণ। ঢাকায় যাত্রা, সার্কাস ইত্যাদি নানা উৎসব হতো। মেলা, জন্মাষ্টমী ও মহররমের তাজিয়া মিছিল হতো। কয়েকটি সিনেমা হলে হলিউড থেকে আমদানি করা ইংরেজি, বোম্বের হিন্দি আর লাহোরের উর্দু সিনেমা চলত। এগুলোই ছিল এখানকার প্রধান সংস্কৃতিচর্চা। মুসলমানদের ধর্মীয় মূল্যবোধে আঘাত লাগে এমন কোনও কিছু করা যায় না এখানে। কাজেই ছবি আঁকার জন্য বিদ্যালয়, প্রদর্শনের জন্য গ্যালারি এবং গবেষণা এবং সংরক্ষণের জন্য কাউন্সিল গড়ে তোলার জন্য পরিস্থিতি অনকূল নয়।
চিত্রকলার জন্য ঢাকায় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার কাজে চার দিক থেকে বাধা আসতে থাকে। কিন্তু জয়নুল আবেদিন এত সহজে দমে যাওয়ার লোক নন। প্রতিকূল পরিবেশ থেকে চিত্রশিল্পী হয়েছেন তিনি। তার পরিচয় আজ শুধু বঙ্গে নয়, সারা ভারতবর্ষে ছড়িয়ে পড়েছে। শুধু উপমহাদেশের সীমার মধ্যেই নয় তার পরিচয়। আন্তর্জাতিক বিশ্বেও ছড়িয়ে পড়েছে। অনেক সমালোচকের কাছ থেকে প্রশংসা আদায় করেছেন।
তবে খ্যাতি তার পক্ষে কাজ করেছে। তিনি মানুষের ছবি আঁকলেও সে ছবি যে জনগণের মনে জীবন্ত ও প্রাণবন্ত। দুর্ভিক্ষের ছবিগুলো তাকে জনগণের কাছে যেতে সহায়তা করেছে। তবু দেশের উচ্চমহল থেকে বাধা আসে। কারণ পাকিস্তানে তখন পাকিস্তানকে ইসলামি রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার কথা আলোচনা হচ্ছে। তখনো সংবিধান প্রণীত হয়নি, হলে তা কোরান-সুন্নাহর ভিত্তিতেই নাকি রচিত হবে। জয়নুল নানা প্রতিবন্ধকতা দূর করার চেষ্টা করেন। শিল্পী বন্ধু ও ছাত্রদের প্রচেষ্টাও ছিল তার সঙ্গে। সরকারের কোনো কোনো মন্ত্রীকে বোঝাতে সক্ষম হলেন। বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী হাবীবুল্লাহ বাহার চৌধুরী একজন সংস্কৃতিমান লোক। তিনি কাজী নজরুল ইসলামের ভক্ত ও শিষ্য। তিনি নিজেও সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনা ও সাহিত্য রচনা করেন। তার মাধ্যমে সরকার রাজি হলেন। অবশেষে গুণীজনদের উদ্যোগে এবং সরকারি সহযোগিতায় ১৯৪৮ সালের ১৫ নভেম্বর ঢাকার জনসন রোডের ন্যাশনাল মেডিক্যাল ইন্সটিটিউটের দোতলায় মাত্র দুটি কক্ষ নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় পাকিস্তান গভর্নমেন্ট ইন্সটিটিউট অব আর্ট। প্রথম ব্যাচে শিক্ষার্থী ভর্তি হন মাত্র আঠারো জন। সেপ্টেম্বর মাসের মাঝামাঝিতে ভর্তির বিজ্ঞাপন প্রচারিত হয়েছে। ৩০ সেপ্টেম্বর ভর্তি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় নভেম্বরে ক্লাস শুরু হয়।
প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ করা হয় জয়নুল আবেদিনকে। এর আগেই আগস্ট মাসে জয়নুলকে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার করাচি বেতার কেন্দ্রে প্রধান শিল্পী হিসেবে নিয়োগ দেয়। জয়নুল আগস্টের তিন তারিখে করাচি চলে যান। তার অনুপস্থিতিতে ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব পালন করেন শিল্পী আনোয়ারুল হক। কামরুল হাসান, সফিউদ্দিন আহমদ, আনোয়ারুল হক, হাবীবুর রহমান ও আলী আহসান (সৈয়দ আলী আহসান নন) এখানে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পান।
পরের বছর ফেব্রুয়ারি মাসে জয়নুল আবেদিন করাচি থেকে চলে আসেন। সেখানে তার মন ভালো লাগছিল না। বড় সুবিধার চাকরি ছেড়ে তিনি ঢাকায় ফিরে এসে মার্চ মাসের ১তারিখ থেকে অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন শুরু করেন।
প্রথমবর্ষে ভর্তি হওয়া আঠারো জন ছাত্রের মধ্যে অনেকেই আজ স্বনামধন্য শিল্পী। তাদের মধ্যে রয়েছেন আমিনুল ইসলাম, হামিদুর রাহমান, খালেদ চৌধুরী প্রমুখ। ভর্তি হওয়া ছাত্রদের মধ্যে অবশ্য কয়েকজন ঝরে গিয়েছিল।
প্রথম একটি বছর যেতেই দেখা যায় মাত্র দুই কক্ষের মধ্যে প্রতিষ্ঠান চালানো কঠিন। কারণ প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীরা দ্বিতীয় বর্ষে উঠেছে, আবার প্রথম বর্ষে নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে অফিস চালানো কঠিন। ছাত্ররা স্থানাভাবে বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। তারা আন্দোলন করতে চাইলে শিক্ষকরা নিষেধ করেন। কারণ পাকিস্তানের ইসলামি ধারার সরকার কোনো অজুহাত পেলেই আর্ট স্কুল বন্ধ করে দেবেন।
আর্ট স্কুলটি জনসন রোড থেকে সেগুন বাগিচার সঙ্গীত মহাবিদ্যালয়ে স্থানান্তরের প্রস্তাব ওঠে, আলাপ আলোচনা চলতে থাকে। সরকার রাজি হলে তা বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়। এ বছর জয়নুল সরকারি বৃত্তি নিয়ে বিদেশে যান। পরের বছর লন্ডনের পাকিস্তান হাইকমিশন বার্কলি গ্যালারিতে জয়নুলের একক প্রদর্শনীর আয়োজন করে। এ প্রদর্শনী দেখতে আসেন সমকালীন বিশ্বের অন্যতম সেরা শিল্পসমালোচক এরিখ নিউটন। তিনি জয়নুলের কাজ দেখে প্রশংসা করেন। এ বছর লন্ডন ছাড়াও তিনি ফ্রান্স, বেলজিয়াম ভ্রমণ করেন। বেলজিয়াম, প্যারিস, আঙ্কারা ও ইস্তানবুলে তার প্রদর্শনী হয়ে। ভেনিসে জয়নুল ইউনেস্কো আয়োজিত শিল্প সম্মেলনে যোগদান করেন।
১৯৫৩ সালের জুলাই মাসে জয়নুলের ছোট ছেলে মইনুল আবেদিন এর জন্ম হয়। সেপ্টেম্বরে লাহোরের আল হামরা গ্যালারিতে ‘মেয়ো স্কুল অব আর্ট’ ও ‘পাকিস্তান আর্ট কাউন্সিলে’র আয়োজনে জয়নুলের প্রদর্শনী হয়। এ বছর তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতিদের নিয়ে ছবি আঁকার ব্যাপারে আগ্রহী হন। তাদের সম্পর্কে জানার চেষ্টা করেন। পার্বত্য চট্টগ্রামে যাতায়াতসহ নানা দিকে তার ব্যস্ততা।
আর্ট স্কুলের সাফল্যে তার ব্যস্ততা বেড়ে যায়। তিনি প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব ভবনের জন্য সরকারের কাছ থেকে জমি পাওয়ার জন্য চেষ্টা তদবির শুরু করেন। কারণ বছরে বছরে ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু এখানে সেখানে পরের দালানে স্কুল চালানো যায় না। সঙ্গীত মহাবিদ্যালয় তো নিজেই একটা কলেজ। সেখানে আরেকটা প্রতিষ্ঠান চালানোর ঝামেলা অনেক। অনেক দেন-দরবার করে কয়েকজন মন্ত্রীকে দিয়ে সরকারকে রাজি করান। শাহবাগে ময়মনসিংহ সড়কের পাশে সাড়ে এগারো বিঘা জমি পান প্রতিষ্ঠানটির নামে।
১৯৫৪ সালে জয়নুলের বন্ধু নৃত্যশিল্পী বুলবুল চৌধুরী ক্যানসার আক্রান্ত হয়ে মারা যান। কলকাতা থেকে ফেরার পরে ১৯৪৯ সালে বুলবুল চৌধুরীকে পাকিস্তানের জাতীয় নৃত্যশিল্পী ঘোষণা করা হয়েছিল। তিনি কিছুদিন ধরেই অসুস্থ। রোগ নিয়েই তিনি কয়েকটা অনুষ্ঠান করেছেন। এ ঘটনা শুধু জয়নুলের জীবনেই একটা বড় আঘাত নয়, এ দেশের সংস্কৃতির অঙ্গনে একটা বড় ধরনের শূন্যতা সৃষ্টি করে।
বুলবুল চৌধুরীর মৃত্যুর পরে তার স্ত্রী বেগম আফরোজা বুলবুল অনেক চেষ্টা করে পরের বছর ১৯৫৫ সালে স্বামীর নামে একটি ললিতকলা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন। এর নাম ‘বুলবুল ললিতকলা একাডেমী’ সংক্ষেপে বাফা বলা হয়। সদর ঘাটের কাছে ওয়াইজঘাটে এটি স্থাপিত করা হয়। ঢাকা এবং আশেপাশের ছাত্র-ছাত্রীদের যাতায়াতের সুবিধা হয়।
_________________________________________________________________________________________________
ব্রিটিশদের শাসন ও শোষণের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য বাঙালি মুসলমানরা ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রাম করেছে। স্বপ্নের পাকিস্তান গড়ে তুলেছে। কিন্তু পাকিস্তান রাষ্ট্রপরিচালনায় দক্ষতার প্রমাণ দিতে পারেনি পশ্চিমঅংশের নেতারা। সংবিধান রচনা করতে নয় বছর লেগে গেছে।
_________________________________________________________________________________________________
কলকাতা থেকে ফিরে আসা জয়নুলের বন্ধু-বান্ধব এবং স্থানীয় কবি-সাহিত্যিক-শিল্পী-সাংবাদিক ও বিজ্ঞানী-গবেষকদের জন্য একের পর এক ব্যবস্থা করা হয়। পূর্ববঙ্গের কবিসাহিত্যিকদের অনুপ্রেরণায় এবং প্রণোদনার লক্ষ্যে ১৯৫৫ সালেই বাংলা একাডেমি প্রতিষ্ঠা করা হয়। এখানে অনেক কবি-সাহিত্যিক-অনুবাদকের সমন্বয়ে সাহিত্যের উন্নয়নের কাজ চলে। এখানকার বিজ্ঞানী ও বিজ্ঞান গবেষকদের জন্য একই বছর প্রতিষ্ঠা করা হয় সাইন্স ল্যাবরেটারি। এর আগে ১৯৫৪ সালে একানকার সাংবাদিকদের জন্য প্রতিষ্ঠা করা হয় প্রেস কাব। এর অনেক আগে প্রাণিসম্পদ সংরক্ষণ ও প্রদর্শীর জন্য ১৯৫০ সালে ঢাকা হাইকোর্টের কাছে চিড়িয়াখানা প্রতিষ্ঠা করা হয়। এসব প্রতিষ্ঠানে জয়নুলের কাছের লোকেরা দায়িত্ব লাভ করেন এবং সৃজনশীল কাজ করার সুযোগ পান। এসব কাজে জয়নুলেরও অংশগ্রহণ ছিল। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের লোগো, মনোগ্রামসহ নানা ডিজাইন বা নকশা এবং পরিচালনা ও পরিকল্পনার সঙ্গে জয়নুল আবেদিন যুক্ত থাকেন।
জয়নুল বিভিন্ন সাহিত্য ও সাস্কৃতিক অনুষ্ঠানেও উপস্থিত থাকতেন। তিনি চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত ১৯৫১ সালের ষোলো থেকে উনিশে মার্চ পর্যন্ত তিনি দিন ব্যাপী পূর্ব পাকিস্তান সাংস্কৃতিক সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন। মূল অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেছিলেন আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ। উদ্বোধন করেছিলেন সুফিয়া কামাল। আর শিল্পকলা শাখার সভাপতিত্ব করেছেন জয়নুল আবেদিন। অনুষ্ঠানমালার অংশ হিসেবে জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসান, সফিউদ্দিন আহমদ, আমিনুল ইসলাম, হামিদুর রাহমানসহ জয়নুল প্রতিষ্ঠিত ‘ঢাকা আর্টগ্রুপ’ চিত্রকলা প্রদর্শনীর আয়োজন করেন। পরের বছর বাহান্ন সালে বাইশ থেকে চব্বিশ আগস্ট কুমিল্লা টাউন হলে ‘কুমিল্লা প্রগতি মজলিশ’ আয়োজিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়। এখানেও অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ। এখানেও ‘ঢাকা আর্ট গ্রুপে’র শিল্পীরা প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেন। জয়নুল এসব অনুষ্ঠানে নিজে অংশগ্রহণ করে অথবা না থেকে ঢাকার বাইরের সারা দেশে আধুনিক চিত্রকলার পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য শিল্পীদের অনুপ্রাণিত করতেন।
ফেব্রুয়ারি মাসে আর্ট স্কুলের নিজস্ব ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়। এ নতুন ভবনের নকশা করেন এদেশের প্রথম আধুনিক স্থপতি মাজহারুল ইসলাম। উদ্বোধন করেন তৎকালীন পূর্ববঙ্গের গভর্নর চৌধুরী খালেকুজ্জামান। মাজহারুল ইসলাম এবং জয়নুল আবেদিন কাছে থেকে কাজের দেখাশোনা করেন। ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত এই বিশাল ভবনের কাজ চলে।
১৯৫৬ সালটা জয়নুল আবেদিনের এবং আমাদের জাতীয় জীবনে গুরুত্বপূর্ণ। এ বছর গভর্নমেন্ট ইন্সটিটিউট অব আর্টস-এর শাহবাগের নিজস্ব ভবনে স্থানান্তিরিত হয়। বাঙালিদের আরেকটা সাংস্কৃতিক সাফল্য—তাদের নিজেদের তৈরি প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য সবাক চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’ মুক্তি পায়। এবং সে বছরই দাবি ওঠে ঢাকায় একটি চলচ্চিত্র উন্নয়ন কেন্দ্র গড়ে তোলা হোক। শিল্প-সংস্কৃতির অঙ্গনের লোকদের দাবি মেনে সরকার পরের বছর ঢাকায় এফডিসি প্রতিষ্ঠা করে।
যে কয়েকজন ব্যক্তির সহযোগিতায় ও অনুপ্রেরণায় পাকিস্তান যুগে বাঙালিরা শিল্প-সংস্কৃতির অঙ্গনে সাফল্য দেখাতে পেরেছেন তাদের একজন হাবীবুল্লাহ বাহার চৌধুরী। তার ছোটবোন কবি শামসুন্নাহার মাহমুদ। কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাদের ভাইবোনকে একত্রে ডাকতেন ‘বাহার-নাহার’ বলে। শামসুন্নাহার মাহমুদ মূলত শিশুসাহিত্যিক ছিলেন। তিনি ছোটদের জন্য অনেকগুলো বই লিখেছেন। শিশুসাহিত্যের পত্রিকা ‘বুলবুল’ ভাইবোনে মিলে সম্পাদনা করতেন। জয়নুলকে তারা স্নেহ করতেন। জয়নুল তাদের আদর স্নেহের স্মারক হিসেবে ‘ঢাকা চারুকলা ইন্সটিটিউটে’র একাংশে শিশুকল্যাণ পরিষদের সহায়তায় ‘শামসুন্নাহার মাহমুদ শিশু চিত্রাংকন বিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠা করেন।
জয়নুল এ বছর যুক্তরাষ্ট্রের রকফেলার ফাউন্ডেশনের আমন্ত্রণে একবছরের জন্য বিদেশ যান। জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং ইউরোপের জার্মানি, বেলজিয়াম, ফ্রান্স, ইতালি ও স্পেন ভ্রমণ করেন। বিভিন্ন দেশের চারুকলা কেন্দ্র, জাদুঘর, গ্যালারি এবং লোকশিল্পের নানা নিদর্শন দেখেন। নানা দিক দিয়ে বছরটা তার সাফল্যে এবং ব্যস্ততায় কাটলেও তার জন্য কষ্টেরও বছর। কারণ এ বছর সেপ্টেম্বর মাসেই বাবা তমিজউদ্দিন আহমদ মারা যান।
যুক্তরাষ্ট্রে বছরব্যাপী ভ্রমণকালে পরের বছর এপ্রিলের ৮-২৯ তারিখ পর্যন্ত ওয়াশিংটন ডিসির স্মিথসোনিয়ান ইন্সটিটিউশনে ৫২ চিত্রকর্মের বিশাল প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়।
দেশে ফেরার পরে ১৯৫৮ সালে জয়নুল আবেদিন চারুকলা ইন্সটিটিউটে লোকশিল্প প্রদর্শনীর আয়োজন করেন। তিনি আধুনিক রীতির শিল্পকলা নিয়ে পড়াশোনা করলেও লোকশিল্পের প্রতি সর্বদাই আকর্ষণ অনুভব করতেন।
এ সময় তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলের জীবন সদস্য নির্বাচিত করা হয়। জয়নুল আবেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন না। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের কাছে তিনি জনপ্রিয় ছিলেন। সাতচল্লিশে দেশভাগের পরে ঢাকায় ফিরে যখন তিনি আরমানিটোলার নরমাল স্কুলে শিক্ষকতার চাকরি নেন। এর কয়েকমাস পরে ১৯৪৮ সালের জানুয়ারি মাসে তার বন্ধুরা তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী ও শিক্ষকদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য এক পরিচিতিসভা এবং চিত্রপ্রদর্শনীর আয়োজন করেন।
অনুষ্ঠানটির অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী। ফজলুল হক হলে হয়েছিল অনুষ্ঠানটি। সারা দিনব্যাপী অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক ছাড়াও শিল্পরসগ্রাহী অনেক লোক অনুষ্ঠানে উপস্থিত হন। তারা জয়নুলকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ পান। এবং তার দুর্ভিক্ষের ছবিগুলো দেখে মুগ্ধ হন। সে ঘটনার দশ বছর পরে জয়নুলকে ফজলুল হক হলের জীবন সদস্য নির্বাচিত করা হল।
__________________________________________________________________________________________________
তার অদম্য শিল্পপ্রতিভাকে ধর্মীয় গোঁড়ামি দিয়ে দূরে সরিয়ে রাখার সাহস পায়নি। লাহোর ও করাচিতে তার প্রদর্শনী হয়েছে। প্রতিবছর পাকিস্তান আর্ট কাউন্সিল বার্ষিক চারুকলা প্রদর্শনীতে তাকে আহ্বান করে। করাচি রেডিওতে তাকে প্রধান ডিজাইনার হিসেবে নিয়োগ দিয়ে ভালো কিছু কাজ করিয়ে রাখতে চেয়েছে পাকিস্তান সরকার।
__________________________________________________________________________________________________
ব্রিটিশদের শাসন ও শোষণের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য বাঙালি মুসলমানরা ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রাম করেছে। স্বপ্নের পাকিস্তান গড়ে তুলেছে। কিন্তু পাকিস্তান রাষ্ট্রপরিচালনায় দক্ষতার প্রমাণ দিতে পারেনি পশ্চিমঅংশের নেতারা। সংবিধান রচনা করতে নয় বছর লেগে গেছে। একটি সাধারণ নির্বাচন দিয়ে জনগণের ভালোবাসা নিয়ে নির্বাচিত একটি সরকারকে দেশ পরিচালনা করা সুযোগ দিতে দীর্ঘদিন সময় লেগেছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার সাত বছর পরে নির্বাচন দিয়েছে। কিন্ত নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতায় টিকতে দেয়নি।
উন্নয়নের ক্ষেত্রে শুরু থেকেই বৈষম্য করেছে পাকিস্তান সরকার। তারও আগে থেকে পূর্ববঙ্গের জনগণের ওপর রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুকে চাপিয়ে দিতে চেয়েছে। রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে বাংলাভাষাকে উপেক্ষা করার মধ্যে দিয়েই বাঙালি বুঝতে পেরেছে পাঞ্জাবের নবাব-জমিদারদের হাতে শোষিত হবে পূর্ববঙ্গের জনগণ। কিন্তু বাঙালি বারবার জেগে উঠেছে, প্রতিরোধ করেছে। প্রথম সাধারণ নির্বাচন দেরিতে হলেও দেখা গেল, পূর্ববঙ্গ প্রদেশে নবাব-জমিদারদের মুসলিম লীগ চরমভাবে পরাজিত হয়েছে যুক্তফ্রন্টের কাছে। ভাষা আন্দেলনের পরে শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে আবার আন্দোলন। এর পরে পূর্ববঙ্গের রাজনৈতিক নেতাদের ঘন ঘন গ্রেপ্তার, বিনাবিচারে জেলে পাঠানো। এসব ঘটনা জয়নুল প্রত্যক্ষ করেছেন।
জয়নুল আবেদিন সরাসরি রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হননি। জড়ালে পাকিস্তান সরকার ধর্মের নামে আর্ট স্কুল বন্ধ করে দিয়ে তাকে হয়তো কেন্দ্রীয় সরকারের অধীন কোনও বড় পদে চাকরি দিয়ে দিত। প্রতিষ্ঠানকে টিকিয়ে রাখা এবং শিল্পচর্চা অব্যাহত রাখার জন্য তিনি দলীয় রাজনীতি থেকে দূরে সরে থেকেছেন। তিনি ভাবতেন, শিল্পের ভেতর দিয়েও রাজনৈতিক কথা বলা যায়; জনগণ মনের ভাব প্রকাশ করতে পারে।
জয়নুল আবেদিন র্প্বূবঙ্গের হলেও তার প্রতিভাকে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার মর্যাদা দিতে চেষ্টা করেছে। তার অদম্য শিল্পপ্রতিভাকে ধর্মীয় গোঁড়ামি দিয়ে দূরে সরিয়ে রাখার সাহস পায়নি। লাহোর ও করাচিতে তার প্রদর্শনী হয়েছে। প্রতিবছর পাকিস্তান আর্ট কাউন্সিল বার্ষিক চারুকলা প্রদর্শনীতে তাকে আহ্বান করে। করাচি রেডিওতে তাকে প্রধান ডিজাইনার হিসেবে নিয়োগ দিয়ে ভালো কিছু কাজ করিয়ে রাখতে চেয়েছে পাকিস্তান সরকার। তার শিল্পের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৫৯ সালে পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি কর্তৃক সর্বোচ্চ সম্মান ‘প্রাইড অব পারফরমেন্স’ প্রদান করা হয়। একই বছর সরকারের সম্মানজনক ‘হেলাল-ই- ইমতিয়াজ’ খেতাব দেওয়া হয়। এ বছরের আঁকা বিখ্যাত চিত্রকর্ম ‘সংগ্রাম’।

