কাচের মেয়ে: সমাজ-বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি ॥ রাকিবুল রকি | চিন্তাসূত্র
৬ ফাল্গুন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ | রাত ২:১১

কাচের মেয়ে: সমাজ-বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি ॥ রাকিবুল রকি

কবিতা বা নাটকের তুলনায় উপন্যাস অর্বাচীন হলেও কবিতা বা নাটকের তুলনায় উপন্যাসের পাঠক সংখ্যা বেশি। পাঠকের কাছে এই গ্রহণযোগ্যতার একটি অন্যতম কারণ হলো—কবিতা বা নাটকের চেয়ে উপন্যাসের সঙ্গে একাত্মা হওয়া সহজ। উপন্যাসের সঙ্গে পাঠকের একাত্মা হওয়ার কারণ ই. এম. ফরস্টারের ভাষায় বলা যায়, ‘অন্যান্য শিল্প-মাধ্যম থেকে উপন্যাসের তফাৎ এই যে, উপন্যাস যা কিছু অপ্রকাশিত, তাকে প্রকাশ করতে পারে।’

বর্তমানে আমরা উপন্যাসের মধ্যেও সাধারণত দুই ধরনের উপন্যাস দেখতে পাই। এক. হালকা, চটুল, এক বসায় পড়ে ফেলা যায় (তবে আয়তনের ঊনত্ব উপন্যাস বিচারের মানদণ্ড নয়, কারণ ক্ষীণায়ব নিয়েও ‘দ্য ওল্ড ম্যান ইন দ্য সি’ মাস্টারপিস উপন্যাস)। দুই. গুরুগম্ভীর, দীর্ঘায়ব, পাঠকের ভাবনা চিন্তাকে খণ্ড-বিখণ্ড করে লেখকের কল্পনার অনুগামী করে তোলে।

এ ধরনের উপন্যাস পাঠের সময় পাঠকের মন সদা সতর্ক থাকে। উপন্যাসের নায়ক বা নায়িকা যা দেখছে পাঠকের চোখেও ভেসে উঠে সে চিত্র। কোনো ভাবেই তাকে এড়ানো সম্ভব হয় না।

যুগে যুগে জনপ্রিয় উপন্যাসের তালিকায় প্রথমোক্ত উপন্যাসের নামই বেশি ছিল। এখনো আছে। তবে সিরিয়াস উপন্যাস জনপ্রিয় হয় না, তাও নয়।

পাঠকের দোরগোড়ায় পৌঁছানোর জন্য সাধারণত অনেকেই রাজনীতি, প্রেম, যৌনতার মিশ্রণ ঘটিয়ে প্রথম শ্রেণির আখ্যান তৈরি করেন। এসব আখ্যান খুব সহজেই পড়ে শেষ করা যায়, আবার শেষ করার সঙ্গে সঙ্গে সহজেই ভুলে যাওয়া যায়। অনেকে আবার পাঠক, জনপ্রিয়তা এইসব শব্দ ভুলে গিয়ে দ্বিতীয় ধারার উপন্যাস নির্মাণের পথে যাত্রা করেন। শিল্পের শুদ্ধতা, মনের আনন্দই তাদের কাছে বড় কথা।

আরও পড়ুন: মাঝে-মাঝে জীবনদর্শনও বদলে যায় ॥ চাণক্য বাড়ৈ

সম্প্রতি অগ্রজ কবি ও প্রাবন্ধিক মোহাম্মদ নূরুল হকের মাধ্যমে কবি চাণক্য বাড়ৈর প্রথম উপন্যাস ‘কাচের মেয়ে’র পাণ্ডুলিপি পড়ে কথা গুলো মনে এলো। চাণক্য বাড়ৈ মূলত কবি হিসেবে পরিচিত। ‘কাচের মেয়ে’ উপন্যাসের মাধ্যমে তিনি ঔপন্যাসিক হিসেবে আবির্ভূত হতে যাচ্ছেন।

বাংলা উপন্যাস প্রধানত নায়ক প্রধান। নায়কের তুলনায় নায়িকাকে কেন্দ্র করে উপন্যাস লেখা হয়েছে খুব কমই। ‘কাচের মেয়ে’ উপন্যাস গড়ে উঠেছে একজন নায়িকাকে কেন্দ্র করে। অর্থাৎ এই উপন্যাসের প্রধান ও মুখ্য চরিত্র একজন মেয়ে। সানিয়া মেহজাবীন। উপন্যাসের আদ্য-মধ্য-অন্ত্য বিবৃত হয়েছে সানিয়া মেহজাবীনের জবানিতে। সানিয়া মেহজাবীন উপন্যাসজুড়ে তার জীবনের কথা বলেছেন। সানিয়া মেহজাবীন স্বপ্নবান, স্বাধীনচেতা মেয়ে। মা নেই। বাবা ঘরে সৎ মা নিয়ে এসেছে। ইন্টারমেডিয়েট পাস করার পর সানিয়া ভর্তি হয় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর হলে উঠতে চাইলেও বাবার ইচ্ছায় এক দূরসম্পর্কীয় ফুপুর বাসায় ওঠে। ফুপুর বাড়িতে থাকা সাময়িক সময়ের জন্য মেনে নিলেও মন থেকে গ্রহণ করতে পারেনি সানিয়া।

উপন্যাসের শুরুতেই তাই সানিয়াকে বলতে শুনি, ‘আজ দুদিন হলো এ বাসায় এসেছি। প্রথম যেমন মুখ ভার করে এসেছিলাম, আজও তেমনই রয়ে গেছে মুখের অবস্থা। আমার মনে হচ্ছে, আর কখনো আমি প্রাণখুলে হাসতে পারব না। মনের আনন্দে নেচে নেচে উড়ে বেড়াতে পারব না একটা রঙিন প্রজাপতির মতো। এখন আমি চার দেয়ালে বন্দী।’

না, এই বন্দিত্ব থাকেনি সানিয়ার। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস চালু হওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই সে হলে উঠে পড়ে। এতে তার বাবার সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়। বাবা বাড়ি থেকে টাকা পাঠানো বন্ধ করে দেয়। এক বড় আপুর সহায়তায় সে বাম সংগঠন দ্বারা পরিচালিত এক কোচিং সেন্টারে জয়েন করে। কোচিং সেন্টারে জয়েন করার পরও সে তৃপ্ত হতে পারে না। কারণ কোচিং সেন্টারে জয়েন করার ফলে তাকে সময়ে অসময়ে পার্টির কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করতে হয়। মনের সায় না থাকা স্বত্ত্বেও অংশগ্রহণ করতে হয়। এর মধ্যে সানিয়ার পরিচিতের গণ্ডী বেড়েছে অনেক। ধ্রুব, নাহিদা, আবীর, ডিপার্টমেন্টের শিক্ষক মো. রেজাউল করিম রিপনসহ অনেকের সঙ্গে সখ্য বেড়েছে। মো. রেজাউল করিম রিপনের সহায়তায় এক সময় সানিয়া অন্য এক বিভাগের অধ্যাপক আফতাব উদ্দিন আহমেদের অধীনের এক প্রজেক্টের কাজে যোগ দেয়। সানিয়ার কাজ হলো বিভিন্ন ফাইল কম্পোজ করা এবং সেগুলো প্রিন্ট দেওয়া। নতুন কাজ পাওয়ার পর সে কোচিংয়ের কাজ ছেড়ে দিয়ে পড়াশোনায় মন দেয়। ইয়ার ফাইনালের ফলাফল দিলে দেখা যায় সানিয়া বিভাগের মধ্যে দ্বিতীয় হয়েছে। সানিয়ার স্বপ্ন আরও বেড়ে যায়। বেড়ে যায় পড়াশোনার প্রতি উৎসাহ। কিন্তু সানিয়া প্রচুর পড়াশোনার পরও দেখা যায় এক টিউটেরিয়াল পরীক্ষায় শূন্য পেয়েছে। অই শিক্ষকের সঙ্গে যোগাযোগ করলে সে সানিয়াকে বলে তার টিউটেরিয়ালের খাতা পাওয়া যায়নি। টিচার অবশ্য আন্তরিকভাবে এর বিকল্প সমাধানও বাতলে দেন। কিন্তু বিনিময়ে তার সঙ্গে সানিয়ার শারীরিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। সানিয়া রাজি না হলে রশিদ স্যার তার কুৎসিত বাসনা চরিতার্থ করার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ে সানিয়ার ওপর।

সানিয়া অনেক অনুনয়, বিনয় করে বলে, ‘স্যার আপনি আমার বাবার মতো, প্লিজ আমাকে মাফ করে দিন। আমাকে যেতে দিন স্যার। প্লিজ।’

কিন্তু তারপরও ওই শিক্ষক সানিয়াকে ছেড়ে দেয় না। সানিয়া অনুভব করতে থাকে একটা দানব হাত তার সর্বশক্তি দিয়ে বাংকারের মতো তার পিঠে বিচরণ করছে। বলতে থাকে, ‘এখানে কেউ আসবে না। পৃথিবীর কেউ যদি না দেখে, না জানে তাহলে তোমার আপত্তি কিসের?’ তারপরও সানিয়া ক্ষমা চাইতে থাকলেও রশিদ স্যার বলে, ‘কী বলছ? ছি! সন্ধ্যার পর যে বয়ফ্রেন্ডের সাথে ঝোপের আড়ালে গিয়ে বসো, তাকে কি তুমি ভাই মনে করো? হাহাহা। …ওদের কাছে যদি তোমার এই ডিলিশাস… এইসব… এই যৌবন তুলে দিতে পারো… আমি কী দোষ করলাম? তোমার মনে হতে পারে, আমি খুব এজেড পার্সন। আসলে কিন্তু তা না। আই অ্যাম ভেরি ইয়ং। দেখো। আই অ্যাম ভেরি অ্যাকটিভ অন বেড। কাম… প্লিজ! ওই দেখো… বোকা মেয়ে… কী হলো?’ তারপর  অনেক চেষ্টায় সানিয়া তার একটা পা এমন অ্যাংগেলে নিতে সক্ষম হয়, যেখানে সে শক্তি প্রয়োগ করতে পারবে। হয়তো ছাড়িয়ে নিতে পারবে নিজেকে। প্রাণপণে সে সেই চেষ্টা করে যেতে থাকে। এমন সময় শিক্ষক নামের কামুক প্রাণিটি তার কপালে একটি চুমু বসিয়ে দিল। সানিয়া বসা থেকে উঠে যাওয়ার সাধ্যমতো চেষ্টা করলে একসময় টুলটা কাত হয়ে পড়ে যায়। সানিয়াও মেঝেতে পড়ে যায়। কনুই আর হাঁটুতে চোট লাগে। এভাবে সে রশিদ স্যারের আয়ত্তের বাইরে চলে যায়। তারপর মোবাইল কুড়িয়ে নিয়ে ওড়না, পার্টস আর জুতো রেখেই হনহন করে রুম থেকে বেরিয়ে আসে। এমন সময় বারান্দায় বাম সংগঠনের তিনজন ছাত্রের সঙ্গে তার দেখা হয়। তারা মূলত সানিয়ার চিৎকার শুনে এগিয়ে এসেছে। সানিয়া কিছু না বলে একটি রিকশা নিয়ে তার হলে চলে আসে এবং প্রচণ্ড অসুস্থ হয়ে পড়ে। ওই ছাত্ররা রশিদ স্যারকে তার কক্ষেই বন্দি করে রাখে। সানিয়া রুমে এসে নাদিয়া আপাকে ফোন করে রুমে আসতে বলে। নাদিয়া রুমে এসে সানিয়ার কাছে সব শুনে রাগে জ্বলে ওঠে। তখন ক্যাম্পাসে এই ঘটনা নিয়ে আন্দোলন শুরু হয়। পত্রিকাতে চলে আসে সেই সংবাদ। লেখা হয়,

‘যৌন নিপীড়নের অভিযোগে অবরুদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষককে উদ্ধার: আন্দোলন অব্যাহত। সাজানো নাটক, বললেন অভিযুক্ত অধ্যাপক।’

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক: এক শিক্ষার্থীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে রাতভর অবরুদ্ধ থাকার পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের হস্তক্ষেপে গতকাল সোমবার বিকেলে মুক্তি পেয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মো. আব্দুর রশিদ।

জানা গেছে, গত রোববার বিকেল আনুমানিক পাঁচটার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিদ্যা ভবনের একটি কক্ষ থেকে একটি মেয়ের চিৎকার শুনতে পেয়ে তিন-চারজন শিক্ষার্থী সেদিকে ছুটে যায়। এ সময় তারা এক ছাত্রীকে ওই অধ্যাপকের কক্ষ থেকে বিপর্যস্ত অবস্থায় বেরিয়ে যেতে দেখে। পরে শিক্ষার্থীরা অধ্যাপকের কক্ষে গিয়ে লাঞ্ছনার শিকার মেয়েটির ওড়না, এক জোড়া জুতো আর তার ভ্যানিটি ব্যাগ দেখতে পায়। ঘটনা কী, তা জানতে চাইলে মো. আব্দুর রশিদ কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। কক্ষের মেঝেতে ছড়িয়ে থাকা জরির চুমকি আর ওই শিক্ষকের শার্টে খয়েরি লিপিস্টিকের দাগ দেখতে পেয়ে এক পর্যায়ে শিক্ষার্থীরা উত্তেজিত হয়ে পড়ে। তারা তার মোবাইল ফোন কেড়ে নেয় এবং টেলিফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। একপর্যায়ে আরো শিক্ষার্থী জড়ো করে তারা ড. আব্দুর রশিদকে অবরুদ্ধ করে রাখে।

খবর পেয়ে আব্দুর রশিদকে উদ্ধারের জন্য রাত দশটার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর মো. রুহুল আমীন সেখানে উপস্থিত হলে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা বাধা দেয়। এতে সারা রাত অভিযুক্ত অধ্যাপক তাঁর কক্ষে অবরুদ্ধ থাকেন।

গতকাল সকাল থেকে অভিযুক্ত শিক্ষকের চাকরিচ্যুতির দাবিতে সাধারণ শিক্ষার্থীরা ক্লাস বর্জন করে এবং ‘উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি ও নিপীড়ন নীতিমালা, ২০০৮’ মোতাবেক উপযুক্ত শাস্তি চেয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। পরে বেলা তিনটার দিকে বিশ^বিদ্যালয়ের উপাচার্য এসএম আহসানুল্লাহর আশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে পরিস্থিতি শান্ত হয়। তিনি অবরুদ্ধ অধ্যাপককে উদ্ধার করে তাঁর কার্যালয়ে নিয়ে যান।

পরে গতকাল সন্ধ্যায় সাভার ও জাবি সাংবাদিক প্রতিনিধিদের সাথে এক সংবাদ সম্মেলনে অভিযুক্ত শিক্ষক ড. আব্দুর রশিদ নিজেকে সম্পূর্ণ নির্দোষ দাবি করে বলেন, তিনি ভিসি বিরোধী শিক্ষক প্যানেলের ষড়যন্ত্রের শিকার। তাঁকে সামাজিক ও পারিবারিকভাবে হেয় করার জন্য এবং তাঁর পেশাগত অর্জনে ঈর্ষান্বিত হয়ে চরিত্রহীন একটি মেয়েকে দিয়ে এই নাটক সাজানো হয়েছে। ওই ছাত্রী ক্যাম্পাসে এক জ্যেষ্ঠ অধ্যাপকের রক্ষিতা হিসেবে পরিচিত। এ ধরনের মূল্যবোধহীন মেয়েদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম ক্ষুণ্ন হচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তিনি আরো বলেন, প্রয়োজন হলে ওই দুশ্চরিত্রা ছাত্রীর পরিচয় বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসন ও সংবাদ মাধ্যমে তিনি ফাঁস করে দেবেন এবং তার ছাত্রত্ব বাতিলের দাবি জানাবেন। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে প্রাণিবিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আ ফ ম জগলুল হায়দার বলেছেন, ড. আব্দুর রশিদ দীর্ঘদিন ধরে দক্ষতা ও সুনামের সাথে অধ্যাপনা করে আসছেন। কোনো মহল শত্রুতাবশবত তাঁর সুনাম ক্ষুণ্ন করার অপপ্রয়াস করছে। তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এর ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যে সিদ্ধান্ত দেবে, আমরা সেই অনুসারে ব্যবস্থা নেব।

তবে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ভিকটিমের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।’

সানিয়া বুঝতে পারে, সে শত চেষ্টা করলেও তার নাম গোপন রাখতে পারবে না। প্রকাশ হয়ে পড়বে। বরং যা নয় সে কলঙ্কের বোঝা তাঁর কাঁধে এসে পড়বে। তার সব স্বপ্ন মুহূর্তেই ভেঙে খান খান হয়ে যায়। তার মনে হতে থাকে তার যাবার সব পথ বন্ধ হয়ে গেছে। সৎ মা, জীলানী, সালাউদ্দীনের কবল থেকে লড়াই করে মুক্তি পেলেও এখানে এসে সে ভেঙে পড়ে। তাই সে ঘুমের ট্যাবলেট সংগ্রহ করে অনেকগুলো একসঙ্গে খেয়ে আত্মহত্যা করার জন্য। এখানেই লেখক সমাপ্তি টানেন উপন্যাসের।

পৃথিবীতে মানুষের মধ্যে দুটো ভাগ—নারী ও পুরুষ। পুরুষের তুলনায় নারীর পদে পদে বাধা। অবশ্য নারীর যদি পদস্খলন ঘটে তবে এগিয়ে যাবার পথ সুগম হয়। উপন্যাসেও আমরা এমন দুয়েকটি নারীর দেখা পাই। নাদিয়া আপা সানিয়াকে যাদের কথা ঘৃণাভরে বলে, ‘তোদের চার নম্বর হলে বেশি না, দুই-তিনটা মেয়ে আছে। সরকারি দলের বড় ভাইদের কাছ থেকে দেহের বিনিময়ে সুবিধা নেয়।’ সেটা ভিন্ন প্রসঙ্গ।

‘কাচের মেয়ে’ উপন্যাসেও আমরা একজন সংগ্রামী আত্মপ্রত্যয়ী নারীর প্রতিমূর্তি পাই। যে অনেকগুলো বাধা অতিক্রম এসে অবশেষে থমকে দাঁড়ায়।  আমাদের সমাজে নারীর অবস্থা চর্যাপদের ‘অঁপণা মাংসে হরিণা বৈরী’র মতো। তাই পদে পদে তাকে যৌন হেনস্থার মুখোমুখি হতে হয়।

আরও পড়ুন: মেলায় এলো চাণক্য বাড়ৈ’র কাচের মেয়ে

বর্তমানে বিশ্বব্যাপী যে ‘মিটু’ আন্দোলন শুরু হয়েছে। চাণক্য বাড়ৈ তাঁর উপন্যাসে সেই যৌননির্যাতিত প্রতিবাদী নারীদের প্রতিচ্ছবি এঁকেছেন তাঁর উপন্যাসে। আশ্চর্যের বিষয় হলো বর্তমানে বাংলাদেশে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া বিভিন্ন সময় এই বিশ্ববিদ্যালয়ের মুষ্ঠিমেয় কিছু শিক্ষকের বিরুদ্ধে ছাত্রীদের যৌন হয়রানির কথা পত্রিকায় এসেছিল, চাণক্য বাড়ৈর উপন্যাসের ঘটনাস্থল সেই জাহাঙ্গীর বিশ্ববিদ্যালয়।

যাইহোক, ‘কাচের মেয়ে’ উপন্যাসটি একটি ঘটনা প্রধান উপন্যাস। এখানে আমরা উপন্যাসের কথক সানিয়ার অবস্থানকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করতে পারি। যেমন তার ফুপুর বাসায় থাকাকালীন ঘটনা, গ্রামের ঘটনা, হলজীবন, কোচিংয়ে চাকরিরত অবস্থা এবং অধ্যাপক আফতাব উদ্দীন আহমেদের অধীনে কাজ করার সময়ের ঘটনা। এছাড়া সানিয়ার বন্ধু-বান্ধব, স্বপ্ন, প্রেম, চাওয়া পাওয়া নিয়ে গড়ে উঠেছে কাঁচের মেয়ে উপন্যাসের বৃহৎ ক্যানভাস।

উপন্যাসে অসংখ্য চরিত্রের সমাহার ঘটেছে। উপন্যাসে ব্যক্তি-চরিত্র নির্মাণ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘স্বকীয় বিশেষত্বের মধ্যে যা হয়ে উঠেছে তাই ব্যক্তি। বিশ্বের যেকোনো পদার্থ-ই, সাহিত্যে সুস্পষ্ট তাই ব্যক্তি। জীবজন্তু, গাছপালা, নদী, পর্বত, সমুদ্র, ভালো জিনিস, মন্দ জিনিস, ভাবের জিনিস সবই ব্যক্তি।’

উপন্যাসটি বিবৃত হয়েছে সানিয়ার জবানিতে। তাই আমরা সানিয়া ছাড়া অন্য কোনো চরিত্রের সম্পূর্ণ বিকাশ ঠিক মতো পাই না। এটা আখ্যানের প্রয়োজনেই ঘটেছে।

সানিয়া চরিত্রটি তিনি পরম মমতায় নির্মাণ করেছেন। উপন্যাস পড়তে পড়তে একসময় সানিয়ার সঙ্গে একাত্ম হয়ে যেতে হয়। সানিয়ার স্বপ্ন হয়ে ওঠে আমাদের স্বপ্ন। সানিয়ার প্রাপ্তি হয়ে ওঠে আমাদের প্রাপ্তি। সানিয়ার বঞ্চনা হয়ে ওঠে আমাদের বঞ্চনা।

ঔপন্যাসিক সানিয়াকে কেন্দ্রীয় চরিত্র করে গল্প বললেও সানিয়াকে তিনি টাইপ চরিত্র করে গড়ে তোলেননি। সানিয়া দুধে ধোয়া তুলসী পাতা নয়। তারও দুর্বলতা আছে। দুর্বল মুহূর্তের স্খলন আছে। তার চরিত্রেও দ্বৈততা আছে। তারপরও সানিয়া হয়ে ওঠে আমাদের কাছের মানুষ। ভরসার মানুষ। যদিও শেষ মুহূর্তে সানিয়ার এই ভেঙে পড়া দেখে আমাদের কাছে কিছুটা হোঁচট লাগে। সানিয়া আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত না নিলে সে প্রতিবাদী নারীদের একজন প্রতিমূর্তি হতে পারতো। কিন্তু ঔপন্যাসিক তা করেননি। ট্র্যাজেডির নির্মাণের জন্য হোক আর যে জন্যেই হোক, ঔপন্যাসিক সানিয়াকে সুইসাইডের অ্যাটেম্পট নিতে বাধ্য করেছেন।

যদিও বাস্তবতা হলো জয়ীর চেয়ে পরাজিতের সংখ্যাই সমাজে বেশি। আমরা জয়ীর গল্প শুনতে চাই, লেখক হয়তো আমাদের পরাজয়ের গল্প শোনাতে চেয়েছেন। আমরা চেয়েছিলাম, সানিয়াকে আমাদের অগ্রযাত্রার অগ্রণী ভূমিকায়, লেখক হয়তো চেয়েছেন, সানিয়ার জন্য আমাদের অন্তরের ভালোবাসাটুকু দেখতে।

তাছাড়া উপন্যাসের সমাপ্তি বা যাবতীয় সব কিছুর এখতিয়ার একান্তই ঔপন্যাসিকের হাতে। আমাদের কাজ শুধু রসাস্বাদন করা।

ঔপন্যাসিক সংলাপ রচনায় পারঙ্গমতার পরিচয় দিয়েছে। তিনি চরিত্র অনুযায়ী, চরিত্রের স্ট্যাটাস অনুযায়ী তাদের মুখের ভাষা দিয়েছেন। যেমন, সানিয়ার বাবা, মা, নানী, ফুপুর মুখে তিনি আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করেছেন। সানিয়ার বন্ধু-বান্ধবদের মুখের ভাষা হালফ্যাশনের বাংলা, যেখানে প্রচুর ইংরেজি শব্দে সমাগম ঘটেছে। আবার শিক্ষদের মুখে প্রমিত বাংলা ব্যবহার করেছেন। কয়েকটি নমুনা দেখা যাক।

ফুপুর মুখের ভাষা:

‘তোদের তো কপাল ভালো, পথঘাট সব পাকা। আর আমরা বর্ষাকালে স্কুলেই যাতি পারি নাই। সারা রাস্তায় হাঁটু পর্যন্ত কাঁদা। তার ওপর মেয়ে মানুষ, চিন্তা করে দেখ, কী অবস্থা!’

সানিয়ার বাবা-মার ঝগড়ার সময়: আজ তুমি ঘরে ঢুকতি পারবা না।

বাবা যেন এই নিষেধাজ্ঞার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। স্বাভাবিক কণ্ঠে বললেন-

—ক্যান কী হইছে আবার?
—এতক্ষণ তুমি চাকলাদার বাড়ি ছিলে না? সত্যি কথা কও!
—হ, ছিলাম চাকলাদার বাড়ি, তাতে কী হইছে?
—কী হইছে, তুমি বোঝো না? যদি না বোঝো, তালি নতুন করে বোঝার দরকার নাই। আজ তোমার ঘরের বাইরি থাকতি হবে। ঘরে ঢুকতি পারবা না তুমি।
—নাছির চাকলাদারের সাথে আমার ব্যাপসা না? আমি চাকলাদার বাড়ি যাবো না তো কেডা যাবে?
—এত রাত পয্যন্ত ব্যাপসা? আর কেউ ব্যাপসা করে না? নাছির চাকলাদার রাত দশটার মধ্যি নাক ডাকতি ডাকতি ঘুমায়। ঘুমের মানুষের সাথে তুমি এত রাত পয্যন্ত ব্যাপসা করো? কিছু বুঝি না আমি? তাই মনে করো?’

সানিয়ার নানির ভাষা:
‘প্যাটে নতুন অ্যাট্টা আইছে ওই ঢেমনা মাগির? দেহে বুঝিস না? বড় হইছিস কি বাতাসে?’

সানিয়ার বন্ধুদের ভাষা:
‘—দেখ, এটা না। ফ্রাঙ্কলি বলতেছি, বেশ মন খারাপ হয়। পুরো ফ্যামিলি ফ্যালাইয়া হলে উঠছি। আর ঢাবিতে যদি ভর্তি হইতাম, তাইলে রোজ বাসা থেকে ক্লাস করতে পারতাম। ফ্যামিলির সবাইকে রেখে এত দূরে থাকতে হতো না। ইশ! ফ্যামিলির সব্বাইকে কী মিস করতেছি, তা কেবল আমি জানি।

—ঈশশশশ…! আমরা বুঝি আর জানি না। আমরা সবাই আমাদের ফ্যামিলি নিয়ে আসছি এখানে। হাহাহা।

ধ্রুব আবার হাসে। তারপর বলে—এই উনিশটা বছর তো ফ্যামিলির সাথেই কাটালি। এখন না হয় একটু দূরেই থাকলি, তাতে কী এমন অসুবিধা?’

এরকম আরও অনেক উদাহরণ দেওয়া যাবে। উপন্যাসের প্রাণ-ই এই সংলাপগুলো। যা চাণক্য বাড়ৈ দক্ষ হাতে নির্মাণ করেছে। সংলাপের কারণে উপন্যাস পেয়েছে আলাদামাত্রা। গতিময়তা।

উপন্যাসে যৌন নির্যাতন ছাড়াও অপ্রধান ভাবে গ্রামের রাজনীতি, পারিবারিক সংকট, মনস্তাত্তিক দ্বন্দ্ব, বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা, ভার্সিটির হল গুলোর অবস্থা, মধ্যবিত্তের চাওয়া পাওয়া উঠে এসেছে। ফলত উপন্যাসের আয়তন কিছুটা দীর্ঘ হলেও পড়ার আগ্রহ ফুরায় না। উপন্যাসের গতি কোথাও কোথাও শ্লথ হয়ে গেলেও শেষ পর্যন্ত পাঠককে টেনে নেওয়ার ক্ষমতা এই উপন্যাসের আছে। একজন নতুন ঔপন্যাসিকের এটি একটি বিরাট সাফল্য। তাঁর লেখা পড়লেই বোঝা যায়, এই উপন্যাস রচনা পেছনে তার শ্রম, প্রস্তুতি কতটা।

তাই কিছুটা জোর দিয়েই বলা যায়, জীবনঘনিষ্ট এই কথাশিল্পীকে পাঠক সাদরে গ্রহণ করবে। প্রত্যাশা করছি তিনিও আমাদের নতুন নতুন জীবনের গল্প, নতুন নতুন জনপদের গল্প আমাদের শোনাবেন। ঋদ্ধ করে তুলবেন তাঁর কৃত্যের ভাঁড়ার।

মন্তব্য

চিন্তাসূত্রে প্রকাশিত কোনও লেখা পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।


কোন মন্তব্য নাই.

লেখাটি সম্পর্কে আপনার মন্তব্য লিখুন