উপহাস ॥ মুরিদ বারগুসি | চিন্তাসূত্র
৭ অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | ২১ নভেম্বর, ২০১৮ | দুপুর ২:১৫

উপহাস ॥ মুরিদ বারগুসি

[মুরিদ বারগুসি। জন্ম ১৯৪৪ সালের  ৮ জুলাই ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরে রামাল্লার কাছেই অবস্থিত ‘দেইর গাসসানা’ গ্রামে। ষাটের দশকে তিনি মিশরের কায়রো ভার্সিটিতে পড়ালেখা করেন। ভার্সিটির শেষ বছর (১৯৬৭) আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু হলে তিনি দেশের বাইরে আটকা পড়ে যান। এরপর ১৯৯৬ সালে ৩০ বছর পরে তিনি মাত্র কয়েকদিনের জন্যে রামাল্লায় ফিরে যাবার সুযোগ পান। এই ভ্রমণকে কেন্দ্র করে তিনি লেখেন ‘রআইতু রামাল্লা’ (১৯৯৭) তার সবচে’ বিখ্যাত আত্মজৈবনিক উপন্যাস। ১২টি কাব্যগ্রন্থসহ বিভিন্ন বিষয়ে অন্তত ২৫টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে তার। বর্তমানে তিনি পিএলও-র প্রতিনিধি হিসেবে বুদাপেস্টে অবস্থান করছেন। মুরিদ বারগুসি’র ‘আস সাখরিয়্যা’ গল্পটির ভাষান্তর করেছেন মনযূরুল হক]

সকালের মিষ্টি রোদের আঁচ লেগেছে গাজাসিটির গায়ে। আলোর রোশনিতে ঝলমল করছে সারা শহর। যদিও বাতাসে ভাসছে বারুদের গন্ধ। নির্মল পরিবেশের সবটুকু স্নিগ্ধতা শুষে নিয়ে যাচ্ছে বারুদের বিষ। রাজসড়কে বাজছে অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেনের বুক কাঁপানো আর্তনাদ। দূরে এইমাত্র ঘটে যাওয়া একটা ভয়ানক বিস্ফোরণের পর কালো ধোঁয়ার কু-লি উড়ছে। শীতের নীল আকাশটা ক্রমশ ঢেকে যাচ্ছে কালচে ধোঁয়ায়।

সকালের সেই মিষ্টি রোদে বারুদের গন্ধের ভেতর গাজার রাস্তায় ফুটপাত ঘেঁষে দ্রুত পায়ে হাঁটছিলো তালাবি। সহসাই দূর থেকে ইসরায়েলি সশস্ত্র সৈন্যদের দেখতে পেয়ে থমকে যায় সে। বুকটা ধক করে ওঠে ওর। জানে ওদিকে না যাওয়াই ভালো। কিন্তু এতদূর এসে পড়েছে যে, এখন আর সরে পড়ার উপায় নেই। পেছনে হটে গেলে সন্দেহমূলক গ্রেপ্তার। সামনে এগুলে বিপদ। না থেমেই ভাবে আইমান, কী করা যায়। ভাবতে ভাবতে আরো একটু সামনে এগিয়ে যায়। নুসাইবা ক’দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে কাতরাচ্ছে। হাসপাতালের দিকেই যাচ্ছে আইমান। তার হাতে নীল রঙের একটি ফ্লাস্ক। তাতে খানিকটা গরম স্যুপ। মা তৈরি করে দিয়েছেন।

রাস্তায় রাস্তায় চেক পোস্ট বসিয়ে তল্লাশি চালাচ্ছে জায়নিস্ট সৈন্যদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বাহিনী। বিবস্ত্র-তল্লাশির শিকার গাজার নিরীহ মানুষ ঠাণ্ডায় থরথর করে কাঁপে। শীতের মৌসুমে ফিলিস্তিনের তাপমাত্রা ততটা ভয়ানক না হলেও গাজাসিটি ও তার আশপাশের এলাকায় ঠাণ্ডা আশঙ্কাজনকহারে বৃদ্ধি পায়। শীতের মধ্যভাগে নিস্তব্ধ পাহাড়ে তুষার জমে সাদা হয়ে থাকে। কখনো সেই পাহাড়ে কাঠ হয়ে লুকিয়ে থাকে হামাসের একরোখা গেরিলারা। থমকে থমকে আসে বুলেটের ঘূর্ণায়মান আগুনের ফুলকি।

আইমান তালাবি। পাতলা বাদামি চুল, চৌকো মুখ আর ঈষৎ নীলাভ চোখের বাইশ বছরের এক লম্বা ফর্সা আরব যুবক। একটা শীতল নিশ্বাস ফেলে সে চেকপোস্টের দিকে এগিয়ে যায়। এক ইহুদি সশস্ত্র সৈন্য তাকে হাত তুলে থামতে বলে। প্রায় ষাট দশক ধরে এই হালচালে অভ্যস্ত তারা। এবার এরা আঁটঘাঁট বেঁধেই নেমেছে মনে হচ্ছে।

সৈন্যটি পরিষ্কার আরবিতে ধমকে ওঠে—হেই, দাঁড়া! কোথায় যাস?
—হাসপাতালে, স্যার। দুর্বল কণ্ঠ আইমানের।
—হাসপাতালে কেন? তোর পরিচিত কেউ কি জখমি? অটোমেটিক ব্রেনগান হাতে আরেক সৈন্য এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করে।
—না। আইমান মাথা নাড়ে। ভীষণ টেনশন হচ্ছে তার। জিভ শুকিয়ে এসেছে।
সৈন্যটি চেঁচিয়ে ওঠে—তাহলে?
—আমার বোন হাসপাতালে।
—ও। তো ফ্লাস্কে কী?
—স্যুপ। আমার বোনের জন্য।
—দেখি।

একজন লালচে শুয়োমুখো সৈন্য হাত বাড়ায়। কাঁপা কাঁপা হাতে আইমান ফ্লাস্কটা এগিয়ে দেয়। সৈন্যটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে। প্যাঁচ ঘুরিয়ে মুখ খোলে। ভেতরে উঁকি দেয়। তারপর তরলটুকু আইমানের মাথায় ঢেলে দিতে থাকে। অনড় দাঁড়িয়ে থাকে আইমান। গরম স্যুপ ওর মাথায় চুলে কপালে চোখে ছড়িয়ে পড়ে। প্রচণ্ড যন্ত্রণা অনুভব করে সে। ব্যথায় কঁকিয়ে ওঠে। সৈন্যরা হো হো স্বরে হাসে। এক সৈন্য কৌতুক করে বলে—হেই, তুই হামাসের চর নস তো?
—না। আইমান মাথা নাড়ে।
একজন আদেশ দেয়—জ্যাকেট খোল। দেখি সাথে আর কী আছে।

সময়টা শীতকাল। ভেড়ার উলের ওপর নীল জিন্সের জ্যাকেট পরেছিল আইমান। সৈন্যদের আদেশে সে ধীরে ধীরে জ্যাকেট খুলতে থাকে। ফের আদেশ হয়—দাঁড়িয়ে আছিস কেন? প্যান্ট খোল।
আঁতকে ওঠে আইমান।
—প্যান্টও খুলতে হবে?
—খোল!

কখন গুলি করে—এই ভয়ে আইমান ট্রাউজারের ফিতায় হাত দেয়। ভাবে পুরোটা খোলার আগেই নিশ্চয়ই নিষেধ করবে।
লালচে শুয়োমুখো সৈন্যরা হো হো করে হাসে।

দূরের পাহাড় থেকে শীতার্ত বাতাস ধেয়ে আসে। ট্রাউজারের ফিতে খুলতে খুলতে ওর হাত-পা কাঁপে। কানের কাছে উষ্ণতা টের পায়। গরম স্যুপ বেয়ে নামছে। কপালের দু’পাশের শিরা দপদপ করে লাফায়।

এরই মধ্যে আবার আইমান ভাবে, হামাসও কি অতিরিক্ত কট্টরপন্থী নয়? তারা কি মানবীয় প্রেম-ভালোবাসা বোঝে? পাশের বাড়ির সাবিহা নামের যে মেয়েটি তাদের বাড়িতে এসে আশ্রয় নিয়েছে, তার প্রতি একটু অনুরাগ আছে আইমানের। অবশ্য সেটা মনে মনে। সবখানে রক্ত, যুদ্ধ, প্রতিরোধ। এরই মধ্যে এই প্রেমের খবর ফাঁস হলে তাকে আর সাবিহাকে উপহাসের কবলে পড়তে হবে নিশ্চিত। তাছাড়া তার বিধবা গর্ভবতী বোন হাসপাতালে। দু’দিন পরেই হয়তো সে একটা ফুটফুটে শিশুর মা হবে। সুতরাং এই মুহূর্তে ওসব মাথা থেকে তাড়ানোই বুদ্ধিমানের কাজ।

ততক্ষণে আইমান ট্রাইজার খুলে ফেলেছে। তার শরীরের রঙ বাদামি ফরসা। এখন পরনে কেবল লাল-কালো ডোরাকাটা আন্ডারওয়্যার। ফরসা শরীরে তাকে কেবলাকান্তর মতোই দেখাচ্ছে। ইহুদি সৈন্যরা তাকে আন্ডারওয়্যারও খুলে ফেলতে নির্দেশ দেয়। উপায় নাই জেনে আর কোনো সংকোচ করে না আইমান। একটানে খুলে ফেলে পরিধানের সর্বশেষ বস্ত্রটি। বেরিয়ে পড়ে উপহাসের সবচে’ বড় উপাদান।

লালচে শুয়োমুখো জায়নিস্ট সৈন্যরা হো হো করে হাসে। বাইশ বছর বয়েসী আরব যুবক আইমান তালাবি এই মুহূর্তে মাটির সঙ্গে মিশে যেতে চায়। পারে না। একটি দখলী দেশের পরাধীন নাগরিক সে। মাটির সঙ্গে মিশে যেতেও জাতিসংঘের অনুমতি লাগবে।

হঠাৎই জায়নিস্টদের হো হো হাসি কাঁই কুঁই শব্দে রূপান্তরিত হয়। মুহূর্তমাত্র সময়। তারপর কাঁই কুঁইও থেমে যায়। শাকিরার দেশের ভল্লুকরা দেখে আইমানের অণ্ডকোষটা অস্বাভাবিক রকমের বড়। দুইটা প্রমাণ সাইজের রাজহাঁসের ডিমের সমান। ভুল ভাঙতে সময় লাগে না তাদের। বিস্ময়ে পিছু হটার স্মৃতিও হারিয়ে ফেলে তারা। কিন্তু আইমানের ভেতরে ফুঁসে উঠেছে ততক্ষণে। অপমানের রঙ বদলে প্রতিশোধের বর্ণে রঙিন হয়ে উঠেছে সর্ব শরীর। ট্রাউজারের নিচের অণ্ডকোষের সঙ্গে জড়ানো আস্ত দুটি গ্রেনেডের পিন খুলে ফেলেছে সে ভাবতে না ভাবতেই। ঠা ঠা শব্দে হেসে ওঠে আইমান। তারপর মাত্র চার সেকেন্ড। আইমানের হাসির গমক আর জায়নিস্টদের কান্নার আকুতির মাঝখানে গগনবিদারি আওয়াজ ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে, হয়তো নুসাইবার হাসপাতালেও। মানবজন্মের সবচে’ বড় উপহাসের বিস্ফোরণ ঘটে— বুম…ম…ম…

মন্তব্য

চিন্তাসূত্রে প্রকাশিত কোনও লেখা পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।