একটি মারাত্মক রাজনৈতিক ভুল ॥ মাজহার সরকার | চিন্তাসূত্র
৪ মাঘ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | ১৭ জানুয়ারি, ২০১৯ | রাত ১১:০৩

একটি মারাত্মক রাজনৈতিক ভুল ॥ মাজহার সরকার

একটি মারাত্মক রাজনৈতিক ভুল
ভাইসব,
কবি হিসেবে আমি ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছি
আপনারা পাথর মেরে আমাকে রক্তাক্ত করুন
সারা জীবন কঠিন শিলা চুষেছি কেবল এক ফোঁটা পানির জন্য
ঝিনুকের কৌটায় পৃথিবীটাকে পোরার চেষ্টা করেছি,
মানচিত্র ছিঁড়েছি কেবল, আঁটেনি
বিশ্বের কোনো নারী কোনোদিন আমার ভালোবাসা পায়নি
ভালোবাসাহীন একজন ব্যর্থ কবি কী রকম বিপন্ন
বিশ্রী
আমাকে দেখুন
দুখে দুখে পরাজয়ের আঙুল খুঁটি একা।
কিন্তু আমাকে ক্ষমা করলে আপনাদের শিশুরা
এই পাহাড়ে উঠে আসতে পারে
তাই পা দুটো গাছে ঝুলিয়ে কিরিচের এক পোঁচে আমার বুকটা চিরে দিন
মাটি কুপিয়ে একটা নালা করে দিন
যেন রক্তগুলো বয়ে যেতে পারে নিচে পরবর্তী উপত্যকা বরাবর।

ভাইসব,
যারা আমার কাছে রাজনৈতিক প্রজ্ঞা চেয়েছিলেন দেখুন
পৃথিবীটাকে প্রাণের এত কাছে নিয়ে কী লাভ হলো আমার
সামান্য একটা প্রদীপ জ্বালাতে গিয়ে ফোস্কা পড়ে যায় হাতে
সাহসের রশি নিয়ে ঝুলে বৃহৎ ভূমি দেখতে চেয়ে
শুধু একটা প্রজাপতির পেছন পেছন গিয়ে লক্ষ্যভ্রষ্ট হলাম
শব্দহীন নীরব বিস্ময়ে কুশলী শিকারীর মতো
একদম কাছে পৌঁছেও বধ না করে গর্ভবতী করে এলাম সুবেশী সিংহী
তাই খাঁচাটা খুলুন, পাখির ডানার মতো দ্রুত পদক্ষেপে বিহ্বল
বাতাসে পাখা পিছলে যাই।

পল্টন মোড়ে মানচিত্র বেচে যে লোকটা
পল্টন মোড়ে বাস দাঁড়াতেই একটা লোক
দুই হাতভর্তি মানচিত্র নিয়ে এলো
আমার এখন মানচিত্র চেনার সময় নেই
শুনে লোকটা মৃদু হাসলো, দুই সারি গাড়ির মাঝখান দিয়ে হেঁটে
হেঁটে জানালার গ্লাসে হাত নেড়ে মানচিত্র মানচিত্র পৃথিবীর মানচিত্র
বাংলাদেশের মানচিত্র ঢাকার মানচিত্র
মানচিত্র কি সত্যি পথ চেনায় মানুষকে!
লোকটা হাতভর্তি নদী পাহাড় স্রোত আগ্নেয়গিরি
শত ক্ষুধার চিৎকার, কতিপয় রেখার দেশ
সোভিয়েত মেঘ আরব খেজুর মার্কিন জনতন্ত্র আফ্রিকার হাড়
এত ভারি পাথর নিয়ে হাঁটে কী করে
লোকটা একটা সিসিফাস!
অবিশ্বাসী কীট কাটে দেহের বেষ্টনি
ছাগল খেয়ে ফেলে বাগানের বেড়া
অফিস থেকে ধর্ষিত হয়ে ফিরে চাকরিজীবীরা
কারোই মানচিত্র কেনার সময় নেই,
লোকটা কী নিষ্ঠুর মানচিত্র বেচে খায়!
সে আবার ফিরে এলো, এবার বললাম,
পাঁচ মিনিটে একটুও এগোতে পারিনি
মানচিত্রে দেখে আমি চলতে পারবো?
সে বললো, আপনারা এগোতে না পারলেই
আমি আরও কয়েকটা মানচিত্র বেশি বেচতে পারি।

মোকাবিলা
আমার কাছে কিছু ফুল ছিল, যা অনায়াসে
যে কাউকে দিতে পারতাম
কিন্তু আজকাল মানুষ কি ফুল পেতে ভালোবাসে?
তাই মৃত্যু অন্ধ উঠোনে ফুলগুলো শুকিয়ে আজ ঘরে তুললাম
তখন বুকে হাত দিয়ে দেখি কলিজাটা সঙ্গে নেই
সারা উদর খুঁজে স্বর্ণশীর্ষ তুলির ডগায় খুঁচিয়ে দেখলাম
নেই
তখন শুনি সদ্যজাত এক শিশুর কলিজাটা পড়ে আছে রাস্তায়
চোখের উৎস ধরে ক্লান্ত নিত্য নিঃস্বতম মাঠগুলোর
এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত দৌড়ে দেখলাম
এ কলিজার দাবিদার কেউ নেই, তবে কি এটা আমার
অগ্নি উৎস ঝরে জীবনের চির স্বামী-পুরুষের নারীর কিংবা
মাঝে মাঝে সাবেকি প্রেমিকেরই, কলিজাটা ছাড়া ফুলক্ষেতে
কিভাবে চাষ করলাম এত জ্বালা!

না, কলিজায় মমতার সঙ্গীত আর শব্দায়িত চিৎকার
কোনো সুন্দরী নারীর কলিজা ভেবে দশটা পুরুষ ঘিরে আছে তাকে
প্রণয় ছড়ানো তার সফলতা কে ছিঁড়ে নিলো
বড় বেশি ভরামুখ চাঁদের প্রতি দৃষ্টি প্রতিহত পূর্ণতা ভরে!
তবু আজ তার ঢেউ এপারে এসে লাগে, তবু কলিজা ছিটকে
রক্ত অন্ধ এমন কাউকে দেখেনি যেতে এ পথ ধরে
কলিজাটা ঝুলিয়ে ধরে বললাম এটা তো আমার বাগানের
নিমিলীত উপোসী হাতের
কেতকীর গন্ধ ভরা
প্রতিদিন বুকের মমতা দিয়ে ধৌত করে পাটির মতো পাতা।

তাকে ঘাসবিছানায় রেখে মাটির জানালা তুলে দিয়েছি
বনপাতার ছাউনি আর পাঁজরের কাছে জলছোঁয়া মাঠ পূর্বনারীরা আমার
যেভাবে দুগ্ধপোষ্য শিশুকে কোলে টেনে রাখে,
একটি কলিজার জন্য প্রতি নাগরিকের নিরক্ত হাড়ে জ্বলন্ত আলিঙ্গন
একটা কলিজা সুদুর্বহ প্রস্বেদে ক্লেদে প্রতি বীভৎস
লাল পলাশের বন থেকে জেগে ওঠা পুষ্পাভিসারী আগুন।
যদিও কারও বুকে তা আর প্রতিস্থাপন হবে না
আমার কাছে কিছু কলিজা ছিল, রক্তে যারা ফেলবে ছায়া
সারাদিন দুঃখের স্তন চুষবে একটুও কাঁদবে না
কিন্তু আজকাল মানুষ কি কলিজা পুষতে ভালোবাসে?

দরজার দোকান
আসবাবপত্রের দোকান ভেবে ঢুকেছিলাম
ঢুকে দেখি সারি সারি দরজা সাজানো
কাঠের দরজা, প্লাস্টিকের দরজা, প্লাইউডের দরজা
নতুন দরজা পুরনো দরজা সদর দরজা বেডরুমের দরজা
বাথরুমের দরজা রান্নাঘরের দরজা
ঢুকে যেহেতু পড়েছি আরও ভেতরটা দেখে এলাম
সারা জীবন এত দরজা একসঙ্গে আমি কখনো দেখিনি
হাত ধরে ধরে দেখলাম কয়েকটা, কাঠের গায়ে বাদশাহী নকশা করা
মনে হলো ঘুণপোকারা দ্বিগুণ হারে জমিয়েছে ফসল
ভাঙনের শব্দ যদি চারদিক প্রকম্পিত করে নামায় ধস
রাতের ভয়াল অন্ধকার কাটানোর জন্য দরজা কিনে নেয় মানুষ,
একটা দরজা খোলা পেয়ে তার ভেতর দিয়েই ওপাশে গেলাম,
পাশ দিয়ে ফিরে ঘুরে আসতেই দোকানদার আটকে দিলো
বললো, যে পথে গেছেন ওপথে আবার ফিরে আসুন
আপনার প্রবেশ প্রত্যাহার করুন
আমি বললাম এটা কেমন সংস্কার!

বুড়ো লোকটা এবার ক্ষেপে গেল, বললো দেয়াল ছাড়া দরজা টপকালে
কলজের রঙ পাল্টে যায়, ওটা রাজনীতিতে হয়
আমরা কেবল বাসা-বাড়ির দরজা বেচি
তিন পুরুষে এই আমাদের সংস্কার।

দোকান থেকে বেরিয়ে দেখি দরজার শহরে ডুবে আছি
প্রতিদিন দরজা আমাকে গিলে খায়
প্রতিদিন দরজা আমাকে বমি করে দেয়
মানুষের নিরাপত্তার কাছে, স্ত্রীর ড্রেসিং রুমের কাছে,
অফিসের গোপন মিটিঙের কাছে, ব্যাঙ্কের ভোল্টে সোনাদানার কাছে
আমি চিহ্নিত আততায়ী
সম্ভাব্য চোর
পরস্ত্রী লোভী
ছেলেধরা
না হজম হওয়া সমাজ উচ্ছিষ্ট।

মন্তব্য

চিন্তাসূত্রে প্রকাশিত কোনও লেখা পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।


৩ Responses to “একটি মারাত্মক রাজনৈতিক ভুল ॥ মাজহার সরকার”

  1. raahman wahid
    অক্টোবর ১৫, ২০১৮ at ৮:৫৭ অপরাহ্ণ #

    Chomke uthlam kobitagulo pore! Kobitar rajje emon bishforon!!! Hoy !!!!!! Sotti valo laglo khub. Congratulation poet!

  2. firozmamun
    অক্টোবর ১৬, ২০১৮ at ৩:০১ অপরাহ্ণ #

    দরজার দোকানটা অনেকবেশী অর্থব। ভাল লাগ, অব্যাহত থাকু।

  3. AMITAV Bishnu
    অক্টোবর ১৮, ২০১৮ at ১:২৬ পূর্বাহ্ণ #

    Mind blowing writup bondhu. Asole tui amader gorbo. Rajnoitik vul kobitay manchitro chirese kebol, atenni poriborte may be akenni hote pare. Good luck

লেখাটি সম্পর্কে আপনার মন্তব্য লিখুন