অদর্শন-অচর্চায় বড় প্রেমও মরে যায় ॥ মিনার মনসুর | চিন্তাসূত্র
৭ অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | ২১ নভেম্বর, ২০১৮ | সকাল ১১:৩৮

অদর্শন-অচর্চায় বড় প্রেমও মরে যায় ॥ মিনার মনসুর

মিনার মনসুরের জন্ম ২০ জুলাই ১৯৬০ সালে, চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার বরলিয়া গ্রামে। পেশায় সাংবাদিক। বর্তমানে দৈনিক ইত্তেফাকের সহকারী সম্পাদক হিসেবে কর্মরত। এই পর্যন্ত প্রকাশিত গ্রন্থ কবিতা: ‘এই অবরুদ্ধ মানচিত্রে’; ‘অনন্তের দিনরাত্রি’; ‘অবিনশ্বর মানুষ’; ‘আমার আকাশ’; ‘জলের অতিথি’; ‘কবিতাসংগ্রহ’ ;  ‘মা এখন থেমে যাওয়া নদী’; ‘মিনার মনসুরের দ্রোহের কবিতা’।   ছড়া: ‘হেলাফেলার ছড়া’। গবেষণা: ‘হাসান হাফিজুর রহমান: বিমুখ প্রান্তরে নিঃসঙ্গ বাতিঘর’,  ‘ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত: জীবন ও কর্ম’। প্রবন্ধ: ‘শোষণমুক্তির লড়াইয়ে মধ্যবিত্তের ভূমিকা’, ‘কবি ও কবিতার সংগ্রাম’।

সম্পাদিত গ্রন্থ: ‘শেখ মুজিব একটি লাল গোলাপ’; ‘শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত স্মারকগ্রন্থ’; ‘শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের আত্মকথা’; ‘মুক্তিযুদ্ধের উপেক্ষিত বীর যোদ্ধারা’  ও ‘বাংলাদেশের সমাজ, রাজনীতি ও উন্নয়ন: বিশিষ্টজনের ভাবনা’। কবিতা, জীবন, পুরস্কার-স্বীকৃত এসব বিষয় নিয়ে এই কবি-গবেষকের মুখোমুখি হয়েছেন তরুণ কবি শামস আরেফিন।

শামস আরেফিন: কী ধরনের রচনাকে আপনি কবিতা বলবেন? আপনার মতে, একটি রচনায় কী কী গুণ  থাকলে সেটি কবিতাপদবাচ্যে উত্তীর্ণ হবে?
মিনার মনসুর: আমার জানা মতে, কবিতার সর্বজনগ্রাহ্য কোনো সংজ্ঞা নেই। নানাজন নানাভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। আমার নিজেরও একটি মত আছে। সেটি আদি কবি বাল্মিকীর মতের অনেকটা কাছাকাছি। সেই পটভূমিটি আপনি নিশ্চয় জানেন। মিথুনরত ক্রৌঞ্চ-দম্পতির একটিকে ব্যাধের হাতে নিষ্ঠুরভাবে নিহত হতে দেখে এবং অন্যটির করুণ রোদন শুনে শোকাহত অরণ্যচারী ঋষি বাল্মিকীর কণ্ঠ থেকে কঠিন একটি অভিশাপ-বাণী উচ্চারিত হয়েছিল। সেটি হলো—‘মা নিষাদ প্রতিষ্ঠাং ত্বমগমঃ শ্বাশ্বতীঃ সমাঃ/ যৎক্রোঞ্চমিথুনাদেকমবধীঃ কামমোহিতম।’ এর অর্থ হলো, নিষাদ তুই চিরকাল প্রতিষ্ঠা লাভ করবি না। কারণ তুই ক্রৌঞ্চমিথুনের একটিকে কামমোহিত অবস্থায় বধ করেছিস। লক্ষণীয় যে এটি বাল্মিকীর চেষ্টাকৃত বা সচেতন কোনো প্রয়াস ছিল না। যে-কারণে পরক্ষণেই তিনি অনুতপ্ত হয়েছিলেন। তাহলে চমৎকার এই পঙ্‌ক্তি দুটি কোত্থেকে, কিভাবে আবির্ভূত হলো? এ কি বাল্মিকীর মর্মোন্তুদ  বাণী নয়? তবে কি আমরা বলব, মর্মস্পর্শী কোনো ঘটনার অভিঘাতে মর্মনিসৃত যে বাণী ভাষারূপ পায়, তাই-ই কবিতা? এর উত্তরও দিয়ে গেছেন সেই আদি কবি। বলেছেন, ‘এই যে চরণবদ্ধ সমান অক্ষরবিশিষ্ট তন্ত্রীলয়ে গানের যোগ্য বাক্য আমার শোকাবেগে উৎপন্ন হয়েছে, তা নিশ্চয় শ্লোক নামে খ্যাত হবে’। আপনি জানেন, বাল্মিকীর ভবিষ্যদ্বাণী অব্যর্থ প্রমাণিত হয়েছে।

জীবনানন্দ বলেছেন, কবিতা নানা রকম। বলা বাহুল্য, কয়েকশ বছরের কাব্য-অভিজ্ঞতা থেকে তিনি এ উপলব্ধিতে উপনীত হয়েছেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কবিতাও বিবর্তিত হয়েছে। পরিবর্তন এসেছে তার বহিরঙ্গ ও অন্তরঙ্গে। নানা রকম ছন্দে লেখা ‘গানের যোগ্য’ কবিতা যেমন সমাদৃত হয়েছে, তেমনি টানাগদ্যে লেখা কবিতার আবেদনও কোনো অংশে কম শক্তিশালী নয়। সম্প্রসারিত হয়েছে কবিতার অন্তর্বিশ্বও। মহাবিশ্বের চেয়েও শতগুণে বিশাল ও বিস্ময়কর হলো মানবের মনোবিশ্ব। সেখানে নিরন্তর আলো-অন্ধকারের বিচিত্র রহস্যময় যে খেলা চলছে।  কবি সুনির্বাচিত শব্দ দিয়ে তার যে টুকরো টুকরো ছবি আঁকেন। কবিতার ধারণ ক্ষমতা অসীম।  প্রধানত হৃদয়জাত (এবং তার অধিষ্ঠান পাঠকহৃদয়ে) হলেও এর সঙ্গে বুদ্ধি, জ্ঞান, অভিজ্ঞতা—এ রকম আরও অনেক কিছুর প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ মিথষ্ক্রিয়ায় কবিতা পূর্ণতা পায়।

শামস আরেফিন: কবিতায় দুর্বোধ্যতা কতটুকু গ্রহণযোগ্য? পৃথিবীর কোনো মহৎ কবিতা বা বিখ্যাত কবিতা কি দুর্বোধ্য হয়েছে?
মিনার মনসুর: দুর্বোধ্যতার ব্যাপারটা আপেক্ষিক। কবিতার মধ্যে আলো-ছায়ার একটা ব্যাপার আছে। আছে অতল এক রহস্যময়তাও। এগুলোই হলো কবিতার ডানা। এতে ভর করেই সে স্থান-কালের সীমানা ছাড়িয়ে যায়। চর্যাপদের কবিরাই তো আমাদের আদি কবি। তাদের সব কবিতা বা কবিতার সব পঙ্‌ক্তির অর্থ কি আমরা বুঝি? এমনকি শতাধিক বছর ধরে  এদেশের আমজনতার হৃদয়ে যে-ফকির লালনের একচ্ছত্র অধিষ্ঠান, কাদামাটির এই মানুষটির সব গান কি সহজবোধ্য? অথচ বোদলেয়ার কিংবা মালার্মে দূরে থাক, তিনি তো কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাই গ্রহণ করেননি। অতএব, কবিতার রস আস্বাদনের জন্যে পাঠকেরও প্রস্তুতির প্রয়োজন রয়েছে। এখন কেউ যদি অশুদ্ধ, অপরিণত ও অর্থহীন শব্দের জঞ্জাল তৈরি করে সেটা নিয়ে মাতামাতি করেন, তা নিয়ে চিন্তিত বা উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। সুধীন দত্তের ভাষায় বলা যায়, অর্বাচীনতা সর্বত্রই উপহাস্য ও পরিত্যাজ্য। সে জ্বলে ওঠে নিভে যাওয়ার জন্যেই।

শামস আরেফিন:  এখন অনেকেই টানাগদ্যে লিখছেন, কেউ কেউ ছন্দবিরোধী কথাও বলছেন। এ বিষয়ে আপনি কী বলবেন? আপনার কি মনে হয়, কবিতা আবার একসময় ছন্দ ও অন্ত্যমিলে ফিরে যাবে?
মিনার মনসুর:
আমি জ্যোতিষী নই। আর কবিতার জগতে জ্যোতিষী যদি কেউ থেকেও থাকেন, আমি আপনাকে আশ্বস্ত করতে চাই যে, এই একটি ক্ষেত্রে কোনো ভবিষ্যদ্বাণী চলে না। তবে এটুকু হয়তো বলা যায় যে, সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ক্রমাগত রূপ বদল সত্ত্বেও কবিতার জন্মগত দুটি বৈশিষ্ট্য—সঙ্গীতময়তা ও রহস্যময়তা হয়তো ডানার মতোই চিরকাল তার দেহের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসেবে থেকে যাবে।

শামস আরেফিন:  আপনার কাব্যভাষা বিনির্মাণে প্রধানতম ভূমিকা হিসেবে কী কাজ করেছে?
মিনার মনসুর:
সেটা আপনারাই ভালো বলতে পারবেন।

শামস আরেফিন: রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ ও আবিদ আজাদ—এ দুজনের সঙ্গে সখ্য ছিল।  সে বন্ধুত্ব কি কবিতার ভাষায় কোনো প্রভাব ফেলেছে? তাদের সঙ্গে আপনার কাব্যভাষার পার্থক্য কোথায়?
মিনার মনসুর:
আমি নিজের মতো করেই লিখি। যখন লিখি, তখন কারও কথাই মনে থাকে না। এমনকি তখন নিজের সচেতন অস্তিত্বটাও গৌণ হয়ে পড়ে। কবিতাটি লিখে ফেলার পর কী লিখেছি, তা ভুলে যাই। শুধু এক অক্ষমতা-অপূর্ণতার বোধ জেগে থাকে। অতএব, বুঝতেই পারছেন, অন্য কারও সঙ্গে নিজের কবিতার তুলনামূলক বিচার করার জন্যে যে-উদ্যম ও আত্মতুষ্টি দরকার আমার মধ্যে তা কখনোই ছিল না। এখনো নেই।

শামস আরেফিন:  আপনার প্রথমদিককার কবিতার বইয়ে দ্রোহ-প্রেম থাকলেও ‘মা এখন থেমে যাওয়া নদী’তে আপনার কবিতায় অনেক ক্ষেত্রেই সিকদার আমিনুল হকের রিফ্লেকশন দেখা যায়। এটা আপনি কিভাবে ব্যাখ্যা করবেন?
মিনার মনসুর: রিফ্লেকশন! সত্যিই? সিকদার আমিনুল হক অনেক বড় কবি। তার ‘সতত ডানার মানুষ’ আমার প্রিয় কাব্যগ্রন্থগুলোর একটি। দেখুন, সুধীন দত্তের মতো আমিও বিশ্বাস করি, আজকের দিনে আদ্যন্ত মৌলিক বলে কিছু নেই। আমরা ক্রমাগত ঐতিহ্যের নবায়ন করে চলেছি। কিভাবে? আজ থেকে ৭০-৮০ বছর আগে সুধীন্দ্রনাথ দত্ত যখন কথাটা বলেছিলেন, তখন ইন্টারনেট নামক আলাদীনের আশ্চর্য প্রদীপটি ছিল না। এখন কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে আপনি জেনে যাচ্ছেন, পৃথিবীর কোথায় কী লেখা বা আঁকা হচ্ছে। এভাবে ঢেউয়ের পর ঢেউ এসে পড়ছে। তার পলি জমা হচ্ছে আমাদের অবচেতনে। আমরা নিজেদের অজান্তে অকাতরে সেখান থেকে ঋণ নিচ্ছি। অতএব, একটি কবিতা যখন নির্মিত হয়, তাতে যে কতজনের কত রকম প্রভাব থাকে, তা নিয়ে বিশাল এক গবেষণা হতে পারে। রবীন্দ্রনাথ-জীবনানন্দের কবিতাও তার ব্যতিক্রম নয়। দেখার বিষয় হলো, শেষ পর্যন্ত নির্মাণটি নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারলো কি না।

শামস আরেফিন: একজন কবি কি রাজনৈতিকভাবে সচেতন হয়ে কবিতা লিখবেন। না, তার কবিতা হবে নিরপেক্ষ মতাদর্শের?
মিনার মনসুর: তরুণ বয়সে সমাজতান্ত্রিক আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে এবং মার্কসীয় সাহিত্যতত্ত্ব পাঠ করে ভাবতাম, কবিকে অবশ্যই রাজনীতিসচেতন হতে হবে। কবিতা হবে সমাজ বদলের হাতিয়ার। এখন বুঝি, কবিতাকে পোষ মানানো যায় না। কবি কবিতার জন্মদাতা হলেও কবিতা কবির ক্রীড়নক নয়। কবিতা সৃষ্টির প্রক্রিয়াটিকেও বাজার করা বা বিদ্যুৎ বিল জমা দেওয়ার মতো শতভাগ সচেতন ক্রিয়া বলা যাবে না। কবি ভাবলেন—এরকম একটি কবিতা লিখবো আর খাতাকলম নিয়ে বসামাত্র তা হয়ে গেলো, ব্যাপারটা মোটেও তত সহজ নয়। আজও ঋষি বাল্মিকীর মতোই কবিকে অবাক হয়ে তার কণ্ঠ বা কলমনিসৃত বাণীর দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়।

শামস আরেফিন:  আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে আগের মতো এখনকার কোনো কবিতা তেমন দেখা যায় না কেন? তাহলে কবিতা কি প্রেম বা সংগ্রামের কোনো কাজেই আর আসবে না বাংলাদেশে?
মিনার মনসুর: কবিতা কোনো কেজো জিনিস নয়। যদিও প্রেমে ও বিপ্লবে আমরা কবিতার দ্বারস্থ হই কিংবা কবিতাদ্বারা আক্রান্ত হই। এটা ঠিক যে একসময় বিষয়ভিত্তিক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কবিতা লেখা হয়েছে। সেগুলোর মধ্যে কিছু কিছু টিকেও গেছে। তবে ফুল যেভাবে ফোটে, পাখি যেভাবে গায়—কবিতাসৃজনের ব্যাপারটাও অংশত তাই। কবি তার অন্তর্গত ব্যাখ্যাতীত কোনো তাড়না থেকে কবিতা লেখেন। লিখে ভারমুক্তির আনন্দও হয়তো পান। কিন্তু ঘটনাচক্রে সেই কবিতাই আমাদের প্রেমের বা বিপ্লবের কাজে লেগে যায়। আমরা তার সঙ্গে অদ্ভুত এক একাত্মতা খুঁজে পাই।

শামস আরেফিন: বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর আপনারাই প্রথম চট্টগ্রাম থেকে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ‘শেখ মুজিব একটি লাল গোলাপ’ নামের সংকলন করেন। এ সম্পর্কে জানতে চাই।
মিনার মনসুর: ওটাই ছিল গ্রন্থাকারে প্রকাশিত বাংলাদেশের প্রথম প্রতিবাদী সংকলন। আমরা ‘শেখ মুজিব একটি লাল গোলাপ’ প্রকাশ করি ১৯৭৯ সালে। এর আগে ১৯৭৮ সালের ১৫ আগস্ট ‘এপিটাফ’ প্রকাশ করি বঙ্গবন্ধুর তৃতীয় শাহাদাৎ বার্ষিকীতে। তখনো দেশে সেনাশাসক জিয়াউর রহমানের সামরিক স্বৈরশাসন চলছে। বঙ্গবন্ধুর স্বঘোষিত ঘাতকদের তাণ্ডব চলছে দেশজুড়ে। ফলে গ্রন্থটি ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছিল। পরে সংকলনটির আরও দুটি সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে।

শামস আরেফিন: অনেক বড় কবিই ভালো লাগা কবিদের নাম জানতে চাইলে এড়িয়ে যান। কিন্তু সমালোচক, কবি, বোদ্ধারা যদি না বলেন বা না জানান, তবে তো সাহিত্যে আগাছায় ভরে যাবে। এ আগাছা সামলানোর দায়িত্ব কার?
মিনার মনসুর: আপনি হয়তো ঠিকই বলেছেন। নাম বলার বিপদও আছে। এমনিতেই এখানে বিপজ্জনকভাবে দলাদলি চলে। রাজনৈতিক ক্ষমতা এবং সংঘশক্তির দাপট খুবই প্রবল। যুক্তির চেয়ে শক্তিই অধিক কার্যকর। ফলে নাম বলে কেউ উটকো ঝামেলায় জড়াতে চান না। আবার চালাকির একটা ব্যাপারও যে আছে—তাও অস্বীকার করা যাবে না পুরোপুরি। তবে এর সঙ্গে আগাছা বাড়া না বাড়ার তেমন জোরালো কোনো সম্পর্ক আছে বলে তো আমার মনে হয় না। যত উৎপাতই করুক, আগাছা আগাছাই। তা এমনিতেই বাতিল হয়ে যাবে। আর যদি দায়িত্বের কথাই বলেন, তাহলে প্রথমেই সাহিত্য পাতার সম্পাদকদের কথা বলতে হয়। বলতে হয় সমালোচকদের কথাও। এক সময় সিকান্দার আবু জাফর, আহসান হাবীব ও হাসান হাফিজুর রহমানের মতো সম্পাদকরা সেই দায়িত্ব পালনও করেছেন নিষ্ঠার সঙ্গে। কিন্তু এখন বাস্তবতা এতটাই বদলে গেছে যে, সাহিত্য পাতাগুলোই বরং আগাছা উৎপাদনের কারখানায় পরিণত হয়েছে। পাশাপাশি, নানা প্রভাব ও প্রযুক্তির বদৌলতে এখন যে কেউ ইচ্ছে করলেই বই প্রকাশ করতে পারে। এজন্যে কোনো প্রস্তুতির প্রয়োজন হয় না।

শামস আরেফিন: আপনি চাকসুর বার্ষিকী সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন। সেই  স্মৃতি ও বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের উত্তাল তারুণ্যের স্মৃতি যদি রোমন্থন করেন?
মিনার মনসুর: দেশ স্বাধীন হয়েছে। অতুলনীয় সেই আনন্দের জোয়ারে আমরা যখন ভাসছি, ঠিক তখনই ঘটে যায় আমাদের ইতিহাসের নৃশংসতম সেই হত্যাযজ্ঞ। ভাবুন তো একবার, মাত্র সাড়ে তিন বছর আগে যে-মানুষটির নেতৃত্বে আমরা অসম্ভবকে সম্ভব করেছিলাম, তাকেই আমরা সপরিবারে হত্যা করলাম রাতের অন্ধকারে। শিশু, গর্ভবতী নারী—কেউ রক্ষা পেলো না। এর চেয়ে কাপুরুষতা আর কী হতে পারে! গোটা দেশ স্তব্ধ হয়ে গেল বেদনায়, বিস্ময়ে।

আমি তখন সবেমাত্র এসএসসি পাস করেছি। নারকীয় সেই হত্যাযজ্ঞের কয়েক মাস পরেই শুরু হয় আমার কলেজ জীবন। সমগ্র সত্তাই তখন আমাকে বলছিল: অস্ত্র হাতে নাও। কিন্তু পারিনি। পারিনি বলেই কলমকে অস্ত্র বানাতে চেয়েছিলাম। সেই সূত্রে জড়িয়ে পড়েছিলাম প্রত্যক্ষ রাজনীতির সঙ্গে। ওবায়দুল কাদের ও বাহালুল মজনুন চুন্নুর নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে আমি যেবার বার্ষিকী সম্পাদক নির্বাচিত হই, সেবার আরও একটি অভাবনীয় ঘটনা ঘটেছিল স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে। ভিপি-জিএসসহ চাকসুর ২৭টি পদের মধ্যে ২৪টিতেই জয়ী হয়েছিল জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র শিবির। বার্ষিকী সম্পাদকসহ মাত্র তিনটি পদে জয়ী হয়েছিলাম আমরা। ফলে চাকসুতে জয়ী হওয়ার পরও আমাকে ঘরেবাইরে লড়াই চালিয়ে যেতে হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে ছিল শিবিরের ক্রমবর্ধমান আগ্রাসী তৎপরতা আর বাইরে ছিল একাত্তর ও পঁচাত্তরের ঘাতক পরিবেষ্টিত সামরিক জান্তার তাণ্ডব।

এই যে জীবনপণ লড়াই, প্রতিমুহূর্তে জীবন নিয়ে এই যে অনিশ্চয়তা, সেই সময়টাকেই এখন সবচেয়ে স্বাধীন এবং সবচেয়ে মূল্যবান বলে মনে হয়। মার্কেজের ‘লাভ ইন দি টাইম অব কলেরা’র উদাহরণ টেনে বলা যায়, সেটাই ছিল আমাদের সর্বোৎকৃষ্ট প্রেমের সময়, জীবনকে সবচেয়ে গভীরভাবে ভালোবাসার সময়।

শামস আরেফিন: কবিতায় দীর্ঘ বিরতির কারণে অনেকে বলেন আপনি এক সময় কাব্যজীবনকে তালাক দিয়েছিলেন? আর এখন একের পর এক এপার বাংলা ওপার বাংলা থেকে কবিতার বই প্রকাশিত হচ্ছে। আপনার অনুভূতিটা কেমন এ ব্যাপারে?
মিনার মনসুর: দীর্ঘ বিরতির ব্যাপারটা অসত্য নয়। তার একটা ব্যক্তিগত এবং রাজনৈতিক পটভূমিও আছে। আপাতত শুধু এটুকু বলি যে, এ জন্যে আমাকে অনেক মূল্যও দিতে হয়েছে। চুলো জ্বালিয়ে রাখতে হয়। অদর্শন- অচর্চায় বড় প্রেমও মরে যায়। ফিরে আসাটা মোটেও সহজ ছিল না আমার জন্যে। তাই আনন্দটাও অনেক বেশি।

শামস আরেফিন: রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহকে নিয়ে আপনার অসাধারণ একটি প্রবন্ধ আছে। প্রবন্ধটি ঠিক রুদ্র’র মৃত্যুর পরপর লেখা। এ লেখাটি কেন কোনো জাতীয় দৈনিকে আপনি প্রকাশ করেননি?
মিনার মনসুর:
ঈদের ছুটিতে এক বন্ধুর গাড়িতে চট্টগ্রাম যাওয়ার পথে সেই অবিশ্বাস্য খবরটি পাই। ফিরে আসার উপায় ছিল না। সারাপথ যন্ত্রণায় বিদ্ধ হয়েছি। অদ্ভুত এক বিষাদ আমাকে গ্রাস করে ফেলে। কোনো কিছুর সঙ্গেই আমি আর নিজেকে যুক্ত করতে পারছিলাম না। ঘরের দরোজা বন্ধ করে তখনই লিখতে বসি। লেখাটি শেষ করার পর আমি আবার নিজেকে ফিরে পেতে শুরু করি। আমি আত্মায় বিশ্বাস করি না। কিন্তু আমার মনে হয়েছে, রুদ্রের আত্মা আমার ওপর ভর করেছিল। অনেক দিন পর্যন্ত আমার মধ্যে এমন একটা বিশ্বাস কাজ করেছিল যে, এটা খুবই ব্যক্তিগত একটি লেখা। পরে অবশ্য কোনো রদবদল ছাড়াই একাধিক পত্রিকায় তা ছাপা হয়েছে।

শামস আরেফিন: সিকদার আমিনুল হকের সঙ্গে আপনার অনেক স্মৃতি আছে। এর মাঝে সবচেয়ে বেদনাবিধুর ও সুখকর স্মৃতিটা জানতে চাই।
মিনার মনসুর:
এলিফ্যান্ট রোড ছেড়ে যাওয়ার কারণে তার সঙ্গে যোগাযোগ কঠিন হয়ে পড়েছিল। এর মধ্যে চিকিৎসার জন্যে ব্যাংককেও ছিলেন বেশ কিছুদিন। দীর্ঘ অসাক্ষাতের পর আমি হঠাৎ করে তার গুলশানের বাসায় হাজির হয়েছিলাম। আমাকে দেখে তিনি খুব খুশি হয়েছিলেন। পীড়াপীড়ি করছিলেন তার সঙ্গে রাতের খাবারে অংশ নেওয়ার জন্যে। তিনি খুব খাদ্যরসিক ছিলেন। কিন্তু সেদিন খাবার টেবিলে ছিল পাস্তা আর কিছু সবজি সেদ্ধ। বলছিলেন, ‘বুঝলেন মিনার, আমি এখন এসব স্বাস্থ্যকর খাবার খাই। আপনার তো গরুর মাংস ছাড়া চলে না।’ হঠাৎ একটি বিয়ারের ক্যান আমার দিকে ঠেলে দিয়ে বললেন, ‘নেন। আমি তো খাই না।’ সিকদার ভাইয়ের সঙ্গে বহু সন্ধ্যা কাটিয়েছি সাকুরায় কিংবা তার বাসায়। তার মুখে হঠাৎ একথা শুনে আমার বুকটা হু হু করে উঠেছিল। আমি সেই বিয়ার স্পর্শও করিনি। সেটাই ছিল আমাদের শেষ সাক্ষাৎ। আমি কল্পনাও করতে পারিনি যে মাত্র চব্বিশ ঘণ্টার ব্যবধানে আমাকে সেই ভয়ঙ্কর কথাটি শুনতে হবে।

সুখস্মৃতি অনেক। সবচেয়ে মধুর স্মৃতিটি হলো তার জীবনাশঙ্কার কথা শুনে আমি কলকাতার বিড়লা হাসপাতালে ছুটে গিয়েছিলাম। ১৪ দিন ছিলাম সেখানে। তিনি সেরে ওঠার পর কলকাতার বিখ্যাত একটি ক্লাবে আমরা (আমি, সিকদার ভাইয়ের বন্ধু ও তৎকালীন মন্ত্রী মাইদুল ইসলাম মুকুল, জলি ভাবী এবং সিকদার ভাইয়ের কনিষ্ঠ পুত্র বান্টি) বিয়ারসহযোগে তা উদযাপন করেছিলাম। ভালো লাগার সেই অনুভূতি ভোলার মতো নয়।

শামস আরেফিন:  সিকদার আমিনুল হককে নিয়ে আপনি সম্ভবত সর্বাধিক প্রবন্ধ লিখেছেন। আর কোনো কবিকে নিয়ে আপনার এত গদ্য নেই। কারণটা জানতে পারি?
মিনার মনসুর:
প্রথম কারণ ভালো লাগা। দ্বিতীয় কারণ তিনি খুব উপেক্ষিত ছিলেন। কবি হিসেবে যতটা গুরুত্ব ও স্বীকৃতি তার পাওয়া উচিত ছিল জীবদ্দশায়, মৃত্যুর পরেও তা তিনি পাননি। অথচ এদেশে তার সঙ্গে তুলনীয় কবির সংখ্যা অতি নগণ্য।

শামস আরেফিন: বাংলাদেশের আর্থসামাজিক বাস্তবতা ও তরুণ কবির ভবিষ্যৎ কী হতে পারে?
মিনার মনসুর: বিশ্বগ্রাম বা গ্লোবাল ভিলেজ বলে যে কথাটি আজকাল প্রায় শোনা যায়, বাংলাদেশও তার আবর্তের বাইরে নয়। এক্ষেত্রে আলাদিনের আশ্চর্য চেরাগ হিসেবে কাজ করেছে বিশ্বায়ন ও প্রযুক্তি। অতএব, বাংলাদেশের আর্থসামাজিক বাস্তবতাকে এখন বিশ্ব বাস্তবতা থেকে খুব একটা আলাদা করে দেখার অবকাশ নেই বললেই চলে। বাংলাদেশকে  যে আলাদাভাবে উপস্থাপন করা যাবে না, তা নয়। সেটা করতে হলে ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির শরণাপন্ন হওয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই। কবিতাতীর্থের তরুণ অভিযাত্রীকে অবধারিতভাবে বিশ্ব এবং বঙ্গ—উভয় উৎস থেকেই যত অধিক পরিমাণে সম্ভব মণিমুক্তো আহরণ করে নিজেকে সমৃদ্ধ করতে হবে। আর তার উপায় তো একটাই—পড়া। স্থান-কালনির্বিশেষে কবিযশোপ্রার্থীদের জন্যে কথাটি আগে যেমন প্রযোজ্য ছিল, এখন আরও বেশি করে প্রযোজ্য। কারণ বিশ্বায়ন ও প্রযুক্তি কাজটিকে অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় অধিকতর চ্যালেঞ্জিং করে তুলেছে। তরুণদের মনে রাখতে হবে যে আগে কবিকে লড়তে হতো মূলত তার দেশ ও দশকের সঙ্গে, এখন লড়াইটা বিশ্বজনীন।

শামস আরেফিন: আপনি যদি এ মুহূর্তে বয়সে নবীন হতেন, তবে কবি হওয়ার জন্য কী করতেন?
মিনার মনসুর: পরিকল্পনা করে তো আর কবি হওয়া যায় না!  আমি মনে করি, এটা এক ধরনের নিষ্কাম কর্ম এবং তা কারও ইচ্ছাধীন নয়। ইচ্ছাধীন হলে সাহিত্যের অধ্যাপকরা সবাই কবি হয়ে যেতেন। কবিতার বীজটা ভেতরে থাকতে হয়, যদিও সেটা কোত্থেকে কিভাবে আসে, তা কেউ জানে বলে মনে হয় না। তবে এটুকু বলা যায় যে বীজটাকে বৃক্ষে বা মহাবৃক্ষে পরিণত করতে হলে পড়া এবং পড়ার কোনো বিকল্প নেই। আসলে এটা একটা সাধনা। সর্বস্ব পণ করে এ সাধনাকে সফল করতে হয়। পরিণত বয়সের এ বোধ নিয়ে তরুণ বয়সে ফিরে যেতে পারলে আমিও নিশ্চিতভাবে তাই করতাম।

শামস আরেফিন: সত্তরের কবিদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য, তারা প্রতিবাদপ্রবণ ও সংগ্রামী এবং অবশেষে রোমান্টিক। সম্ভবত স্বাধীনতা আন্দোলন,  স্বৈরশাসনপরবর্তী সামাজিক অবক্ষয়ই তাদের সরাসরি প্রতিবাদ করতে উদ্বুদ্ধ করে। যদি রুদ্র, আবিদ আজাদ, কামাল চৌধুরী ও আসাদ মান্নানসহ আপনাদের সমসাময়িক কবিদের কবিতার বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে কী বলবেন?
মিনার মনসুর: সত্তরের কবিতা প্রধানত হৃদয়জাত। যার অনেকটাই জুড়ে আছে তীব্র দেশাত্মবোধ।

শামস আরেফিন: আপনার কবিতা অনেক ক্ষেত্রেই উপমাপ্রধান ও নতুন শব্দনির্ভর। যেমন ‘মহাপরাক্রান্ত পতাকা’, ‘সমুদ্রের সম্মোহন’, ‘শীতের তীক্ষ্ণ দাঁত’, ‘প্রিয়তম দশকেরা’, ‘ধুলোর চাবুক’, ‘বাঁধভাঙা প্রাণের প্লাবন’, ‘রূপসী রাজনীতি’, ‘বর্ষণের তীক্ষ্ণ শর’, ‘বাচালতার বীজ’; তখন শব্দগত দিক থেকে কি আমরা আপনাকে সত্তরের আবুল হাসান বললে ভুল হবে?
মিনার মনসুর: এ প্রশ্নের উত্তর আমি আগে দিয়েছি। তবু হক ভাইয়ের কথা ধার করে বলি, আমি প্রতিদিন নতুন করে শুরু করি। গতকাল কী লিখেছি তা ভুলে যাই। শব্দের অন্তর্গত যে সঙ্গীত বা ঝঙ্কার, তা আমাকে আকর্ষণ করে—এটা ঠিক। তবে আমি থেমে নেই। আপনি লক্ষ করে থাকবেন যে, আমার কবিতা ক্রমশ টানা গদ্যকেই অধিক আপন করে নিচ্ছে।

শামস আরেফিন:  আপনার বন্ধুদের অনেকে বাংলা একাডেমি, একুশে পদকসহ নানা পুরস্কার পেলেন। কবি কখনো স্বীকৃতির জন্য লেখে না, পাঠকের জন্য লেখে। তবু স্বীকৃতি কি ভালো লিখতে উৎসাহ দেয় না?
মিনার মনসুর:
কবি ঠিক পাঠকের জন্যেও লেখেন না। আমি আগেও বলেছি, এটা তার (কবির) আজ্ঞাবহ বা ইচ্ছাধীন কোনো কর্ম নয়। অবস্থাটা এমন হয় যে, তিনি না লিখে থাকতে পারেন না। একটা পর্যায়ে কবি আবিষ্কার করেন যে, লিখে তিনি আনন্দ পান। আবার সেই আনন্দ একলাফে কয়েক গুণ বেড়ে যায়, যখন অন্য কেউ সেই লেখাটির সঙ্গে একাত্মতা অনুভব করেন। তখনই কবি ও কবিতার মাঝখানে পাঠকের আবির্ভাব ঘটে। কবি ক্রমশ তার সঙ্গে অচ্ছেদ্য এক বন্ধনে জড়িয়ে পড়েন। তারপরও কবিতাকে আমি নিষ্কাম কর্ম বলেই মনে করি। তবে অস্বীকার করা যাবে না যে, পাঠকের মতোই প্রশংসা ও স্বীকৃতি ইত্যাদিরও একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রয়েছে কবির জীবনে। তার ভেতরে বিশাল যে-চুল্লিটি রয়েছে, সেটাকে জ্বালিয়ে রাখতে যত ধরনের জ্বালানি লাগে তার মধ্যে এটাও অন্যতম। আমার কোনো কোনো বন্ধু ইতোমধ্যে শতাধিক পুরস্কার ও স্বীকৃতি পেয়েছেন। তাদের সৃজনকর্মের চেয়েও পুরস্কার বা সম্মাননার প্রাপ্তির গতি অধিক দ্রুতগামী। এসব ব্যাপারে আমার মধ্যে এক ধরনের সহজাত নিস্পৃহতা আছে। তারপরও যখন পা দুটো একেবারেই থেমে যেতে চায়, আমি নিজেকে এই বলে সান্ত্বনা দেই যে, আমি তো সামান্য মানুষ। অনেক মহৎ কবির ভাগ্যেও কোনো স্বীকৃতি জোটেনি।

মন্তব্য

চিন্তাসূত্রে প্রকাশিত কোনও লেখা পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।