ভোরবাসী বালকেরা ও অন্যান্য ॥ আবু মকসুদ | চিন্তাসূত্র
৭ অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ | ২১ নভেম্বর, ২০১৮ | দুপুর ২:২২

ভোরবাসী বালকেরা ও অন্যান্য ॥ আবু মকসুদ

মানুষের মুখ
চাঁদ পৃথিবী
পৃথিবী করে সূর্য প্রদক্ষিণ,
আমিও ঘুরতে থাকি প্রতিনিয়ত
কিন্তু মানুষের প্রদক্ষিণ সম্পন্ন
করতে পারি না।

প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে
শিখছি অসংখ্য ভাষা, হর্ষলয়ে
কিংবা দীর্ঘ সুরে গেয়ে যাই প্রলম্বিত গীত
অথচ মানুষের ভাষাই এখনো
আত্মস্থ করতে পারিনি।

পাড়ি দিয়েছি সাগর
তুষার মাড়িয়ে পৌঁছেছি
এভারেস্টে, কাঙ্ক্ষা রাখি
মঙ্গলে পদচিহ্ন আঁকার
শুধু জানি না কী করে
মানুষে পৌঁছানো যায়।

আমোদিত হই প্রাকৃতিক ঝর্ণায়
বৃষ্টি বিকেলে সাত রঙ রঙধনু
পাড়ি দিয়ে দেখি গোধূলি
দেখা হয় না শুধু ঘরে ফেরা
মানুষের মুখ।

দুর্ঘটনায় পতিত ষাঁড়ের কষ্টে
ভেজাই তুলার বালিশ, পুকুর
শুকিয়ে গেলে নিজস্ব উদ্যোগে
যাই জলের খোঁজে
শুধু মানুষের পতনে
কম্পিত হয় না আমার হৃদয়।

মানুষে হাঁটি, মানুষের
মিছিলে হেঁটে বাড়ি ফিরি
ঘুম ভেঙে পুবের জানালায়
দেখি মানুষের মুখ, তবুও নিজেকে
মানুষ ভাবতে পারি না

ভোরবাসী বালকেরা
আমাদের ছেলেবেলার নদী হাফপ্যান্ট পরে
চলে যেত দূরে, বহুদূরে-
তার পথ চেয়ে একদল ভোরের বালক
কাতর হতো, তাদের কাতরতা নদীকে
স্পর্শ করতো কি না, এখন তা জানার উপায় নেই
তবে নদী ফিরতো না, নিরুদ্দেশ ভালোবেসে
থেকে যেতো দূর পরদেশে
বালকেরা অপেক্ষা করতে করতে
ফিরে যেতো বিষণ্ণ বারান্দায়
আর ধীরে ধীরে নিজেদের আদুল
গা ঢাকতে ঢাকতে দেখত
অবিশ্বাসী নদীর মতোই নিরুদ্দেশ হয়েছে
তাদের যাবতীয় বিশ্বাস, ছেলে ভোলানো গল্পে
তারা আর মোহিত হয় না
নদীর সাথেই হারিয়েছে
জীবনের সব নীতি বাক্য বলি।

আমাদের ছেলেবেলার গ্রাম তরুণী ছিল
শরতের সন্ধ্যায় সাদা সাদা মেঘে চড়ে
সে যেত বৃষ্টি পাড়ায়, তারপর দুই সখি
যুগলে নেমে পড়তো পূর্ণ চাঁদের স্নানে
আমরা পাড়ে দাঁড়িয়ে দেখতাম আর
ভাবতাম এমন জুড়ি ত্রিভুবনে কোথাও পাব না
আমাদের ভাবনার মাঝেই গ্রাম হঠাৎ যুবতি
হয়ে উঠত, বিয়ের আলাপের জের ধরে
আস্তানা গাড়ত পাশের শহর,
আমরা দেখতাম উচ্ছল তরুণী গ্রাম অযাচিত
দাম্পত্যের ক্রমাগত অত্যাচারে মিইয়ে পড়েছে
শরতের মেঘ তাই পাঠাতো না নিমন্ত্রণ,
দুঃখে কষ্টে আর অভিমানে শয্যায় লুটিয়ে পড়া
আমাদের তরুণী গ্রাম দেখতো
চিতাভষ্মের পাশে তার অতৃপ্ত বিদায়বেলা

যাবতীয় ক্লান্তির পালক
ছেলেবেলায় আমাদের বাড়িগুলো বাড়ি ছিল
মায়ের মমতার মতো তারা আমাদের আগলে রাখতো
বাড়িগুলোর মাটির মেঝেতে পাটি পেতে শুয়ে

আমরা চলে যেতাম স্বপ্নরাজ্যে, যেখানে
রাজার কুমারী কন্যা সিথানে দাঁড়িয়ে পালকের
পাখায় তাড়িয়ে দিতো আমাদের যাবতীয় ক্লান্তি
বাড়ির টিনের ছাদে বর্ষার অবিরাম গান
আমাদের সপ্তসুরে বাঁধতে চাইলে, মাজা পুকুরের
ব্যাঙ পাঠাত স্নানের নিমন্ত্রণ, আমরা নেমে যেতাম
অনন্তকালের স্নানে। পুকুরের জল ছুঁয়ে বেড়ে
ওঠা নেবু-গাছগুলো তাদের নির্লজ্জতা দেখিয়ে
লোভ জাগাতো, শরীরে খিধে জেগে উঠলে
অসমাপ্ত স্নান শেষে ফিরতাম, চাটাইয়ে
সাজানো মাটির সানকিতে আমাদের মায়েরা
ঢেলে দিতো বকুল ফুলের মতো ধবধবে সাদা ভাত
শর্ষে ইলিশ আর কাঁচা লঙ্কায় পূর্ণ উদরে আমরা
ছেলেবেলার বাড়ি দাপিয়ে বেড়াতাম।

বাড়ির লেপা উঠানে ক্রমাগত পায়ের ছাপ
এঁকে এঁকে আমরা বড় হয়ে উঠলে দেখতাম
বাড়িগুলো আর বাড়ি নয় তারা হয়ে উঠেছে
ইট, কাঠ, কংক্রিটের তথাকথিত বাসা-
কৃত্রিম ঝর্ণা কিংবা বাথটাবের জলে আমাদের
ছেলেবেলার বাড়ি গুমরে মরে, ক্লান্ত দেহ
মেঝেতে আশ্রয়ের খোঁজে লুটিয়ে পড়লে
সারা শরীরে অনুভূত হয় অযাচিত ইটের ধর্ষণ

মন্তব্য

চিন্তাসূত্রে প্রকাশিত কোনও লেখা পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ।